আধুনিক সমাজে এতদিনের কেতাদুরস্ত মানুষগুলো একটু বিপাকে পড়েছেন, আর এই বিপাকে পড়াটাকে আমি সাধুবাদ জানাই। কারণ অত্যাচারীর বিপক্ষে আমার অবস্থান, শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নয়। পৃথিবীর অন্য কোথাও যে যত বেশি রিসোর্সফুল, যত বেশি পরিশ্রমী আর উৎপাদনশীল, সে ততটাই ধনী হয়। আমাদের দেশে গল্পটা উল্টা। দিনের পর দিন পকেট ভারী হচ্ছে জোচ্চোর আর ধান্ধাবাজদের, যারা কুলিগিরি করারও যোগ্যতা রাখে না অথচ ইম্পোর্ট করছে মিনি কুপার।
এই কথা কেন বললাম?
গত কয়েকবছরে জুলাই রেকর্ডসের হয়ে সাক্ষাৎকার নিতে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরেছি। যেসব ঘরবাড়িতে গেছি, বিশ্বাস করেন আর না-ই করেন, ওদেরকে একটা ছিমছাম বাড়ি করে দিতে না পারার, বেকার ভাইটাকে একটা চাকরীর ব্যবস্থা করে দিতে না পারার, কিংবা আহত গাজী ভাইকে তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিতে না পারার আক্ষেপে নিজের গরীবী হালতকে অনেকবার দোষারোপ করছি। যে ছেলেগুলা মারা গেছে, কেউ কেউ ভাইয়ের সাথে প্ল্যান করছে সামনের কয়েক বছরে পয়সাপাতি জমায়ে বাড়িতে একটা ঘর তুলবে, আবার কেউ তার স্ত্রীর সাথে স্ট্রাগলের সময় কাটাচ্ছিলো, এবং শেষ পর্যায়ে, দুজনে স্বাবলম্বী হয়ে যখন স্বপ্নের সংসার গুছানো শুরু করবে, তখনই নেমে আসে অমানিশা। সেই স্বপ্নগুলো অলীক থেকে যায়। হত্যা করছে আওয়ামীলীগ নামের একটা রাজনৈতিক নামধারী সন্ত্রাসী সংগঠন। গরিবের জীবন যায়, নেতাদের পকেট ভারী হয়। আর গরিবেরা এমনভাবে মুছে যেতে থাকে যেন এই দেশে তাদের কোনো অস্তিত্বই কখনো ছিল না।
কয়েক বছর আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে। চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার গড়দুয়ারা গ্রামে বিএনপি থেকে এমরান চৌধুরী নামে একজন সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে ২০১৯ সালে ফজলে করিমের (জুনু) পালিত এক দুর্বৃত্ত জামশেদের ছুরিকাঘাতে তিনি নিহত হন। এমরান মেম্বার গ্রামের মানুষের সেবায় সবসময় নিয়োজিত ছিলেন, রাত দুইটা কী তিনটা, তার ফোনে ডাক এলে হাজির না হওয়ার নজির নাই। মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন বন্ধুবৎসল, ক্রীড়ানুরাগী। অথচ তার মৃত্যুর পর আসামি ধরা বা বিচারের আশ্বাস তো দূরের কথা, স্থানীয় আওয়ামী চেয়ারম্যান শোকার্ত পরিবারকে খোলা উঠানে বলে বসলেন, “শক্তি রাখো, আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার গোটা পরিবার হারিয়ে কোনো বিচার পাননি, তবুও শক্তি হারাননি, তোমরা এতটুকুতে এভাবে করলে চলবে?” এই কথাগুলো আমি নিজের কানে শুনেছি, নিজের চোখে দেখেছি।
স্বজন হারানোর বেদনা
“স্বজন হারানোর বেদনা” নামের এই আখ্যানটাকে কী নিদারুণ শৈল্পিকতায় খুনি হাসিনা গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। প্রতিটা লাশের, প্রতিটা খুনের বৈধতা এভাবেই দিয়ে চলছিলেন মাফিয়া মম হাসিনা।
এমরানের জায়গায় লীগ থেকে একজন ভারপ্রাপ্ত সদস্য বসলেন। কয়েক বছরের মধ্যে তিনি বনে গেলেন কলাগাছ, চল্লিশটা গরু দিয়ে মেজবানও দিলেন। এর কিছুদিন পর তিনি ঢাকা থেকে আটক হন, পরে জানা যায় ইয়াবা ব্যবসা, স্বর্ণ চোরাচালান আর বিকাশ কেলেঙ্কারিতে জড়িত ছিলেন সেই লোক। এই হলো তাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের নমুনা। খোদ আওয়ামী সমর্থক সুশিক্ষিত পরিবারগুলোও সে সময় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল, কারণ ইজ্জত নিয়ে চলার ভরসা তারা পাচ্ছিলেন না সেই সমাজে। সেই সরে থাকার ফলাফল তারা এখন পাচ্ছে। তবে এটাও সত্যি, অহেতুক মামলায় জড়াননি এমন অনেক আওয়ামী পরিবার এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন না, এই সমাজেই দিন কাটাচ্ছেন, বেশ ভালোই আছেন।
