Why does July come back around the world?

How inequality turns into rebellion and why some movements survive and others fade away.

● The Publish

আগস্ট ৫, ২০২৬

ইলাস্ট্রেশন : মাহমুদ / দ্য পাবলিশ / ছবি : পাবলিক ডোমেইন


১৬ জুলাই, ২০২৪। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এক তরুণ পুলিশের ছোড়া গুলির মুখে বুক পেতে দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে লাঠি, চোখে নেই কোনো ভয়। কয়েক সেকেন্ড পরে তিনি লুটিয়ে পড়েন, আর সেই দৃশ্য দেশের প্রতিটি মোবাইল স্ক্রিনে ছড়িয়ে পড়ে ঝড়ের গতিতে। আবু সাঈদ তখনও জানতেন না যে তাঁর মৃত্যু একটি সরকারের পতনের সূচনা বিন্দু হয়ে উঠবে। প্রায় আটচল্লিশ বছর আগে, দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েটোর রাস্তায় আরেকটি ছবি তোলা হয়েছিল, বারো বছরের হেক্টর পিটারসনের নিথর দেহ কোলে তুলে দৌড়াচ্ছেন এক কিশোর, পাশে ছুটছে বোন। সেই আলোকচিত্র সারা বিশ্বে বর্ণবাদবিরোধী ক্ষোভের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় । দুটি ছবির মাঝে পঞ্চাশ বছরের দূরত্ব, দুটি ভিন্ন মহাদেশ, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন রাজনীতি। তবু একটি প্রশ্ন দুটি দৃশ্যকেই বেঁধে রাখে। বৈষম্য ঠিক কোন মুহূর্তে অসহনীয় হয়ে ওঠে, আর কেন কিছু আন্দোলন একটি জাতির গতিপথ বদলে দেয়, অথচ অন্যগুলো ইতিহাসের পাদটীকায় হারিয়ে যায়?

এই ছবিতে আবু সাঈদকে দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার দাবিতে এক বিক্ষোভ চলা কালে তিনি পুলিশের গুলিতে নিহত হন। পুলিশের বিরুদ্ধে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়ানোর ছবি ভাইরাল হওয়ার পর তিনি আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হন।

বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল একটি খুবই নির্দিষ্ট, প্রায় আমলাতান্ত্রিক প্রশ্ন দিয়ে, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার। হাইকোর্ট ২০১৮ সালের কোটাবিলুপ্তির প্রজ্ঞাপন বাতিল করার পর আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু জুলাইয়ের মাঝামাঝি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দমননীতি এই আন্দোলনকে রূপান্তরিত করে এক ভিন্ন সংগ্রামে, যার নাম হয়ে যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় চৌদ্দশো মানুষ নিহত হন। এটি সেই মুহূর্তের চিহ্ন যেখানে একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ সাধারণ ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়।

এখানেই ইতিহাসের একটি প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বৈষম্য নিজে থেকে আন্দোলন তৈরি করে না, বরং একটি নির্দিষ্ট, মানবিক মুহূর্ত সেই বৈষম্যকে দৃশ্যমান করে তোলে। ১৯৫৫ সালে মিসিসিপিতে চৌদ্দ বছরের এমেট টিলকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল একজন শ্বেতাঙ্গ নারীর প্রতি কথিত অসৌজন্যের অভিযোগে। তাঁর মা মেমি টিল মোবলি ছেলের ক্ষতবিক্ষত মরদেহের কফিন খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেন, যাতে গোটা জাতি দেখতে পায় বর্ণবাদী সহিংসতার প্রকৃত রূপ। একশো দিন পরে রোজা পার্কস মন্টগোমারির একটি বাসে সিট ছাড়তে অস্বীকার করেন, আর ইতিহাসবিদরা মনে করেন এই দুটি ঘটনা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। পরিসংখ্যান মানুষকে তথ্য দেয়, কিন্তু একটি মুখ, একটি নাম, একটি মায়ের কফিন খোলা রাখার সিদ্ধান্ত মানুষকে নামায় রাস্তায়। 

ছবিতে বহন করে নিয়ে যাওয়া ১২ বছর বয়সী স্কুলছাত্রটি ১৯৭৬ সালের ১৬ই জুনের বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিল।

ছাত্ররাই কেন বারবার এই মুহূর্তগুলোর কেন্দ্রে থাকে, তার একটি সহজ ব্যাখ্যা আছে। তাদের হারানোর মতো প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান কম, কিন্তু জড়ো হওয়ার জায়গা তৈরিই আছে, ক্যাম্পাস, হল, শ্রেণিকক্ষ। ১৯৭৬ সালে সোয়েটোর প্রায় বিশ হাজার স্কুলশিক্ষার্থী পথে নেমেছিল আফ্রিকান্স ভাষা তাদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে, একটি ভাষানীতির বিরুদ্ধে যা তাদের কাছে ছিল বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থারই সম্প্রসারণ। বাংলাদেশেও ছাত্ররা প্রথমে একটি প্রশাসনিক অবিচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিল, কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রতিক্রিয়া তাদের দাবিকে বদলে দেয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক বিস্তৃত রাজনৈতিক প্রশ্নে।

