সিডনির জর্জ স্ট্রিটে একটা দেয়ালচিত্র আছে, যেখানে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মুখ আঁকা। রাস্তার শিল্পী স্কটি মার্শের হাতে গড়া সেই ছবির নিচে দাঁড়িয়ে, নিজের দিকে আঙুল তুলে একটা ছবি তুলেছিলেন অ্যাসাঞ্জ নিজেই। সেই ছবিই ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে জুড়ে দিয়েছিল উইকিলিকসের এক্স অ্যাকাউন্ট, ক্যাপশনে লেখা: “সে ফিরে এসেছে, @JulianAssange”। কয়েক মিনিটের মধ্যেই অ্যাসাঞ্জ নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে সেই পোস্ট রিপোস্ট করলেন, সঙ্গে নিজের লেখা মাত্র দুটি শব্দ: “আই অ্যাম ব্যাক“।
এই দুটো শব্দ শুনতে সাধারণ মনে হলেও, এর ওজন অনেক। কারণ শেষবার অ্যাসাঞ্জ নিজের একাউন্ট থেকে পোস্ট করেছিলেন ২০২৪ সালের ২৮ জুনে, তার আইনি মামলার নিষ্পত্তি নিয়ে একটা প্রতিবেদন শেয়ার করে। তারপর দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অ্যাকাউন্টটা পড়ে ছিল একেবারে নিথর, কোনো ব্যান নেই, কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, শুধু একটা সচেতন নীরবতা। প্ল্যাটফর্মের কোনো বাধা তাঁকে থামায়নি, তিনি নিজেই থেমে ছিলেন।
যে মুক্তির পর শুরু হয়েছিল নীরবতা
কাহিনীর শুরু হয় ২০২৪ সালের জুনে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের সঙ্গে হওয়া একটি প্লি ডিলের পর, লন্ডনের বেলমার্শ কারাগার থেকে মুক্তি পান অ্যাসাঞ্জ। শ্রেণিবদ্ধ জাতীয় প্রতিরক্ষা তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের ষড়যন্ত্রের একটি মাত্র অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন তিনি, বিনিময়ে সাজা হয় ইতিমধ্যে ভোগ করা বন্দিদশার সমান, অর্থাৎ কার্যত মুক্তি। মুক্তির পর তিনি ফিরে যান নিজের জন্মভূমি অস্ট্রেলিয়ায়, স্ত্রী স্টেলার কাছে, প্রকাশ্য জীবনের ঝলমলানি থেকে বহুদূরে।
অ্যাসাঞ্জের সামাজিক মাধ্যম নিয়ে রহস্য অবশ্য নতুন কিছু না। ২০১৭ সালের বড়দিনের আগের রাতে, তখনো টুইটার নামেই পরিচিত সেই প্ল্যাটফর্মে, তাঁর অ্যাকাউন্ট হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। যে কেউ প্রোফাইলে ঢুকতে গেলে দেখতে পেতেন একটা বার্তা, পাতাটাই নাকি অস্তিত্বহীন। পরদিন সকালে অ্যাকাউন্টটা ফিরে আসে, কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি টুইটার।
সেই বিভ্রান্তির মধ্যেই মার্কিন নৌবাহিনীর সরকারি অ্যাকাউন্ট থেকে একটা পোস্ট আসে, তাতে শুধু লেখা ছিল “জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ”, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তা মুছেও ফেলা হয় সঙ্গে সঙ্গে। নৌবাহিনী পরে জানায়, ট্রেন্ডিং বিষয়বস্তু পর্যবেক্ষণের সময় একজন কর্মীর অসতর্ক টাইপিংয়ে এটা ঘটেছিল।
যা বদলায়নি
অ্যাসাঞ্জের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিভাজন এখনো স্পষ্ট। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি স্বচ্ছতার এক অক্লান্ত যোদ্ধা, যাঁর প্রকাশিত নথি বদলে দিয়েছিল যুদ্ধ আর কূটনীতি নিয়ে জনগণের বোঝাপড়া। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাঁর বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল, বলেছিল এই মামলা শ্রেণিবদ্ধ তথ্য নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক ও প্রকাশকদের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকদের কাছে তিনি এমন একজন, যাঁর প্রকাশিত নথি মার্কিন জীবন বিপন্ন করেছে, এই বিতর্ক এখনো থামেনি।
এই বিভাজনের মধ্যেই ফিরে এলেন অ্যাসাঞ্জ, কোনো বিবৃতি ছাড়া, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া। শুধু একটা ছবি, একটা দেয়ালচিত্র, আর দুটো শব্দ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই পোস্ট লক্ষ লক্ষ মানুষের চোখে পড়ে যায়, কেউ লেখেন স্বাগত জানিয়ে, কেউ প্রশ্ন তোলেন, তিনি আসলে কী থেকে ফিরলেন। প্রশ্নটার উত্তর এখনো অজানা। অ্যাসাঞ্জ শুধু বলেছেন, তিনি ফিরেছেন। বাকিটা জানার অপেক্ষায় সবাই।