শুক্রবার বিকেল সাড়ে তিনটা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা নাহিদের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম মায়ের আইফোনটা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে। কোটবাড়ির গান্ধামতি এলাকার বাসা থেকে হেঁটে বের হওয়া তেরো বছরের ছেলেটি আর ফেরেনি। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত ফোনের অবস্থান কোটবাড়িতেই দেখা যাচ্ছিল, তারপর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার থানায় জিডি করেন। রাতভর পুলিশ, ডিবি ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন সিসিটিভি ফুটেজ ঘেঁটে ছেলেটির সন্ধান করে। মা ফেসবুকে লেখেন, বিকাল তিনটা থেকে ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছেন না, কেউ যেন সাহায্য করে।
শনিবার দুপুর একটার দিকে পুলিশের কাছে খবর আসে, বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গলে একটি ছেলের মরদেহ পড়ে আছে। স্থানীয় এক শ্রমিক বাঁশ কাটতে গিয়ে প্রথম দেহটি দেখতে পান। মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল, আর মায়ের যে ফোনটি নিয়ে সে বেরিয়েছিল, সেটি আর পাওয়া যায়নি। পুলিশ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আঠারো বছর বয়সী এক যুবককে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে; প্রাথমিক ধারণা, ফোনটি ছিনিয়ে নিতে গিয়েই খুন হয়েছে অপ্রতীম। এই মৃত্যুর পেছনে কোনো রহস্যময় বা রাষ্ট্রীয় শক্তি নেই, অন্তত এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে তাতে। এটি একটি সাধারণ, নিষ্ঠুর অপরাধের গল্প, যার শুরুটা হয়েছিল সবচেয়ে সাধারণ একটি বাক্য দিয়ে, “ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছি না।”
বাংলাদেশে প্রতিদিন এই বাক্যটি বহুবার উচ্চারিত হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই, এই সাত মাসেই দেশে শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ৭১৭টি। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যে ৮৭ শতাংশের বেশি, অর্থাৎ ১৩ হাজার ৬৭৯ জন শিশু উদ্ধার হয়েছে বা নিজে ফিরে এসেছে। বাকি ২ হাজার ৩৮ জনের এখনো কোনো সন্ধান মিলে নাই। সংখ্যাটা এত বড় যে প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হয়, প্রতিদিন গড়ে পঁচাত্তরটির বেশি শিশু নিখোঁজের অভিযোগ জমা পড়ছে দেশের কোনো না কোনো থানায়। অপ্রতীমের গল্প তাই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি বিশাল ও অদৃশ্য বাস্তবতার একটি দৃশ্যমান অংশ মাত্র।
যারা পথ হারায়
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ ছোট শিশু নিখোঁজ হয় পরিবারের সঙ্গে অপরিচিত জায়গায় গিয়ে পথ হারিয়ে, নিজের ঠিকানা বলতে না পেরে, অথবা একা বাড়ি ফেরার পথে ভুল পথে চলে গিয়ে। রাজধানীর গুলশান থানার কড়াইল বস্তি থেকে ছয় বছর বয়সী মোহাম্মদ রাতুল মিয়া এভাবেই হারিয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা তাকে খুঁজে পরিবারের হাতে তুলে দেন। এই ধরনের গল্পগুলো প্রায়ই সংবাদের শিরোনাম হয় না, কারণ এগুলোর শেষ সুখকর, আর সুখকর শেষের গল্প খবর হয়ে ওঠে কম।
কিশোর-কিশোরীদের বেলায় ছবিটা আরও জটিল। দশ থেকে সতেরো বছর বয়সীদের মধ্যে একই সময়ে নিখোঁজের জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি, যার মধ্যে প্রায় দুই হাজার এখনো উদ্ধার হয়নি। এই বয়সের নিখোঁজের পেছনে কারণ কেবল পথ হারানো না। রাজশাহীর তানোর উপজেলায় বাড়ির পাশে ঘাস কাটতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া এক কিশোরীকে তিন দিন পর স্থানীয় একটি গির্জায় পাওয়া যায়। উদ্ধার হওয়াটা যতটা স্বস্তির খবর মনে হয়েছিল, বাস্তবতা ততটা সহজ ছিল না। এই ঘটনা ২০২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। মেয়েটির পরিবার তৎকালীন ফাদারের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করে, ছয় বছর পর গত জুলাইয়ের ১২ তারিখ গির্জায় কিশোরীকে ধর্ষণের মামলায় ফাদার বেকসুর খালাস পান। তবে, এ রায় নিয়ে আসামিপক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেলেও বাদী এবং রাষ্ট্রপক্ষ হতাশা প্রকাশ করে উচ্চ আদালতে আপিল করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, “নিখোঁজের অবসান” আর “নিরাপদে ফেরা” সবসময় সমার্থক নয়।
