স্বাভাবিকের স্বাভাবিক হওয়ারও একটা রাজনীতি আছে

ভাষা কীভাবে ক্ষমতাকে ‘সাধারণ বোধ’ বলে মনে করায়।

● দ্য পাবলিশ

অক্টোবর ১, ২০২৬

স্বাভাবিকের স্বাভাবিক হওয়ারও একটা রাজনীতি আছে | দ্য পাবলিশ The Publish

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ


“আমরা শ্রমজীবীদের পাশে আছি”, সমাজে এই কথাটি আপনি অবশ্যই শুনেছেন; ব্রিটিশ রাজনৈতিক আলোচনার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে এই বাক্য, নিউ লেবারের “ওয়ার্কিং ফ্যামিলিজ” শব্দভাণ্ডার থেকে শুরু করে পরবর্তীতে কনজারভেটিভদের পরিশ্রম পর্যন্ত। শুনতে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। ন্যায্য মনে হয়। বহু ক্ষেত্রেই স্বতঃসিদ্ধ মনে হয়। ঠিক এই স্বতঃসিদ্ধতার বোধটিই আন্তোনিও গ্রামশি তাঁর সারা কর্মজীবন ধরে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন।

আন্তোনিও গ্রামসি (১৮৯১–১৯৩৭) ছিলেন একজন ইতালীয় মার্ক্সবাদী দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ, যিনি তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন এবং ফ্যাসিবাদী বন্দিদশায় মারা যান। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত মুসোলিনির নির্দেশে কারাবন্দি থাকাকালীন তিনি তেত্রিশটি নোটবুকে রাজনৈতিক তত্ত্ব, ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এবং ভাষা নিয়ে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে ভরিয়ে তুলেছিলেন। নোটবুকগুলো থেকে নির্বাচিত অংশ তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয় এবং তখন থেকে এগুলো সমালোচনামূলক তত্ত্ব, সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন ও বক্তৃতা-বিশ্লেষণের ভিত্তিগ্রন্থ হয়ে উঠেছে। শাসক শ্রেণি কীভাবে নিরন্তর বলপ্রয়োগ ছাড়াই তার অবস্থান ধরে রাখে? তার এই কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি দেখতে সহজ, কিন্তু আসলে তা নয়। উত্তরটি হলো হেজিমনি বা আধিপত্য। আর আধিপত্য কাজ করে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, ভাষার মাধ্যমে।

আধিপত্য যা নয়

আধিপত্যকে প্রায়ই আধিপত্য বা মতাদর্শের সমার্থক শব্দে সংকুচিত করে ফেলা হয়। এতে গ্রামশি আসলে কী বলতে চেয়েছিলেন, তা হারিয়ে যায়। তাঁর কাছে আধিপত্য শুধু এক দলের ইচ্ছা অন্য দলের উপর চাপিয়ে দেওয়া নয়। বরং এটি সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি হয়ে ওঠে বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিই: সেই পটভূমি, যার বিপরীতে অন্য সব অবস্থানকে বিচার করা হয়। এই সিস্টেমটা সম্মতির মাধ্যমে কাজ করে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়। সংস্কৃতির মাধ্যমে কাজ করে, আইনের মাধ্যমে নয়; এবং সেই সব শ্রেণিবিভাগের মাধ্যমে কাজ করে যা দিয়ে আমরা জগৎকে বুঝি, কোনো একক যুক্তির বিষয়বস্তুর মাধ্যমে নয়।

গ্রামশি এই যুক্তি গড়ে তুলেছিলেন একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরাজয় থেকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিপ্লবী ঢেউ পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে ব্যর্থ হয়েছিল, অথচ ইতালিতে সফল হয়েছিল ফ্যাসিবাদ। সেই পরাজয়ের বিশ্লেষণই নোটবুকের প্রতিটি পাতায় ছায়া ফেলেছে। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল, উন্নত পুঁজিবাদী সমাজে রাজনৈতিক ক্ষমতা নিছক ছিনিয়ে নেওয়া যায় না। এর জন্য আগে প্রস্তুতি দরকার, এক দীর্ঘস্থায়ী “অবস্থানগত যুদ্ধ”-এর মাধ্যমে: নাগরিক সমাজে, স্কুলে, সংবাদপত্রে, পেশাজীবী সংগঠনে এবং রাজনৈতিক শব্দভাণ্ডারে ধীরে ধীরে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব তৈরি, রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নে পৌঁছানোরও আগে। আধিপত্য রাজনৈতিক ক্ষমতা জয়ের পুরস্কার নয়। আধিপত্যই সেই ক্ষমতা জয়ের পূর্বশর্ত।

