ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে আধুনিকতা যত পরিণত হয়েছে, ধর্মীয় বিশ্বদৃষ্টির অবশিষ্ট আশ্রয়গুলো তত দ্রুত খসে পড়েছে। আর সেই খসে পড়ার ফাঁক দিয়ে যে শূন্যতা ঢুকেছে, তাকেই আমরা আজ নিহিলিজম নামে চিনি। এই সংকটের মুখোমুখি হয়ে দার্শনিকরা সেই পুরনো প্রশ্নটা নতুন করে তুলতে বাধ্য হলেন, জীবনের অর্থ আসলে কী। সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিল দুটো পরস্পরবিরোধী উত্তর, এক্সিস্টেনশিয়ালিজম আর অ্যাবসার্ডিজম। এই লেখায় আমরা দেখব সংকটটা কোথা থেকে এল, আর এই দুই দর্শন কীভাবে তার মোকাবিলা করল।
একটা ঐশ্বরিক উদ্দেশ্যের জগৎ
ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে জীবনের একটা বস্তুনিষ্ঠ অর্থ থাকে, এমন একটা অর্থ যা তার নিজের পছন্দ-অপছন্দ থেকে স্বাধীন। ইহুদি ও খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যে ইতিহাসের একদিকে থাকে সৃষ্টি, অন্যদিকে বিচার দিবস। মাঝখানের প্রতিটি জীবন সেই বৃহত্তর আখ্যানের একটা অংশ। বৌদ্ধ ও হিন্দু চিন্তায় কাঠামোটা ভিন্ন হলেও যুক্তিটা একই রকম। সেখানে আছে কর্মফল আর জন্ম-মৃত্যুর চক্রের ধারণা, যার শেষ বিন্দু স্বর্গ-নরকের দ্বৈততা নয়, বরং মুক্তি। হিন্দুধর্মে যাকে বলা হয় মোক্ষ, বৌদ্ধধর্মে নির্বাণ।
পূর্ব আর পশ্চিমের এই বিশ্বাস-ব্যবস্থাগুলো মানুষকে বাস্তবতার একটা নির্দিষ্ট, সুরক্ষিত অবস্থান দিয়েছিল। মহাবিশ্বে আমাদের একটা জায়গা আছে, এই আশ্বাসটুকু ছিল। কিন্তু আধুনিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি যত পরিণত হয়েছে, ততই সেই ধর্মীয় ছাপগুলো ঝরে পড়েছে। বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য দেবত্বের প্রয়োজন কমতে থেকেছে, আর আমরা ধীরে ধীরে সেই দেবত্ব এবং তার সঙ্গে জড়ানো নিশ্চয়তাগুলো ছেড়ে দিয়েছি। নিৎশে এই প্রক্রিয়াটাকে অন্যভাবে দেখেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, খ্রিস্টধর্ম নিজেই সত্যনিষ্ঠাকে এত মূল্য দিয়েছিল, নিজের অনুসারীদের মধ্যে এই গুণটাকে এত শাণিত করেছিল যে শেষপর্যন্ত সে নিজের ধারালো করা অস্ত্রেই ধরাশায়ী হলো। খ্রিস্টীয় নৈতিকতার সততার দাবিই একসময় খ্রিস্টীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ফিরে এল।
যেভাবে জন্ম নিল অর্থ-সংকট
উনিশ শতকের ইউরোপে একের পর এক গ্রন্থ প্রকাশিত হতে থাকে, যেগুলা এই ফাটল আরও চওড়া করে দেয়। ১৮৩৫ সালে তরুণ জার্মান ধর্মতাত্ত্বিক ডেভিড ফ্রিডরিখ স্ট্রাউস প্রকাশ করলেন তাঁর লাইফ অফ জেসাস। বইটা বাইবেলকে সরাসরি ইতিহাসের দলিল হিসেবে পড়ার অভ্যাসের ভিত নাড়িয়ে দিল, যিশুর জীবনের অলৌকিক অংশগুলোকে মিথ হিসাবে চিহ্নিত করে। প্রতিক্রিয়া এতটাই তীব্র হয়েছিল যে টুবিঙেন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্ট্রাউসের একাডেমিক ক্যারিয়ারই ভেস্তে যায়, আর পরে জুরিখে তাঁকে অধ্যাপনার প্রস্তাব দেওয়া হলে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ এতটাই বেড়ে যায় যে সুইস সরকারই একসময় পড়ে যায়।
