২৬ অগাস্ট, ২০২৬। সকাল সাড়ে আটটা। রাসুওয়াগাঢ়ি সীমান্ত তখনও ঘুম ভাঙছে। নেপাল আর তিব্বতের মাঝের এই ছোট্ট বন্দরনগরীতে প্রতিদিন কয়েকশ ট্রাক পণ্য নিয়ে সীমান্ত পার হয়, কৈলাস মানসরোবর যাত্রার তীর্থযাত্রীরা লাইন দেন পাসপোর্ট হাতে, আর ত্রিশূলী নদীর তীর ধরে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলায় রাতের শিফট শেষ করে ঘরে ফেরেন প্রকৌশলী আর শ্রমিকেরা। সেদিন সকালে বৃষ্টি হয় নাই। রাসুওয়া জেলা সদরে আকাশ ছিল পরিষ্কার, এমনটাই নথিভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। বর্ষার এই মৌসুমে এটাই ছিল অস্বাভাবিক, কারণ হিমালয়ের এই উপত্যকাগুলায় বিপর্যয় সচরাচর আসে মেঘ ফেটে, প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে। কিন্তু এবার এল অন্যভাবে।

লাংতাং লিরুং শৃঙ্গের গা বেয়ে, প্রায় সাত হাজার মিটার উচ্চতায়, একটি হিমবাহের (glacier) বিশাল অংশ এবং তার নিচের পাথুরে পাহাড়চূড়া একসঙ্গে ভেঙে পড়ে। বিজ্ঞানীরা পরে স্যাটেলাইট চিত্র মিলিয়ে দেখেছেন, এটা নিছক বরফের ধস ছিল না, ছিল বিশাল এক পাথরধসও, যা হিমবাহের একাংশকে সঙ্গে নিয়ে নিচে নেমে আসে। সেই ধস আছড়ে পড়ে লেন্দে খোলা নদীতে, তারপর তা মিশে যায় ত্রিশূলী নদীর স্রোতে। জল, বরফ, কাদা আর পাথরের সেই স্রোত প্রায় একশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়, রাসুওয়া, নুওয়াকোট আর ধাদিং জেলার একের পর এক জনপদ, সেতু আর সড়ক গিলে ফেলে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ইএসএ) হিসাবে, পাহাড়ের গা থেকে সেই ধসের উপত্যকার তলায় আছড়ে পড়ার শক্তি ছিল রিখটার স্কেলে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমান।
সাড়ে আটটার সীমান্তবাজার তখন নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল কয়েক মিনিটের মধ্যেই। ত্রিশূলী থ্রি-এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে তখনও কাজ করছিলেন কয়েকশ শ্রমিক। রাতের শিফট থেকে সবে ফেরা একজন শ্রমিক পরে জানিয়েছিলেন, জল দেখেই তিনি পাহাড়ের দিকে দৌড় দিছিলেন, পাথুরে ঢালে ঘাস গজানো পথ ধরে। তবে, অনেকে অতটা সৌভাগ্যবান ছিলেন না। নয় দিন পর, ৪ সেপ্টেম্বর, উদ্ধারকারীরা ত্রিশূলী থ্রি-এ প্রকল্পের প্রধান সুড়ঙ্গ থেকে দুজন শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে নয় দিন আটকে থাকার পর। তাঁদের একজনের ভাই সাংবাদিকদের বলেন, এই মুহূর্তে বুকটা হালকা লাগছে। সেই সময়েও দেশের বারোটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে প্রায় নয়শ শ্রমিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না, যাদের প্রায় ৫০০জন বিভিন্ন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

এই দুর্যোগকে শুধু একটি দুর্ঘটনা বলে বিদায় করা কঠিন। কারণ যে নদী রাসুওয়ার জনপদগুলো ভাসিয়ে নিয়েছে, সেই নদীই শেষ পর্যন্ত মিশে যায় গঙ্গায়, আর গঙ্গা যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নাম নিয়ে, তখন তার সঙ্গে বয়ে আসে হিমালয়ের প্রতিটি ভাঙনের প্রতিধ্বনি। নেপালের একটি পাহাড়ের ধস, বাংলাদেশের একটি নদীভাঙা গ্রামের গল্পের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে যায়, সেই সুতোটাই আসলে এই লেখার বিষয়।
