দেয়ালের এপাশে একজন, ওপাশে আরেকজন। মাঝখানে দুজনের হাত ধরাধরি।
ব্যান্ডের এক সদস্য তথ্যচিত্রে দৃশ্যটা এমনভাবে বলেন, যেন গতকালের ঘটনা। মামার বাসায় গিয়েছিলেন, পাশের বাড়ি থেকে গিটারের আওয়াজ আসছিল। মামাতো বোন জানাল, বাজাচ্ছে সাজ্জাদ। তিনি তখনই দেয়ালের এপার থেকে ডাক দিলেন। সাজ্জাদ ওপার থেকে হাত বাড়াল, তিনিও। তারপর সাজ্জাদের প্রশ্ন: আমরা ব্যান্ড করলে কি একসঙ্গে থাকব? উত্তর ছিল, অবশ্যই।
সময়টা ১৯৭২। ব্যান্ডটির জন্ম জানুয়ারি মাসে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরে। নাম আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভার্স, সংক্ষেপে ইউপিএল।
শুরু
ব্যান্ডের প্রথম সারির পাঁচজন হলেন দস্তগীর হক (লিড ভোকাল), ওমর খালেদ রুমি (ভোকাল ও গিটার), সাজ্জাদ আলী (ভোকাল ও গিটার), সালাউদ্দিন খান (বেজ ও ভোকাল) আর শাহেদুল হুদা (ড্রামস ও ভোকাল)। তথ্যচিত্রে তাঁরা একে একে নিজেদের শুরুর গল্প বলেন, আর গল্পগুলো আশ্চর্যরকম একই ছাঁচে পড়ে। কারও কাছে একটা যন্ত্র ছিল, কেউ ভয় পাচ্ছিল, আর কেউ একজন বলছিল, চিন্তা কোরো না, সবাই মিলে করব।

সালাউদ্দিনের কাছে একটা মোসরাইট গিটার ছিল, মোসরাইট গিটার তখন ঢাকায় চোখে দেখাই দুর্লভ। বেজ গিটার জোগাড় হলো অনেক খুঁজে, মাত্র ৪৬০ টাকায়। আর ড্রামার শাহেদুলকে, বাড়ি থেকে প্রায় জোর করেই তুলে আনা হয়। গায়ক খোঁজার দায়িত্ব পড়ল সাজ্জাদের ওপর। তিনি চিনতেন দস্তগীরকে। দস্তগীর নিজে ডেইলি ট্রিবিউনকে বলেছেন, প্রথম শোর আগে তাঁর এতটাই ভয় লাগছিল যে পালাতে চেয়েছিলেন, রুমি আর সালাউদ্দিন তাঁকে খুঁজে বের করেন। ওই শোতে তিনি হারমোনিকায় বাজিয়েছিলেন বিটলসের “ইয়েস্টারডে”। রিহার্সালের জায়গা ছিল সাজ্জাদের বাড়ি, যেটাকে তিনি বলেছেন তাঁদের জ্যামিংয়ের ঘর আর স্টুডিও।
আরেক সদস্যের স্মৃতিতে প্রথম গানটা ছিল “লেট ইট বি”। বাজানো শেষ হতেই বাকিরা উত্তেজিত, বলল, তোমাকে ব্যান্ডে থাকতেই হবে। তাঁর শোবার ঘর হয়ে গেল প্র্যাকটিস রুম। মা সবাইকে দেখতেন ছেলের মতো, কোনো আপত্তি করেননি, আর বাবা মেনে নিয়েছিলেন।
গানের মঞ্চ
১৯৭২ সালের মার্চে হোটেল পূর্বাণীতে, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কনসার্ট হিসাবে তাদের প্রথম বড় পরিবেশনা দেখা যায়। সেদিন তাঁরা গেয়েছিলেন: ব্ল্যাক ম্যাজিক ওম্যান, স্যান্ডম্যান, আর সাজ্জাদের গাওয়া একটা বিটলস। সামনের সারিতে বসা সিনিয়র সংগীতশিল্পীরা নাকি অবাক হয়ে শুনছিলেন, কারণ এসব গান তখন কেউ বাজাতে পারত না। তাঁদের ধারণায় দস্তগীরের গলার পরিসর এমন ছিল যে আজও অনেকে তা ছুঁতে পারেন না।
ব্যান্ডের নিয়মিত তালিকায় ছিল ডিপ পারপল, সান্তানা, রোলিং স্টোনস, বিটলস, সিসিআর আর রেয়ার আর্থ। ইউপিএলের সবচেয়ে বড় নম্বর, এক সদস্যের ভাষায়, ছিল রেয়ার আর্থের “গেট রেডি”, ২১ মিনিটের একটা গান, যেখানে পাঁচজনই নিজের ওস্তাদি দেখানোর জায়গা পেতেন। কারও সোলো, কারও লিড, আর কারও রিদম।
