ইউটিউব কি পারবে বাংলাদেশে কোটিপতি উদ্যোক্তা বানাতে?

সাধারণ মানুষের ধারণা, ইউটিউবার মানেই বিজ্ঞাপন থেকে আয়। কিন্তু বাস্তবতা অনেক জটিল।

● দ্য পাবলিশ

সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬

ইউটিউব কি পারবে বাংলাদেশে কোটিপতি উদ্যোক্তা বানাতে? | দ্য পাবলিশ The Publish

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ


রাত তখন প্রায় দুইটা। মোহাম্মদপুরের একটা তিনতলা বাসার ছাদ-চিলেকোঠায় নীল আলোয় ভাসছে একটা মনিটর। ছেলেটার বয়স চব্বিশ, চোখের নিচে কালি, হাতে একটা কফি মগ যেটা ঠান্ডা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। টাইমলাইনে হাজারখানেক ক্লিপ, প্রতিটা তিন সেকেন্ডের কম। সে একটা থাম্বনেইলের হলুদ রঙ নিয়ে পঞ্চম বারের মতো দ্বিধায় পড়েছে, কারণ তার বিশ্বাস, এই একটা রঙের সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে ভিডিওটা পাঁচ লাখ মানুষ দেখবে না পঞ্চাশ লাখ মানুষ দেখবে। বাসা ভাড়া বাকি পড়েছে দুই মাস, এই মুহূর্তে সেটা তার মাথায় নেই। তার মাথায় আছে একটাই হিসাব, রিটেনশন কার্ভ কোথায় পড়ে যায়, কোন সেকেন্ডে দর্শক চলে যায়, আর কীভাবে সেই ফাঁকটা বন্ধ করা যায়।

একই সময়ে, অন্য এক দৃশ্য চলছে গোলার্ধের অন্য পাশে। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার গ্রিনভিলের এক গুদামঘরে, যেটা এখন আর গুদামঘর নেই, বরং একটা পূর্ণাঙ্গ প্রোডাকশন স্টুডিও, রাত পার করে কাজ করছে এডিটর, কালার স্পেশালিস্ট, ডেটা অ্যানালিস্ট, এমনকি একজন সাবেক হলিউড প্রোডাকশন ম্যানেজারও। দেয়ালে সাঁটা আছে স্প্রেডশিট, যেখানে প্রতিটা ভিডিওর বাজেট, প্রত্যাশিত ভিউ, আর বিজ্ঞাপনদাতার রিটার্ন হিসাব করে রাখা। এই প্রতিষ্ঠানের নাম বিস্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, যার প্রতিষ্ঠাতা জিমি ডোনাল্ডসন, যাকে পৃথিবী চেনে মিস্টার বিস্ট নামে। এক দশক আগে এই মানুষটাও ঠিক ওই চিলেকোঠার ছেলেটার মতোই একা বসে ভিডিও এডিট করত। আজ তার প্রতিষ্ঠানের কর্মী সংখ্যা কয়েকশো ছাড়িয়ে গেছে, আর প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানটির মূল্য ধরছেন পাঁচ দশমিক দুই বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি টাকায় ৬৩,৯৬৮ কোটি টাকা।

এই দুই দৃশ্যের মাঝখানে একটা প্রশ্ন ঝুলে থাকে, যেটা শুধু প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়, অর্থনীতিরও প্রশ্ন। ইউটিউব কি কেবল ব্যক্তি-খ্যাতির একটা মঞ্চ, নাকি এটা আসলে বাংলাদেশের পরবর্তী হাজার কোটি টাকার শিল্পের সূচনাবিন্দু? একজন মানুষ, একটা ক্যামেরা, আর একটা ইন্টারনেট সংযোগ থেকে কি সত্যিই একটা কর্পোরেট সাম্রাজ্য দাঁড় করানো সম্ভব? আর যদি সম্ভব হয়, তাহলে ঢাকার সেই চিলেকোঠার ছেলেটা আর গ্রিনভিলের বিলিয়ন-ডলার প্রতিষ্ঠানের মাঝখানে দূরত্বটা ঠিক কতটুকু, এবং সেই দূরত্ব পার হওয়ার রাস্তাটা কোথায়?