একটি ভাঙা পাহাড়ের অর্থ
লাংতাং উপত্যকাকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় “হিমবাহের উপত্যকা”। এই একই উপত্যকা ২০১৫ সালের গোর্খা ভূমিকম্পে একবার বিধ্বস্ত হয়েছিল, তখন একটি তুষারধস পুরো লাংতাং গ্রামটিকেই মুছে দিয়েছিল। এবারের ধসের কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রথম কয়েক দিন বিভ্রান্তি ছিল। কেউ ভেবেছিলেন ভূমিকম্প, কেউ ভেবেছিলেন হিমবাহী হ্রদের হঠাৎ বিস্ফোরণ (glacial lake outburst flood, সংক্ষেপে GLOF)। পরে ইউএসজিএসের বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়, ভূকম্পীয় সংকেতটি কোনো ভূমিকম্পের আগাম সংকেত ছিল না, বরঞ্চ ধসটি নিজেই সেই সংকেত তৈরি করেছিল।
এখানেই প্রশ্নটা জটিল হয়ে ওঠে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই নির্দিষ্ট ধসের সম্পর্ক ঠিক কতটা, তা এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। জলবায়ু বিশ্লেষক জেক হাউসফাদার লক্ষ করেছেন, যে পাহাড়ে ধসটি হয়েছে, তার সাম্প্রতিক চারটি গ্রীষ্মই রেকর্ড করা ইতিহাসের পাঁচটি উষ্ণতম গ্রীষ্মের মধ্যে পড়ে, আর সেই বছরের অগাস্ট মাসও রেকর্ড ভাঙার পথে ছিল, এমনটাই জানান ‘ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর’ এর প্রতিবেদন। নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবিজ্ঞানী বেথান ডেভিসের গবেষণা বলছে, লাংতাং অববাহিকায় চার হাজার মিটারের ওপরের এলাকা ১৯৬০-এর দশক থেকে বৈশ্বিক গড়ের প্রায় পাঁচ গুণ দ্রুতগতিতে উষ্ণ হয়েছে, কারণ বরফ গলে গেলে নিচের গাঢ় পাথর বেরিয়ে পড়ে, যা সূর্যের তাপ আরও বেশি শোষণ করে। তবু, জলবায়ু বিজ্ঞানীরাই সবচেয়ে বেশি সতর্ক এই প্রশ্নে। জলবায়ু বিশ্লেষণী প্ল্যাটফর্ম দ্য ক্লাইমেট ব্রিংক-এর একটি বিশ্লেষণ মনে করিয়ে দেয়, পাথর-বরফের ধস আর সাধারণ হিমবাহ গলনের কার্যকারণ শৃঙ্খল সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস, এবং আইপিসিসির ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন শুধু এটুকু বলে যে, ১৯৯০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে হিমবাহ পশ্চাদপসরণের প্রধান চালিকাশক্তি মানবসৃষ্ট প্রভাবই, এই নির্দিষ্ট ধসের কারণ নয়। অর্থাৎ, একটা উষ্ণ পাহাড়, একটা গলতে থাকা হিমবাহ, আর একটা রেকর্ড-উষ্ণ অগাস্ট, এই তিনটে ঘটনা একসঙ্গে ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু বিজ্ঞান এখনও সরাসরি বলতে পারছে না যে জলবায়ু পরিবর্তনই এই নির্দিষ্ট ধসটি ঘটিয়েছে।
তবে বৃহত্তর ছবিটা নিয়ে কোনো দ্বিমত নাই। হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের ওপর মধ্যস্থতাকারী গবেষণা সংস্থা ইকিমড এ বছরের মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, ২০০০ সালের পর থেকে এই অঞ্চলের হিমবাহ গলনের হার দ্বিগুণ হয়ে গেছে, আর ১৯৭৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত বরফের পুরুত্ব কমেছে সাতাশ মিটার পর্যন্ত। ২০২৩ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দুকুশ হিমালয়ের হিমবাহ আগের দশকের তুলনায় ৬৫শতাংশ দ্রুতগতিতে বিলীন হয়েছে, এবং বর্তমান নির্গমনের গতি বজায় থাকলে শতাব্দীর শেষে এই অঞ্চলের আশি শতাংশ হিমবাহই হারিয়ে যেতে পারে। এই পরিসংখ্যানগুলো কোনো নির্দিষ্ট দিনের কোনো নির্দিষ্ট ধসের কৈফিয়ত দেয় না। কিন্তু এগুলা বলে, পুরো পর্বতমালাটাই একটা নতুন, অস্থির ভারসাম্যের দিকে সরে যাচ্ছে, যেখানে এই ধরনের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
আরও একটি অস্বস্তিকর তথ্য সামনে এসেছে দুর্যোগের কয়েক দিন পর। বৈজ্ঞানিক গবেষক জোট হাইরিস্কের একটি প্রতিবেদন বলছে, ধসের কয়েক দিন আগে থেকেই পাহাড়ে কিছু সতর্কসংকেত ছিল, গলিত জল বাদামি রং ধারণ করেছিল, আর পাথরের চূড়ায় ফাটল বিস্তৃত হচ্ছিল। কিন্তু এই দুর্গম, প্রায়-অনুপর্যবেক্ষিত এলাকায় সেই সংকেত পড়ার মতো কোনো ব্যবস্থাই ছিল না।

পানির একটি রাজনৈতিক মানচিত্র
ত্রিশূলী নদীর নিজের একটি ভূগোল আছে, যা এই দুর্যোগকে স্থানীয় থেকে আঞ্চলিক করে তোলে। রাসুওয়াগাঢ়ির কাছে লেন্দে খোলা আর কেরুং খোলার মিলনে জন্ম নেওয়া ত্রিশূলী নদী দক্ষিণে বয়ে দেবঘাটে গিয়ে মেশে নারায়ণী বা গণ্ডকী নদীর সঙ্গে, যার প্রবাহ এলাকার ৬০শতাংশেরও বেশি তিব্বতের ভূখণ্ডে। নারায়ণী সেখান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে ভারতে ঢোকে, বিহারের সমতলে গণ্ডক নাম নিয়ে বয়ে পাটনার কাছে গঙ্গায় মিশে যায়। সেই গঙ্গাই বাংলাদেশে ঢুকে পদ্মা নামে, শেষমেশ মিশে বঙ্গোপসাগরে। অর্থাৎ, রাসুওয়ায় যে জল একদিন ভয়াবহ ধ্বংস বয়ে এনেছিল, তার পরের প্রজন্মের ফোঁটাগুলো মাস কয়েকের ব্যবধানে হয়তো কুষ্টিয়া বা রাজবাড়ীর কোনো চরের পাশ দিয়েই বয়ে যাবে।
নেপালের এই নদীগুলোর ওপরই দাঁড়িয়ে আছে দেশটির জলবিদ্যুৎ ভবিষ্যতের বড় অংশ। পাহাড়ি ঢালের প্রবল স্রোতকে বিদ্যুতে রূপান্তরের এই তাড়না অস্বাভাবিক কিছু না, নেপালের মতো একটি স্থলবেষ্টিত, জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য জলবিদ্যুৎ রপ্তানি অর্থনীতির অন্যতম ভরসা। কিন্তু এবারের দুর্যোগ সেই তাড়নার মূল্যও দেখিয়ে দিয়েছে। ত্রিশূলী আর ভোটেকোশি নদীর করিডোর ধরে গড়ে ওঠা ১৪জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, মোট প্রায় ৭৪৮মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে। ৩২সেতু আর প্রায় ২৫মাইলের সড়ক ভেসে গেছে, যার মধ্যে নুওয়াকোটের বেত্রাবতী থেকে রাসুওয়াগাঢ়ি সীমান্ত পর্যন্ত পুরো সড়কটিই ছিল। এই ধ্বংসের মাত্রা প্রশ্ন তোলে, হিমালয়ের অস্থির খাদগুলায় অবকাঠামো বসানোর ঝুঁকি আসলে কতটা মূল্যায়ন করা হয়েছিল। একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, হাইড্রোপাওয়ারকে সরলভাবে ভিলেন বানানো ঠিক না, কারণ জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে এই বিদ্যুৎই দক্ষিণ এশিয়ার শক্তি রূপান্তরের অন্যতম স্তম্ভ। প্রশ্নটা তাই হওয়া উচিত, ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সেই অবকাঠামো কোথায়, কীভাবে গড়া হচ্ছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই নদী যে সীমান্ত পার হয়ে বয়ে যায়, তার তথ্যও কি সীমান্ত পার হয়? উত্তরটা মূলত না। বিপর্যয় বিশেষজ্ঞ বিজয়কুমারের কথা অনুযায়ী, আর্কটিক বা আন্দিজ পর্বতমালার তুলনায় হিমালয়ের উপত্যকাগুলোয় জনঘনত্ব, সড়ক ও অবকাঠামো অনেক বেশি, অথচ প্রাথমিক সতর্কব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে অনেক কম উন্নত। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এই একই নদী করিডোরে একবার তিব্বতের একটি হিমবাহী হ্রদ বিস্ফোরিত হয়ে নয়জনের মৃত্যু ঘটিয়েছিল। সেই ঘটনার পর নেপাল আর চীন নীতিগতভাবে বন্যা, ভূমিধস আর হিমবাহী হ্রদ সম্পর্কিত তথ্য বাস্তব সময়ে ভাগাভাগি করার বিষয়ে একমত হয়েছিল, তবে সেই কাঠামো এখনও কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি। ইকিমডের দুর্যোগ ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ সাসোয়াতা সান্যাল সিএআরইকে জানান, এই একই নদী ১৪মাসে দুইবার বন্যায় ডুবেছে, এবং প্রতিবারই আঘাত এসেছে প্রায় বিনা সতর্কতায়।
এই তথ্যশূন্যতার রাজনৈতিক মাত্রাও আছে। যে নদীগুলো তিব্বত থেকে নেপাল হয়ে ভারত-বাংলাদেশে নামে, তাদের হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য প্রায়ই কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তু, বিনা মূল্যে বিনিময়যোগ্য বৈজ্ঞানিক উপাত্ত না। আর ঠিক এই মুহূর্তে, নেপালের এই দুর্যোগের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই, গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আগাচ্ছে। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা আর এইচ ডি দেবগৌড়ার সরকারের মধ্যে সইকৃত ৩০বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১১ ডিসেম্বর, ২০২৬। ফারাক্কা বাঁধ থেকে শুষ্ক মৌসুমে কতটা জল বাংলাদেশের দিকে ছাড়া হবে, তা নিয়েই মূল দর কষাকষি। বাংলাদেশ চাইছে ১৯৭৭ সালের গঙ্গা চুক্তির মতো একটি নিশ্চয়তা ধারা ফিরিয়ে আনতে, যাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ জলপ্রবাহের প্রতিশ্রুতি আইনি ভিত্তি পায়। কিন্তু এই পুরো আলোচনার ভিত্তিই দাঁড়িয়ে আছে ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের গড় জলপ্রবাহের হিসাবে, যে সময়টাতে নেপালের উজানের বৃষ্টিপাত ও জলবিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন এখনকার মতো ছিল না। অর্থাৎ নেপালের পাহাড়ে যা ঘটছে, তার প্রভাব শুধু পরিবেশগত না, আসছে দশকগুলোর জলকূটনীতির হিসাব-নিকাশেও তার ছায়া পড়বে।
যাদের ওপর দিয়ে যায় পানি
সংখ্যা দিয়ে এই দুর্যোগের মাত্রা বোঝানো কঠিন, তবু সংখ্যাগুলো এড়ানোও যায় না। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, নেপাল আর চীন উভয় দিক মিলিয়ে অন্তত ১২৮০জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন ৫হাজার ৬শর বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে অন্তত ৫৫০জন বিদেশি নাগরিক। এই বিদেশিদের বড় অংশই ছিলেন কৈলাস মানসরোবর তীর্থযাত্রী কিংবা লাংতাং অঞ্চলের পর্যটক, যে অঞ্চলটি এমনিতেই ট্রেকিং পর্যটনের জন্য বিখ্যাত।
