লকডাউনের প্রথম কয়েক মাস। লন্ডনের এক ছাত্রাবাসে বসে ইউসিএলের বায়োকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র পূর্বিশ থাকের ইনস্টাগ্রামে দুয়েকজন পরিচিত সংগীতশিল্পীর গান লাইভ স্ট্রিম করছিলেন। কোনো মহাপরিকল্পনা ছিল না তার পেছনে, ছিল শুধু একটা অস্বস্তি, দক্ষিণ এশিয়ার গজল আর সুফি সংগীতের জন্য ইন্টারনেটে ঠিকঠাক কোনো ঘর নেই। ছয় বছর পর সেই সাধারণ তাগিদ থেকে জন্ম নেওয়া চ্যানেলটির নাম সুফিস্কোর, আর তার সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা এখন প্রায় তেরো মিলিয়নের কাছাকাছি।
সপ্তম শতাব্দীর আরবি কাব্যরীতি থেকে গজলের জন্ম, রুমি আর হাফিজের হাত ধরে ফারসি সাহিত্যে এর পূর্ণতা, তারপর বলা যায় গালিবের কলমে উর্দুতে তার চূড়ান্ত রূপ। কিন্তু একুশ শতকের প্রথম দুই দশকে এই ঘরানাটা কেমন যেন কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল, বলিউডি আইটেম গান আর পাঞ্জাবি পপের ভিড়ে গজল হয়ে উঠেছিল প্রায় জাদুঘরের প্রদর্শনীর মতো। পূর্বিশের পরিকল্পনা ছিল সহজ, যদি এই সংগীতকে ইনস্টাগ্রাম রিল আর ইউটিউব শর্টসের ভাষায় নিয়ে আসা যায়, তাহলে হয়তো তরুণ প্রজন্মও কান পাতবে। কাজটা তিনি একাই করছিলেন প্রথম দিকে, কনট্রাক্ট থেকে শুরু করে এডিটিং পর্যন্ত। শিল্পীরা সুফিস্কোরের সঙ্গে কাজ করতে চান কারণ এখানে “কোনো লালফিতার দৌরাত্ম্য নাই, কোনো নাটক নাই”। এই সারল্যই বোধহয় আসল অস্ত্র। যেখানে বড় লেবেলগুলো মাসের পর মাস আইনি জটিলতায় আটকে থাকে, সেখানে সুফিস্কোর একটা গান রেকর্ড থেকে রিলিজ পর্যন্ত নিয়ে আসে সপ্তাহখানেকের মধ্যে।

অ্যাবি রোডের চকচকে সিলমোহর এবং বাংলার সঙ্গে গজলের সম্পর্ক
স্রেফ ইউটিউব চ্যানেল থেকে রেকর্ড লেবেলে রূপান্তরটা ঘটেছিল দ্রুতই। ২০২০ সালের শেষদিকে সুফিস্কোর তাদের বেশ কিছু প্রকাশনা মাস্টার করাতে শুরু করে কিংবদন্তি অ্যাবি রোড স্টুডিওতে, যেখানে রেকর্ড করতেন বিটলস-এর মতো ব্যান্ড। বাঁশিবাদক পরস নাথ আর সন্তোষ মুলেকরের “ডেজার্ট রোজ”-এর ইনস্ট্রুমেন্টাল সংস্করণ, শফকত আমানত আলীর গুলাম আলীকে উৎসর্গ করা অ্যালবাম, প্রীতিভা সিং বাঘেলের কণ্ঠে চিত্রা সিংয়ের ক্লাসিক পুনর্নির্মাণ, এসবই আসতে থাকে একের পর এক। আতিফ আসলাম, অরিজিৎ সিং, শ্রেয়া ঘোষাল, হরিহরনের মতো তারকারাও যুক্ত হন এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে।
মজার ঘটনা হলো দাগ দেহলভির বিখ্যাত গজল “উজর আনে মেঁ” পুনর্নির্মাণ, যেখানে ফরিদা খানমের কালজয়ী পরিবেশনাকে নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে এবং নতুন আয়োজনে সাজানো হয়। সুফিস্কোরের প্রতিনিধির ভাষায়, লক্ষ্য ছিল “পুরনো ঐতিহ্যকে ধরে রেখে একে চিরসবুজ করে তোলা”। এই পুনর্নির্মাণের রাজনীতিটা কৌতূহলোদ্দীপক, কারণ এখানে মৌলিকত্বের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে স্মৃতির পুনরুজ্জীবন। পুরনো প্রজন্মের শ্রোতা তার নস্টালজিয়া খুঁজে পায়, নতুন প্রজন্ম পায় একটা পরিচিত সুরের নতুন প্যাকেজিং।
এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে, বাঙালি শ্রোতা কেন উর্দু গজলে এত মজে যায়, যেখানে ভাষাটাই বোঝার কথা না সবার? আসলে সম্পর্কটা নতুন না, প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো। বাংলা গজলের পথিকৃৎ অতুলপ্রসাদ সেন লখনৌতে থাকাকালীন গজলের ধরণটা হাত করেন, আর সেটাকে বাংলায় প্রতিস্থাপন করেন এক অভাবনীয় দক্ষতায়। পরে কাজী নজরুল ইসলাম এই ধারাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন, তার অসংখ্য গানে গজলের ধরণ আর ফারসি-উর্দু শব্দভাণ্ডার মিশিয়ে দিয়ে। অর্থাৎ বাঙালির কানে গজলের সুর আসলে অচেনা কিছু না, এটা আমাদের নিজস্ব সংগীত-স্মৃতির অংশ, শুধু ভাষার আবরণটা বদলেছে মাত্র।