ইউপিএল ছিল অসাধারণ দক্ষ অনুকরণকারী। ক্যাসেট কিনে বারবার শুনে শুনে যন্ত্রের নোট তুলে আনা, তা-ও এমন সময়ে, যখন আন্তর্জাতিক গান শোনার সুযোগ সহজ ছিল না, এটা সহজ কাজ নয়। দস্তগীরও এই পরিশ্রমের কথা বলেছেন। কিন্তু অনুকরণের একটা সীমা আছে, ইতিহাসের স্মৃতিতেও। ডেইলি স্টারের এক পুরোনো লেখায় ইউপিএল ছিল এমন দল, যারা বিটলস, ঈগলস আর রোলিং স্টোনসের গান দিয়ে ক্লাব আর হোটেলে শুরু করেছিল। আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভার্সের নিজেদের লেখা গান নিয়ে অ্যালবামটা এসেছে ২০১৭ সালে, প্রতিষ্ঠার ৪৫ বছর পরে। আর, যে ব্যান্ড নিজের গান বাঁধেনি, সে মুখে মুখে টেকার সম্ভাবনা কম রাখে।

ইউপিএল গাইতেন বিভিন্ন ক্লাব আর হোটেলে, দেশি আর বিদেশি দুই ধরনের দর্শকের সামনে। এক সদস্যের মতে, ইন্টারকন্টিনেন্টালে গাওয়ার সময় বিদেশিরা জানতে চাইত, তোমরা কোথা থেকে এসেছ। বাংলাদেশি শুনে অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইত না। দস্তগীরের কাছেও মেয়েদের চিঠি আসত, আর কেউ কেউ বিশ্বাসই করত না যে গানগুলো বাংলাদেশি একটা ব্যান্ডের।
হোটেল-ক্লাবের এই মঞ্চের একটা সামাজিক ওজনও আছে। আজম খান নিজেই ২০০৬ সালে বলেছিলেন, দেশের ব্যান্ডসংগীত ঠিকমতো সামলানো হয়নি, ফলে তা সীমিত থেকে গেছে ফ্যাশনদুরস্ত অভিজাত তরুণদের মধ্যেই।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ওই সময়টা ছিল অস্থিতিশীল, মঞ্চের বাইরের শহরটা ছিল অন্যরকম। এক সদস্য সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে বলেন, “সকলের হাতেই বন্দুক ছিল, খালি আমাদের হাতে ছিল গিটার।” যুদ্ধের পরের ঢাকায় অস্ত্র ছিল সহজলভ্য, আর বাজনা ছিল সেই সময়ের কাছে একটা অদ্ভুত বিকল্প।
ভাঙন
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় ইউপিএল অর্থ তুলতে একটা চ্যারিটি শো করেছিল, এক সদস্য বলেন, সেই টাকা দুর্ভিক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দেওয়া হয়েছিল। ব্যান্ডের সদস্যরা “ধীরে বহে মেঘনা”সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রের আবহসংগীতেও কাজ করেছেন।
তারপর, ১৯৭৫ সালে ব্যান্ডটি ভেঙে যায়। সালাউদ্দিন উচ্চশিক্ষার জন্য যান ইংল্যান্ডে, সাজ্জাদ সুইডেনে, শাহেদুল কানাডায়, আর দস্তগীর ফিরে যান রংপুরে। ওমর খালেদ রুমি ছাড়া সবাই দেশ ছাড়েন। একটা ব্যান্ড ভাঙার এই ধরন চেনা, কিন্তু এক ঝটকায় একটা পুরো প্রজন্মের সৃজনশীল শক্তি দেশের বাইরে চলে যাওয়ার দৃষ্টান্ত হিসাবেও এটা পড়া যায়। নামটা অবশ্য থেকে গিয়েছিল। ১৯৭৫ সালে হ্যাপি, রুমি, রবিন, ইদু, কামাল ও ইশতিয়াককে নিয়ে “আন্ডারগ্রাউন্ড পিচ লাভারস” ইন্টারকন্টিনেন্টালে নিয়মিত বাজাত, আর সালাউদ্দিন ইংল্যান্ডে চলে গেলে ভাঙনের মুখে পড়ে। তারপর চলে যায় অনেকগুলো বছর, কেঁটে যায় চার দশক।