ছয় বছর পর, ১৮৪১ সালে, প্রকাশিত হলো লুডভিগ ফয়েরবাখের দ্য এসেন্স অফ ক্রিশ্চিয়ানিটি। এখানে ফয়েরবাখের যুক্তি ছিল অন্য রকম। তিনি বললেন,খোদা আসলে মানবতার নিজেরই একটা মনস্তাত্ত্বিক প্রক্ষেপণ, মানুষ তার নিজের সেরা গুণগুলাকে বাইরে ছুড়ে দিয়ে তাকে দেবত্ব দিয়েছে। ফয়েরবাখ নামের আক্ষরিক অর্থ আগুনের ঝর্ণা, আর কাকতালীয়ভাবে তাঁর চিন্তাও কার্ল মার্ক্সের কাছে ঠিক তেমনই কাজ করেছিল। মার্ক্স মনে করতেন, সত্য আর স্বাধীনতার দিকে আগাতে হলে এই আগুনের ঝর্ণার ভেতর দিয়াই পার হতে হবে, এই শ্লেষটা তখনকার তরুণ হেগেলপন্থীদের মহলে বেশ পরিচিত ছিল।
স্ট্রাউস আর ফয়েরবাখ ধর্মীয় আখ্যানের গোড়া নাড়িয়েছিলেন। সেই আখ্যানের বুকে সত্যিকার ছুরিটা বসাল আঠারো বছর পর, ১৮৫৯ সালের নভেম্বরে, চার্লস ডারউইনের অন দ্য অরিজিন অফ স্পিসিস। বইটা প্রকাশের প্রথম দিনেই নিঃশেষ হয়ে যায়। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রজাতির বিবর্তনের এই ব্যাখ্যায় মানুষকে সৃষ্টির বিশেষ, পূর্বপরিকল্পিত কেন্দ্র হিসেবে দেখার আর কোনো প্রয়োজন থাকল না। বিজ্ঞান আর ধর্মতত্ত্বের মধ্যে যে দূরত্ব স্ট্রাউস আর ফয়েরবাখ তৈরি করেছিলেন, ডারউইন সেই দূরত্বকে অনতিক্রম্য করে তুললেন।
এই সাংস্কৃতিক স্রোত শেষপর্যন্ত এসে ঠেকল নিৎশের সেই বিখ্যাত দৃশ্যে, যা তিনি লিখেছিলেন দ্য গে সায়েন্স বইয়ের ১২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে, ১৮৮২ সালে। একজন উন্মাদ লোক এক উজ্জ্বল সকালে লণ্ঠন হাতে বাজারের মধ্যে ঢুকে খোদার খোঁজ করে, আর গ্রামবাসীরা তাকে বিদ্রূপ করে সেই আত্মবিশ্বাসী উদাসীনতা দিয়ে, যা আধুনিকতার নিজস্ব ভঙ্গি হয়ে উঠেছিল। তারপর সে জনতার সামনে এক দীর্ঘ ভাষণ দেয়। কীভাবে সমুদ্র শুষে নিলাম আমরা, দিগন্ত মুছে ফেলার স্পঞ্জটা কে দিল হাতে, পৃথিবীকে তার সূর্য থেকে খুলে ফেলে এখন আমরা কোন দিকে পড়ে যাচ্ছি, এসব প্রশ্ন তুলে সে শেষে বলে,খোদামৃত। খোদামৃতই থাকবে। আর আমরাই তাকে হত্যা করছি।
এই অনুচ্ছেদটাই যেন নিহিলিজমের আহ্বান-ধ্বনি। পেছনে, পাশে, সামনে, ওপরে, নিচে, এই দিকনির্দেশনাগুলো দিয়েই আমরা জগতে নিজেদের অবস্থান বুঝি। আর খোদার মৃত্যু সেই কম্পাসটাকেই ভেঙে দেয়।
খোদার মৃত্যুর অর্থ
আরেকটু দার্শনিকভাবে বললে,খোদাছিলেন বাহ্যিক মূল্যবোধ আর বস্তুনিষ্ঠ অর্থের সেই ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে বাকি সবকিছু অর্থ পেত।খোদা ছাড়া বাইরের জগতের আর কোনো টেলোস থাকে না, কোনো পূর্বনির্ধারিত উদ্দেশ্য থাকে না। নৈতিকতা আর মানব-অস্তিত্বের বস্তুনিষ্ঠ ভিত্তি খসে পড়ে, আর সেই শূন্যতাই বিপর্যয়কর হয়ে ওঠে।