ক্রিয়েটর ইকোনমি বলতে ঠিক কী বোঝায়

    শব্দটা শুনতে নতুন লাগলেও ধারণাটা আসলে পুরনো এক ব্যবসার নতুন সংস্করণ। প্রকাশক, সম্পাদক আর পরিবেশকের যে ত্রিস্তরীয় কাঠামো একসময় মিডিয়া শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করত, ইউটিউব সেই কাঠামোটাকে একজন মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা বিভাগ একে সংজ্ঞায়িত করেছে এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্র হিসেবে, যেখানে ব্যক্তি নির্মাতারা নিজেদের শ্রোতা-দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে আয় করেন, মাঝখানে কোনো প্রথাগত প্রকাশনা সংস্থা ছাড়াই। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, এই বাস্তুতন্ত্রের সম্ভাব্য বাজার আকার আড়াইশো বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দুই হাজার সাতাশ সালের মধ্যে প্রায় চারশো আশি বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যেখানে ব্র্যান্ড স্পনসরশিপ, প্ল্যাটফর্ম পেআউট আর সাবস্ক্রিপশন আয়কে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৬ সালে এসে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাবে বর্তমান বাজারের আকার নিয়ে কিছুটা ভিন্নতা আছে, কারণ কেউ শুধু সরাসরি নির্মাতা-আয় গোনেন, কেউ আবার এর সঙ্গে যোগ করেন এজেন্সি, সফটওয়্যার আর অবকাঠামো ব্যবসাকেও। সেই পার্থক্যের কারণেই সংখ্যাটা কোথাও দুইশো পাঁচ বিলিয়ন, কোথাও আবার তিনশো তেইশ বিলিয়ন ডলার হিসেবে উঠে আসে।

    পার্থক্যটা শুধু সংখ্যায় নয়, চরিত্রেও। প্রথাগত মিডিয়া প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপনদাতার কাছে বিক্রি করত দর্শকের মনোযোগ, যেটা একটা সামষ্টিক পরিমাপ, রেটিং পয়েন্ট আর সার্কুলেশন সংখ্যা দিয়ে মাপা হতো। ক্রিয়েটর অর্থনীতিতে বিক্রি হয় বিশ্বাস, যেটা একেবারেই ব্যক্তিগত এক সম্পর্ক। একজন দর্শক একটা টেলিভিশন চ্যানেলকে বিশ্বাস করে না, কিন্তু একজন নির্দিষ্ট মানুষের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বাস করে, এবং সেই বিশ্বাসই পণ্যে রূপান্তরযোগ্য এক সম্পদ হয়ে ওঠে। এই কারণেই আজকের সফল নির্মাতারা আর নিজেদের বিনোদনদাতা মনে করেন না, নিজেদের দেখেন প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা হিসাবে, যাদের প্রথম পণ্য হলো একটা ভিডিও, কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য একটা ব্র্যান্ড।

    বিজ্ঞাপনের বাইরে টাকা যেভাবে আসে

      সাধারণ মানুষের ধারণা, ইউটিউবার মানেই বিজ্ঞাপন থেকে আয়। কিন্তু বাস্তবতা অনেক জটিল। ইউটিউব নিজেই ২০২৫ সালে মোট ষাট বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে, যেটা অ্যালফাবেট প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করেছে, এবং এর মধ্যে বিজ্ঞাপন খাতেই ছিল প্রায় ছত্রিশ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু বিজ্ঞাপনদাতা যে অর্থ দেন, সেটাকে বলা হয় সিপিএম, আর নির্মাতা যা হাতে পান সেটা আরপিএম নামে পরিচিত, যেটা সাধারণত সিপিএমের প্রায় অর্ধেক, কারণ ইউটিউব নিজে প্রায় পঁয়তাল্লিশ শতাংশ কেটে রাখে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, এই সিপিএম দেশভেদে আকাশ-পাতাল পার্থক্য তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র বা জার্মানির মতো বাজারে সিপিএম দশ থেকে চল্লিশ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে, অথচ বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের মতো বাজারে এই সংখ্যা প্রায়ই দুই ডলারের নিচে থেকে যায়। ফলে একই এক মিলিয়ন ভিউ, দুই ভিন্ন দেশে, দুই ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করে।

