দ্য পাবলিশ
একটা খবর প্রকাশ পেতে এখন কয়েক সেকেন্ড লাগে। আর একটা ঘটনা বুঝতে কখনো কখনো কয়েক দশক লাগে। এই দুই সময়ের মাঝখানে যে ফাঁকটুকু তৈরি হয়, আমরা প্রতিদিন তার ভেতর দিয়ে হাঁটি, প্রায় লক্ষ্যই করি না।
মানুষের ইতিহাসে এমন কোনো সময় ছিল না, যখন এত তথ্য এত দ্রুত এত মানুষের হাতে পৌঁছেছে। একটা বিস্ফোরণ ঘটার পাঁচ মিনিটের মধ্যে ছবি ছড়িয়ে পড়ে। একটা বিবৃতি দেওয়ার আগেই তার প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়ে যায়। যা কিছু ঘটছে, তার প্রায় সবকিছুই আমরা জেনে যাচ্ছি, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। এখন, ঘটনা জানার পরিমাণ যত বেড়েছে, ঘটনা বোঝার সময় ততটাই কমেছে। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য শিরোনাম পড়ি, কিন্তু কোনো শিরোনামের পেছনের প্রশ্নগুলো নিয়ে বসার সময় পাই না। কেন এটা ঘটল, এর আগে কী ঘটেছে, এর ফল কী হতে পারে। এখন আর তথ্যের অভাব নাই, আছে ব্যাখ্যার।
আমরা সংবাদ পাই ভাসমান আকারে। একটা ঘটনা, বিচ্ছিন্ন, নিজের প্রেক্ষাপট থেকে কাটা। একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আসে, আমরা তার প্রতিক্রিয়া জানি, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পেছনের ঘটনা, তার অর্থনৈতিক যুক্তি, তার সামাজিক পরিণতি, এসব বোঝার জন্য যে সময় ও মনোযোগ দরকার, তা আমাদের নিউজ ফিডের গঠনের মধ্যেই নাই। প্রতিটি প্ল্যাটফর্ম আমাদের দ্রুত সরে যেতে শিখায়। একটা পোস্ট থেকে আরেকটা পোস্টে, একটা বিতর্ক থেকে আরেকটা বিতর্কে। মনোযোগ এখন একটা সীমিত সম্পদ, আর সেই সম্পদ নিয়ে প্রতিটি হেডলাইন প্রতিযোগিতা করছে অন্য হাজারো হেডলাইনের সাথে। এই প্রতিযোগিতায় যা টিকে থাকে, তা প্রায়ই সবচেয়ে জরুরি খবর না, সবচেয়ে দ্রুত হজমযোগ্য খবর। যার রসকষ বেশি।
বহির্বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশে এই সংকট আরও তীব্র, কারণ এখানে পরিবর্তনের গতি অস্বাভাবিক রকম বেশি। রাজনীতি বদলায় রাতারাতি। অর্থনীতির চেহারা বদলায় তাড়াতাড়ি। শহর বদলায়, ভাষা বদলায়, তরুণদের চিন্তাভাবনা বদলায়, আর এই সবকিছুর মধ্যে সংবাদমাধ্যমের কাজ হয়ে দাঁড়ায় শুধু সেই পরিবর্তনের গতির পেছনে দৌড়ানো। কী ঘটল, তা জানানোই যথেষ্ট মনে হয়। কেন ঘটল, তা জানানোর সময় বা সংস্থান, কোনোটাই সবসময় থাকে না। ফলে আমরা একটা সমাজে বাস করি, যে সমাজ প্রতিদিন প্রচুর তথ্য পায়, কিন্তু নিজেকে বোঝার মতো যথেষ্ট প্রেক্ষাপট পায় না।
এটা কোনো নির্দিষ্ট পত্রিকা বা প্রতিষ্ঠানের দোষ না। এটা একটা সিস্টেমের বাস্তবতা। ব্রেকিং নিউজের অর্থনীতি এমনভাবেই তৈরি, যেখানে গতি পুরস্কৃত হয় আর ধৈর্য পায় শাস্তি। ফেসবুকের টাইমলাইন যেভাবে পাবলিক আলোচনাকে চালিত করে, সেখানে দীর্ঘ, জটিল, বহু-স্তরীয় বিশ্লেষণের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসে। যে প্রশ্নের উত্তর এক লাইনে দেয়া যায় না, সেই প্রশ্ন প্রায়ই জিজ্ঞাসাই করা হয় না। অথচ বাংলাদেশের মতো একটা সমাজ, যেখানে রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তি একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে জড়িয়ে আছে, সেখানে ঠিক এই ধরনের প্রশ্নগুলাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।
দ্য পাবলিশ এই ফাঁকটার ভেতর থেকে জন্ম নিয়েছে।

