নগর বাঁচে তার নামে

● The Publish

July 24, 2026


নগর বাঁচে তার নামেআপনি পুরান ঢাকায় কোনো সন্ধ্যায় হাঁটতে বেরোলেন নবাবপুরের যানজট পেরিয়ে, সূত্রাপুরের সরু গলি ধরে, আর্মানিটোলার পুরনো দেয়াল ছুঁয়ে হাঁটছেন। খেয়াল করলে মনে হবে এই রাস্তাগুলো শুধুই পথ নয়, এদে্য প্রত্যেকের নিজস্ব নিজস্ব ভাষা আছে। প্রতিটি নামের ভেতরে একটা করে গল্প আছে।

পুরান ঢাকাকে ব্যাখ্যা করা যায় ‘বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি’ বলে। শুধু বাজার নয়, এখানে আছে অনেকগুলো ‘পুর’, ‘গঞ্জ’, ‘তলা’, ‘তলী’ আ্য বাহারি নামের এলাকা। এলাকার নামকরণের পেছনে লুকিয়ে আছে একটির চেয়ে একটি রোমাঞ্চকর সব ঘটনা। আজ আমরা সেই গল্প ও ঘটনাগুলোই জানবো।

নবাবের পায়ের ছাপ নবাবপুর

ঢাকার সবচেয়ে ব্যস্ত রাস্তাগুলোর একটি হলো নবাবপুর। বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের দোকান, রিকশার ভিড়, হকারের চিৎকার চেঁচামেচি। এই হলো আজকের নবাবপুর। তবে নবাবপুরই কিন্তু একসময় ছিল ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত এলাকা।

নবাবপুরের পুরনো নাম ছিল উমেরপুর। কারণ, এই অঞ্চলে বাস করতেন আমির ওমরাগণ। পরে ইসলাম খানের আমলে এই রাস্তা দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করতেন নবাব বাহাদুর। নবাবের বিচরণের কারণে উমেরপুর হয়ে ওঠে নবাবপুর। ভাবুন একবার। ৪০০ বছর আগে এই পথ দিয়ে হাতির পিঠে চড়ে নবাব যেতেন। দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকত প্রজারা। বাতাসে ভাসত আতরের সুগন্ধ। আর সেই পায়ের ছাপ থেকে গেছে নামে, নবাবপুর।

কাঠের কারিগর বাস করত সূত্রাপুরে

নবাবপুর থেকে একটু দক্ষিণে হাঁটলে পড়বে সূত্রাপুর। এই নামটা এসেছে একটি পেশা থেকে।

প্রাচীন ঢাকা নৌকা ও কারুশিল্পের জন্য বেশ বিখ্যাত ছিল। আর এই দুটি শিল্পই ছিল কাঠনির্ভর। কাঠের কাজ যারা করত তারা সূত্রধর নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীন ঢাকায় সূত্রধররা এই এলাকায় বসতি স্থাপন করে, তাই তাদের নামানুসারেই এলাকাটির নাম হয় সূত্রাপুর।

বুড়িগঙ্গার ঘাটে তখন লক্ষ লক্ষ নৌকা। মুঘল সুবেদাররা নদীপথেই চলাচল করতেন। সেই নৌকা বানাতেন সূত্রধররা। কাঠ কেটে, গড়ে, রঙ মাখিয়ে। সবাই একসাথে থাকতেন। একসাথে কাজ করতেন। আর আজ সেই জনগোষ্ঠীর নামে পুরো একটা এলাকার নাম হয়ে গেল। আজকের সূত্রাপুরে সেই কারিগর নেই। তাদের বংশধরেরাও হয়তো নেই। কিন্তু নামটা রয়ে গেছে। যেন পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া শেষ চিহ্ন।

সেনাপতির শহর ইসলামপুরঢাকার প্রথম মুঘল সুবেদার ও মুঘল বাহিনীর প্রধান ছিলেন ইসলাম খান চিশতি। তার নামানুসারে নামকরণ হয়েছে ইসলামপুরের। এক সময় এই এলাকা কাঁসা-পিতল, ঘড়ি, বই-পুস্তক প্রভৃতি পণ্যের ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ছিল।

ইসলাম খান এই নামটি বাংলার ইতিহাসে অনেক বড়। ১৬১০ সালে তিনি মুঘল রাজধানী রাজমহল থেকে সরিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং শহরের নাম দেন জাহাঙ্গীরনগর। সেই মানুষটির নাম আজও বেঁচে আছে ইসলামপুরের ঘিঞ্জি গলিতে।

বিদেশি বণিকের পাড়া আর্মানিটোলা

পুরান ঢাকার রাস্তার নামগুলায় শুধু মুঘলদেরই গল্প নয়। আছে দূর দেশের মানুষদের গল্পও। ককেশাস পর্বতের কোলে ছোট একটা দেশ আর্মেনিয়া। খ্রিস্টীয় ৩০১ সালে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে আর্মেনিয়া খ্রিস্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছিল, যার ফলে অধিকাংশ আর্মেনীয় আর্মেনীয় অ্যাপোস্টলিক চার্চের অনুসারী হয়ে উঠে।

সতেরো শতকের দিকে সুদূর আর্মেনিয়া থেকে বণিকেরা জাহাজে চড়ে বুড়িগঙ্গার ঘাটে এসে উঠে। ঢাকার মসলিন আর পাটের টানে। আভিজাত্যের পুরানো এই শহরে তারা এসেছিল ব্যবসার উদ্দেশ্যে। পসরা সাজিয়েছিল পাট, বস্ত্র, লবণ আর সুপারির। তারপর, তারা যে অংশটিতে থাকত সেটি ধীরে ধীরে আর্মানিটোলা নামে পরিচিতি পায়।

তারা এখানে এসেছে। ব্যবসা করেছে। চার্চ বানিয়েছে। আর তাদের স্মৃতি থেকে গেছে ‘আর্মানিটোলা’ নামে। আজও পুরান ঢাকায় একটি আর্মেনিয়ান চার্চ আছে। কিন্তু সেখানে আর কোনো আর্মেনিয়ান নেই।

ব্যাঞ্জো বাদকের অমরত্ব চানখাঁর পুল

ইতিহাসের এক অদ্ভুত সৌন্দর্য হলো মহারাজাও মরে যায়, কিন্তু কখনো কখনো একজন সাধারণ মানুষ অমর হয়ে যায় সাধারণ একটা রাস্তার নামেও।

চানখাঁর পুলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যাঞ্জো বাদক চান খাঁর নাম। শোনা যায় তার নাম অনুসারে এলাকাটির নাম চানখাঁর পুল নামে পরিচিতি পায়। সেসময় নদীবেষ্টিত ঢাকার চারপাশ বর্ষা মৌসুমে জলে টইটম্বুর হয়ে যেত। শহরের ভেতরেও ছিল ছোট ছোট খাল বিল।

চান খাঁ ছিলেন একজন সংগীতজ্ঞ। হয়তো দরবারের সভাগায়ক, হয়তো গলির মোড়ে গান করা সাধারণ মানুষ। তার জীবনের কথা কেউ লিখে রাখেনি। কিন্তু একটা পুলের নামে তিনি বেঁচে আছেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। চানখাঁর পুল।

ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের নামে ওয়ারি

তখন সাল ১৮৮৪। ঢাকা নগরীর ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন ওয়্যার নামের এক ব্যক্তি। মি. ওয়্যার একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা। হয়তো ন্যায়পরায়ণ ছিলেন, হয়তো শুধু দায়িত্বপালনকারী। কিন্তু তার আমলে এলাকাটি এত সুন্দর হয়েছিল যে স্থানীয়রা তার নামেই ডাকতে শুরু করল।

তারপর আর কি, তার নামানুসারেই তখনকার ঢাকার উপকণ্ঠ এলাকাটি পরিচিত হয় ওয়ারি নামে। সে সময় ওয়ারি যে খুবই পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছিল। তার প্রমাণ পাবেন এখানকার পথঘাট-বাড়িঘর দেখলে। পুরান ঢাকার অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে ওয়ারি সুন্দর, পরিষ্কার ও প্রশস্ত। আর আভিজাত্যেও এর তুলনা হয় না অন্য কোন অঞ্চলের সাথে।

ঔপনিবেশিক শাসকের নাম। কিন্তু সেই নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে সে যুগের ঢাকার চমৎকার এই গল্প।

