The unfinished route of the movie peddler

The same film by Tarek Masud that put Bangladesh on the world map at the Cannes Film Festival was banned in his own country.

● The Publish

আগস্ট ১৩, ২০২৬

Illustration: Mahmud / The Publish / Photo: Pa. Do.


আজ থেকে ঠিক পনেরো বছর আগে, ২০১১ সালের ১৩ অগস্ট, মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার কাছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে একটি মাইক্রোবাস উল্টো দিক থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে পড়ে। সেই মাইক্রোবাসে ছিলেন তারেক মাসুদ এবং তাঁর দীর্ঘদিনের চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর, যাঁরা তখন ঢাকায় ফিরছিলেন “কাগজের ফুল” নামের একটি নতুন ছবির শুটিং লোকেশন চূড়ান্ত করে। ছবিটি বাংলার ১৯৪৭ সালের দেশভাগ নিয়ে, যা মাটির ময়নার এক ধরনের পূর্বকথা হয়ে ওঠার কথা ছিল। দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ মোট পাঁচজন নিহত হন, স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ গুরুতর আহত হয়েও বেঁচে যান।

এই তথ্যগুলো এখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-ইতিহাসের একটি স্থায়ী অংশ, প্রায় মুখস্থ বাক্যের মতো উচ্চারিত হয় প্রতি অগস্টে। কিন্তু সংখ্যা আর তারিখের বাইরে একটা প্রশ্ন থেকে যায়, যেটা প্রতি বছর একই রকম জরুরি মনে হয়। একজন মানুষের মৃত্যু কীভাবে একটি জাতীয় সিনেমার কল্পনায় স্থায়ী শূন্যতা তৈরি করে? আর সেই শূন্যতা আসলে কীসের? একজন প্রতিভাবান পরিচালকের অভাব, নাকি একধরনের দেখার পদ্ধতির অভাব, যেটা তিনি একা তৈরি করেছিলেন আর যেটা তাঁর সঙ্গেই হারিয়ে গেছে?

তারেক মাসুদকে নিয়ে লেখা বেশিরভাগ শ্রদ্ধাঞ্জলি তাঁকে একরকম নিরাপদ জায়গায় বসিয়ে দেয়, যেখানে তিনি একজন মহৎ, সৎ, নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী, যাঁর কাজ প্রশ্নাতীত। সেই নিরাপদ জায়গাটা আসলে তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় অবিচার। কারণ তারেক মাসুদের গুরুত্ব বোঝা যায় তখনই, যখন তাঁকে একজন অভ্রান্ত কিংবদন্তি না ভেবে, বাংলাদেশের সিনেমার একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সংকটের মধ্যে বসিয়ে দেখা হয়। প্রশ্নটা তখন আর থাকে না তিনি কত বড় শিল্পী ছিলেন। প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়ায়, তিনি বাংলাদেশের সিনেমাকে সত্যিই বদলে দিয়েছিলেন, নাকি এমন একটা বাংলাদেশকে দেখিয়েছিলেন যেটাকে আমাদের সিনেমা এতদিন দেখতে চায়নি।