গ্রামশি যে প্রক্রিয়াটি চিহ্নিত করেছিলেন তাকে তিনি বলেছেন “সাধারণ বোধ” (সেনসো কোমুনে), কিন্তু শব্দটির চেনা অর্থে নয়। রোজকার ব্যবহারে সাধারণ বোধ মানে ব্যবহারিক প্রজ্ঞা, স্বাভাবিক কাজ কোনটি তার বোধ। গ্রামশির বিশ্লেষণে এটি বোঝায় সেই সঞ্চিত, অপরীক্ষিত ধারণা ও শ্রেণিবিভাগের সমষ্টিকে, যা একটি সমাজের অধিকাংশ মানুষ কোনো প্রশ্ন না তুলেই ধারণ করে চলে। সাধারণ বোধ মতাদর্শে পরিপূর্ণ, কিন্তু তা যান্ত্রিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয় না। এটি সাধারণত সচেতন বা কেন্দ্রীভূতভাবে নকশা করা হয় না। বলা যেতে পারে, এটি “হার্ডওয়্যার্ড”, অর্থাৎ কাঠামোগতভাবে প্রোথিত। এটি গড়ে ওঠে সময়ের সঙ্গে, বছরের পর বছর ধরে প্রচলিত ধারণা, বারবার উচ্চারিত বাক্যাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাস, গণমাধ্যমের শ্রেণিবিভাগ ও রাজনৈতিক শব্দভাণ্ডারের চর্চার মধ্য দিয়ে। এগুলোই ঠিক করে দেয় একটি সমাজ কোনটিকে যুক্তিসঙ্গত, স্বাভাবিক বা স্বতঃসিদ্ধ বলে গণ্য করবে। তাই সাধারণ বোধ বা কমন সেন্স মিশ্র ও অসমান। এর কিছু অংশ প্রভাবশালী স্বার্থকে সমর্থন করে; কিছু অংশে প্রতিরোধেরও সূচনা লুকিয়ে থাকে।

মূল শব্দটি হলো “স্বাভাবিক”। কোনো রাজনৈতিক অবস্থান যখন সাধারণ বোধ বলে অনুভূত হয়, তখন তা বাস্তবতা সম্পর্কে একটি যুক্তি মনে না হয়ে বাস্তবতার বর্ণনা বলে মনে হয়। সেই স্বাভাবিকীকরণই আধিপত্যের সাফল্য।

সংগ্রামের ক্ষেত্র হিসেবে ভাষা

গ্রামশি ক্ষমতা নিয়ে লিখতে গিয়ে ভাষাকে রূপক অর্থে ব্যবহার করেননি। তিনি তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্তেও বার্তোলির অধীনে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাষাতত্ত্ব পড়েছিলেন, যিনি নিজে বিশেষজ্ঞ ছিলেন এই বিষয়ে যে কীভাবে ভাষার বিভিন্ন রূপ সামাজিক মর্যাদা অর্জন বা হারায়। বার্তোলি যুক্তি দিয়েছিলেন, ভাষাগত পরিবর্তন মূলত চালিত হয় অভ্যন্তরীণ ব্যাকরণগত বিবর্তনের চেয়ে বেশি সেই গোষ্ঠীগুলোর সামাজিক মর্যাদা দিয়ে, যারা নির্দিষ্ট ভাষারূপ ব্যবহার করে। গ্রামশি এই শিক্ষা আত্মস্থ করেছিলেন: ভাষা কখনোই একটি নিরপেক্ষ যন্ত্র না। এটি সবসময়ই সামাজিক সম্পর্কের দ্বারা গঠিত, এবং একই সঙ্গে সেই সম্পর্কগুলোকে পুনরুৎপাদনও করে।

এর মানে হলো, রাজনৈতিক তর্কের জন্য উপলব্ধ শব্দভাণ্ডার নিজেই একটি রাজনৈতিক অর্জন। কোনো তর্কের শর্তাবলি কে নিয়ন্ত্রণ করছে, তা আগে থেকেই ঠিক করে দেয় সেই তর্কের ভেতরে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।