বাইবেল-সমালোচনার সেই ধারাবাহিকতা এবং কোপার্নিকাস ও নিউটনের অন্তর্দৃষ্টির ওপর ডারউইনের আবিষ্কার যোগ হলে দেখা যায়, বাস্তবতা আর ভূকেন্দ্রিক বা মানবকেন্দ্রিক থাকে না। নিউটনের নিয়মবদ্ধ মহাবিশ্বে আর ডারউইনের বিবর্তনের গল্পে খোদার প্রয়োজন কমে আসে, হয়তো সীমাবদ্ধ থাকে অ্যারিস্টটলের সেই বিমূর্ত অকারণ কারণের ভূমিকায়। বস্তুবাদী ব্যাখ্যাগুলা বাইরের জগৎ বোঝার ক্ষেত্রে ধর্মীয় ব্যাখ্যার চেয়ে এত বেশি কার্যকর প্রমাণিত হলো যে ধর্মীয় আখ্যানগুলা ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ল।
সমস্যা হলো, এই টালমাটাল হয়ে যাওয়া ধর্মীয় ব্যাখ্যাগুলার সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল মানব-নৈতিকতা আর অর্থের ভিত্তি। ফলে খোদার মৃত্যু একই সঙ্গে ডেকে আনল অর্থ-সংকট।
এক্সিস্টেনশিয়ালিজম বলতে আসলে কী বোঝায়
এই মূল সমস্যা থেকেই জন্ম নিল এক্সিস্টেনশিয়ালিজম আর অ্যাবসার্ডিজম। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে বিভ্রান্তির একটা বড় কারণ আছে, আর সেটা হলো এক্সিস্টেনশিয়ালিজম শব্দটার নিজস্ব অস্থির ব্যবহার।
লেখকভেদে শব্দটার পরিধি কমবেশি হয়। কারও সংজ্ঞায় আলবেয়ার কামু আর তাঁর অ্যাবসার্ডিজমকে এক্সিস্টেনশিয়ালিজমেরই একটা উপশাখা বলা হয়, আবার কারও কাছে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা দর্শন। এক্সিস্টেনশিয়ালিজমের আলোচনায় প্রায়ই ঊনবিংশ শতাব্দীর সোরেন কিয়ের্কেগার্ড আর নিৎশেকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যদিও শব্দটার আধুনিক ব্যবহার শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের প্যারিসে। কিয়ের্কেগার্ড অবশ্য এই দুই ধারারই একরকম পূর্বসূরি। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ঝুঁকি নিয়ে তাঁর যে ধারণা, যাকে বলা হয় বিশ্বাসের লাফ, তা এক্সিস্টেনশিয়ালিজমের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল ধর্মীয় দর্শনে, কিন্তু অসঙ্গতির (অ্যাবসার্ড) ধারণাটাও তাঁর লেখাতেই প্রথম স্পষ্ট আকার পায়।
ব্যাপারটা আরও জটিল হয় যখন দেখা যায়, মার্টিন হাইডেগার আর কামু, যাঁদের প্রায়ই এক্সিস্টেনশিয়ালিস্ট বলে চিহ্নিত করা হয়, তাঁরা নিজেরাই প্রকাশ্যে এই তকমা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফলে শব্দটার সঠিক সীমারেখা কিছুটা অস্পষ্টই থেকে যায়। এই লেখার সুবিধার্থে আমরা এক্সিস্টেনশিয়ালিজম বলতে মূলত জঁ-পল সার্ত্রের দর্শনকেই বুঝব। এর একটা স্পষ্ট কারণ আছে। সার্ত্রই শুধু শব্দটার সংজ্ঞা দেননি, এর অনেক মূল পরিভাষাও তৈরি করেছেন, আর তিনি ছিলেন সেই হাতেগোনা দার্শনিকদের একজন যিনি নিজেকে সরাসরি এক্সিস্টেনশিয়ালিস্ট বলে পরিচয় দিতেন।
এক্সিস্টেনশিয়ালিস্ট প্রতিক্রিয়া