      ঠিক এই অসাম্যের কারণেই বিশ্বের সফল নির্মাতারা কখনোই কেবল বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করেন না। ব্র্যান্ড স্পনসরশিপ এখন গোটা ক্রিয়েটর অর্থনীতির আয়ের প্রায় সত্তর শতাংশ দখল করে আছে। এর বাইরে আছে অ্যাফিলিয়েট বিপণন, যেখানে নির্মাতা একটা পণ্যের লিংক শেয়ার করে বিক্রির একটা অংশ পান। আছে মার্চেন্ডাইজ, ডিজিটাল পণ্য আর অনলাইন কোর্স, যেগুলো একবার তৈরি করলে বারবার বিক্রি করা যায়। আছে মেম্বারশিপ আর পেট্রিয়ন-ধাঁচের সরাসরি ভক্ত-অনুদান, যেখানে দর্শক নিজেই টাকা দিয়ে মেম্বারশিপ কিনে নেন। আছে লাইসেন্সিং, লাইভ ইভেন্ট, পরামর্শ সার্ভিস, এমনকি সফটওয়্যার পণ্য, যেমন মিস্টার বিস্টের নিজস্ব ভিউস্ট্যাটস নামের অ্যানালিটিক্স প্ল্যাটফর্ম। যে নির্মাতা যত বেশি আয়ের উৎস তৈরি করতে পারেন, তার ব্যবসা ততই একটা প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম বদলের ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে।

      একজন মানুষ যেভাবে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়

        শুরুটা প্রায় সবসময় একরকম। এক ব্যক্তি, নিজের হাতে ক্যামেরা ধরে, নিজের ঘরে বসে এডিট করে, নিজেই স্ক্রিপ্ট লিখে ভিডিও বানান। কিন্তু একটা চ্যানেল যখন লাখ থেকে দশ লাখ, দশ লাখ থেকে কোটি সাবস্ক্রাইবারের দিকে হাঁটতে শুরু করে, তখন একা একজন মানুষের পক্ষে সব কাজ করা সম্ভব হয় না। মিস্টার বিস্টের প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কর্মী সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নতা আছে, কোনো তথ্যভান্ডার বলছে প্রায় দুইশো চল্লিশ জন, আবার পিচবুকের হিসাবে সংখ্যাটা হাজার ছাড়িয়ে গেছে যদি সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ধরা হয়। যে সংখ্যাই সঠিক হোক, একটা বিষয় স্পষ্ট, একটা ইউটিউব চ্যানেল আজকের যুগে একটা মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানের মতোই জটিল সাংগঠনিক কাঠামো দাবি করতে পারে।

        এই রূপান্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটা আসে তখন, যখন প্রতিষ্ঠাতা নিজে ক্যামেরার সামনে থাকা বন্ধ না করেও, প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত-গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে কিছুটা সরিয়ে নেন। মিস্টার বিস্টের প্রতিষ্ঠান বার্ষিক কনটেন্ট বাজেট হিসেবে প্রায় আড়াইশো মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে, যা মাঝারি মানের হলিউড স্টুডিওর একটা পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রের বাজেটের চেয়েও বেশি। এই পরিমাণ অর্থ কোনো একক ব্যক্তি নিজে হাতে ব্যবস্থাপনা করতে পারেন না, এখানেই দরকার পড়ে অপারেশন্স আর ফাইন্যান্স বিভাগের।

        বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত, বিজয় ও ব্যর্থতা

          মিস্টার বিস্টের গল্পটা এখন প্রায় প্রবাদ হয়ে উঠেছে, কিন্তু সংখ্যাগুলো এখনও চমকে দেয়। ২০২২ সালে বিস্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মূল্যায়ন ছিল দেড় বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে আলফা ওয়েভ গ্লোবালের নেতৃত্বে নতুন বিনিয়োগ রাউন্ডের পর সেই মূল্যায়ন পাঁচ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়, আর ২০২৬ সালের শুরুতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী সংখ্যাটা পাঁচ বিলিয়নের ঘরে স্থির হয়। এই মূল্যায়নের একটা বড় অংশ আসে তার চকোলেট ব্র্যান্ড ফিস্টেবলস থেকে, যেটা ২০২৪ সালেই আড়াই শো মিলিয়ন ডলার আয় করেছে, প্রতিষ্ঠার মাত্র দুই বছরের মধ্যে ওয়ালমার্ট আর টার্গেটের তাকে জায়গা করে নিয়ে, এমন একটা গতি যা প্রথাগত ভোগ্যপণ্য কোম্পানির কয়েক দশক লাগত অর্জন করতে। অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর সঙ্গে তার রিয়েলিটি শো বিস্ট গেমসের চুক্তি প্রমাণ করে, একটা ইউটিউব চ্যানেল থেকে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান এখন প্রথাগত স্ট্রিমিং জায়ান্টদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামতে পারে।