এটা কোনো নতুন ধরনের সংবাদমাধ্যম হওয়ার দাবি না। বরঞ্চ আমরা সেই পুরনো প্রশ্নে ফিরে যেতে চাই। সাংবাদিকতার কাজ কি শুধু জানানো, নাকি বোঝানোও? একটা ঘটনার বিবরণ দেওয়া সহজ। একটা ঘটনার মানে বের করা কঠিন, সময়সাপেক্ষ, আর প্রায়ই অলাভজনক। The Publish এ আমরা এই কঠিন কাজটাকেই কেন্দ্রে রাখতে চাই। বিশ্লেষণ ভিত্তিক প্রতিবেদন, প্রবন্ধ, অনুসন্ধান এবং এমন ধরনের চিন্তা, যা স্থায়ী এবং আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে।
এখানে একটা পার্থক্য স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার। খবর আর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মধ্যে পার্থক্য। প্রতিদিন যা ঘটে, তার সবকিছু খবর হতে পারে, কিন্তু সবকিছু সমান গুরুত্বপূর্ণ না। আবার এমন অনেক কিছু আছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে খবর মনে হয় না, অথচ দীর্ঘ মেয়াদে সমাজের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। একটা প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সংকট, একটা ভাষার হারিয়ে যাওয়া শব্দভাণ্ডার, একটা প্রযুক্তির নীরব অনুপ্রবেশ যা মানুষের সম্পর্ক বদলে দিচ্ছে। এই ধরনের বিষয়গুলো হেডলাইনের ভাষায় আসে না, কারণ এগুলার কোনো একক মুহূর্ত নাই, যাকে এক কথায় বলা যায়। এগুলো ঘটে ধীরে, প্রায় চোখে পড়ে না। আর ঠিক একারণেই এগুলা বোঝার জন্য আলাদা মনোযোগ দরকার। যে মনোযোগ ব্রেকিং নিউজের কাঠামো দিতে পারে না।
আমাদের বিশ্বাস, একটা সমাজের জন্য কেবল ঘটনা জানা যথেষ্ট না। ইতিহাস না জানলে বর্তমান বোঝা যায় না। প্রেক্ষাপট না থাকলে সিদ্ধান্তের যুক্তি বোঝা যায় না। আর পরিণতি নিয়ে না ভাবলে, প্রতিটি ঘটনা শুধু একটা বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত হয়ে থেকে যায়, কোনো বৃহত্তর গল্পের অংশ হয়ে ওঠে না। এই বিশ্বাস থেকেই দ্য পাবলিশ রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, ইতিহাস আর সমাজ এই সবকিছুকে আলাদা আলাদা বিভাগ হিসেবে না দেখে একটা পরস্পরসংযুক্ত জগৎ হিসেবে দেখতে চায়। একটা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনীতির খবর না, তা ক্ষমতার ভাষাও বলে। একটা প্রযুক্তিগত পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তির খবর না, তা মানুষের আচরণ ও সম্পর্কের গল্পও বলে। একটা বিনোদনমূলক ঘটনাও আসলে সময়ের একটা দলিল। একটা প্রজন্ম কী নিয়ে হাসে, কী নিয়ে ভয় পায়, কোন গানে নিজেকে খুঁজে পায়, তা থেকেও সমাজকে এবং আমাদেরকে বোঝা যায়।
এই দৃষ্টিভঙ্গির একটা সরল ও কঠিন দাবি আছে। যে বিষয়ে তাৎক্ষণিক পাঠকসংখ্যা কম, সেই বিষয়েও ভাবার জায়গা রাখতে হবে, যদি বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ হয়। এটা বাস্তবসম্মতভাবে কঠিন একটা সিদ্ধান্ত, বিশেষত যখন একটা প্রকাশনার সম্পদ সীমিত, আর প্রতিটি লেখার পেছনে সময় ও শ্রমের একটা মূল্য আছে। দ্য পাবলিশের বড় কোনো বিনিয়োগকারী নাই। স্বাধীন প্রকাশনা চালানো, বিশেষত এমন একটা সময়ে যখন পাঠক বিনামূল্যে সবকিছু পেতে অভ্যস্ত। দ্য পাবলিশে আমাদের চেষ্টা থাকবে যে দুনিয়াতে আমরা বসবাস করছি, সেই দুনিয়া আপনাকে আরেকটু স্পষ্টভাবে দেখতে-বুঝতে সাহায্য করা। কোনো ঘটনাকে দ্রুততর করে জানানোর চাইতে তার পেছনের ঘটনা আপনার সামনে তুলে ধরা। আর হয়তো এটুকুই যথেষ্ট। কারণ একটা সমাজ যখন প্রশ্ন করতে শিখে, প্রেক্ষাপট খুঁজতে শিখে। তখনই সে নিজেকে সত্যিকার অর্থে বোঝার সুযোগ পায়।
দ্য পাবলিশ প্রশ্নটা করার এবং বোঝার একটা আন্তরিক জায়গা হয়ে থাকতে চায়।