রাকসুর সাধরণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার রাজনীতিতে নিজেকে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্বতন্ত্র প্রতিনিধি হিসেবেই সামনে এনেছিলেন। রাকসু নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন “আধিপত্য বিরোধী” প্যানেলকে শিবিরের “ডামি প্যানেল” বলা হলে, তিনি তা অস্বীকার করেন এবং বলেন শিবিরের সাথে তাঁদের কোনো ধরণের সম্পৃক্ততা নেই। অথচ গত ৩০ সেপ্টেম্বর, শিবিরের সাংগঠনিক চিঠিতে আম্মারের শিবিরের “সাথী” পদে থাকার তথ্যটি প্রকাশিত হয় এবং নৈতিক পদস্খলন, নারীদের সঙ্গে অবাধ বিচরণ, অর্থের বিনিময়ে পদবাণিজ্য, মৌলিক ইবাদত পালনে উদাসীনতা, অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করার বিষয়টিও সামনে আসে।
প্রশ্নটি শুধু আম্মার ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, তা নয়। বরং প্রশ্নটি হলো তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল রেখে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে ম্যান্ডেট নেওয়া গণতন্ত্রের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? এবং ছাত্রশিবিরই বা কেন এমন গুপ্ত রাজনীতির পথ অবলম্বন করছে?
এক, ইতিহাসে গোপন রাজনৈতিক সংগঠন বা আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি নতুন কোনো ঘটনা নয়। যখন প্রকাশ্য রাজনীতির পথটি বন্ধ হয়ে যায় তখন সংগঠন টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায় গুপ্ত রাজনীতি। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী সরকার ন্যাশনাল কংগ্রেসকে নিষিদ্ধ করার পর তারাও গোপন সাংগঠনিক কাঠামোর আশ্রয় নিয়েছিলো। পোল্যান্ডে সামরিক শাসনের সময় সলিডারিটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর তাঁর সংগঠনও গোপনে কার্যক্রম চালিয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রাখা উচিত। জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ থেকে শুরু করে হামলা-নির্যাতন এবং ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের আধিপত্যের মধ্যে প্রকাশ্যে শিবিরের কার্যক্রম চালানো ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো। ২০২৪ সালের ১ আগস্ট আওয়ামী লীগ জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধও করেছিলো। ফলে সেই সময় গুপ্ত থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর একটি বাস্তব কারণ ছিলো।
তবে এখানেই শিবিরের কৌশল নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। চব্বিশ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ এসেছে যে, শিবির তাঁদের পরিচয় গোপন রেখে ছাত্রলীগের কাঠামোতে সক্রিয় ছিলো। যদিও শিবিরের নেতারা এসব অভিযোগকে বরাবরই প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাই সেই সময়ের রাজনৈতিক কৌশল মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ মনে হতে পারে, তবে সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকায় তাঁদের সেই দাবির ক্ষেত্রে সন্দেহের সুবিধা দেওয়া যায়।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর পরিস্থিতি একেবারে বদলে যায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২৮ অগাস্ট জামায়াত-শিবিরের উপরে থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। অর্থাৎ তাঁদের প্রকাশ্যে রাজনীতি করার পথে আর কোনো বাধা থাকলো না। ফলে ২৪ সালের পর শিবিরের গুপ্ত রাজনীতির কৌশলকে আগের যুক্তি দিয়ে আর ব্যাখ্যা করা যায় না।
এই জায়গাতেই রাকসু নির্বাচন এবং সালাউদ্দিন আম্মারের ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। ছাত্রশিবিরের সাথে তাঁর সংশ্লিষ্টতার তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর গুপ্ত রাজনীতির কৌশলটি নতুন প্রেক্ষাপটে বিচার করার সুযোগ হয়েছে। দমন-পীড়নের সময় যেই গোপনীয়তা সংগঠন টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হতে পারে, রাজনৈতিক পরিসর উন্মুক্ত হওয়ার পর, সেটিই যদি নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করার পদ্ধতি হয়ে উঠে, তবে তার যৌক্তিকতা আর আগের মতো থাকে না। তখন বিষয়টি শুধু সংগঠনকে টিকিয়ে রাখা নয় বরং ভোটারের জানার অধিকার এবং গণতন্ত্রের স্বচ্ছতার উপর প্রশ্ন তুলে।