এই দুর্যোগের বোঝা কিন্তু সবার কাঁধে সমান ভাবে চাপেনি। জাতিসংঘ নারী সংস্থার একটি জেন্ডার সতর্কবার্তা জানাচ্ছে, রাসুওয়া আর নুওয়াকোট জেলাতেই প্রায় ১৫৭,০৫০জন নারী ও কিশোরী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সংস্থাটি ব্যাখ্যা করেছে, দুর্যোগের সময় নারীরা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি অবৈতনিক পরিচর্যার দায়িত্ব বহন করেন, পানি সংগ্রহ করতে আরও দূরে যেতে বাধ্য হন, আর দ্রুত দারিদ্র্যের গভীরে তলিয়ে যান। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের একটি পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৯৮হাজার ৫৬০জন প্রজননক্ষম বয়সী নারী এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৫০৩০জন গর্ভবতী, অথচ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ও রাস্তা বন্ধ থাকায় জরুরি প্রসূতি সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘ নারী সংস্থার আরেকটি ব্রিফিংয়ে একজন স্থানীয় নারী সংগঠনের প্রতিনিধির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা, প্রতিবন্ধী মানুষ, যাঁদের সাধারণত সাহায্য করি, তাঁরাই উঁচু জায়গায় দৌড়াতে না পেরে ভেসে গেছেন। এই বাক্যটি আসলে দুর্যোগবিজ্ঞানের একটি সাধারণ সত্যকেই আবার মনে করিয়ে দেয়, বিপর্যয় সমাজের বিদ্যমান বৈষম্যের ওপর দিয়েই বয়ে যায়, আর যারা আগে থেকেই পিছিয়ে ছিলেন, তারাই সবার আগে ভেসে যান।
এই মানুষদের গল্প যেখানে শেষ হয়, বাংলাদেশের গল্প ঠিক সেখান থেকে শুরু হয় না, বরঞ্চ তার পাশ দিয়ে বহুদূর চলতে থাকে। প্রতিটি পরিবর্তন এখানে এসে রূপ নেয় নদীভাঙনে, লবণাক্ততায়, অথবা হঠাৎ বন্যায়। গত পঞ্চাশ বছরে যমুনা, গঙ্গা আর পদ্মা নদী মিলিয়ে এক লাখ আটান্ন হাজার তিনশ তিপান্ন হেক্টর জমি গ্রাস করেছে, আর ২০২৬ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা আর সিরাজগঞ্জ জুড়ে আরও প্রায় ৯১৫হেক্টর জমি ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে। প্রতিবছর এই ভাঙন নতুন করে মানুষকে গৃহহীন করে, অনেকে শেষমেশ গ্রামীণ জীবিকা চিরতরে ছেড়ে, ঠাঁই নেন শহরের বস্তিতে।
তবে বাংলাদেশকে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হিসাবে দেখাটা অসম্পূর্ণ ছবি। গঙ্গা চুক্তির নবায়ন আলোচনায় বাংলাদেশ এখন সক্রিয়ভাবে জলবায়ু-সহনশীল একটি কাঠামোর দাবি তুলছে, যেখানে শুধু জলবণ্টন না, পরিবেশ সুরক্ষা আর তরুণ প্রজন্ম ও সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকেও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। যৌথ নদী কমিশনের মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, কারিগরি সক্ষমতা আর কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার সঞ্চয়, এই সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের হাতে একেবারে শূন্য নয়, বরং একটা মধ্যম মাপের দর কষাকষির সামর্থ্য আছে, বিশেষত যেহেতু অববাহিকা-ব্যাপী জল ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে ভারতেরও নিজস্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে।
ঋণ ও দায়ের হিসাব