তারেক মাসুদের হাতে ক্যামেরা

তারেক মাসুদের জন্ম ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর, ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রামে। শৈশবে তিনি প্রায় আট বছর মাদ্রাসায় পড়েন, যতদিন না ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর পড়াশোনায় ছেদ ফেলে। স্বাধীনতার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স ও মাস্টার্স করেন। এই তথ্যটুকু গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারেক মাসুদের সিনেমাকে বোঝার একটা চাবি এখানেই আছে। তিনি প্রথমে চলচ্চিত্র নির্মাতা হননি, প্রথমে হয়েছিলেন ইতিহাসের একজন ছাত্র, এবং পরে বুঝেছিলেন যে ইতিহাস লেখার একটা মাধ্যম হতে পারে ক্যামেরা।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি চলচ্চিত্রে যুক্ত হন। ১৯৮২ সালে তিনি শুরু করেন তাঁর প্রথম বড় কাজ, শিল্পী এস এম সুলতানকে নিয়ে তথ্যচিত্র আদম সুরত, যা শেষ হতে সময় লাগে সাত বছর। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সুলতানের চোখ দিয়েই তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং কৃষিনির্ভর বাংলার পুনরাবিষ্কার দুটোই শিখেছিলেন, এবং আদম সুরত বানাতে বানাতেই তিনি একজন শিল্পী হিসেবে পরিণত হয়েছিলেন। এই স্বীকারোক্তি সাধারণ বিনয় নয়। এটা একটা ইঙ্গিত, যে তারেক মাসুদের শিল্পভাষা কোনো চলচ্চিত্র স্কুল থেকে আসেনি, এসেছে একজন প্রান্তিক, চিত্রকরের কাছ থেকে দীর্ঘ শিক্ষানবিশি করে। আদম সুরতের শুটিংয়ের সময়েই, ১৯৯১ সালে, তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় আমেরিকান চলচ্চিত্র সম্পাদক ক্যাথরিন শাপিয়ারের, যিনি পরে তাঁর স্ত্রী এবং সৃজনশীল অংশীদার হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তী দুই দশক একসঙ্গে কাজ করেন তাঁদের প্রযোজনা সংস্থা অডিওভিশনের মাধ্যমে।

মুক্তির গান

তারেক মাসুদকে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পরিচিত করে তোলে মুক্তির গান। ছবিটির ভিত্তি ছিল আমেরিকান চিত্রগ্রাহক লিয়ার লেভিনের তোলা প্রায় কুড়ি ঘণ্টার ফুটেজ, যা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে ভ্রমণ করে ধারণ করা হয়েছিল, কিন্তু অর্থাভাবে ছবিটি তখন শেষ করা যায়নি, এবং প্রায় কুড়ি বছর সেই ফুটেজ পড়ে ছিল নিউইয়র্কে লেভিনের বাড়ির বেসমেন্টে। ১৯৯০ সালে তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন লেভিনের খোঁজ পান, তাঁর ফুটেজকে ভিত্তি ধরে বিশ্বের বিভিন্ন আর্কাইভ থেকে আরও ফুটেজ সংগ্রহ করেন, সব মিলিয়ে ১৯৯৫ সালের ১ ডিসেম্বর মুক্তি পায় মুক্তির গান

ছবিটির গুরুত্ব বোঝার জন্য মনে রাখা দরকার, এর মুক্তি এমন একটা সময়ে ঘটেছিল যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরির ক্ষেত্রে দীর্ঘ একটা রাজনৈতিক খরা চলছিল। গবেষক নাঈম মহাইমেন তাঁর একটি প্রবন্ধে লেখেন, ১৯৯৫ সালে মুক্তির গানের মুক্তি সেই দীর্ঘ খরার অবসান ঘটায়। ছবিটি হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় তথ্যচিত্র, এবং দর্শক একে প্রায় নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ দলিল হিসেবে গ্রহণ করেন, যদিও ছবির নির্মাণকৌশলে তথ্যচিত্র ও পুনর্নির্মাণের মিশ্রণ ছিল স্পষ্ট।