ধরা যাক “পরিশ্রমী পরিবার” বাক্যাংশটি, যা ব্রিটিশ রাজনৈতিক আলোচনায় দীর্ঘকাল টিকে আছে। শুনতে অন্তর্ভুক্তিমূলক মনে হয়। বাস্তবে এটি কাজ করে বর্জনের মাধ্যমে। এই বাক্যাংশের তৈরি করা “যোগ্য” সামাজিক অভিনেতা সংজ্ঞায়িত হয় বেতনভুক্ত, প্রচলিত শ্রম এবং একটি পারিবারিক ইউনিটের সদস্যপদ দিয়ে। যারা এই শ্রেণিবিভাগের বাইরে, বেকার, প্রতিবন্ধী, একক প্রাপ্তবয়স্ক, অপ্রচলিত গৃহস্থালির মানুষ, তাদের এই বাক্যাংশ সম্বোধন করে না। তারা এর ভেতরে অনুপস্থিত থাকে। বাক্যাংশটি এই যুক্তি দেয় না যে এই গোষ্ঠীগুলো কম গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বিষয় নির্মাণ করে, যাতে তারা অন্তর্ভুক্ত নাই, এবং তারপর সেই নির্মাণকে “পরিশ্রমী মানুষ” আসলে কারা তার বর্ণনা হিসেবে উপস্থাপন করে।

গ্রামশি একে বলতেন হেজিমনিক চাল। বাক্যাংশটি একটি সামাজিক গোষ্ঠীর বর্ণনা দেয় না। এটি একটি গোষ্ঠী নির্মাণ করে, আর সেই নির্মাণটি আপাত-বর্ণনার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায়।

রাজস্ব নীতিতে গৃহস্থালির রূপক

অনুরূপ ভাবে “রাজস্ব দায়বদ্ধতা” বাক্যটিও বিশ্লেষণ করা দরকার। এই বাক্যটি সরকারি অর্থব্যবস্থাকে একটি গৃহস্থালির বাজেটের সঙ্গে তুলনা করে: একটি দায়িত্বশীল পরিবার যেমন তার সামর্থ্যের বাইরে খরচ করে না, তেমনি একটি দায়িত্বশীল সরকারেরও সামর্থ্যের বাইরে খরচ করা উচিত নয়। এই উপমাটি রাজনৈতিকভাবে কার্যকর, কারণ এটি বিতর্ক শুরু হওয়ার আগেই একটি নির্দিষ্ট ধারণাকে অগ্রাধিকার দেয়। এই কাঠামোর মধ্যে আত্মসংযম নীতির বিরোধিতা করা মানে সহজেই নিজেকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীনতার’ পক্ষে দাঁড় করানো। অর্থাৎ, যুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে বিতর্কের একটি বড় অংশ নির্ধারিত হয়ে যায়।

সরকারের বাজেট উদ্বৃত্ত হওয়া উচিত, নাকি ঘাটতি থাকা উচিত, সেটি একটি অর্থনৈতিক প্রশ্ন। এই নিবন্ধ সেই প্রশ্নে কোনো অবস্থান নিচ্ছে না। এখানে মূল প্রশ্নটি ভাষা নিয়ে: “রাজস্ব দায়বদ্ধতা” কথাটি কীভাবে অর্থনৈতিক বিতর্ক শুরু হওয়ার আগেই সেটিকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে?

বিষয়টি হলো, এই বাক্যাংশটি একটি নির্দিষ্ট অবস্থানকে, অর্থাৎ সরকারি অর্থব্যবস্থাকে গৃহস্থালির বাজেটের সঙ্গে তুলনা করার ধারণাকে এমনভাবে তুলে ধরে, যেন সেটিই একটি স্বাভাবিক ও নিরপেক্ষ মানদণ্ড। ফলে এই উপমাটি যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বহন করছে, তা আড়ালে থেকে যায়। এইভাবে কোনো নির্দিষ্ট ধারণা বা অবস্থানকে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘নিরপেক্ষ’ বলে প্রতিষ্ঠা করাই একটি গ্রামশিয়ান কৌশল।

অর্থাৎ, যে পক্ষ অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে কথা বলার জন্য ব্যবহৃত রূপক বা ভাষাটি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সে আসলে বিতর্কের মাটিটাও অনেকটা নিজের মতো করে তৈরি করে ফেলে। এরপর অন্য পক্ষগুলোকে সেই নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যেই নিজেদের যুক্তি তৈরি করতে হয়।

এটাই গ্রামশি বোঝাতে চেয়েছিলেন যখন তিনি বলেছিলেন, ভাষার লড়াইকে রাজনীতির লড়াই থেকে আলাদা করা যায় না।