          কিন্তু মিস্টার বিস্ট একমাত্র মডেল নন। ডুড পারফেক্ট Dude Perfect নামের একটি চ্যানেল ট্রিক-শট ভিডিও দিয়ে শুরু করে এখন নিজেদের একটা লাইসেন্সিং আর মোবাইল গেমিং ব্যবসায় রূপান্তরিত করেছে। মার্কেস ব্রাউনলি, যিনি এমকেবিএইচডি নামে পরিচিত, টেক জার্নালিসমের মান এমনভাবে পুনর্নির্ধারণ করেছেন যে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এখন পণ্য উন্মোচনের আগে তার প্রতিক্রিয়া নিয়ে চিন্তিত থাকে। আলী আবদাল একজন চিকিৎসক থেকে প্রোডাক্টিভিটি-বিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা হয়ে এখন নিজের একটা সফটওয়্যার ও কোর্স ব্যবসা চালান। নাস ডেইলি এক মিনিটের ভ্রমণ-ভিডিও দিয়ে শুরু করে একটা পূর্ণাঙ্গ মিডিয়া ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রতিটা গল্পেই একটা সাধারণ প্যাটার্ন দেখা যায়, একক প্রতিভা প্রথমে দর্শক তৈরি করে, তারপর সেই দর্শকের বিশ্বাসকে একাধিক পণ্যে রূপান্তরিত করে, আর শেষ পর্যন্ত নিজের ব্যক্তি-পরিচয়ের চেয়ে বড় একটা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করায়।

          তবে প্রতিটা সাফল্যের গল্পের ছায়ায় থাকে ব্যর্থতার গল্পও। বহু নির্মাতা প্রথম বিনিয়োগেই ব্যর্থ হয়েছেন, কারণ তারা নিজেদের দর্শকের ওপর একটা পণ্য চাপিয়ে দিয়েছেন, যেটার সঙ্গে তাদের মূল কনটেন্টের কোনো স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল না। কেউ কেউ দ্রুত সম্প্রসারণ করতে গিয়ে নিজেদের মূল কনটেন্টের মান হারিয়েছেন, আর দর্শক সেটা টের পেয়েছে সঙ্গে সঙ্গে। ক্রিয়েটর অর্থনীতিতে বিশ্বাসই মূলধন, আর মূলধন একবার ক্ষয় হলে সেটা পুনরুদ্ধার করা কঠিন এবং প্রথাগত ব্যবসার চেয়ে অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ।

          বাংলাদেশের বাস্তবতা

            এখন প্রশ্নটা ফিরিয়ে আনা যাক ঢাকায়। বাংলাদেশে ইউটিউব আর ফেসবুক ইতিমধ্যে স্থানীয় নির্মাতাদের স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে, আর তরুণ প্রজন্মের একটা অংশ এখন সরকারি চাকরির স্বপ্নের বদলে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসাবে বেছে নিচ্ছে। কিন্তু সংখ্যার দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়ে যায়, বাংলাদেশ এখনও এই বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ, ভারত আর পাকিস্তানের মতো বাজারে গড় সিপিএম প্রায়ই দুই ডলারের নিচে, যেখানে জার্মানি বা যুক্তরাজ্যের মতো বাজারে এই সংখ্যা দশ থেকে বিশ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর মানে, একজন বাংলাদেশি নির্মাতাকে সমান আয়ের জন্য একজন জার্মান নির্মাতার তুলনায় প্রায় পাঁচ থেকে দশ গুণ বেশি ভিউ প্রয়োজন হয়।

            এই বৈষম্যের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বাংলাদেশে স্থানীয় বিজ্ঞাপন বাজার এখনও প্রথাগত টেলিভিশন আর সংবাদপত্রের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাজেট এখনও তুলনামূলক ছোট। পেমেন্ট ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, যেমন আন্তর্জাতিক লেনদেনে ব্যাংকিং জটিলতা, নির্মাতাদের গ্লোবাল ব্র্যান্ড ডিল বা সাবস্ক্রিপশন আয় গ্রহণ করতে কঠিন করে তোলে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ, যা যুক্তরাষ্ট্রে সৃজনশীল স্টার্টআপগুলোকে দ্রুত বাড়তে সাহায্য করেছে, বাংলাদেশে ক্রিয়েটর-কেন্দ্রিক ব্যবসার জন্য প্রায় অনুপস্থিত। কপিরাইট সুরক্ষার সিস্টেম দুর্বল, দক্ষ এডিটর আর অ্যানিমেটরের সংখ্যা সীমিত, যারা ইউটিউবকে আরো গভীর ভাবে বুঝে কন্টেন্ট দিবে।