এই গোটা পরিস্থিতির কেন্দ্রে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, যা সহজে উত্তর দেয়া যায় না। যে বিশ্ব উষ্ণায়ন হিমালয়ের বরফ গলাচ্ছে, তার জন্য দায় ঠিক কার, আর তার মূল্য শেষমেশ কে চোকাচ্ছে? পরিসংখ্যান এখানে নির্মমভাবে স্পষ্ট। ১৭৫১ সাল থেকে হিসাব করলে বৈশ্বিক মোট কার্বন নিঃসরণের মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য এক শতাংশের জন্য দায়ী নেপাল, এমনটাই বলছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্ল্যাটফর্ম আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটার হিসাব। মাথাপিছু নির্গমনের হিসাবেও একই ছবি, বৈশ্বিক গড় যেখানে বছরে প্রায় সাড়ে চার টন কার্বন ডাই অক্সাইড, নেপালের ক্ষেত্রে তা মাত্র প্রায় শূন্য দশমিক পাঁচ টন, অর্থাৎ বৈশ্বিক গড়ের প্রায় নয় ভাগের এক ভাগ।
এই বৈষম্য নতুন কিছু না, তবে জলবায়ু আলোচনার টেবিলে এর সুরাহা এখনও অধরা। ২০২২ সালে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে “লস অ্যান্ড ড্যামেজ” তহবিল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়, যার লক্ষ্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হওয়া অপূরণীয় ক্ষতির জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই তহবিলে যে অর্থ জমা পড়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বার্ষিক প্রয়োজন যেখানে প্রায় চারশ বিলিয়ন ডলার অনুমান করা হয়, সেখানে ২০২৩ সালে দোহায় প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ ছিল সাতশ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, অর্থাৎ প্রয়োজনের এক শতাংশেরও কম। দক্ষিণ এশিয়ার মতো অঞ্চলের জন্য এই ঘাটতির অর্থ, প্রতিটি বড় দুর্যোগের পর পুনর্গঠনের বোঝা মূলত নিজের কাঁধেই বহন করতে হয়, প্রায়শই ঋণ নিয়ে।
নেপালের এই দুর্যোগ তাই একদিকে যেমন একটি নির্দিষ্ট পাহাড়ের গল্প, অন্যদিকে তেমনি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোরও প্রতিচ্ছবি, যেখানে যারা সবচেয়ে কম কার্বন পুড়িয়েছে, তারাই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে। এই ভারসাম্যহীনতা রাতারাতি বদলাবে না। কিন্তু এটুকু অন্তত স্পষ্ট, হিমালয়ের প্রতিটি ধস, প্রতিটি বন্যা, শুধু নেপালের অভ্যন্তরীণ বিষয় থেকে যাচ্ছে না, তার ঢেউ গিয়ে পৌঁছাচ্ছে সেই সব সমতলে, যেখানকার মানুষ কখনো লাংতাং লিরুংয়ের নামও শোনে নাই।
রাসুওয়ার সেই ধসের জায়গায় এখন দুটো নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে, ধ্বংসস্তূপ আর গলা বরফের জলে ভরা। ভারী বৃষ্টি হলে বা আরেকটি ছোট ধস হলে সেগুলোও যে কোনো দিন ভেঙে যেতে পারে, এই আশঙ্কাতেই উদ্ধারকর্মীদের বারবার কাজ থামিয়ে উঁচু জায়গায় সরে যেতে হয়েছে। কেউ জানে না, কে সেই হ্রদ দুটোর ওপর চোখ রাখছে, বা রাখার কথা। পাহাড়ের গায়ে পানি জমছে নিঃশব্দে, ঠিক যেভাবে সেই বুধবার সকালেও কোনো বৃষ্টি ছাড়াই একটা পাহাড় ভেঙে পড়েছিল। নদী তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, ত্রিশূলী থেকে নারায়ণী, নারায়ণী থেকে গঙ্গা, গঙ্গা থেকে পদ্মা, ঠিক যেমন হাজার বছর ধরে চালিয়ে আসছে।