দুই, গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত হচ্ছে ভোটারকে জানার সুযোগ দেওয়া। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক রবার্ট ডাল গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হিসেবে “অবহিত উপলব্ধির” কথা বলেছেন। অর্থাৎ নাগরিকের সমান সুযোগ থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট বিকল্প নীতি এবং সেগুলার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে জানার ও বোঝার। এ ধারণাটি আম্মারের ঘটনাটি বোঝার জন্য জরুরি। একজন ভোটার কাকে ভোট দিবেন সেটা সম্পূর্ণ তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তবে ভোট দেওয়ার পূর্বে প্রার্থী সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য জানারও সুযোগ থাকতে হয়। একজন প্রার্থীর ব্যক্তিগত পছন্দ, রাজনৈতিক আদর্শ কিংবা সাংগঠনিক সম্পর্ক তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বা সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত বোঝার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক। এসব তথ্য যদি ভোটারের কাছে গোপন থাকে তাহলে ভোটারের জন্য তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
সালাউদ্দিন আম্মারের ঘটনা এই সমস্যাটিকে স্পষ্ট করে। রাকসু নির্বাচনের সময় তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি বড় অংশ তৈরি হয়েছিলো একজন সাধারণ শিক্ষার্থী, জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। কিন্তু শিবিরের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য শিক্ষার্থীদের সামনে ছিলো না। সাংগঠনিক পরিচয় অনেক ভোটার কাছে তাঁদের সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়ার মতো তথ্য। একজন ভোটার যদি জানতেন যে আম্মারের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পর্ক রয়েছে, তাহলে হয়তো তিনি তাকে একই ভাবে মূল্যায়ন করতেন না। তাঁর কাছে বাকিসব পরিচয়ের থেকে সংগঠনটির সঙ্গে সম্পর্ক বেশি অর্থবহ হতে পারতো। ভোটাররা হয়তো তাঁকে তবুও ভোট দিতেন, তবে তা হতো তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত।
এখানেই শিবিরের গুপ্ত রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়। একটি সংগঠন যদি নিজের নামে নির্বাচন করে তাহলে ভোটার জানেন তিনি কোন রাজনৈতিক আদর্শকে সমর্থন করছেন। কিন্তু সংগঠনটির সাথে সম্পর্কিত একজন ব্যক্তিকে যদি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো হয়, যেখানে সেই সম্পর্কটি দৃশ্যমান নয়, তাহলে সংগঠনটি ভোটারের রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে থেকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়। ভোটার তখন তাঁকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিচার করছেন অথচ তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভোটারের কাছে অদৃশ্যমান। এতে প্রার্থী যেই ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসেন , সেই ম্যান্ডেটের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠে।
এই জায়গাতেই গুপ্ত রাজনীতি, শুধু রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে থাকে না বরং ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণার প্রশ্নটিও সামনে আসে। শিবিরের ক্ষেত্রে সমালোচনাটি আরো স্পষ্ট। প্রকাশ্য পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে সংগঠনটি তার আদর্শ, অতীতের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে ভোটারের বিচারের মুখোমুখি হয়। কিন্তু সাংগঠনিক সম্পর্ক অস্পষ্ট থাকলে সরাসরি সেই দায় তৈরি হয় না। প্রার্থী নিজের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে ম্যান্ডেট দাবি করতে পারেন, তবে নির্বাচিত হওয়ার পর সংগঠনটি প্রয়োজন অনুযায়ী সেই ম্যান্ডেটকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থেও ব্যবহার করতে পারেন। অর্থাৎ, গুপ্ত রাজনীতির সুবিধা নির্বাচনের দিন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না, ভবিষ্যতে সেই প্রার্থীকে সংগঠনের বৃহত্তর স্বার্থে কাজে লাগানোর সুযোগও তৈরি হয়। এটিই গুপ্ত রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক সমস্যা।
