৫ অক্টোবর, প্যারিস। লিসে সোফি জার্মেইন স্কুলের গেটে ডাস্টবিন ঠেলে ব্যারিকেড বানিয়েছে ছাত্ররা। ভেতরে ঢোকা বন্ধ, গেটের বাইরে প্রতিবাদ। তারপর অধ্যক্ষ জানালেন, আজ স্কুল ছুটি। ছাত্ররা তখন ডাস্টবিনগুলো যেখান থেকে এনেছিল, সেখানেই ফিরিয়ে রেখে বাড়ি ফিরল। ছবিটা প্রায় হাস্যকর রকমের ভদ্র বলা যায়। অথচ সেই সপ্তাহেই ফ্রান্সের আরও অনেক জায়গায় ছবিটা ছিল আগুন, গ্রেনেড আর হাসপাতালের। একই আন্দোলন, দুই রকম মুখ। এই দ্বৈততাই বোধহয় আজকের ফ্রান্সের ছাত্র-আন্দোলনের সবচেয়ে সৎ বর্ণনা।
এক স্কুল থেকে সারা দেশ
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। প্যারিস-সংলগ্ন শহরতলি ক্রেতেইয়ের লিসে সাঁ-তেক্সুপেরির ছাত্ররা প্রতিবাদে নামে। কারণটা কোনো বড় মতাদর্শ না, সরল কিছু ঘাটতি। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে নিজেই পরে বলেছেন, সেই স্কুলে তিনজন শিক্ষক, একজন উপ-অধ্যক্ষ, একজন সমাজকর্মী আর একজন স্কুল-মনোবিজ্ঞানীর পদ ফাঁকা ছিল। প্যারিসের উত্তরের এলাকা সেন-সাঁ-দনিতে গল্পটা একই। অবারভিলিয়ের একটি স্কুলে শিক্ষাবর্ষ শুরুর পর থেকে অঙ্ক, ইংরেজি আর খেলাধুলার ক্লাস শিক্ষকের অভাবে হয়নি।
আন্দোলনের প্রথম দিন ঠিক কোনটা, সেটা নিয়ে মত বিরোধ আছে: ১৮ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নানা তারিখ পাওয়া যায়।
এরপর খবরটা আগুনের মতো ছড়াল। ২৯ সেপ্টেম্বর সরকারি কর্মচারীদের জাতীয় সমাবেশের দিনে অনেক স্কুল আন্দোলনে যোগ দেয়। ১ অক্টোবর নাগাদ ফ্রান্সের প্রায় ত্রিশ শতাংশ হাই স্কুল কোনো না কোনোভাবে আন্দোলনের প্রভাবে আসে। সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও যোগ দিল। ছাত্রসংগঠন ইউনিয়ঁ এতুদিয়াঁত প্রায় ত্রিশটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবরোধের কথা জানাল। তারপর, ৬ অক্টোবর এল সবচেয়ে বড় দিন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের হিসাবে সারা দেশে ২,৬৬,০০০ মানুষ রাস্তায় নামল, সংগঠনগুলোর হিসাবে সেটা ৪,৫০,০০০। সংখ্যা দুই রকম, কিন্তু দুইটাই বলছে, এটা আর কয়েকটা স্কুলের ব্যাপার না।
আন্দোলনের মূল চরিত্র ফ্রান্সের উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রছাত্রীরা, যাদের বড় অংশ এখনও প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি। তাদের পাশে এসেছে ছাত্রসংগঠন, শিক্ষক ইউনিয়ন আর অভিভাবকরা। ছাত্রসংগঠনগুলো মিলে দশ দফা জরুরি দাবির একটি তালিকাও তৈরি করেছে। এই আন্দোলনের একটা অদৃশ্য সংগঠকও আছে, সেটা হলো ফোনের স্ক্রিন। ১৭ অক্টোবরের তারিখ ঠিক হয়েছিল ৭ সেপ্টেম্বরের একটি টিকটক ভিডিওতে, যার মোট ভিউ ১৩ কোটি ২০ লাখ। মিছিলের প্ল্যাকার্ডেও এই প্রজন্মের ভাষা: একটিতে লেখা ছিল, “আমাদের ক্লাস উপচে পড়ছে, ধৈর্যও।”
