জিন্নাহ কি আমরার আব্বা?

আমাদের যাদের জন্ম আছে, পরিচয় আছে, আব্বা আছেন, তারা কেনই বা খনে মুজিব, খনে জিন্নাহরে গিয়া ‘বাপ বাপ’ করব!

● আবু তাহের তারেক

সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬

জিন্নাহ কি আমরার আব্বা? The Publish

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ


বাংলাদেশে ইসলামি পরিচয়বাদীদের একটা অংশ হজরত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহরে নিয়া ফ্যান্টাসিতে ভোগেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পাঠাতনে দাঁড়াইয়া, এই ফ্যান্টাসিরে কিভাবে পাঠ করব আমরা? তাদের জিন্নাহ বিষয়ক এক্টিভিজমের স্বরূপই বা কেমন? খিয়াল করি যে, যারা জিন্নাহর আলাপ করেন, তারা ইংলিশ রাজরে যেন বা চিনেনই না! এদিকে, জিন্নাহরে ‘বংগবন্ধু’ টাইপ কিছু একটা বানাইতে পারলেই যেন বা আমরা উতরায়া যাইব- এইরকম একটা ঝোঁকও তান তান এক্টিভিজমে খিয়াল করি। আমার নিচের আলাপ মূলত এইসব আলাপেরই একটা ইনস্টান্ট রেসপন্স।

পার্টিশন ও ইংরাজ

হজরত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ কি পার্টিশন ঘটাইছিলেন! শুধু ইতিহাস-জ্ঞান নয়, সাধারণ জ্ঞানও এই কথা বলবে না যে, শাসক ইংরেজগণ ইন্ডিয়া নামক বিশাল একখান দুনিয়ারে ভাগ-বাটোয়ারা, কাট-ছাট না কইরা তারে ছাইড়া, বায়ে বায়ে চইলা যাইবেন! হিন্দু আর মুসলিম যে দুইটা সেপারেট ‘নেশন’, এই ধারণাও ত, আমাদের মইদ্যে ইংরেজরাই ছড়াইছেন- আমাদের তুচ্ছ ইতিহাস জ্ঞান হইতে আমরা এইটা জানি, অন্তত, হজরত জেমস মিলরা যে এই বাবতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন, তা অস্বীকার করার চান্স নাই।

পার্টিশন ও হিন্দু পরিচয়বাদ

ভাগ-বাটোয়ারা বিষয়ে কলোনির দালাল, বর্ণহিন্দুগণের কথা না বললেই নয়। মানে, কোটি কোটি মুসলমানদের বসতিপূর্ণ অঞ্চলে তারা কিভাবে একক একটা হিন্দু-রাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন, যদি না কাট-ছাট ছাড়াই তারা পুরা অঞ্চলটা হাতে পাইতেন!

পার্টিশন ও জিন্নাহ এন্ড আদার্স

পার্টিশনের আলাপে জিন্নাহরা আসবেন এরপরে, তিসরা নম্বরে। আসবেন ইকবালসহ, অগণিত চরিত্র। কিন্তুক, এইটা অনুমান করা সহজই মনে করি যে, জিন্নাহ যদি নাই থাকতেন, তাহলে ইংরেজরা একজন জিন্নাহরে খুইজা পাইতা নিতেন। বর্ণহিন্দুরাও, যাতে কয়েক ডজন জিন্নাহ গঠন হয়, এইমতন কামকাজই চালাইয়া যাইতেন।

পার্টিশন, পেইন ও জটিলতা

পার্টিশন মোটেও সহজ, চিরসুখী, একমুখী ও সলভড্ কুনু ঘটনা নয়। এখনও নয়। আমরা কি আসলেই আজাদ- এই এখনো? আমাদের দেশে ঠিক কারা আজাদ? তো, যারাই আজাদ থাকুন, হিন্দুস্থানের ভিতরের মুসলিমদের কথা কি আমরা মনে রাখব না? তারা কি হালে আছেন? আজাদির ফলে, তাদের লাইফে কি কি ঘটল! আমরা তার হিসাব কিভাবে করি, বা, করব?

জিন্নাহ ও সিলেক্টিভিজম

সিলেক্টিভিজম আধুনিক মানুষের বড় এক সমস্যা। মানে, পার্টিশনের লাগি হজরত জিন্নাহরে মাথায় তুলি নাচো! আর, পার্টিশনের পরে কত্ত কিছু ঘটল, আগে কত্ত কিছু ঘটল- তার আলাপ কিন্তুক মিসিং! এইভাবে হিস্ট্রি চর্চা কম হয়। বেশী  হয় সিলেক্টিভ, পরিচয়বাদী ও জাতীয়তাবাদী জিংগোইজম।

জিন্নাহ কি আমরার আব্বা

ওয়েল, আমরা যারা মুজিবরে আমরার ‘আব্বা’ মানি নাই, তারা জিন্নাহরেও নিশ্চয়ই তা মানব না! আমাদের যাদের জন্ম আছে, পরিচয় আছে, আব্বা আছেন, তারা কেনই বা খনে মুজিব, খনে জিন্নাহরে গিয়া ‘বাপ বাপ’ করব! পিতৃ-ফিগার মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাপ বানাইতে চাওয়ার সাইকোলজিকাল চাহিদা মানুষের ভিতরে থাকেই। কিন্তুক, এইটা কিভাবে ও কতটুকু ঘটবে- তার মাত্রাজ্ঞান থাকা, বা বোঝা নিশ্চয় জরুরী! এদিকে, যেই দেশের মানুষ মুজিবরে বাপ মানল না, তারা আরেক নতুন বাপরেই বা মানবে কেন!