নিহিলিজমের সংকট আর বস্তুনিষ্ঠ অর্থের অনুপস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সার্ত্র প্রথমে ঠিক করতে চাইলেন, মানুষ হওয়ার মানে আসলে কী। এখান থেকেই আসে তাঁর সেই বিখ্যাত সূত্র, অস্তিত্ব সারবত্তার আগে আসে। সূত্রটা তিনি প্রথম উচ্চারণ করেন ১৯৪৫ সালের ২৯ অক্টোবর প্যারিসের ক্লাব মেনতেনঁ-এ দেওয়া এক বক্তৃতায়, পরে যা বই আকারে প্রকাশিত হয় এক্সিস্টেনশিয়ালিজম ইজ আ হিউম্যানিজম নামে, ১৯৪৬ সালে। সূত্রটা শুনতে যত সহজ, আসলে তত সহজ না। এর শেকড় লুকিয়ে আছে হাইডেগারের ১৯২৭ সালের বই বিয়িং অ্যান্ড টাইম-এ, যেখানে হাইডেগার বলেছিলেন মানুষের সারবত্তা তার অস্তিত্বের মধ্যেই নিহিত। সার্ত্র সেই ধারণাটাকেই আরও স্পষ্ট, আরও রাজনৈতিক অর্থে ব্যবহার করলেন।
সারবত্তা বা এসেন্স একটা প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক পরিভাষা। অ্যারিস্টটলের কাছে কোনো বস্তুর সারবত্তা মানে তার সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্য, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে টেলোস বা উদ্দেশ্যের ধারণা। ছুরির সারবত্তা কাটা, কাপের সারবত্তা তরল ধরে রাখা, নৌকার সারবত্তা জলে ভাসা। দর্শনের চিরায়ত দৃষ্টিতে বস্তুর সারবত্তা তার অস্তিত্বের আগে আসে। কোনো কাপ তরল ধরে রাখতে না পারলে সেটা আসলে কাপ হিসাবেই ব্যর্থ, কারণ তার মধ্যে সেই অত্যাবশ্যক গুণটাই নাই।
রূপকভাবে বলা যায়, খোদার মৃত্যুর আগে মানুষের সারবত্তাও তার অস্তিত্বের আগে আসত বলে ভাবা হতো। মানুষের একটা পূর্বনির্ধারিত উদ্দেশ্য ছিল, অ্যারিস্টটলের মতে যুক্তিবাদিতা, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে মুক্তির দিকে যাত্রা। কিন্তু নিহিলিজমের হাত ধরে এই বিভ্রম ভেঙে পড়ল, আর প্রকাশ পেল যে মানবতার চেয়ে বড় কোনো উদ্দেশ্য অস্তিত্বেই নাই। তাহলে অর্থ-শূন্যতার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের সংজ্ঞায়িত করব কীভাবে?
সার্ত্রের উত্তর হলো, সারবত্তা নির্ধারিত হয় আমাদের অস্তিত্ব দিয়ে, আমরা মূলত তা-ই যা আমরা করি, যেভাবে আমরা পৃথিবীতে কাজ করি। মানুষের কোনো সহজাত স্বভাব নাই, কারণ তাকে কল্পনা করার মতো কোনোখোদা নাই। মানুষ শুধু নিজেকে যেমন ভাবে তা-ই নয়, বরঞ্চ নিজেকে যেমন হতে চায় তা-ও বটে। যেহেতু মানুষ নিজেকে কল্পনা করে কেবল অস্তিত্বে আসার পরই, তাই মানুষ আসলে তা-ই যা সে নিজেকে বানিয়ে তোলে। এটাই এক্সিস্টেনশিয়ালিজমের প্রথম নীতি। নিহিলিজমের এনে দেওয়া অর্থহীনতার সামনে এক্সিস্টেনশিয়ালিস্ট উত্তর তাই এই, বস্তুনিষ্ঠ কোনো অর্থ নাই বলেই আমাদের নিজেদের কর্মের মধ্য দিয়ে নিজেদের অর্থ তৈরি করতে হবে।
অ্যাবসার্ডিস্ট প্রতিক্রিয়া
অসঙ্গতি বা অ্যাবসার্ডের ধারণা কিয়ের্কেগার্ডের মধ্যেও ছিল, কিন্তু আলবেয়ার কামু তাঁর দ্য মিথ অফ সিসিফাস বইয়ে এটাকে সম্পূর্ণ দর্শনে রূপ দিলেন। বইটা প্রকাশিত হয় ১৯৪২ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন তুঙ্গে, ফ্রান্স জার্মান দখলে। কামু বইটা শুরু করেন দর্শনের ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত পঙক্তি দিয়ে, সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক সমস্যা একটাই, আর সেটা হলো আত্মহত্যা। জীবন বেঁচে থাকার যোগ্য কি না, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই আসলে দর্শনের মৌলিক কাজ।
