১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকালে হিরোশিমা শহরের আকাশে কোনো বিকট শব্দ হয়নি। যাঁরা সেই মুহূর্তে বেঁচে ছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই বলেছেন, তাঁরা কোনো বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনেননি। শুধু একটা অদ্ভুত সাদা আলোর ঝলকানি, অথবা তারও প্রতিচ্ছায়া, চোখের সামনে দিয়ে চলে গিয়েছিল। তারপর যা ঘটেছিল, তা ভাষায় ধরার মতো কিছু নয় ।

ইয়োকোগাওয়া স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এক দম্পতি আকাশে একটা বি-টোয়েন্টিনাইন বিমান আর তার থেকে ছেড়ে দেওয়া একটা প্যারাশুট দেখেছিলেন। ভাবার আগেই তাঁরা জ্ঞান হারান। যখন চোখ খোলেন, দেখেন শরীর পোড়া, জামাকাপড় নেই, আর চারপাশের সব বাড়িঘর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। এই দৃশ্যই সেদিন হিরোশিমার প্রায় প্রতিটি মানুষের ভাগ্যে লেখা ছিল, শুধু দূরত্বের হিসেবে তীব্রতার তফাত।

এই ঘটনার কেন্দ্রে ছিলেন কিয়োশি তানিমোতো, স্থানীয় এক গির্জার পাদ্রি এবং তাঁর পাড়ার প্রতিরক্ষা সমন্বয়কারী। বিস্ফোরণের সময় তিনি শহরের কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে ছিলেন বলে বেঁচে যান। কিন্তু বেঁচে যাওয়ার সেই মুহূর্তেই তাঁর মাথায় একটাই চিন্তা কাজ করছিল, তাঁর স্ত্রী আর সদ্যোজাত মেয়ে কোকো কোথায়, কেমন আছে।

বোমা হামলার পর হিরোশিমা নাগারেকাওয়া গির্জা, যেখানে তানিমোতো ধর্মযাজক ছিলেন। কার্টেসি : কোকো কোন্দো

কোই এবং ফুকুশিমা সেতু পেরিয়ে বিস্ফোরণস্থলের প্রায় এক কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে তানিমোতো যা দেখলেন, তার সঙ্গে আগের কোনো অভিজ্ঞতার তুলনা চলে না। শহরতলির বাড়িগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু কেন্দ্রের কাছাকাছি সব বাড়ি মাটিতে চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে ছিল, যেন কেউ খেলনার বাড়ি হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ভাঙা বাড়ির নিচ থেকে ভেসে আসছিল “তাসুকেতে” অর্থাৎ “বাঁচাও” চিৎকার।

তানিমোতো জানতেন, ধসে পড়া বাড়ি থেকে একটা কাঠের গুঁড়ি সরানোই একজন মানুষের একার পক্ষে কতটা কঠিন, কারণ আগে তিনি এমন কাজে হাত লাগিয়েছেন। একার শক্তিতে এই মানুষগুলোর জন্য কিছুই করার উপায় ছিল না। অথচ চারদিকে, মাটির নিচে, মানুষ চাপা পড়ে আছে, এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া সহজ ছিল না।

নিজের স্ত্রী, সন্তান আর প্রতিবেশীদের কথা ভেবে তিনি ছুটতে শুরু করেন। তাঁর কাঁধে দায়িত্ব ছিল একশো বিশজন মানুষের জীবনের। পথে দেখা হয় সহকর্মী মাৎসুওর সঙ্গে, কিন্তু ক্ষমা চেয়ে তিনি থামেননি, দৌড়ে চলে যান। রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা আহত মানুষদের দেখে তিনি নিজের টুপি খুলে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলেন, কারণ নিজে অক্ষত থাকার কোনো যুক্তি তাঁর কাছে ছিল না। মনে হচ্ছিল, তাঁর স্ত্রী-সন্তানও নিশ্চয়ই এই মানুষগুলোর মতোই কোথাও চাপা পড়ে আছে।

স্বাভাবিক পথ, মিসাসা সেতু হয়ে হাকুশিমা যাওয়ার রাস্তা, ততক্ষণে আগুনে ঘেরা। শুধু ওতা নদীর অপর পাড়ের উশিতা এলাকা তখনও আগুন থেকে রক্ষা পেয়েছিল। সেই পথ পেরোতে পারলেই নিজের পাড়া নোবোরিচো হাতের নাগালে। আর কোনো উপায় না দেখে তানিমোতো নদীতে ঝাঁপ দেন। সাঁতারে তেমন দক্ষতা ছিল না তাঁর, স্রোতও ছিল প্রবল, আর প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দৌড়ানোর ক্লান্তি শরীরে। পানি নাকেমুখে ঢুকতে থাকে, শরীর ভারী হয়ে ডুবতে শুরু করে। জুতো, কোট, গেইটার সব খুলে ফেলে হালকা হয়ে তিনি শেষ শক্তিটুকু দিয়ে সাঁতরে পাড়ে পৌঁছান।