            তুলনা করলে চিত্রটা আরও স্পষ্ট হয়। ভারতে বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের হিসাব অনুযায়ী প্রায় পঁচিশ লাখ ক্রিয়েটর এখন কোনো না কোনোভাবে অর্থ উপার্জন করছেন, আর তাদের প্রভাব ভোক্তা ব্যয়ে সাড়ে তিনশো থেকে চারশো বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ইউটিউবের সৃজনশীল বাস্তুতন্ত্র শুধু ভারতেই ষোলো হাজার কোটি রুপির বেশি জিডিপি অবদান রেখেছে আর নয় লাখ ত্রিশ হাজারেরও বেশি পূর্ণকালীন সমতুল্য চাকরি তৈরি করেছে। ভারতের সবচেয়ে বেশি আয় করা ক্রিয়েটররা বছরে দশ থেকে একশো কোটি রুপি পর্যন্ত আয় করেন, যেখানে প্ল্যাটফর্ম আয়, ব্র্যান্ড অংশীদারিত্ব, মার্চেন্ডাইজ আর ডিজিটাল পণ্য একসঙ্গে যোগ হয়। বাংলাদেশে এই ধরনের সংগঠিত তথ্য-উপাত্তই এখনও অনুপস্থিত, যা নিজেই একটা সমস্যার লক্ষণ, কারণ যে খাতের নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই, সে খাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও আসে না।

            তবে সমস্যার মধ্যেই সুযোগও লুকিয়ে আছে। বাংলাদেশের সতেরো কোটির বেশি জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান স্মার্টফোন ব্যবহার, আর তেরো কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী একটা বিশাল অন্তর্মুখী বাজার তৈরি করেছে, যেখানে বাংলা ভাষার কনটেন্টের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। যে নির্মাতা এই বিশাল স্থানীয় বাজারকে বৈশ্বিক মানের প্রযোজনা মূল্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবেন, তিনিই প্রথম সারিতে দাঁড়াবেন।

            একটা চ্যানেল কখন সত্যিকারের ব্যবসা হয়ে ওঠে

              সংখ্যায় ফিরে আসা যাক। একটা বাংলাদেশি চ্যানেল যদি মাসে পঞ্চাশ লাখ ভিউ পায়, আর গড় আরপিএম যদি হয় এক ডলারের কাছাকাছি, তাহলে শুধু বিজ্ঞাপন আয় দাঁড়ায় মাসে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার সমতুল্য, যা একজন ভিডিও এটির আর একজন কন্টেন্ট রাইটারের বেতনও পুরোপুরি ঢাকতে পারে না। কিন্তু একই চ্যানেল যদি একটা ব্র্যান্ড স্পনসরশিপ যোগ করে, যেখানে একটা ভিডিওর জন্য পঞ্চাশ থেকে দুই লাখ টাকা পাওয়া সম্ভব দর্শক সংখ্যা আর নিশের ওপর নির্ভর করে, তাহলে হিসাবটা সম্পূর্ণ বদলে যায়। এখানেই আসে বৈচিত্র্যের গুরুত্ব। বিজ্ঞাপন আয় অস্থির, প্রতি মাসে ওঠানামা করে অ্যালগরিদম আর মৌসুমের সঙ্গে। কিন্তু স্পনসরশিপ, ডিজিটাল পণ্য আর মেম্বারশিপ মিলিয়ে যদি একজন নির্মাতা তার মোট আয়ের অর্ধেকের বেশি অ-বিজ্ঞাপন উৎস থেকে আনতে পারেন, তবেই তার ব্যবসা একটা স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়।

