মিরপুর ১ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে যখন রাত নামল, তখন কেউ জানত না যে সকালে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত আড়াইশোরও বেশি মানুষের একটি দল নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে কেন্দ্রটিতে ভাঙচুর চালায়, যাতে প্রায় দেড় কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস হয় এবং কেন্দ্রটির দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এই কেন্দ্রটি কোনো সাধারণ ভবন ছিল না। সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে এটি মিরপুরের দরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও শিশুদের টিকাদান সেবা দিয়ে আসছিল। হামলার পর মুখোশ পরা হামলাকারীরা লুটপাট শেষে পুরো স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেয়, আর তারপর ধ্বংসস্তূপের ওপর টাঙিয়ে দেওয়া হয় একটি দোকানদার সমিতির সাইনবোর্ড, দখলের ঘোষণা হিসেবে। কেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে আইনের পথে যাওয়া যেত। তিনি ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
পরদিন রাতে, শহরের অন্য প্রান্তে, প্রায় একই চিত্র ফিরে এল। ইসিবি চত্বরের নিউগ্রিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ঢুকে পড়ল একদল মানুষ। রাত সাড়ে দশটার দিকে শুরু হওয়া এই ভাঙচুর ও লুটপাট প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলে, আর হামলাকারীরা আশপাশের নির্মাণশ্রমিকদের কাছ থেকেও টাকা, মোবাইল ও জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। সালমান মুক্তাদির ফেসবুক লাইভে এসে জানান, সেখানে বিভিন্ন ক্লায়েন্টের অন্তত ত্রিশ থেকে চল্লিশটি চলমান প্রজেক্টের শুটিং ফুটেজ ও তথ্য নষ্ট বা খোয়া গেছে। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, “বিএনপির লোকজন যারা করছে, এটা তোমাদের চাঁদাবাজি”। পুলিশ জানিয়েছে, নিউগ্রিনি প্রপার্টিজ নিয়ে দুই পক্ষের জমি বিরোধ দীর্ঘদিনের। সেই বিরোধের সূত্র ধরেই অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পক্ষের লোকজন এলাকায় ঢুকে বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালায়, যার একটি অংশ ছিল মুক্তাদিরের স্টুডিও।
দুটি ঘটনার গল্প আলাদা, কিন্তু সিস্টেমএকই। জমি বা সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, রাতের অন্ধকারে সংঘবদ্ধ হামলা, দ্রুত দখল বা ধ্বংস।
একটা প্যাটার্ন
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি এখন ক্ষমতাসীন দল, আর ঠিক এই কারণেই দলটির নাম এখন সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে যাচ্ছে দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে। ১০ অগাস্ট ২০২৬-এ দ্য ডেইলি স্টার এর এক খবর মতে, মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় দলীয়ভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি-জোটের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে ৩২টি ঘটনায়, যা মোটের ৭৫ শতাংশ। জামায়াত-জোটের সম্পৃক্ততা ছিল ৪টি ঘটনায়, অর্থাৎ ৯ শতাংশ।
নির্বাচনের পর ১৭টি ঘটনায়, অর্থাৎ ৪১ শতাংশ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৬টি ঘটনায়, অর্থাৎ ৩৯ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। আরও আটটি ঘটনায় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা পর্যবেক্ষকেরা নিশ্চিত করতে পারেননি।
সংখ্যায় সংকট
এই সহিংসতাকে বিচ্ছিন্ন মনে হলেও পরিসংখ্যান অন্য কথা বলে। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসের হিসাবে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি, এই সতেরো মাসে সারা দেশে চারশো তেরোটি গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসের ঘটনায় অন্তত দুইশো ঊনষাট জন নিহত হয়েছেন। একই প্রতিবেদনে চৌদ্দশো এগারোটি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে, যার অর্ধেকই (৭০৪) ছিল বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, যাতে অন্তত একশো একুশ জন নিহত ও সাত হাজার একশো একত্রিশ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ, দলটির সবচেয়ে বড় সহিংসতার উৎস আসলে নিজেরই ভেতরে, ক্ষমতা ও দখলের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ।