নিহিলিজমের মুখোমুখি হয়ে আমরা আসলে জিজ্ঞাসা করছি, বস্তুনিষ্ঠ উদ্দেশ্যের অভাব কি বোঝায় যে জীবন বেঁচে থাকার যোগ্য নয়। কামুর প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে অ্যাবসার্ড, যা দুটো জিনিসের সংঘর্ষে জন্ম নেয়। একদিকে ঠান্ডা, উদাসীন আর অর্থহীন বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতা, অন্যদিকে অর্থের প্রতি মানুষের সহজাত তৃষ্ণা। এই তৃষ্ণা আর তা মেটানোর অসম্ভাব্যতার মধ্যেকার টানাপোড়েনই অ্যাবসার্ড। আমরা সবাই এই টানাপোড়েনে ডুবে আছি, আর কামুর মতে এই সমস্যা সামলানোর তিনটি পথ আছে।
প্রথম পথ আত্মহত্যা। জীবনের যদি কোনো অর্থই না থাকে, তাহলে বেঁচে থাকা কেন? কামু এই পথকে অসন্তোষজনক মনে করেন, কারণ মৃত্যুতেও জীবনের চেয়ে বেশি কোনো অর্থ নাই। এটা সমস্যাটাকে সমাধান করে না, শুধু এড়িয়ে যায়। দ্বিতীয় পথ বিশ্বাসের একটা লাফ, এমন কোনো মতবাদে বিশ্বাস স্থাপন করা যা বলে দেয় একটা অর্থ আছে। এটা হতে পারে ধর্ম, হতে পারে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ। আমরা এক টুকরো অসারতা মেনে নেই, বিনিময়ে অ্যাবসার্ড থেকে সাময়িক মুক্তি পাই। কামু একে বলেন দার্শনিক আত্মহত্যা।
কামু এই দুটো পথকেই আন্তরিকতাহীন মনে করেন। তাই তিনি তৃতীয় পথের কথা বলেন, সেই অতৃপ্ত টানাপোড়েনকে আলিঙ্গন করা, অ্যাবসার্ডকে সরাসরি গ্রহণ করা। এই তৃতীয় পথটাই অ্যাবসার্ডিজম। এটা অর্থহীনতার বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ, যেখানে আমরা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বা দার্শনিক আত্মহননের মধ্য দিয়ে পালাই না, বরঞ্চ অ্যাবসার্ডকে যেমন আছে তেমনভাবেই মুখোমুখি হই, কোনো পলায়ন ছাড়া।
অ্যাবসার্ডিজম বনাম এক্সিস্টেনশিয়ালিজম
কামু এক্সিস্টেনশিয়ালিস্টদের দিকে তাকিয়ে তাদের মধ্যে দেখতে পান পলায়নপরতা। তাঁর ভাষ্যে, তারা যা তাদের পিষে ফেলছে তাকেই দেবত্ব দেয়, আর যা তাদের দরিদ্র করে তোলে তার মধ্যেই আশার কারণ খুঁজে নেয়। সার্ত্রের অর্থ-নির্মাণকেও তিনি একধরনের বিশ্বাসের লাফ হিসেবে দেখতেন, যদিও তা কোনো প্রচলিত ধর্ম বা মতাদর্শের রূপে না। অ্যাবসার্ডিজম বলে, নিজের অর্থ তৈরি করার প্রলোভন থেকেও দূরে থাকতে হবে, কারণ সেটাও শেষ পর্যন্ত এক ধরনের সান্ত্বনা, যা অ্যাবসার্ড টানাপোড়েনটাকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করে। কামুর ভাষায়, একটা পরাধীন পৃথিবীর সঙ্গে মোকাবিলার একমাত্র উপায় হলো এতটাই মুক্ত হয়ে ওঠা যে নিজের অস্তিত্বই হয়ে ওঠে এক বিদ্রোহের কাজ।
সিসিফাস