কারা জিন্নাহ নিয়া অতি আগ্রহী

জিন্নাহরে নিয়া আলাপ, আলোচনা, ভক্তি সবই চলতে পারে। তা সহিও বটে। কিন্তুক, যারা জিন্নাহ নিয়া ফানা- তারা কারা? তাদের বড় একটা অংশ কি মুসলিম পরিচয়বাদী নয়! আমাদেরকে প্রশ্ন করতে পারতে হবে, তারা ‘স্বাধীন বাংলাদেশে’ হজরত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে কিভাবে ও কোথায় স্থান দিতে আগ্রহী?

ইতিহাস ও বর্তমান

আমরা ইতিহাসের ভিতরেই বাস করি। ইতিহাস বিষয়ে আমাদের ‘ধারণা’ই বর্তমানের আমাদেরকে নির্মাণ করে। ফলত, ইতিহাস পাঠ করা ও বোঝা জরুরী। কিন্তুক, কেউ যদি তার সমগ্রিক ইতিহাসকে না বুঝতে চাইয়া, শুধু একাত্তর করেন, বা কেউ যদি এর বিপরীতে গিয়া খালি সাতচল্লিশ করেন, তাহলে আমরা ইতিহাসের চোরাটানে পড়ব বটে!

উপসংহার 

হজরত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ‘আব্বা’ ডাকলেই ইতিহাসের দায় সারা হয় না। উনারে আব্বা ডাকার জরুরতও নাই আসলে। সাতচল্লিশের একজন লিডার এই ছাব্বিশে আইসাও কেন ও কিভাবে আমাদের জন্য জরুরী- তার বুঝবুদ্ধি তৈয়ার করাই এখনকার আসল কাজ।

একসময় যারা মুজিবকে পূজা করারেই তাদের সবচাইতে বড় কাজের একটা মনে করতেন, তাদের মতন করি, জিন্নাহর মইদ্যে একজন ‘মুজিব’ প্রতিষ্ঠা করারেই যারা কর্তব্য মনে করেন- তাদের উভয় পক্ষের মইদ্যে ডিফরেন্সের জায়গাটা কই!
জিন্নাহ পূজা কি আমাদের ঐতিহাসিক ও কৃষ্টিগত যাবতীয় মুশকিলরে আসান করতে পারবে! ধরেন, এদেশে রাবীন্দ্রিক কৃষ্টির মোকাবিলা করা জরুরি। জিন্নাহ পূজা বা ধরেন ইকবাল পূজা- এইসবই কি এর জুতসই সমাধান! 
এইগুলা যে কাজে আসে নাই, বা আসে না- তা কি আমরা ষাইটের বাংগালি জাতীয়তাবাদের উত্থানের পরেও বুঝতে পারব না!

সম্পাদকীয় নোট: এই লেখায় প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। লেখকের ভাষা ও স্বর অক্ষুণ্ণ রাখতে তাঁর নিজস্ব বানানরীতি ও ভাষাশৈলী বহাল রাখা হয়েছে।


Picture of আবু তাহের তারেক

আবু তাহের তারেক

আবু তাহের তারেক একজন কবি ও অনুবাদক। বর্তমানে ইউরোপপ্রবাসী। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ফের্নান্দ পেসোয়ার কবিতা (২০১৬), আইয়ো রেগো ময়না (২০১৮) ও আম্মা নদী (২০২১)।

শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

“আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা আমাদের বাচ্চাদেরকে নানাভাবে আদর করেন। কিন্তুক, সবগুলাই যে ভাল, তা মোটেও নয়।”

আবু তাহের তারেক

বাংলাদেশে নিখোঁজ হওয়া ঠেকানোর বা দ্রুত সন্ধান পাওয়ার ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত।

The Publish

নেপালের একটি পাহাড়ের ধস, বাংলাদেশের একটি নদীভাঙা গ্রামের গল্পের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে যায়, সেই সুতোটাই টানবো আজ।

দ্য পাবলিশ সম্পাদকীয়

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের প্রকাশিত নথি বদলে দিয়েছিল যুদ্ধ আর কূটনীতি নিয়ে জনগণের বোঝাপড়া।

The Publish Newsroom

Scroll to Top