এই প্রবণতা অবশ্য কোনো একটি দলের কীর্তি নয়, এটা দীর্ঘ সময়ের প্রতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ফসল। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল, এই দশ বছরে গণপিটুনির এক হাজার নয়টি ঘটনায় কমপক্ষে সাতশো বিরানব্বই জন নিহত ও সাতশো পঁয়ষট্টি জন আহত হয়েছেন, আর সংস্থাটি নিজেই বলেছে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথম বছরেই এই বক্ররেখা তীব্র হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালে গণপিটুনিতে নিহত হন একশো ছেচল্লিশ জন, যা আগের বছরের প্রায় তিন গুণ, যেখানে ২০২৩ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল একান্ন জন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম সাত মাসেই এই সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত একশো চৌদ্দটি গণপিটুনির ঘটনায়।
রাষ্ট্রের জবাব এবং কাঠামোর
প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র এর বিরুদ্ধে ঠিক কী করেছে। কথা কম হয়নি। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এসে, ঠিক এই দুই হামলার পরপরই, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সতর্ক করে বলেছে, দুর্নীতিবিরোধী নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সরকারি দল এখনই কার্যকর আত্মশুদ্ধিমূলক পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে দখলবাজি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হারাতে পারে, আর স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে কঠোরভাবে দমন করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কিশোরগঞ্জের জলমহাল দখল নিয়ে স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও রাজধানীতে সালমান মুক্তাদিরের ক্রিয়েটিভ স্টুডিও ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; ২০২৪ সালের আগস্টের পরের ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতা। সরকার এখনই কার্যকর আত্মশুদ্ধিমূলক পদক্ষেপ না নিলে দখলবাজি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এখানে একটা বিষয় নজরে রাখা দরকার, চব্বিশের পরের এলোমেলো জনরোষ আর সংগঠিত দখলবাজি, দুটোকে একই কাতারে ফেলাটাও বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
ভাঙচুর, দখল বা চাঁদাবাজির মতো ঘটনায় সাধারণত দণ্ডবিধি ও সম্পত্তি আইনের সাধারণ ধারাই প্রযোজ্য হয়, বিশেষ কোনো দ্রুত বিচার ব্যবস্থা এখনও নেই। ফল দাঁড়ায় এই যে, রাড্ডা সেন্টারের ঘটনায় যেমন থানার ওসিকে প্রত্যাহার করতে হয়েছে, তেমনি মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পরও প্রকৃত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও বিচার পর্যন্ত পৌঁছানো একটা দীর্ঘ, অনিশ্চিত পথ। আইন থাকা আর আইন প্রয়োগ হওয়া, বাংলাদেশে এই দুইয়ের মধ্যে দূরত্বটা আসল আরেকটা ইতিহাস।
এই দুই হামলার পর স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন উঠে আসে, বাঙালি কি সত্যিই শুধু ভাঙতেই জানে, গড়তে জানে না। প্রশ্নটা আবেগের জায়গা থেকে বোধগম্য, কিন্তু জাতিগত চরিত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করলে আসল দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়, কারণ প্রতিটি ভাঙচুরের পেছনে থাকে সুনির্দিষ্ট মানুষ, সুনির্দিষ্ট স্বার্থ, আর একটা রাষ্ট্রযন্ত্র যে হয় দেখেও দেখে না, নয়তো দেখার সামর্থ্যই রাখে না। ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিটি পর্বে বাংলাদেশে জমি, দোকান আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দখল বদল হয়, কারণ দখলটাই এখানে রাজনৈতিক ক্ষমতার সবচেয়ে দৃশ্যমান লভ্যাংশ। যতদিন থানা থেকে আদালত পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি অনুপস্থিত থাকবে, ততদিন যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তার পতাকার নিচে একই দৃশ্য ফিরে আসবে। মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা ইসিবি চত্বরের স্টুডিও তাই বিচ্ছিন্ন দুটি অপরাধ নয়, এগুলো একটা প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি, রাষ্ট্র কার সম্পত্তি রক্ষা করবে, আর কার বিরুদ্ধে নীরব থাকবে। ভাঙা হয়েছে অনেক কিছু, এবার আসলে দরকার একটাই জিনিস, একটা প্রতিষ্ঠান যেটা ভাঙে না, বরং জবাবদিহি করে।