ফুলের বাড়ি, তাই ফুলবাড়িয়া

মোগলরা সুগন্ধি আর বাহারি আতর পছন্দ করতেন। তাই তখন ঢাকায় সুগন্ধি ও আতর তৈরির জন্য এক এলাকায় প্রচুর ফুলের চাষ শুরু হয়। যেহেতু এখানে ফুল উৎপাদন হয়, বা একপ্রকার ফুলের বাড়ি বলা যেতে পারে তাই এলাকার নামকরণ হয় ‘ফুলবাড়িয়া’। এরপর ব্রিটিশরা এলো। ফুলের মাঠ কেটে বসালো রেললাইন। ঢাকার প্রথম রেলস্টেশন এখানেই নির্মাণ করা হয়। ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে এখানে রেললাইন স্থাপন করে।

মোঘল রাজ শেষ হলো। বৃটিশ রাজ শেষ হলো। পাকিস্তানি রাজও শেষ হলো । যুগের পর যুগ বদলেছে, শাসক বদলেছে কিন্তু নামটা আজো রয়ে গেছে। ফুলবাড়িয়া এখনও আছে, যদিও সেখানে এখন আর কোনো ফুল নেই।

সম্রাটের নাম বাজার-এ-আলম

পুরান ঢাকার আরও একটি ঐতিহ্যবাহী এলাকা হচ্ছে আলমগঞ্জ। কারো মতে, মুঘল বাদশাহ আলমগীরের নামানুসারে এর নাম হয় আলমগঞ্জ।আলমগীর তথা আওরঙ্গজেব মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ শক্তিশালী সম্রাট। তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘গঞ্জ’, মানে বাজার। একজন সম্রাটের নাম একটি বাজারের নামে মিশে গেছে। ইতিহাসের এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে?

একজন দরবেশের স্মৃতিতে রোকনপুর

ঢাকার একটি প্রাচীন জনপদের নাম ‘রোকনপুর’। কথিত আছে যে, এখানে সুলতানি আমলে রোকন উদ্দিন চিশতি নামে একজন দরবেশ বাস করতেন। তার নামানুসারেই এলাকাটির নামকরণ করা হয় রোকনপুর। এখানে তার নামে কিন্তু একটি মাজারও রয়েছে। প্রতিদিন সেখানে মানুষের আসা যাওয়াও আছে।

এক ইংরেজের ‘হোয়াট এ গ্র্যান্ড এরিয়া’ থেকে গেন্ডারিয়া

একবার এক ইংরেজ ভদ্রলোক ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ ধোলাই নদীর ওপর লোহার পুলের কাছে এসে লাগাম টানে বসলেন। চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি বলে উঠেন, ‘হোয়াট এ গ্র্যান্ড এরিয়া!’। বাঙালি তো বুঝেনি। আর সেখান থেকেই ‘গ্র্যান্ড এরিয়া’ হয়ে গেল গেন্ডারিয়া। ভাবতে পারছেন? এক ইংরেজের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা একটি শব্দ কিভাবে হয়ে গেল একটি এলাকার নাম।

আজকে পুরান ঢাকার নাম শুনলেই কেমন যেন একটা অপরিষ্কার, ধুলো মাখা ঘিরিঞ্জি এলাকা সামনে আসে। কিন্তু পুরান ঢাকা সব সময় এমনটা ছিল না। একসময় অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, সুন্দর ও ছিমছাম একটি শহর ছিল পুরান ঢাকা। কিন্তু মুঘল শাসকদের পতনের পর থেকে এখানকার ভাগ্যে বিপর্যয় নেমে আসে।

উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে পুরান ঢাকার স্থাপনাগুলো যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি হারাতে বসেছে তার সোনালি ইতিহাসের গল্পগুলোও। কিন্তু রাস্তার নামগুলো এখনও টিকে আছে। নবাবপুর, সূত্রাপুর, আর্মানিটোলা, চানখাঁর পুল, ওয়ারি, ফুলবাড়িয়া, আলমগঞ্জ, রোকনপুর, গেন্ডারিয়া। এই নামগুলো শুধু কোন পথ বা ঠিকানা না। শত বছরের ইতিহাস চাপা পড়ে আছে এই নামগুলোর ভেতরে।

Scroll to Top