ছাত্রদের অভিযোগের তালিকা মূলত স্কুলের ভেতরের: শিক্ষকের ঘাটতি, ভিড়ের ক্লাস, জরাজীর্ণ ভবন, ভারী সময়সূচি। সঙ্গে আছে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির অনলাইন ব্যবস্থা পারকুরসুপ নিয়ে অসন্তোষ। কিছু সংগঠন চাইছে বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও ২,৫০,০০০ আসন আর পারকুরসুপের বাছাই-ব্যবস্থা বাতিল। আন্দোলনের উপলক্ষ ২০২৭ সালের বাজেট। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বেড়েছে ১.৭ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লকর্নুর ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য অতিরিক্ত ১২০ কোটি ইউরো রাখা হয়েছে।
লকর্নু ২০১৭ সালে ম্যাক্রঁ ক্ষমতায় আসার পর সপ্তম প্রধানমন্ত্রী, যিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে “সব বন্ধ করো” আন্দোলনের মধ্যে। এখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কাছে, আর আজ যারা স্কুলের গেটে, তাদের কেউ কেউ সেই নির্বাচনে প্রথমবার ভোট দেবে।
ইতিহাসের ছায়া
ফ্রান্সে ছাত্ররা রাস্তায় নামলে সেই গল্পের শিকড় যায় প্রায় আটশো বছর পিছনে।
১২২৯। প্যারিসে তখন সদ্য গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়। সরাইখানার এক ঝগড়া থেকে ছাত্র আর শহরের সংঘর্ষ বাধে, পুলিশ ছাত্রদের পিটিয়ে সেন নদীতে ফেলে দেয়। জবাবে শিক্ষক ও ছাত্ররা প্যারিস ছেড়েই চলে গেলেন। শহর মর্যাদা আর অর্থ হারাতে লাগল।
১৯৬৮। সবচেয়ে বেশি আলোচিত বছর। ছাত্রদের স্থানীয় ক্ষোভ প্রতীক হয়ে উঠল, তারপর আন্দোলন গেল কারখানায়। ২২ মে নাগাদ ফ্রান্সে ৭০ লাখ মানুষ ধর্মঘটে।
১৯৮৬। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বাছাই ব্যবস্থার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ২৭ নভেম্বর প্যারিসে ২ লাখ আর অন্য বড় শহরে ৪ লাখ ছাত্র রাস্তায় নামে। ৬ ডিসেম্বর রাতে ২২ বছরের মালিক উসেকিন, যিনি বিক্ষোভে ছিলেনই না, পুলিশের একটি মোটরসাইকেলবাহী ইউনিটের হাতে পিটুনিতে মারা যায়। চাপের মুখে মন্ত্রী পদত্যাগ করে, প্রস্তাবও বাতিল হয়। ২০২৬-এর সঙ্গে এখানে দুইটা সুতা মিলে: ভর্তির বাছাইয়ের প্রশ্ন, যা আজ পারকুরসুপের নামে ফিরেছে, আর আন্দোলনের মধ্যে পুলিশি সহিংসতার প্রশ্ন।
২০০৬। তরুণদের জন্য সহজে ছাঁটাই করা যায় এমন চাকরির চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছড়ালে ১০ এপ্রিল সরকার তা বাতিল করে অন্য ব্যবস্থা আনার ঘোষণা দেয়।
আন্দোলন এবং সরকারের জবাব