গজলে দিল্লি দরবারের প্রভাবও ছিল অনেক। উনিশ শতকের দিকে ভারতের লখনউ এবং দিল্লির নবাব ও উচ্চবিত্তদের মাধ্যমে ধ্রুপদী উর্দু এবং ফার্সি গজল বাঙালি অভিজাত শ্রেণীর শ্রোতাদের মাঝে পরিচিতি পেতে শুরু করে। সে সময় লখনউয়ের নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ কলকাতায় নির্বাসিত হলে তাঁর দরবারের সঙ্গীতশিল্পীদের মাধ্যমে বাংলায় গজলের চর্চা ও শ্রোতা তৈরি হওয়া শুরু করে।
বাংলাদেশে সুফি সাধনার সাথেও গজলের সম্পর্ক গভীর। জিকিরের সময় গজল গাওয়া হয় বহু খানকায়, আর ময়জভান্ডারি সংগীতের মতো ঐতিহ্যেও এর প্রভাব স্পষ্ট । মধ্যযুগীয় বাংলায় সুফি কবিরা হামদ, নাত আর গজল রচনা করে ইসলামি দর্শনকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন, আর এই ঐতিহ্য এখনো বেঁচে আছে গ্রামীণ কাওয়ালি আর বাউল-ফকিরি আসরে। ফলে যখন সুফিস্কোরের মতো একটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবের মাধ্যমে গজল আর সুফি সংগীতকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়, বাংলাদেশের শ্রোতা তাতে খুঁজে পায় একটা পুরনো পরিচিত সুর।

দর্শক মহল
সুফিস্কোরের প্রথম বছরের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ছিল আটত্রিশ লাখের মতো। এক বছরের মধ্যে তা চল্লিশ লাখ ছাড়িয়ে যায়, ইউকে ইউটিউবের শীর্ষ ২০এ জায়গা করে নেয় চ্যানেলটি। ২০২৬ সালে এসে সেই সংখ্যা প্রায় তেরো মিলিয়ন। প্রবৃদ্ধির এই গ্রাফটা যদি সরলরেখায় আঁকা যায়, তাহলে দেখা যাবে একটা মহামারীর নিঃসঙ্গতা থেকে জন্ম নেওয়া প্রকল্প কীভাবে ক্রমে পরিণত হয়েছে একটা বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে, যেখানে লন্ডন বসে থেকেও একজন তরুণ উদ্যোক্তা মুম্বাই, করাচি, দুবাই আর ঢাকার শ্রোতাকে একই সুতায় বাঁধছে।
তবে সংখ্যা দিয়ে সবটা মাপা যায় না। ইউটিউব কমেন্ট সেকশন ঘাঁটলে দেখা যায় একধরনের কৃতজ্ঞতার সুর, প্রবাসী দর্শকরা প্রায়ই লেখেন যে এই চ্যানেলের মাধ্যমে তারা তাদের দাদা-দাদির প্রজন্মের সংগীতের সাথে নতুন করে সংযুক্ত হয়েছেন। এই আবেগটা বোঝা জরুরি, কারণ এটাই আসলে ব্যাখ্যা করে কেন একটা “নিশ” জনরা এত দ্রুত মূলধারায় ঢুকে পড়তে পারল। অ্যালগরিদম হয়তো ভাইরাল হওয়ার শর্ত ঠিক করে, কিন্তু আবেগের গভীরতা ঠিক করে কে সেই ভিডিওটা তিনবার দেখবে, আর কে স্রেফ স্ক্রল করে চলে যাবে।
এখন প্রশ্ন, সুফিস্কোরের মতো প্ল্যাটফর্ম কি গজলকে সত্যিই “বাঁচাচ্ছে”, নাকি স্রেফ তার একটা সহজপাচ্য, ইনস্টাগ্রাম-বান্ধব সংস্করণ তৈরি করছে, যেখানে মূল কাব্যের জটিলতা আর দার্শনিক গভীরতা হারিয়ে যাচ্ছে তিন মিনিটের রিলের চাপে? ফরিদা খানম বা মেহেদী হাসানের মূল পরিবেশনায় যে ধ্যানমগ্ন নীরবতা ছিল, নতুন প্রযোজনার চকচকে ভিজ্যুয়াল আর দ্রুতলয়ের আয়োজনে সেই নীরবতা কতটা টিকে থাকে, এই বিতর্ক সংগীত সমালোচকদের মধ্যেও চলমান।
গজল যদি সত্যিই বেঁচে থাকে আগামী প্রজন্মে, তাহলে হয়তো তার কৃতিত্বের একটা অংশ পাওনা থাকবে লকডাউনের সেই নিঃসঙ্গ ছেলেটির, যে বুঝেছিল একটা হারিয়ে যাওয়া ঘরানার দরকার শুধু ভালোবাসা না, দরকার একটা ঠিকঠাক ডিজিটাল ঠিকানাও।