The Sultan's peasant never gets tired.

The farmers of Bengal have always been weak, destitute and exploited throughout history. Yet SM Sultan has depicted them with bodies that can move mountains.

● The Publish

আগস্ট ১০, ২০২৬

The Sultan's farmer never gets tired.

ইলাস্ট্রেশন : মাহমুদ / দ্য পাবলিশ


বাংলার কৃষক বলতে ইতিহাস আমাদের সামনে যে ছবি এঁকে রেখেছে, তাতে শরীর বলতে তেমন কিছু নাই। খাজনার চাপে কুঁজো পিঠ। অনাহারে বসে যাওয়া গাল। রোদে পোড়া চামড়ার নিচে হাড়ের রেখা। ঔপনিবেশিক আমলের আলোকচিত্র থেকে দুর্ভিক্ষের বিবরণ পর্যন্ত বাংলার কৃষক বরাবরই এসেছে দুর্বলতার প্রতীক হয়ে। এস এম সুলতান সেই কৃষককেই ক্যানভাসে বসালেন এমন এক শরীরে, যা রীতিমতো মহাকাব্যিক। হাতের পেশি ফুলে থাকে কাঁধ থেকে কনুই পর্যন্ত। বুকের ছাতি চওড়া। পায়ের গোছ যেন এখনই মাটি খুঁড়ে ফেলবে। যে মানুষটা বাস্তবে হয়তো সারাদিন আধপেটা খেয়ে জমিতে খেটেছে, ক্যানভাসে সে দাঁড়িয়ে আছে দেবতার মতো।

এই ফারাকটা নিছক শৈল্পিক অতিরঞ্জন ভাবলে ভুল করবেন। সুলতান নিজেই একবার বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ তো অনেক রুগ্ন, কৃষকায়। একেবারে কৃষক যে সেও খুব রোগা, তার গরু দুটো, বলদ দুটো -সেটাও রোগা। আমার ছবিতে তাদের বলিষ্ঠ হওয়াটা মনের ব্যাপার। মন থেকে ওদের যেমনভাবে আমি ভালোবাসি যে আমাদের দেশের কৃষক সম্প্রদায়ইতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়েছিলো। অর্থবিত্ত ওরাই তো যোগান দেয়। …আর এই যত জমিদার রাজা মজারাজা আমাদের দেশের কম কেউ না। সবাই তো কৃষিনির্ভর একই জাতির ছেলে। আমার অতিকায় ছবিগুলোর কৃষকের অতিকায় অতিকায় দেহটা এই প্রশ্নই জাগায় যে, ওরা কৃশ কেন? ওরা রুগ্ন কেন- যারা আমাদের অন্ন যোগায়। ফসল ফলায়।’ এই প্রশ্নটাই তাঁর কাজের কেন্দ্রে ছিল।

চিত্রকর্ম : এস এম সুলতান

নড়াইলের ছেলে

সুলতানের জন্ম নিয়ে বাংলা তথ্যসূত্রে একধরনের বিভ্রান্তি আছে। কিছু সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ১৯২৪ সাল লেখা হলেও, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন এবং তাঁর মৃত্যুর পরপর প্রকাশিত অধিকাংশ প্রামাণ্য জীবনীই নিশ্চিত করে যে তাঁর জন্ম ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট, তৎকালীন যশোর জেলার (বর্তমান নড়াইল) মাছিমদিয়া গ্রামে। বাবা রাজমিস্ত্রি, ঘরে দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী। ছেলেবেলায় তার নাম ছিল লাল মিয়া। ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে মাত্র পাঁচ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পর বাবার সঙ্গে রাজের কাজে হাত লাগান সুলতান। যে দালান তিনি বানাতে সাহায্য করতেন, তারই দেয়ালে কাঠকয়লা দিয়ে ছবি আঁকতেন। শিল্পের সঙ্গে তাঁর প্রথম সম্পর্ক তৈরি হয় শ্রমের ভেতর দিয়েই।

স্থানীয় জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের সহায়তায় ১৯৩৮ সালে সুলতান কলকাতা যান, আর সমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সুপারিশে ১৯৪১ সালে ভর্তি হন কলকাতা আর্ট স্কুলে। তিন বছর পড়ার পর কোর্স শেষ না করেই স্কুল ছেড়ে দেন। প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা তাঁর সঙ্গে কখনো মানানসই ছিল না। এই ভবঘুরে জীবনের শুরু এখান থেকেই, যা পরে তাঁর গোটা কর্মজীবনের চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতের টুকরো টুকরো শহরে ঘুরে বেড়ান, ১৯৪৩ সালে খাকসার আন্দোলনে যোগ দেন তিনি, কাশ্মীরের আদিবাসীদের সঙ্গে থাকেন, ভ্যান গঘের প্রভাবে তেলরঙে ল্যান্ডস্কেপ আঁকেন। তারপর, দেশভাগের পর করাচি চলে যান, পার্সি স্কুলে দুই বছর শিল্পশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন, চুঘতাই ও শাকের আলীর মতো শিল্পীর সংস্পর্শে আসেন সুলতান। ১৯৫০ সালে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো, বোস্টন হয়ে লন্ডন পর্যন্ত তাঁর কাজ প্রদর্শিত হয়। সুলতান এমন এক শিল্পী, যিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রেখেও কখনো তার অংশ হয়ে ওঠেননি।