গ্রামশি দুই ধরনের বুদ্ধিজীবীর মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন। “ঐতিহ্যবাহী বুদ্ধিজীবীরা” নিজেদের রাজনীতির ঊর্ধ্বে বলে মনে করেন। তাঁরা নিজেদের বিশেষজ্ঞ, স্বাধীন বিশ্লেষক বা প্রযুক্তিবিদ হিসেবে উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে, “জৈব বুদ্ধিজীবীরা” কোনো একটি সামাজিক শ্রেণির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকেন এবং সেই শ্রেণির বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। এটি সব সময় সচেতনভাবে বা কোনো পরিকল্পনা করে করা হয় না। বরং তাঁরা এমন একটি ধারণাগত কাঠামোর মধ্যে কাজ করেন, যেটিকে তাঁরা নিজেরাই কখনো প্রশ্ন করে দেখেননি। এই অর্থে, কোনো সাংবাদিক যখন “রাজস্ব দায়বদ্ধতা” কথাটিকে একটি নিরপেক্ষ ও স্বাভাবিক বর্ণনা হিসেবে ব্যবহার করেন, অথবা কোনো থিংক ট্যাংকের অর্থনীতিবিদ যখন সরকারি অর্থনীতিকে বোঝাতে গৃহস্থালির বাজেটের উপমাকে স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নেন, তখন তাঁরা হয়তো একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শিক ব্যবস্থার জৈব বুদ্ধিজীবী হিসেবেই কাজ করছেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁদের খারাপ উদ্দেশ্য আছে। গ্রামশি কাউকে খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করতে আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর আগ্রহ ছিল অন্য জায়গায়: কোন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে কিছু ধারণাকে আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়, আর কিছু ধারণাকে চরমপন্থী বা অস্বাভাবিক বলে মনে হয়?

এই কারণেই গ্রামশি সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিয়েছিলেন, যেগুলোর মাধ্যমে সমাজে ধারণা ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ছিল স্কুল, চার্চ, সংবাদপত্র এবং তাঁর সময়ে, রেডিওও (১৯৩০)। গ্রামশির কাছে এগুলো নিছক নিরপেক্ষ মাধ্যম ছিল না। এগুলোই ছিল “অবস্থানগত যুদ্ধ” বা war of position-এর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কারণ, যে পক্ষ প্রধান গণমাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে অনেকটাই প্রভাব ফেলতে পারে, রাজনৈতিক জীবনকে বোঝার জন্য মানুষের সামনে কোন ধরনের চিন্তার কাঠামো থাকবে এবং কোন ধরনের চিন্তা প্রান্তিক হয়ে থাকবে।

গ্রামশি এই বৃহত্তর লড়াইকে “জাতীয়-জনপ্রিয়” (national-popular) ধারণার জন্য সংগ্রাম হিসেবেও দেখেছিলেন। অর্থাৎ, কোন ধারণাগুলো একটি নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর স্বার্থ বা মতামত হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো সমাজের সাধারণ স্বার্থ ও সাধারণ বোধের অংশ বলে মানুষের কাছে মনে হবে, সেটি নিয়েও একটি লড়াই চলে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই নিবন্ধে যে ভাষাগত কৌশলগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো একা একা কাজ করে না। সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে যেভাবে বিভিন্নভাবে কাঠামোবদ্ধ করা হয়, অর্থনৈতিক রূপকগুলোকে যেভাবে স্বাভাবিক ও স্বতঃসিদ্ধ করে তোলা হয়, সেগুলোও বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এসব ধারণা তৈরি হয় এবং বারবার প্রতিষ্ঠিত হয় সেইসব প্রতিষ্ঠান ও মাধ্যমের মাধ্যমে, যেগুলো নিজেরাই রাজনৈতিক সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

অর্থাৎ, ভাষা, ধারণা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান আলাদা আলাদা বিষয় নয়। সমাজে কোন ধারণা স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হবে, আর কোন ধারণা অস্বাভাবিক বা চরমপন্থী বলে মনে হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সেই ধারণাগুলো কোন প্রতিষ্ঠান, কোন মাধ্যম এবং কোন সামাজিক শক্তির মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে তার ওপর।

একটি প্রয়োজনীয় সতর্কতা

আধিপত্য সর্বগ্রাসী নয়। গ্রামশির বিশ্লেষণকে কখনো কখনো এমনভাবে পড়া হয়েছে, যেন তিনি বলছেন প্রভাবশালী মতাদর্শ মানুষের চিন্তাভাবনার উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে। এই পাঠ অতিরিক্ত কঠোর। গ্রামশি নিজেই “সাধারণ বোধ” আর “শুভ বোধ” (বুওন সেনসো)-এর মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন: পরেরটি হলো সেই সমালোচনামূলক, প্রতিফলনশীল ক্ষমতা, যা সাধারণ চিন্তার ভেতরেই বিদ্যমান এবং যথাযথ পরিস্থিতিতে হেজিমনিক অনুমানগুলোকে চিনে নিয়ে প্রতিরোধ করতে পারে। প্রতিপাঠ, বিরুদ্ধ কাঠামো এবং ভাষার প্রতিরোধী ব্যবহার সবসময়ই সম্ভব।