সীমান্তের ওপারে পাচার হয়ে যাওয়া কিশোরীদের গল্পগুলো আরও অন্ধকার। এ বছরের অগাস্টে পশ্চিমবঙ্গের একটি সীমান্তবর্তী গ্রাম থেকে ঢাকার এক কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়, আর একই মাসে চোদ্দ বছর বয়সী আরেকজনকে উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত থেকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়; পুলিশের ভাষ্যে, তাকে পানীতে চেতনানাশক মিশিয়ে সীমান্ত পার করানো হয়েছিল। হায়দরাবাদে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া এক কিশোরীকে জোরপূর্বক দেহ ব্যবসায় বাধ্য করার পর উদ্ধার করা হয়, যা নিয়ে প্রথম আলো জানায়, এই নিয়ে চতুর্থবারের মতো সে শহরের যৌনপল্লি থেকে বাংলাদেশি নারী উদ্ধারের ঘটনা ঘটল। এই কিশোরীরা কাগজে-কলমে “নিখোঁজ” হিসাবে নথিভুক্ত হয়, অথচ তাদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে থাকে একটি সংগঠিত, লাভজনক অপরাধচক্র, যা সীমান্তের দুই পাশেই সক্রিয়।
এই সংকটের মাত্রা বুঝেই সরকার এ বছরের জানুয়ারিতে একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে শুরু হওয়া “মুন অ্যালার্ট”, অর্থাৎ মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন, দেশের প্রথম জাতীয় পর্যায়ের জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা, যার লক্ষ্য নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা। এটি একটি স্বীকৃতি যে বিচ্ছিন্ন থানার জিডি আর এলাকাভিত্তিক খোঁজাখুঁজির পুরনো পদ্ধতি একটি এত বড় সংকট মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।
যাদের কোনো অ্যালার্ট নাই
শিশুদের জন্য অন্তত একটি নাম আছে এখন, একটি হেল্পলাইন আছে, একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে। কিন্তু নিখোঁজ হওয়া আরেকটি বড় জনগোষ্ঠীর জন্য এমন কিছু নেই, প্রবীণরা, বিশেষত যারা স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগে ভোগেন। এই বছরের জুলাইয়ে মাদারীপুরে রাস্তায় ঘোরাফেরা করতে দেখা এক বৃদ্ধকে স্থানীয়রা খাবার-পানি দিলেও তার পরিচয় কেউ জানতে পারছিলেন না, কোনো স্বজনের সন্ধানও মিলছিল না। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবক, স্থানীয় যুবক ও সংবাদকর্মীদের যৌথ চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়, আর সংবাদ প্রকাশের পর তার পরিচয় জানা যায়। এই ধরনের ঘটনায় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার জায়গাটা দখল করে নেয় কাকতালীয় সহানুভূতি, একজন সাংবাদিক, একজন স্বেচ্ছাসেবক, একটি ছবি যা ভাইরাল হয়ে যায়। এই নির্ভরতা নিজেই একটি ফাঁক নির্দেশ করে, শিশুদের জন্য যে জরুরি সতর্কতা কাঠামো তৈরি হয়েছে, প্রবীণ বা মানসিকভাবে দুর্বল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তেমন কিছু এখনো নাই।
নদীর দেশে নিখোঁজ
বাংলাদেশে নিখোঁজ হওয়ার আরেকটি বড় কারণ পানি। নদীমাতৃক এই দেশে প্রতি মাসেই কোথাও না কোথাও নৌকাডুবি হয়, আর প্রতিটি দুর্ঘটনার পর একই ধরনের একটি শব্দ পুনরাবৃত্তি হয়, “নিখোঁজ”। রাঙামাটির বরকলে কাপ্তাই হ্রদে যাত্রীবাহী একটি বার্মিজ নৌকা ডুবে গেলে এক তরুণ নিখোঁজ হন, তিন দিন পর তার লাশ পাওয়া যায়। নড়াইলের নবগঙ্গা নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ এক হেলাল শেখের মরদেহ তিন দিন পর ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হয়। বান্দরবানের সাঙ্গু নদীতে নৌকাডুবিতে এক পর্যটক নিখোঁজ হন, আর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দিনের পর দিন উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যান, দুই দিন পর মরদেহ পাওয়া যায়। এই ঘটনাগুলোর প্রতিটির পেছনে একটি পরিবার থাকে, যারা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে, জানে না প্রিয়জনকে জীবিত পাবে নাকি মৃত।