রাষ্ট্র প্রায় প্রতিবারই ভুল হিসাব করে। ১৯৬৯ সালের ২৮ জুন নিউ ইয়র্কের স্টোনওয়াল ইনে পুলিশ যে অভিযান চালিয়েছিল, তা ছিল রুটিন কাজ, এমন অভিযান ওই বারে প্রায়ই হতো। কিন্তু সেদিন খদ্দেররা প্রতিরোধ করে, আর একটি নিয়মিত হয়রানি রূপ নেয় বহুদিনের বিক্ষোভে, যা আধুনিক সমকামী অধিকার আন্দোলনের সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়। ক্ষমতার এই ভুল হিসাবের পেছনে একটি সাধারণ অহংকার কাজ করে, দমন করলেই নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসবে এই বিশ্বাস। বাস্তবে দমন প্রায়ই বিপরীত ফল দেয়, কারণ তা নিপীড়িতদের মধ্যে এমন এক ঐক্য তৈরি করে যা স্বাভাবিক সময়ে সম্ভব হতো না।

তবু সব আন্দোলন একইভাবে টেকে না। যে আন্দোলনগুলো দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রাখে, তাদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, ক্ষোভের মুহূর্তটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলন আইনি সংস্কার আর দীর্ঘমেয়াদি সংগঠনে রূপান্তরিত হয়েছিল। স্টোনওয়ালের পরে গঠিত হয় একের পর এক অধিকার সংগঠন, আর ঘটনাস্থলটি ২০১৬ সালে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভের মর্যাদা পায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় সোয়েটোর রক্তক্ষরণ থেকে বর্ণবাদী শাসনের পতন পর্যন্ত সময় লেগেছিল প্রায় দুই দশক, কারণ প্রতিরোধ শুধু একটি ঘটনায় থেমে থাকেনি, তা টিকে ছিল সংগঠন, নির্বাসিত নেতৃত্ব আর আন্তর্জাতিক চাপের ধারাবাহিকতায়। বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পর সংবিধানে এই আন্দোলনের স্বীকৃতি যুক্ত হয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি আর স্থায়ী রূপান্তর এক জিনিস নয়। একটি সংবিধানে নাম ওঠা মানেই ক্ষমতার কাঠামো বদলে যাওয়া নয়।

ছবিতে শিকাগোর ১৪ বছর বয়সী আফ্রিকান আমেরিকান কিশোর এমেট টিল, ছবিটি তার হত্যাকাণ্ডের এক বছর আগে, ১৯৫৪ সালে তোলা হয়েছিল।

আর এখানেই আসে স্মৃতির প্রশ্ন, যা হয়তো এই পুরো আলোচনার সবচেয়ে অস্বস্তিকর অংশ। দক্ষিণ আফ্রিকা ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতি ১৬ জুন পালন করে যুব দিবস হিসেবে, হেক্টর পিটারসনের স্মরণে। এমেট টিলের নামে ২০২৩ সালে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মিসিসিপি ও ইলিনয়ে। কিন্তু এই স্বীকৃতিগুলো এসেছে দশকের পর দশক পরে, যখন ক্ষমতার সমীকরণ বদলে গেছে এবং স্মৃতিকে আর ভয় পাওয়ার কারণ নেই। বাংলাদেশের জুলাই এখনো এত টাটকা যে তার স্মৃতি এখনো লড়াইয়ের ময়দানে, মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আজও থামেনি, হাসপাতালের তথ্য আটকে রাখা আর সিসিটিভি ফুটেজ সরিয়ে ফেলার অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন।

একটি জাতি কীভাবে তার নিজের ক্ষতকে মনে রাখে, তা নির্ভর করে কে সেই স্মৃতি লিখছে তার ওপর। যে সমাজ ভুলে যায়, সে হয়তো পুনরাবৃত্তির দিকেই হাঁটে। আর যে সমাজ মনে রাখে, তাকেও প্রতিদিন নতুন করে বেছে নিতে হয় কোন সংস্করণটি সত্য, কোন মুখটি প্রতীক হয়ে থাকবে, আর কোন নামগুলো নিঃশব্দে হারিয়ে যাবে সরকারি নথির ভেতর। রংপুরে আবু সাঈদের বুক পেতে দাঁড়ানোর ছবিটি আজ যতটা স্পষ্ট, পঁচিশ বছর পরে তা ঠিক কী রূপ নেবে, সেটা আজো বলা যায় না।


Picture of The Publish

The Publish

An independent platform for research, stories, articles, and free thought.
শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

“আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা আমাদের বাচ্চাদেরকে নানাভাবে আদর করেন। কিন্তুক, সবগুলাই যে ভাল, তা মোটেও নয়।”

আবু তাহের তারেক

বাংলাদেশে নিখোঁজ হওয়া ঠেকানোর বা দ্রুত সন্ধান পাওয়ার ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত।

The Publish

নেপালের একটি পাহাড়ের ধস, বাংলাদেশের একটি নদীভাঙা গ্রামের গল্পের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে যায়, সেই সুতোটাই টানবো আজ।

দ্য পাবলিশ সম্পাদকীয়

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের প্রকাশিত নথি বদলে দিয়েছিল যুদ্ধ আর কূটনীতি নিয়ে জনগণের বোঝাপড়া।

The Publish Newsroom

Scroll to Top