একটি লেখা কী স্বাভাবিক করে তোলে, কী যুক্তির বদলে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করে, কোন অবস্থানগুলোকে উচ্চারণযোগ্য করে তোলে আর কোনগুলোকে অনুচ্চারণযোগ্য করে রাখে, এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞাসা করা মানেই গ্রামশিয়ান প্রশ্ন করা। এগুলো একই সঙ্গে ফলিত বক্তৃতা-বিশ্লেষণেরও ব্যবহারিক প্রশ্ন।

শব্দভাণ্ডার কেন গুরুত্বপূর্ণ

গ্রামশি মারা যান ১৯৩৭ সালে। তাই তিনি থ্যাচারবাদ, থার্ড ওয়ে বা এখনকার সময়ের রাজনীতির ভাষা সরাসরি দেখার সুযোগ পাননি। কিন্তু তাঁর চিন্তার কাঠামো ব্যবহার করে বোঝা যায়, এই ধরনের রাজনৈতিক ভাষা কীভাবে কাজ করেছে। যেমন, “কোনো বিকল্প নেই” কথাটি কীভাবে শুধু একটি যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি, বরং মানুষ কী নিয়ে ভাবতে পারবে, সেই সীমাটাই নির্ধারণ করেছে। একইভাবে, “বাজার” কীভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে না থেকে ধীরে ধীরে প্রকৃতির কোনো স্বাভাবিক শক্তির মতো মনে হতে শুরু করেছে। আবার “সংস্কার” শব্দটিও কীভাবে ধীরে ধীরে সাধারণ অর্থে পরিবর্তন বা উন্নতি বোঝানোর বদলে অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ব্যয় কমানো, সুযোগ-সুবিধা কমানো বা সামাজিক সুরক্ষা সংকুচিত করার অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে।

গ্রামশি আধিপত্য কীভাবে কাজ করে, তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট লেখা বা ধারণাকে দেখে আধিপত্য কীভাবে শনাক্ত করা যাবে, তার জন্য তিনি কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি দিয়ে যাননি। “সাধারণ বোধ” বা common sense আমাদের কাছে স্বাভাবিক ও স্বতঃসিদ্ধ মনে হয়। প্রভাবশালী শব্দ ও ভাষাগুলোও নিরপেক্ষ বলে মনে হয়। আর ক্ষমতাবানদের কিছু মৌলিক অনুমান এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, সেগুলো আর কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের ধারণা বলে মনে হয় না; বরং পৃথিবী সম্পর্কে সাধারণ সত্য বা স্বাভাবিক পর্যবেক্ষণ বলে মনে হয়।

তাহলে প্রশ্ন হলো, বাস্তবে এই প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করে? কে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে? কার কথা মানুষ গুরুত্ব দিয়ে শুনছে? আর কার দেওয়া কোনো সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যাই শেষ পর্যন্ত সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে টিকে থাকছে?

অর্থাৎ, ক্ষমতা শুধু কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোন শব্দ ব্যবহার করা হবে, কোন ধারণাকে স্বাভাবিক মনে হবে, কার ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে এবং কোন ব্যাখ্যা প্রান্তিক হয়ে যাবে, এসবের মধ্যেও ক্ষমতা কাজ করে, রাজনীতি করে। ◼

নোট: এই আর্টিকেলটি সাবসটেক-এ প্রকাশিত একটি লেখা থেকে অনূদিত।


Picture of দ্য পাবলিশ

দ্য পাবলিশ

অনুসন্ধান, গল্প, প্রবন্ধ ও মুক্তচিন্তার স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম।
শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইটে লাখ লাখ হামলার চেষ্টা। ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

প্যারিসের শহরতলির এক স্কুলের ফাঁকা পদ থেকে শুরু হয়ে এক মাসে সারা দেশ। এই আন্দোলনের মুখ কারা এবং কেন।

দ্য পাবলিশ

ভারতে বাড়ছে তরুণদের ক্ষোভ, রাস্তায় নামছেন বিরোধীরা। তবু বাংলাদেশের জুলাইয়ের সঙ্গে ভারতের আন্দোলনের দূরত্ব কতটা এবং কেন?

দ্য পাবলিশ

Scroll to Top