তবে নদী সবসময় শুধু কেড়েই নেয় না। এই মাসেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীতে একটি নৌকা ডুবে যায়, যেখানে ছিল মাত্র কুড়ি দিন বয়সী শিশু তানিশা, মায়ের কোলে। নৌকাডুবির পর উত্তাল স্রোতে ভেসে তানিশাসহ দশজন যাত্রী পৌঁছে যান ভারতীয় জলসীমায়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ তাদের উদ্ধার করে, তানিশাকে তখন প্রায় নিস্তেজ অবস্থায় পাওয়া যায়। চিকিৎসার পর সে সুস্থ হয়, আর সেই রাতেই বিজিবির মাধ্যমে বাকি নয়জন যাত্রীর সঙ্গে দেশে ফিরে আসে। এই ছোট্ট মেয়েটি হয়তো কোনোদিন জানবেও না, জীবনের বিশতম দিনে সে কতটা কাছাকাছি গিয়েছিল হারিয়ে যাওয়ার। তার ফিরে আসা মনে করিয়ে দেয়, নিখোঁজ হওয়ার প্রতিটি গল্পের শেষ ট্র্যাজেডি নয়, কখনো কখনো তা সীমান্তের ওপারের অচেনা মানুষের তৎপরতায়ও লেখা হয় বেঁচে ফেরার গল্প হিসেবে।
একটি সাধারণ সত্য এবং একটি অসমাপ্ত বাক্য
এই সব ঘটনার মধ্যে একটি মিল আছে, যা রাজনীতি বা রাষ্ট্রীয় দমননীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন। একটি শিশু পথ হারায়। একজন প্রবীণ রাস্তায় দিকভ্রান্ত হয়ে হাঁটতে থাকেন। একটি নৌকা ডুবে যায়। একটি মেয়েকে প্রতারণা করে সীমান্ত পার করানো হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই “নিখোঁজ” শব্দটি একই রকম ভার বহন করে, একজন মানুষের হঠাৎ অনুপস্থিতি, আর তার পরিবারের জন্য অনিশ্চয়তার এক অসহনীয় সময়। পার্থক্য কেবল কারণে, পরিণতিতে নয়।
এই সংখ্যাগুলো একসঙ্গে দেখলে একটি প্রশ্ন উঠে আসে, বাংলাদেশে নিখোঁজ হওয়া ঠেকানোর বা দ্রুত সন্ধান পাওয়ার ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত। শিশুদের জন্য একটি হেল্পলাইন ও অ্যালার্ট সিস্টেম চালু হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু নদীপথে নিরাপত্তা, প্রবীণদের জন্য শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, আর সীমান্তে পাচার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ফাঁক এখনো বিস্তর। মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ অধ্যাদেশ এ বছরের জানুয়ারিতে জারি হয়েছে বটে, কিন্তু আইন আর বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে দূরত্ব থেকেই যায়, যতক্ষণ না সীমান্তের ওপারে যৌনপল্লি থেকে বারবার বাংলাদেশি কিশোরী উদ্ধারের খবর আসা বন্ধ হয়।
কুমিল্লার সেই জঙ্গলে যে ছেলেটির মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল, তার গল্প এতক্ষণে হয়তো একটি সংখ্যায় পরিণত হয়েছে, এই বছরের সেই দুই হাজার আটত্রিশ জনের একজন হিসেবে, যারা এখনো নিখোঁজ, অথবা সেই তেরো হাজারের একজন হিসেবে, যারা ফিরে এসেছে, তবে জীবিত নয়। নাহিদা নাহিদ যে রাত জেগে ছেলের ফোনের অবস্থান খুঁজেছিলেন, যে ভয় নিয়ে থানায় ছুটে গিয়েছিলেন, সেই একই ভয় প্রতিদিন বাংলাদেশের কোনো না কোনো ঘরে জন্ম নেয়, কড়াইলের বস্তিতে, মাদারীপুরের রাস্তায়, কাপ্তাই হ্রদের পাড়ে, কিংবা সীমান্তের কাছের কোনো গ্রামে।
একটা পরিবারের কাছে “নিখোঁজ একটি অসমাপ্ত বাক্য, যা শেষ হয় স্বস্তিতে, নয়তো শোকে, আর মাঝেমধ্যে এমন এক অনিশ্চয়তায় যা কোনোদিন শেষ হয় না। রাষ্ট্র, প্রতিবেশী, অচেনা মানুষ, কেউ না কেউ সেই বাক্যের শেষটা লিখে। প্রশ্ন হলো, সেই শেষ লেখার কাজে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত, আর কতটা এখনো নির্ভর করে কাকতালীয়তার ওপর। ◼