              একটা প্রকৃত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে হলে খরচের সিস্টেমও বদলাতে হয়। একজন এককর্মী নির্মাতার মূল খরচ হয়তো ক্যামেরা আর সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশনে সীমাবদ্ধ। কিন্তু যখন একটা টিম যুক্ত হয়, পে-রোল দাঁড়ায় মাসের সবচেয়ে বড় খরচ হিসাবে। একটা স্টুডিও ভাড়া, সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ, আর বাংলাদেশে ডিজিটাল আয়ের ওপর কর ব্যবস্থাপনার জটিলতা যোগ হয় তার সঙ্গে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে একটা চ্যানেলকে সত্যিকারের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করতে যে ন্যূনতম স্কেল দরকার, বৈশ্বিক নিম্ন সিপিএমের কারণে সেই স্কেল পশ্চিমা বাজারের তুলনায় কয়েকগুণ বড় হতে হয়। এখানেই দেশের বহু প্রতিভাবান ক্রিয়েটর মাঝপথে আটকে যান, তাদের দর্শক আছে কিন্তু আয়ের পথ নেই যা একটা টিমকে টেকসইভাবে চালাতে পারে।

                সিলিকন ভ্যালির বিনিয়োগকারীরা এখন প্রায়ই একজন সফল নির্মাতাকে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে তুলনা করেন, আর তুলনাটা একদমই অহেতুক নয়। একজন নির্মাতার দর্শকই তার সম্পদ, ঠিক যেমন একটা স্টার্টআপের ব্যবহারকারী ভিত্তি তার সম্পদ। বিশ্বাসই তার মূলধন, কারণ একজন দর্শক যখন কোনো পণ্য কিনেন কেবল নির্মাতার সুপারিশে, সেটা বিনিয়োগকারীর অর্থের চেয়ে কোনো অংশে কম মূল্যবান নয়। মনোযোগ তার মুদ্রা, কারণ প্রতিটা ভিউ আসলে একটা লেনদেন, দর্শক তার সময় দিচ্ছেন বিনিময়ে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায়। কনটেন্ট তার পণ্য, কমিউনিটি তার পরিবেশন ব্যবস্থা, আর তার ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড আসলে তার মেধাস্বত্ব, যা কপি করা কঠিন। এই সিস্টেমটা বুঝলেই স্পষ্ট হয়ে যায়, কেন কিছু ক্রিয়েটর বছরের পর বছর ধরে ধৈর্য নিয়ে দর্শক গড়ে তোলেন, ঠিক যেমন একজন প্রতিষ্ঠাতা প্রথম কয়েক বছর লাভের কথা না ভেবে ব্যবহারকারী বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেন।

                ঝুঁকি এবং এআই যেভাকে খেলা বদলে দিচ্ছে

                  গত দুই বছরে যে পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি আলোচিত, সেটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রবেশ। এআই এখন ভিডিও এডিটিং, স্ক্রিপ্ট লেখা, থাম্বনেইল তৈরি করা, ডাবিং আর অনুবাদের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যাপক হারে। অ্যাডোবির এক জরিপ অনুযায়ী প্রায় ছিয়াশি শতাংশ ক্রিয়েটর এখন কোনো না কোনো রূপে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছেন তাদের দৈনন্দিন কাজে, বিশেষত পোস্ট প্রোডকশনের ক্ষেত্রে। এর ফলে প্রযোজনা খরচ নাটকীয়ভাবে কমে যাচ্ছে, একজন ক্রিয়েটর এখন একক ভাবে এমন কাজ করতে পারছেন, যেটার জন্য আগে একটা পূর্ণাঙ্গ টিম দরকার হতো।

                  কিন্তু এই প্রযুক্তির প্রভাব দ্বিমুখী। একদিকে এটা ছোট নির্মাতাদের জন্য প্রবেশপথ সহজ করে দিচ্ছে, বিশেষত বাংলাদেশের মতো বাজারে যেখানে পেশাদার এডিটর নিয়োগ করা এখনও ব্যয়বহুল। অন্যদিকে এটা প্রতিযোগিতার মান এতটাই উঁচু করে দিচ্ছে যে, শুধু ভালো প্রযোজনার মান দিয়ে আর নিজেকে আলাদা করা যাচ্ছে না। যখন সবাই একই এআই টুল ব্যবহার করে সমান মানের ভিডিও বানাতে পারবে, তখন প্রতিযোগিতার আসল ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াবে মৌলিকতা, ব্যক্তিগত কণ্ঠস্বর, আর দর্শকের সঙ্গে প্রকৃত সংযোগ, যা কোনো প্রযুক্তি অনুকরণ করতে পারে না।