এসব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি ফিরে আসেন বাংলায়, আর মধ্য-পঞ্চাশের পর তাঁর ক্রমশ কাজের কেন্দ্রে চলে আসে পল্লীবাংলার মানুষ। এখানেই তাঁর শিল্পভাষার আসল রূপের দেখা মিলে। জমি, ফসল আর মানুষ একসঙ্গে বাঁধা পড়ে যায় তাঁর ক্যানভাসে। সত্তরের দশকে আঁকা প্রথম বৃক্ষরোপণ ছবিতে হাঁটু গেড়ে বসা এক পুরুষ, চারাগাছকে দুই হাতে বর্মের মতো আগলে রেখেছেন। শরীরটা কৃষকের, কিন্তু ভঙ্গিটা যোদ্ধার। সুলতান নিজে বলেছেন, তাঁর বড় ক্যানভাস ঘরসাজানোর জন্য নয়, বরং মানুষের জন্য। এই কথাটা তাঁর কাজের রাজনৈতিক অভিপ্রায় স্পষ্ট করে দেয়। যে শরীর ইতিহাসে বারবার বঞ্চিত হয়েছে, সুলতান তাকে ক্যানভাসে ফিরিয়ে দিয়েছেন তার হারানো মর্যাদা, অথবা অন্তত সেই মর্যাদার একটা কল্পিত রূপ।

প্রথম বৃক্ষরোপণ
চিত্রকর্ম : এস এম সুলতান

আজও কেন প্রাসঙ্গিক সুলতান

    একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টানা দরকার। সুলতান কৃষকের দারিদ্র্য অস্বীকার করেননি। তিনি নড়াইলেই থেকেছেন সারা জীবন, গ্রামীণ বাস্তবতা থেকে কখনো দূরে সরে যাননি। কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন করুণার নন্দনতত্ত্ব, যে দৃষ্টিভঙ্গি দরিদ্র মানুষকে কেবল সহানুভূতির বস্তু বানিয়ে রাখে। তাঁর কৃষক তাই ভিক্ষা চায় না, করে প্রতিরোধ। সমালোচকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তাঁর ছবিতে গ্রামীণ জীবনের প্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণির দ্বন্দ্বও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কৃষক এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র।

    সুলতানের কাছে মানুষ আর প্রকৃতি কখনো আলাদা বিষয় ছিল না। ধান-মাড়াইয়ের ছবিতে কৃষকের পেশি, গরু-বলদের গা থেকে চুঁইয়ে পড়া আলো, আর খড়ের ঘরের ছায়া মিলেমিশে একটাই দৃশ্য তৈরি করে। মানুষ প্রকৃতির ওপর প্রভু নয়, তার অংশ। এই বোঝাপড়াতেই তাঁর কাজ ইউরোপীয় ল্যান্ডস্কেপ ঐতিহ্য থেকে সরে আসে, যেখানে প্রকৃতি প্রায়ই মানুষবিহীন এক নান্দনিক বস্তু। সুলতানের নদী, মাঠ আর গোলাঘর সবসময় মানুষের শ্রমের সাক্ষী দেয়।

    আশ্চর্যের বিষয়, যে শিল্পী পিকাসো-মাতিসের সমসাময়িক প্রদর্শনীতে জায়গা পেয়েছিলেন, লন্ডনের লিসেস্টার মিউজিয়ামে এশিয়া থেকে প্রথম স্থান পেয়েছিলেন, তিনিই দেশে ফিরে দীর্ঘদিন প্রায় অচেনা থেকে গেছেন। ঢাকার শিল্প প্রতিষ্ঠান তাঁকে চিনতে সময় নিয়েছে অনেক। ১৯৭৬ সালে শিল্পকলা একাডেমিতে তাঁর প্রথম বড় প্রদর্শনী হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি মূলত নড়াইলেই কাটিয়েছেন, শিশুদের নিয়ে স্কুল গড়েছেন, চিড়িয়াখানার মতো প্রাণীর সংসার পুষেছেন। ১৯৮৭ সালে গ্যেটে ইনস্টিটিউটের রেট্রোস্পেক্টিভ তাঁকে জাতীয় পরিচিতি এনে দেয়, প্রায় জীবনের শেষ প্রান্তে। এত বিলম্বে স্বীকৃতি পাওয়াটাই বলে দেয়, বাংলাদেশের শিল্প-প্রাতিষ্ঠানিকতা আর সুলতানের নিজস্ব পথ কতটা আলাদা ছিল।

    সুলতানের কৃষক কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বা আন্দোলনের প্রতীক নয়। কিন্তু যে প্রশ্নটা তিনি রেখে গেছেন। কাকে আমরা শক্তিশালী হিসেবে কল্পনা করি, আর কাকে করি না। সেটা আজও অমীমাংসিত। শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব আজও প্রায়ই দুই চরমে আটকে থাকে, হয় করুণার বস্তু, নয়তো পরিসংখ্যানের সংখ্যামাত্র। সুলতান তৃতীয় একটা পথ দেখিয়েছিলেন, যেখানে দুর্বলতাকে অস্বীকার না করেই তার মর্যাদা আঁকা যায়।


    Picture of The Publish

    The Publish

    An independent platform for research, stories, articles, and free thought.
    শেয়ার করুন

    পড়তে পারেন

    “আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা আমাদের বাচ্চাদেরকে নানাভাবে আদর করেন। কিন্তুক, সবগুলাই যে ভাল, তা মোটেও নয়।”

    আবু তাহের তারেক

    বাংলাদেশে নিখোঁজ হওয়া ঠেকানোর বা দ্রুত সন্ধান পাওয়ার ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত।

    The Publish

    নেপালের একটি পাহাড়ের ধস, বাংলাদেশের একটি নদীভাঙা গ্রামের গল্পের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে যায়, সেই সুতোটাই টানবো আজ।

    দ্য পাবলিশ সম্পাদকীয়

    জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের প্রকাশিত নথি বদলে দিয়েছিল যুদ্ধ আর কূটনীতি নিয়ে জনগণের বোঝাপড়া।

    The Publish Newsroom

    Scroll to Top