বিএনপি এখন সরকারে। বিচারের অপেক্ষায় জমে থাকা মামলার ফিরিস্তি বিশাল, কিন্তু সেদিকে মন না দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রেসক্রিপশনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বকারী উপদেষ্টার নামে একের পর এক অভিযোগ তোলা হচ্ছে। ১৭ বছরের দুর্নীতি নিয়ে ইন্টেরিম সরকারকে দেওয়া শ্বেতপত্রে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য যে ফিরিস্তি তুলে ধরেছিলেন, তার ব্যবস্থা দুদক কবে নিবে? দুদক আদৌ এসবে আগ্রহী কিনা, সেই প্রশ্নও থেকে যায়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক আমলা নিজেই মাদক চোরাচালানে ধরা পড়েন, এসবের জবাবদিহিতা কোথায়? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিডিবির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ নিয়ে এই টালবাহানা ভেতর থেকে কৃত্রিমভাবে তৈরি, এমনকি মিটারেও কারসাজির সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি। তার ধারণা, আওয়ামীপন্থী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই এসব ঘটছে। বিদ্যুৎ নিয়ে, আদানি চুক্তি ও রূপপুরের অগ্নিকাণ্ড নিয়ে রুহুল কবির রিজভীও একই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। অথচ ব্রিকস সম্মেলনেও গেলেন না তারেক রহমান।
রাষ্ট্র কি কারো হাতে বন্দী?
৫ অগাস্টের পরপর সাধারণ জনগণ যদি একটু অবিবেচক হয়ে এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের ওপর সওয়ার হতো, কী অবস্থাই না হতে পারত। এসব কি তারা ভাবেন না? এত পড়ালেখা করে মাথায় এটুকু না বোঝার যৌক্তিকতা আমি অন্তত মানতে রাজি নই। বরং আইনের ছাত্র হিসেবে আমি এর একটা সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করতে চাই। তাদের টিকি কোথাও বাঁধা পড়েছে। এমন এক গোলকধাঁধা, যেখান থেকে তারা নিজেরাও বেরিয়ে আসতে পারছেন না, হয়তো পরিবারসহ ঝুঁকিতে আছেন তারা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বিদেশি এজেন্সির আনাগোনার খবর আমরা প্রায়ই পাই। তাদের টিকি এসব এজেন্সির কাছে বাঁধা, তাদের দুর্বলতাকে দায় বানিয়ে এজেন্সিগুলো নিজ নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে ছড়ি ঘোরাচ্ছে নিরীহ বাংলাদেশের জনগণের ওপর। এরা চিহ্নিত, কিন্তু সরকার নীরব।
৫ অগাস্টের পর উঁচু স্তরের নেতারা জনগণকে সহিংস না হয়ে দায়িত্বশীল আচরণের ডাক দিয়েছিলেন, আর জনগণ সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ঘরে ফিরে গিয়েছিল। কাদের ওপর ভরসা করে? বিশ্বাসের এই প্রতিদান? রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আরশোলার মতো ঘাপটি মেরে বসে থাকা লোকগুলোকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ আর দক্ষ লোকবল থাকার পরও এই ধানাইপানাইয়ের মানে কী? লাখ লাখ বেকার শিক্ষিত তরুণ-তরুণী চাতকের মতো চাকরির জন্য তাকিয়ে আছে, নিয়োগ পাওয়া তো দূরের কথা, পরীক্ষার ব্যবস্থাটুকুও করা যাচ্ছে না। এসবের জন্যই কি তবে সংযত আচরণের ডাক দেওয়া হয়েছিল?
আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক রেখে দিচ্ছে কারা, এই প্রশ্নটাও থেকে যায়। যারা সত্যিকারের অন্যায়ে জড়িত, তাদের শাস্তির ব্যবস্থা না করে অহেতুক মামলায় জড়িয়ে বা ব্যক্তিগত আক্রোশে শুধু সমর্থক হওয়ার কারণে অনেককে জেল খাটতে হচ্ছে, যাদের অনেকেই দরিদ্র পরিবারের। আইনের প্রতি, সমাজের প্রতি একটা গোটা জনগোষ্ঠীকে এভাবে নির্বিচারে শোষণের ভেতর দিয়ে যেতে বাধ্য করলে, পরে সুযোগ পেলে তারা কেন অবিবেচক হবে না? কেন তারা অন্যায়ের পথ বেছে নেবে না? এই দ্বিধাবিভক্তির ভেতর দিয়ে দেশের ভেতরে শান্তি আনা যাবে কীভাবে?
আজ যাদের কাছে বিচার চাইছি, কালই যদি তাদের বিচার করতে হয় বা চাইতে হয়, এর চেয়ে বড় দুর্দশা আর কী হতে পারে?
সম্পাদকীয় নোট: মতামত লেখকের নিজস্ব।