                  এই মুহূর্তে, এই পুরো শিল্পের ভিত্তি একটা অস্বস্তিকর সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, প্রতিটা নির্মাতা আসলে একটা প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভরশীল, যেটা তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন না। একটা অ্যালগরিদম আপডেট, একটা নীতিমালা পরিবর্তন, কিংবা একটা ভুল বোঝাবুঝির কপিরাইট স্ট্রাইক রাতারাতি একটা আয়ের উৎস বন্ধ করে দিতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হয় মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্ন, কারণ ক্রমাগত ভিডিও প্রকাশের চাপ, মন্তব্যের নেতিবাচকতা, আর সবসময় ক্যামেরার সামনে থাকার মানসিক ক্লান্তি বহু নির্মাতাকেই পুড়িয়ে ফেলে। রাজনৈতিক চাপ, ভুল তথ্যের অভিযোগ, ব্র্যান্ড সুরক্ষার শঙ্কা, এসবও যোগ হয় ঝুঁকির তালিকায়। আর সবচেয়ে বড় কাঠামোগত ঝুঁকি হলো প্ল্যাটফর্ম একচেটিয়াত্ব, যেখানে ইউটিউব, টিকটক বা মেটার মতো কয়েকটা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেয় লাখো ক্রিয়েটরের ভাগ্য। এই কারণেই ক্রিয়েটর ব্যবসা, যত বড়ই হোক না কেন, প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের মতো স্থিতিশীল নয়, বরং প্রতিনিয়ত একটা অনিশ্চিত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নিজেকে পুনর্নির্মাণ করে যেতে হয়।

                  বাংলাদেশে ইউটিউবাররা কি কোটি টাকার ব্যবসা গড়তে পারবে?

                    এই প্রশ্নের উত্তর একবাক্যে দেওয়া কঠিন, কারণ এটা নির্ভর করে এমন কিছু পরিবর্তনের ওপর, যেগুলো একজন ক্রিয়েটরের একার হাতে নেই। বিজ্ঞাপন বাজারকে ডিজিটাল মাধ্যমের দিকে আরও দ্রুত সরে আসতে হবে। পেমেন্ট আর ব্যাংকিং সিস্টেম এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে একজন বাংলাদেশি ক্রিয়েটর বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড ডিল আর সাবস্ক্রিপশন আয় নির্বিঘ্নে গ্রহণ করতে পারেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের এই খাতে আস্থা রাখতে হবে, একজন নির্মাতাকে শুধু বিনোদনকারী নয়, একজন উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে হবে। তাই প্রশ্নটা আর এমন থাকে না যে, বাংলাদেশে ইউটিউবাররা কি কোটি টাকার ব্যবসা গড়তে পারবে?। প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়ায়, বাংলাদেশ কি সেই ব্যবসাকে বেড়ে উঠতে দেওয়ার মতো মাটি আর আবহাওয়া তৈরি করতে প্রস্তুত।

                    যদি এই পরিবর্তনগুলো ঘটে, তাহলে বাংলাদেশের বিশাল বাংলাভাষী দর্শক, যা শুধু দেশের ভেতরে নয় পশ্চিমবঙ্গ আর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাভাষীদের মধ্যেও বিস্তৃত, একটা প্রকৃত সুযোগ তৈরি করতে পারে। বাংলা কনটেন্টের প্রতিযোগিতা এখনও বৈশ্বিক ইংরেজি কনটেন্টের তুলনায় অনেক কম ঘনীভূত। যে নির্মাতা এই সুযোগটা প্রথম বুঝবেন, এবং তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক শৃঙ্খলা যোগ করবেন, তিনিই হয়তো বাংলাদেশের প্রথম কোটি টাকার ক্রিয়েটর প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি গড়বেন।


                    Picture of দ্য পাবলিশ

                    দ্য পাবলিশ

                    অনুসন্ধান, গল্প, প্রবন্ধ ও মুক্তচিন্তার স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম।
                    শেয়ার করুন

                    পড়তে পারেন

                    পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইটে লাখ লাখ হামলার চেষ্টা। ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

                    দ্য পাবলিশ নিউজরুম

                    প্যারিসের শহরতলির এক স্কুলের ফাঁকা পদ থেকে শুরু হয়ে এক মাসে সারা দেশ। এই আন্দোলনের মুখ কারা এবং কেন।

                    দ্য পাবলিশ

                    ভারতে বাড়ছে তরুণদের ক্ষোভ, রাস্তায় নামছেন বিরোধীরা। তবু বাংলাদেশের জুলাইয়ের সঙ্গে ভারতের আন্দোলনের দূরত্ব কতটা এবং কেন?

                    দ্য পাবলিশ

                    Scroll to Top