২০১১ সালে গুলশান ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে সদস্যদের আবার একসঙ্গে পাওয়া গেল। এরপর ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে এল তাঁদের প্রথম অ্যালবাম, ১৩টি গান, যার সুর আর কথা সদস্যদেরই।
“প্রথম” শব্দের ইতিহাস
তথ্যচিত্রের কয়েকজন সদস্য জোর দিয়ে বলেন, ১৯৭২ সালে ব্যান্ড বলতে আর কেউ ছিল না, স্পন্দন আর উচ্চারণ এসেছে তাঁদের অন্তত ছয় মাস পরে। কিন্তু, এই দাবি ইতিহাস পুরোপুরি সমর্থন করে না।

সূত্র ঘাঁটলে দেখা যায়, ডেইলি স্টারের এক লেখায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সংগঠিত ব্যান্ড হিসেবে চট্টগ্রামের জিঙ্গা গোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে, যা ১৯৬৩ সালে গড়া। একই লেখায় আছে, ১৯৭২ সালে চট্টগ্রামে সুরেলা নামে একটা দল গড়ে ওঠে, যা পরে সোলস হয়। উচ্চারণের প্রতিষ্ঠার সালও একাধিক সূত্রে ১৯৭২। আবার একটি সংকলনে বলা হয়েছে, ওই বছরই আগলি ফেসেস নামের আরেকটি ব্যান্ড গড়ে ওঠে, এবং স্বাধীনতার পর প্রথম ব্যান্ড কোনটি, তা নিয়ে সেখানে বিতর্কের কথা স্বীকার করা হয়েছে।
তাহলে ইউপিএল সম্পর্কে ঠিক কোন বাক্যটা টেকে? আমার বিবেচনায় এটাই: তাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম দিকে গড়ে ওঠা ব্যান্ডগুলোর একটি, সম্ভবত সবচেয়ে প্রথমটি, আর রাজধানীর হোটেল-ক্লাবের মঞ্চে পশ্চিমা রক বাজানোর পথিকৃৎ। শুধুই “প্রথম” বলা তাঁদের সঙ্গে সুবিচার নয়, কারণ তাতে তাঁদের আসল অবদান ঢাকা পড়ে যায়: যুদ্ধের পরের ক্লান্ত, ভীত একটা শহরে এই ছেলেরা প্রমাণ করেছিলেন যে ব্যান্ড নিয়ে মঞ্চে ওঠা যায়।
যা আছে, আর যা নেই
এ বছর ব্যান্ডের কণ্ঠশিল্পী দস্তগীর হক মারা গেছেন। দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতাসহ নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী আর একমাত্র ছেলেকে।
বন্ধন, পরিবার, একসঙ্গে থাকা, এই কথাগুলো যতই সুন্দর শোনাক, একটা ব্যান্ডের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় যা রেকর্ড হয়েছে, লেখা হয়েছে, বাজানো হয়েছে তার ওপর। সত্তরের দশকে ইউপিএলের মঞ্চের কোনো রেকর্ড আমি খুঁজে পাইনি। আছে ২০১৭ সালের তেরোটা গান, কয়েকটা পুরোনো প্রতিবেদন, আর একটা তথ্যচিত্র, যেখানে পাঁচজনের স্মৃতি পরস্পরের পাশে বসে আছে, কোথাও মিলছে, কোথাও মিলছে না।
দেয়ালের দুই পাশ থেকে হাত ধরার সেই দৃশ্যটা সত্যি ছিল কি না, তা যাচাই করার উপায় নেই। শুধু এটুকু জানা যায়, যে প্রশ্নটা সেদিন করা হয়েছিল, তার উত্তর একটা ব্যান্ড ৪৫ বছর ধরে দিয়ে গেছে। কখনো একসঙ্গে থেকে, বেশির ভাগ সময় দূরে থেকে।