এখানেই তারেক মাসুদের কাজের একটা জটিলতা লুকিয়ে আছে, যেটা প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়। মুক্তির গান শুধু ইতিহাসের নথি ছিল না, ছিল ইতিহাস বলার একটা পদ্ধতির পুনর্নির্মাণ, যেখানে পাওয়া ফুটেজ, স্মৃতি এবং নির্মিত বর্ণনা একসঙ্গে মিশে গিয়েছিল। কিন্তু তারেক মাসুদ থেমে থাকেননি এখানেই। ছবিটি নিয়ে গ্রামে গ্রামে প্রদর্শনী করার সময় তিনি লক্ষ করেন, দর্শকরা নিজেদের যুদ্ধের গল্প বলতে শুরু করেছে, যেসব গল্প ছবিতে নেই। তিনি নিজেই একবার বলেছিলেন, মুক্তির গান দেখানোর সময় তাঁরা দর্শকদের ছবি তুলছিলেন, আর দর্শকরা তখন নিজেদের অজানা গল্প বলা শুরু করে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় পরবর্তী ছবি মুক্তির কথা, যেখানে দর্শকই হয়ে ওঠে বিষয়বস্তু। এই ধারাবাহিকতা দেখলে বোঝা যায়, তারেক মাসুদের কাছে সিনেমা শুধু একমুখী বার্তা ছিল না, ছিল একটা কথোপকথনের প্রক্রিয়া, যেখানে দর্শক শুধু গ্রহীতা নয়, ইতিহাস রচনার সহযাত্রীও বটে।

মাটির ময়না এবং কানে বাংলাদেশের প্রথম পরিচিতি

২০০২ সালে মুক্তি পায় তারেক মাসুদের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র মাটির ময়না, যার চিত্রনাট্য তিনি লেখেন ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে যৌথভাবে, নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে। ছবিটি হয়ে ওঠে কান চলচ্চিত্র উৎসবের ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট বিভাগের উদ্বোধনী ছবি, এবং জিতে নেয় ফিপরেস্কি আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কার, একটি দেশ কীভাবে তার গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করছে তার আন্তরিক ও স্পর্শকাতর চিত্রায়ণের স্বীকৃতি হিসেবে, যা আন্তর্জাতিক ফিল্ম ক্রিটিকস ফেডারেশনের নথিতে লেখা আছে। এটি ছিল অস্কারের বিদেশি ভাষার শাখায় প্রতিযোগিতা করা বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র

কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, দেশে ফিরে ছবিটি প্রথমে নিষিদ্ধ হয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার আশঙ্কায় ছবিটির প্রদর্শনী আটকে দেওয়া হয়, এবং পরে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, তারপর ২০০৫ সালের এপ্রিলে ছবিটির ভিসিডি ও ডিভিডি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। একটা ছবি যেটা কানে বাংলাদেশকে বিশ্বমানচিত্রে জায়গা করে দিচ্ছে, সেই একই ছবি নিজের দেশে নিষিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, এই বৈপরীত্যটাই বাংলাদেশের সিনেমায় তারেক মাসুদের অবস্থান কতটা অস্বস্তিকর ছিল তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ।

ছবির গল্প মাদ্রাসায় পাঠানো এক কিশোর আনুকে ঘিরে, যার বাবা কট্টর ধর্মবিশ্বাসী, মা তুলনামূলক উদার। ছবিতে মাদ্রাসা, পরিবার, ধর্ম এবং একাত্তরের রাজনৈতিক উত্তাপ একই ফ্রেমে মিশে যায়। শিরোনামের অর্থ নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তারেক মাসুদ বলেছিলেন, শৈশবে প্লাস্টিকের পুতুল ছিল স্বাধীনতার একটা প্রতীক যা তাঁর বোনের নাগালের বাইরে ছিল, আর সুফি চিন্তায় দেহ হলো মাটি, আত্মা হলো মুক্ত পাখি, যে সবসময় সেই মাটির সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি চায়, এই দ্বন্দ্বই ছবির শিরোনামের মূল ভাবনা। এখানে ব্যক্তিগত স্মৃতি আর জাতীয় ইতিহাস আলাদা থাকে না, একে অপরের ভেতর দিয়ে বয়ে যায়। মাদ্রাসার ভেতরের রাজনৈতিক বিভাজন, উদার ও কট্টরপন্থীদের টানাপোড়েন, পরিবারের ভেতরে বাবা-মায়ের সংঘাতের সঙ্গে সমান্তরালে চলে।