পাড়ে উঠে কিছুক্ষণ মাথা মাটিতে রেখে শুয়ে থাকার পর তিনি আবার হাঁটা শুরু করেন উশিতার দিকে, সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায়, শুধু শরীরে পোড়ার দাগ না থাকাটাই তাঁকে বাকিদের থেকে আলাদা করছিল। গির্জার কোষাধ্যক্ষের বাড়িও ধসে পড়েছিল, খালি পড়েছিল উশিতার রাস্তাঘাট, মনে হচ্ছিল সবাই পালিয়ে গেছে।

কাছেই ছিল মিসেস তাদার বাড়ি, যেখানে তাঁর স্ত্রী প্রায়ই রাত কাটাতেন। যদি সেদিন সকালেও সেখানে থেকে যান, তাহলে হয়তো বেঁচে গেছেন, এই আশা নিয়ে তিনি এগিয়ে যান। আর তখনই, শরণার্থীদের সারিতে, নিজের মেয়ে কোকোকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রীকে দেখতে পান। রক্তমাখা পোশাক, এলোমেলো চুল, ভূতের মতো চেহারা, তবু জীবিত।

স্ত্রী ফিরে তাকান, চোখে জল, কিন্তু কথা বলেন না প্রথমে। তানিমোতো চোখ সরিয়ে জিজ্ঞেস করেন কী হয়েছিল। উত্তরে জানা যায়, বাড়ি ফেরার পরপরই প্রতিবেশী মিসেস তাকাকি দেখা করতে এসেছিলেন, দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলার সময়েই তাঁরা চাপা পড়ে যান। মিসেস তাকাকির পরে কী হয়েছিল, তা তাঁর স্ত্রীও জানতেন না।

এই মুহূর্তে তানিমোতোর মনে যে অনুভূতি খেলা করেছিল, তা স্বস্তির বদলে ছিল এক ধরনের ক্ষোভ। একজন গির্জার সদস্য, যিনি নিছক দেখা করতে এসেছিলেন, তিনি মারা যাবেন, আর পাদ্রির পরিবার বেঁচে যাবে, এটা তাঁর কাছে অন্যায্য মনে হয়েছিল। এই আত্মজিজ্ঞাসা এবং অপরাধবোধ যুদ্ধ-পরবর্তী বেঁচে যাওয়া মানুষদের মনস্তত্ত্বের একটা সাধারণ চিহ্ন, যাকে গবেষকরা পরবর্তীতে “সারভাইভার্স গিল্ট” নামে চিহ্নিত করেছেন।

পরে জানা যায়, বিস্ফোরণের মুহূর্তে তানিমোতোর স্ত্রী বাড়ির নিচে চাপা পড়ে প্রায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, কাঠের চাপে জ্ঞান হারানোর দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু কোলে থাকা কোকোর কান্নার শব্দে জ্ঞান ফিরে আসে। দুই হাত ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকলেও একটু নড়াচড়ার সুযোগ পেয়ে তিনি চিলেকোঠায় একটা ছোট্ট ফাঁক খুঁজে পান। প্রতিবার নড়ার চেষ্টায় মাথায় ভাঙা চালের টুকরো পড়ছিল, কোকো কাঁদছিল অবিরাম। তবু তিনি ফাঁকটা বড় করেন, প্রথমে মেয়েকে ঠেলে বের করেন, তারপর নিজে বেরিয়ে আসেন।

পাশের বাড়িতে ততক্ষণে আগুন লেগে গেছে, ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে চারপাশ। মেয়েকে কোলে নিয়ে তিনি গলিপথ ধরে হাঁটতে থাকেন, মিসেস তাকাকির জন্য সাহায্য খুঁজতে চেয়েও কোনো বাড়িতে কাউকে পাননি, সব ভাঙা, সব খালি। আগুন আর ধোঁয়ার তাড়া খেয়ে অবশেষে তিনি সেন্তেই বাগানে গিয়ে পৌঁছান। কিন্তু মনটা পড়ে ছিল সেই প্রতিবেশীর কাছেই, যাঁকে তিনি বাঁচাতে পারেননি।

তানিমোতোর এই স্মৃতিকথা কেবল একটি পরিবারের বেঁচে থাকার গল্প নয়। এটি সেই সব হাজারো মুহূর্তের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক দলিল, যেখানে একটি শহরের প্রতিটি মানুষ একই সঙ্গে উদ্ধারকারী এবং অসহায় দর্শক হয়ে উঠেছিলেন। যে নদী তাঁকে প্রায় ডুবিয়ে দিয়েছিল, সেই একই নদীই তাঁকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিল, এই বৈপরীত্যই যেন হিরোশিমার সেই সকালের সবচেয়ে নিষ্ঠুর রূপক।

দ্য গার্ডিয়ানে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি অনুবাদিত স্মৃতিকথার অংশবিশেষ অবলম্বনে।
মূল স্মৃতিকথার সম্পূর্ণ অংশ পড়তে পারেন এই বই থেকে Hiroshima, 8:15: The Lost Memoir by Kiyoshi Tanimoto

Scroll to Top