তিন, গণতন্ত্রে, নির্বাচনের পর মুখ্য প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতার উৎস কোথায় এবং তার দায় কার উপর। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির বিভিন্ন সিদ্ধান্তের পিছনে যদি কোনো সংগঠনের প্রভাব থাকে, যা ভোটারের কাছে পরিষ্কার নয় তাহলে দায়িত্বের সীমারেখাটিও ধোঁয়াশাপূর্ণ হয়ে যায়। তখন সাধারণ ভোটারের ক্ষেত্রে বোঝা কঠিন হয়ে যায় যে কোনটি ব্যক্তির নিজস্ব সিদ্ধান্ত, কোনটি সংগঠনের সিদ্ধান্ত। এর ফলে নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে একটি সংগঠন, প্রকাশ্য পরিচয় ছাড়াই সংগঠনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়ে যায়। এতে ক্ষমতার উৎস চিহ্নিত করা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য দায় নির্ধারণ করা এবং প্রতিনিধির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
যেহেতু, শিবির নিজেরদেরকে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল হিসাবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাই ইসলামের দৃষ্টি থেকেও বিষয়টি বোঝা জরুরি। ইসলামে সততা, স্বচ্ছতা ও আমানত রক্ষার উপর বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে সত্য গোপন করতে এবং সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে বিভ্রান্ত তৈরি করতে নিষেধ করা হয়েছে (সূরা বাকারা: ২;৪২)।
রাসূল (সা) বলেছেন, “যে প্রতারণা করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়” (সহীহ মুসলিম)। প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্ব একধরনের আমানত, তাই ইসলামিক আদর্শের দাবিদার কোনো সংগঠনের কাছ থেকে জনগণ আরো স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করে। পরিচয় গোপন রেখে ম্যান্ডেট নেওয়া সেই নৈতিক মানদণ্ডের সাথে সাংঘর্ষিক।
আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের গোপন রাজনৈতিক একটি সংগঠনের রাজনৈতিক আচরণকেও বদলে দিতে পারে, যেমনটি হয়েছিলো মিশরের ব্রাদারহুড দলের সঙ্গে। গামাল আবদেলের শাসনামলে দমন-পীড়নের কারণে সংগঠিনটি দীর্ঘ সময় গোপন কাঠামোর মাধ্যমে রাজনীতিতে টিকে ছিলো। সেই সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব সাইয়্যিদ কুতুব কারাগারে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাকে আরো কঠোর রূপ দেন, যার ফলে পরবর্তীতে সেই লেখাগুলা কিছু বিচ্ছিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠী তৈরি করেছিলো। গুপ্ত রাজনীতি কর্মীদের মধ্যে “আমরা বনাম তারা” এই মানসিকতা আনতে পারে, যেখানে মানুষ রাষ্ট্রকে শত্রু ভাবতে শুরু করে এবং উগ্রপন্থার দিকে ধাবিত হয়। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের গুপ্ত রাজনীতি শুধু সাংগঠনিক কাঠামো নয়, একটি আলাদা রাজনৈতিক মনস্তত্বও তৈরি করতে পারে।
শিবিরের রাজনৈতিক পরিচয়, তাদের গুপ্ত রাজনীতি বা আম্মারের সাথে তাদের সম্পর্ক এগুলা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, গণতন্ত্র রাজনৈতিক আদর্শ কতটা প্রকাশ্য, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং কতটা স্বচ্ছতার সাথে জনগণের কাছে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরে। এই ধরণের রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে আস্থার জায়গায়। ভবিষ্যতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, সত্যিই স্বতন্ত্র কি না, কিংবা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত কি না এই ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন। একই সময়ে অন্য রাজনৈতিক সংগঠনগুলা শিবিরবিরোধী প্রচারণা ও আক্রমণে আরো প্রবল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। গুপ্ত রাজনীতি হয়তো সাময়িকভাবে একটি সংগঠনকে কিছু সুবিধা দিতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই কৌশলের সবচেয়ে বড় মূল্য হতে পারে মানুষের ভরসা হারানো। ◼