সিনেমা ফেরিওয়ালা

তারেক মাসুদের ছবিগুলো একসঙ্গে রাখলে একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়। আদম সুরতে তিনি দেখিয়েছিলেন একজন লোকশিল্পীর চোখে গ্রামীণ বাংলা, মুক্তির গানে দেখিয়েছিলেন যুদ্ধকে গানের ভেতর দিয়ে, মাটির ময়নায় দেখিয়েছিলেন ধর্মের ভেতরের বহুস্বরতাকে, আর অন্তর্যাত্রায় দেখিয়েছিলেন প্রবাসী দুই প্রজন্মের বাংলাদেশে ফেরার গল্প, একটি লন্ডন-প্রবাসী পরিবারের বিচ্ছিন্ন মা ও ছেলের স্বল্প সময়ের দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে। প্রতিটি ছবিতে তাঁর ক্যামেরা এমন জায়গায় যেত, যেখানে বাণিজ্যিক বাংলা চলচ্চিত্র সাধারণত যেতে চাইত না। গ্রাম বনাম শহর, ধর্ম বনাম আধুনিকতা, ব্যক্তি বনাম রাষ্ট্র, স্মৃতি বনাম দলিলবদ্ধ ইতিহাস, এই দ্বন্দ্বগুলোই তাঁর কাজের কেন্দ্রীয় স্নায়ু।

এটা বলা ভুল হবে যে তিনি নিছক বিকল্প বিষয় বেছে নিতেন। প্রশ্নটা বরং এই যে, বাংলাদেশের প্রধান ধারার সিনেমা তখন পর্যন্ত মূলত নগরকেন্দ্রিক মেলোড্রামা এবং সরলীকৃত জাতীয়তাবাদী আখ্যানে আটকে ছিল, যেখানে ঐতিহ্যবাহী দক্ষিণ এশীয় সিনেমার মেলোড্রামাটিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে বাস্তবতার প্রতি তাঁর ঝোঁক ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। তারেক মাসুদ পেশাদার নয়, স্থানীয় অ-অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করতেন, লোকেশনে শুটিং করতেন, লাইভ সাউন্ড ব্যবহার করতেন, আর গল্প বলার ধরনেও পর্যবেক্ষণমূলক ধৈর্য রাখতেন। এই পদ্ধতিগত পার্থক্যই বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রচর্চার জন্য একটা নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল।

তারেক মাসুদকে বোঝার জন্য শুধু তাঁর ছবিগুলো দেখাই যথেষ্ট নয়। তিনি ছিলেন ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন, স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য একটা প্ল্যাটফর্ম, আর ১৯৮৮ সালে তিনিই দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও তথ্যচিত্র উৎসব সংগঠিত করেন, যা আজও দুই বছর অন্তর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে অস্বাভাবিক অবদান সম্ভবত ছিল প্রদর্শনী নিয়ে তাঁর ভাবনায়।

দেশের অধিকাংশ গ্রামে সিনেমা হল ছিল না, লক্ষ লক্ষ মানুষ কোনোদিন বড় পর্দায় ছবি দেখেননি, এই বাস্তবতাকে তিনি সমস্যা হিসেবে না দেখে সম্ভাবনা হিসেবে দেখেন। প্রজেক্টর, পর্দা আর একটা ভ্যান নিয়ে তিনি নিজেই ছবি নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন, বিনামূল্যে সাম্প্রদায়িক প্রদর্শনীর আয়োজন করতেন, ঠিক যেভাবে ফেরিওয়ালা জিনিসপত্র নিয়ে দরজায় দরজায় যান, সেভাবেই তিনি সিনেমা পৌঁছে দিতেন সেসব মানুষের কাছে, যারা জাতীয় কথোপকথনে সাধারণত অনুপস্থিত থাকে। এই কাজের জন্যই তিনি পরিচিত হন সিনেমা ফেরিওয়ালা নামে। ক্যাথরিন মাসুদ পরে এক আলোচনায় বলেছিলেন, তারেক প্রায়ই বলতেন একটা ছবির মাত্র বিশ শতাংশ নির্মাতার কল্পনার কাজ, বাকি আশি শতাংশ হলো আয়োজন, দলটাকে একসঙ্গে করে সেই কল্পনাকে বাস্তবায়ন করার শ্রম, এবং সেটাকে তিনি প্রায় যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করতেন।