প্রধানমন্ত্রী লকর্নু ৬ অক্টোবর জানান, আন্দোলন শুরুর পর ২১৫ জন ছাত্র আর ৮৫ জন শিক্ষা-কর্মী আহত, আহত পুলিশ সদস্য ৭০০-র বেশি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের হিসাবে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত গ্রেপ্তারদের ৮৭ শতাংশ নাবালক। এর দায় কার, আর পুলিশের জবাব কতটা মাপা ছিল। উত্তরের লঁস শহরে একজন ১৫ বছরের কিশোরের হাত পুলিশের গ্রেনেডে উড়ে গেছে। শিক্ষামন্ত্রীর মতে, অনেক ছাত্রের আন্দোলন ভাঙচুরকারীরা কেড়ে নিচ্ছে। ছাত্রসংগঠনগুলোর দাবি, পুলিশি সহিংসতায় দোষীদের বিচার হোক। আর সরকারের কিছু সদস্য অভিযোগ করেছে, বামপন্থী দল লা ফ্রাঁস আঁসুমিজ আন্দোলনকে কাজে লাগাচ্ছে। দলের নেতা জাঁ-লুক মেলাঁশঁ বিদ্রূপ করে বলেন, সবাই দোষ দিলে বুঝতে হবে সবটা “টেলিপ্যাথিতে” ঘটেছে।
৪ অক্টোবর লকর্নু মন্ত্রীদের চিঠিতে পাঁচটি অগ্রাধিকারের কাজ ঘোষণা করলেন: পড়ানোর অবস্থা, স্কুলের সময়সূচি, ভবন, পারকুরসুপ আর ছাত্রদের কথা শোনার ব্যবস্থা। প্রথম সিদ্ধান্ত আসার কথা অক্টোবরের শেষে। ছাত্রসংগঠন ইউনিয়ঁ এতুদিয়াঁত একে ফাঁপা আশ্বাসের কৌশল বলেছে, যেহেতু এখনো এটা কাজের পরিকল্পনা মাত্র, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না, তাই একে এখনো বিচার করা যাচ্ছে না।
৬ অক্টোবর রাতে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর শিক্ষামন্ত্রীকে এলিজে প্রাসাদে ডেকে বৈঠক করেন। ১৭ অক্টোবর শনিবার জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিরুদ্ধে ডাকা জাতীয় বিক্ষোভে ছাত্রদের পাশে দাঁড়াল ইয়েলো ভেস্টের অবশিষ্ট কর্মীরা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হিসাবে, সেদিন রাস্তায় নেমেছে ৫,৫০,০০০ মানুষ, আর আয়োজকদের হিসাবে ৮,০০,০০০ মানুষ অংশ নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট পরে বলেছেন, যারা ভাঙচুর করেছে, তাদের বিচার হবে।
এই আন্দোলন এরই মধ্যে কী বদলেছে
একটা মাসেই কিছু জিনিস বদলে গেছে। তরুণদের জন্য সমাজে কতটা জায়গা, এই প্রশ্ন এখন রাজনীতির এজেন্ডার শীর্ষে। ঢেউ ছড়িয়েছে প্রতিবেশী বেলজিয়ামের লিয়েজেও, সেখানে স্কুলে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। তবে এর দামও আছে: ক্লাস বন্ধ, ক্ষতি, আর নাবালকদের বিশাল সংখ্যায় গ্রেপ্তার।
এই আন্দোলনের সামনে এখন দুটো পরীক্ষা। সরকারের পরীক্ষা, অক্টোবরের শেষে ঘোষণায় সংখ্যা আর সময়সূচি দিতে পারে কি না। আন্দোলনের নিজের পরীক্ষাও আছে। ফরাসি ইতিহাসে ১৯৮৬ ও ২০০৬-এ ছাত্ররা জিতেছিল একটি নির্দিষ্ট আইন বা চুক্তি বাতিলের লড়াইয়ে। ২০২৬-এর প্রতিপক্ষ কোনো একটি আইন নয়, এক ধরনের ঘাটতি। সব শেষে যা বলা যায়, সেটা হলো: যে আন্দোলন একটি স্কুলের ফাঁকা পদ দিয়ে শুরু হয়েছে, তার শেষ বিচার হবে সেই স্কুলেই। ডাস্টবিন ফিরিয়ে রেখে বাড়ি যাওয়া সেই ছাত্ররা যেদিন ক্লাসে ফিরবে, সেদিন সেখানে কতগুলো পদ ভরার নিশ্চয়তা আছে, সেটাই বলে দেবে, এক মাসের এই উত্তাপ কিছু রেখে গেল কি না।