কামুর দর্শনের সবচেয়ে ভালো প্রতিফলন পাওয়া যায় একটা চিত্রকল্পে, গ্রিক পুরাণের সিসিফাস চরিত্রে। সিসিফাস ছিলেন করিন্থের প্রতিষ্ঠাতা রাজা, প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটি। পুরাণে তাঁকে বলা হয় সবচেয়ে ধূর্ত মানুষ, এমনকি দেবতাদেরও ছাড়িয়ে যাওয়া চতুর। একবার মৃত্যুর দেবতা থানাতোসকে যখন তাঁকে নিতে পাঠানো হয়, সিসিফাস কৌশলে তাঁকেই শিকলে বেঁধে ফেলেন। ফলাফল ছিল এক বিরাট বিশৃঙ্খলা, কেউ আর মরতে পারছিল না, যুদ্ধে মানুষ মরছিল না, অসুস্থরা মুক্তি পাচ্ছিল না। শেষে যুদ্ধদেবতা এরিস বিরক্ত হয়ে থানাতোসকে মুক্ত করেন, আর সিসিফাসকে পাতালে পাঠানো হয়।
সিসিফাস অবশ্য সেখানেও হাল ছাড়েন নাই। মৃত্যুর আগে তিনি স্ত্রী মেরোপিকে বলে যান তাঁর শবদেহ সৎকার না করতে। পাতালে পৌঁছে তিনি পার্সেফোনির কাছে অভিযোগ করেন, স্ত্রী তাঁকে যথাযথ সৎকার না করে অপমান করেছেন, আর অনুমতি চান একবার পৃথিবীতে ফিরে সেই অন্যায় শুধরে দিতে আসার। পার্সেফোনি রাজি হন। সিসিফাস পৃথিবীতে ফিরে আর পাতালে যান না, বুড়ো বয়স পর্যন্ত করিন্থ শাসন করেন, শেষে দেবদূত হার্মিস এসে তাঁকে চিরতরে পাতালে টেনে নেন। শাস্তি হিসাবে তাঁকে একটা পাথর পাহাড়ের চূড়ায় ঠেলে তুলতে হয়, প্রতিবার চূড়ার কাছাকাছি গেলেই পাথরটা গড়িয়ে নিচে নেমে যায়, আর তাঁকে আবার নতুন করে শুরু করতে হয়, অনন্তকাল ধরে।
সিসিফাসকে কামু অ্যাবসার্ডিজমের প্রতীক হিসেবে বেছে নেন তিনটে কারণে। প্রথমত, জীবনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, যা প্রকাশ পায় পাতাল থেকে চালাকি করে বেরিয়ে এসে আবার পৃথিবীর সুখ উপভোগ করার মধ্য দিয়ে, যা জীবন-বিরোধী নিহিলিজমের ঠিক বিপরীত। দ্বিতীয়ত, তাঁর শাস্তির নিজস্ব অসঙ্গতি, পাথর ঠেলে তোলা যা জেনেবুঝেই বারবার গড়িয়ে পড়ে, তবু তাঁকে আবার তা তুলতে হয়। তৃতীয়ত, সিসিফাস একজন বিদ্রোহী। তিনি মৃত্যু আর দেবতাদের বোকা বানিয়ে জীবনে ফিরে আসেন, বিদ্রোহ করেন জিনিসের মৌলিক শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে। কামু বইটা শেষ করেন সেই বিখ্যাত পঙক্তি দিয়ে। প্রভুহীন এই মহাবিশ্ব সিসিফাসের কাছে বন্ধ্যাও মনে হয় না, অর্থহীনও না। সেই পাহাড়ের প্রতিটি খনিজ কণা, পাথরের প্রতিটি পরমাণু নিজের মধ্যেই একটা গোটা জগৎ গড়ে তোলে। উচ্চতার দিকে সেই সংগ্রামই একজন মানুষের হৃদয় পূর্ণ করার জন্য যথেষ্ট। সিসিফাসকে অবশ্যই সুখী কল্পনা করতে হবে।
নিহিলিজম হলো এই উপলব্ধি যে কোনো বস্তুনিষ্ঠ অর্থ নাই। এক্সিস্টেনশিয়ালিজম বলে, আমরা নিজেদের জীবনে যে সিদ্ধান্ত নেই তার মধ্য দিয়েই নিজেদের অর্থ তৈরি করা সম্ভব। অ্যাবসার্ডিজম বলে, নিজেদের অর্থ তৈরি করার চেষ্টাও এক ধরনের প্রতারণা, বরঞ্চ অ্যাবসার্ডের দিকে সরাসরি তাকিয়ে সেই অর্থহীনতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা উচিত। দুটো পথই একই ভাঙা মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে, শুধু হাতটা বাড়াচ্ছে দুই দিকে।