এই দিকটা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায় যখন তাঁকে নিয়ে লেখা হয়। তিনি শুধু ছবি বানাননি, দর্শক তৈরি করেছিলেন, এমন একটা দর্শকশ্রেণি যারা শহরের সিনেপ্লেক্সের বাইরে থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, জটিল সিনেমার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। একটা প্রশ্ন এখানে থেকেই যায়, তিনি চলে যাওয়ার পর সেই দর্শকশ্রেণির কী হলো, আর কে তাদের কাছে ছবি নিয়ে যাচ্ছে এখন।

তারেক মাসুদের শেষ সম্পূর্ণ ছবি রানওয়ে, ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তি পায়, চিত্রনাট্য লেখেন ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে, চিত্রগ্রহণে ছিলেন মিশুক মুনীর। ছবিটির মূল প্রেরণা ছিল ২০০৫ সালে সারাদেশে একযোগে ঘটা বোমা হামলার ঘটনা, আর চিত্রনাট্য লেখা হয় ২০০৫-০৬ সালে জঙ্গিবাদের উত্থানের প্রেক্ষাপট থেকে, যখন উগ্রপন্থীদের সহিংসতা দেশকে অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছিল।

ছবির কেন্দ্রে রুহুল, বিমানবন্দরের পাশে ঝুপড়িতে থাকা এক বেকার তরুণ, মাদ্রাসা থেকে ঝরে পড়া, যে সাইবার ক্যাফেতে পরিচিত হয় আত্মবিশ্বাসী এক তরুণের সঙ্গে, আর ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে উগ্রবাদী চক্রে। মাটির ময়নার তুলনায় রানওয়ে অনেক বেশি সরাসরি সমসাময়িক, শহুরে বেকারত্ব, পোশাকশিল্প, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক অভিবাসন, মাইক্রোক্রেডিট, এই সবকিছুকে একই কাহিনীতে বেঁধে ফেলে। এটাকে তারেক মাসুদের চিন্তার পরিণত পর্যায় বলা যায় এই অর্থে যে, এখানে তিনি আর অতীতের স্মৃতিচারণে ফিরে যাননি, বরং সরাসরি বর্তমান বাংলাদেশের ভেতরের ফাটলে ক্যামেরা রেখেছেন। একটা তরুণ কীভাবে দারিদ্র্য আর হতাশা থেকে উগ্রবাদের দিকে সরে যায়, এই প্রশ্নে তিনি কোনো সহজ রায় দেননি, বরং প্রক্রিয়াটাকে দেখিয়েছেন প্রায় নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের চোখে।

তারেকের অসমাপ্ত যাত্রা এবং আমাদের স্মরণ

মৃত্যুর সময় তারেক মাসুদ কাজ করছিলেন কাগজের ফুল নিয়ে, ১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গ নিয়ে একটা ছবি, যাকে মাটির ময়নার পূর্বকথা হিসেবে ভাবা হচ্ছিল। শুটিং লোকেশন খুঁজতে গিয়েই দুর্ঘটনা ঘটে। ছবিটি শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত থেকে যায়। এই অসমাপ্ততার মধ্যে একটা প্রতীকী ভার আছে, যা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। মাটির ময়না ছিল একাত্তরের গল্প, কাগজের ফুল হতো সাতচল্লিশের গল্প, দুটো মিলে তারেক মাসুদ সম্ভবত তৈরি করতে চেয়েছিলেন বাংলার বিভাজন আর পুনর্গঠনের একটা দীর্ঘ, দ্বিমুখী আখ্যান। সেই আখ্যান অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে নয়, বাংলাদেশের সিনেমার একটা সম্ভাব্য ইতিহাস-আখ্যানের অসমাপ্তি হিসেবেও।

তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি রক্ষার কাজ মূলত করেছেন ক্যাথরিন মাসুদ নিজে, যিনি তাঁদের অসমাপ্ত কাজের আর্কাইভ সংরক্ষণ এবং সেগুলো সম্পূর্ণ করার প্রচেষ্টায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে চালু হয় তারেক মাসুদ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতা, নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত মুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির মতো আন্দোলনও স্বাধীন চলচ্চিত্রচর্চাকে বাংলাদেশে জীবিত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সম্পাদক মহাদেব শি, যিনি মুক্তির গানের সময় তারেক মাসুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর বলেছিলেন, তারেক মাসুদ ছিলেন তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য একটা বড় প্রেরণা, বিকল্প চলচ্চিত্রধারার এক অনুঘটক, আর তাঁর অভাব অনেক বড়।

ধরা যাক এমন একটা রাত, কোনো এক গ্রামে, যেখানে বহু বছর আগে একটা ভ্যান এসে থামত, একটা সাদা পর্দা টাঙানো হতো দুটো বাঁশের খুঁটির মাঝে, আর অন্ধকার নেমে এলে প্রজেক্টরের আলোয় ভেসে উঠত মুক্তির গানের কোনো দৃশ্য, একদল গায়ক গান গাইছে শরণার্থী শিবিরে, আর চারপাশে বসে থাকা মানুষগুলো, যাদের অনেকেই কোনোদিন সিনেমা হলের ভেতরে পা রাখেননি, নিজেদের চেনা মুখ, চেনা গল্প খুঁজে পাচ্ছেন সেই আলোয়। সেই ভ্যান আর আসে না। প্রজেক্টরের আলো নিভে গেছে ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট, একটা মহাসড়কের ওপর, এক মুহূর্তের সংঘর্ষে।

প্রশ্নটা তাই থেকে যায় খোলা অবস্থায়। তারেক মাসুদ বাংলাদেশের সিনেমাকে বদলে দিয়েছিলেন, নাকি শুধু এমন একটা বাংলাদেশের ছবি তুলে ধরেছিলেন যাকে আমাদের সিনেমা এতদিন দেখতে চায়নি, এই দুটো উত্তরের মধ্যে বাস্তবে হয়তো কোনো বিভাজনরেখা নেই। একটা দেশের সিনেমাকে বদলে দেওয়ার একমাত্র উপায় হয়তো সেটাই, যা সেই দেশ নিজে থেকে দেখতে চায় না, সেটাকে ক্যামেরার সামনে এনে দাঁড় করানো, তারপর অপেক্ষা করা, দর্শক প্রস্তুত কিনা তার জন্য। পনেরো বছর পরেও সেই অপেক্ষা শেষ হয়েছে কিনা, সে প্রশ্নের উত্তর এখনও বাংলাদেশের সিনেমাকেই দিতে হবে।


Picture of The Publish

The Publish

An independent platform for research, stories, articles, and free thought.
শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

“আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা আমাদের বাচ্চাদেরকে নানাভাবে আদর করেন। কিন্তুক, সবগুলাই যে ভাল, তা মোটেও নয়।”

আবু তাহের তারেক

বাংলাদেশে নিখোঁজ হওয়া ঠেকানোর বা দ্রুত সন্ধান পাওয়ার ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত।

The Publish

নেপালের একটি পাহাড়ের ধস, বাংলাদেশের একটি নদীভাঙা গ্রামের গল্পের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে যায়, সেই সুতোটাই টানবো আজ।

দ্য পাবলিশ সম্পাদকীয়

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের প্রকাশিত নথি বদলে দিয়েছিল যুদ্ধ আর কূটনীতি নিয়ে জনগণের বোঝাপড়া।

The Publish Newsroom

Scroll to Top