মোহাম্মদপুরের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে একসময় বসিলা নামে একটি গ্রাম ছিল। চারপাশে ছিল জলাভূমি। বর্ষায় সেই জলাভূমি বৃষ্টির পানিতে ভরে যেত। বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পনাহীন নির্মাণ আর জলাভূমি দখলের মধ্য দিয়ে এলাকাটি আজ ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে রূপ নিয়েছে।
২০১০ সালের ঢাকা মহানগর ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ডিএপি) বসিলার প্লাবনভূমিকে ফ্লাড-ফ্লো জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই জমি খোলা রাখার কথা ছিল, যাতে বর্ষার অতিরিক্ত পানি এখানে জমা হয়ে শহরকে জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের একটি গবেষণায় ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (জিআইএস), স্যাটেলাইট ইমেজ ও বাস্তব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ঢাকার চারপাশে নদীর পাড় ধরে ১৮ মাইল এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, ঢাকার সব নদীর মধ্যে বুড়িগঙ্গার তীরেই সবচেয়ে বেশি স্থাপনা উঠেছে, এবং এক যুগের কিছু বেশি সময়ে ঢাকার চারপাশে নদ-নদীর ২৫০ একরের বেশি জায়গা দখল হয়েছে। বসিলা ও কামরাঙ্গীরচরের কাছে বুড়িগঙ্গা একাই হারিয়েছে ৯৭ একর নদীবক্ষ! শহরের মোট ফ্লাড-ফ্লো জোনের প্রায় ৫৭ শতাংশ ইতিমধ্যে অপরিকল্পিত নির্মাণের দখলে চলে গেছে।
মোহাম্মদপুরের কাটাসুর খাল, হায়কারখাল ও বীরবীর খাল একসময় বৃষ্টির পানি বসিলার জলাভূমি হয়ে বুড়িগঙ্গায় নিয়ে যেত। এখন নদীর মতো এই খালগুলোও দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। প্রাকৃতিক এই নিষ্কাশনব্যবস্থা হারিয়ে যাওয়ায় মোহাম্মদপুরে ভারী বৃষ্টি হলেই এখন জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

আমিন-মওমিন হাউজিং, বসিলা হাউজিং, চন্দ্রিমা হাউজিং, একতা হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, মধু সিটি এবং আফসানা হাউজিংসহ আরও অনেক ডেভলাপার প্রতিষ্ঠান এসব দখল এর পিছনে থাকার অভিযোগ রয়েছে। এদের কয়েকটি এমন জমিও বিক্রি করেছে, যার মালিকানা তাদের ছিল না বলে, অভিযোগ উঠেছে।
২০০৪ সালের পর রাজধানী উন্নয়ন কমিশন (রাজউক) বসিলা এলাকায় নতুন কোনো বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়নি। তবু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন ছাড়াই নির্মাণ চালিয়ে গেছে। ২০১১ সালে আদালত এ ধরনের ৭৭টি প্রকল্পকে অবৈধ ঘোষণা করে। পরের বছরই রাজউক এর মধ্যে ছয়টিকে সাময়িক অনুমোদন দিয়ে দেয়। বসিলা ব্রিজ থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সুরক্ষামূলক ওয়াকওয়ে তৈরির একটি আদালত-নির্দেশিত প্রকল্পও নেওয়া হয়েছিল। ষোলো বছর পরও সেই কাজের অর্ধেকও শেষ হয়নি।
২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত হিসাবে, ২০১০ সাল থেকে সারা দেশে নদী থেকে ২৮ হাজার ৩২৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এতে ১ হাজার ২৪৪ একর নদীতীর উদ্ধার হয়েছে। এই তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BIWTA)। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছেন, স্বল্প মেয়াদের মধ্যেই সরকার ১৩টি নদীকে অবৈধ দখলমুক্ত করার জন্য বেছে নিয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবে কতটা কাজ হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন জেলায় নদীর তীর জরিপ করে সীমানা পিলার বসানো হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে দখল শনাক্ত করা সহজ হয়।
শুধু ঘোষণা বা পরিসংখ্যান দিয়ে নদী রক্ষা হয় না। সীমানা পিলার স্থায়ী না হলে, উচ্ছেদ অভিযান রাজনৈতিক চাপে থেমে গেলে, আজকের সংরক্ষিত নদীও একদিন বসিলার মতোই দখল হয়ে যেতে পারে।