সিলিকন ভ্যালির রূপসী নারীর উত্থান, প্রতারণা ও পতন

কারাগারে যাওয়ার আগে এলিজাবেথ হোমসের জীবনে ঢুকে পড়ে এক কমেডিয়ানের ক্যামেরা।

● দ্য পাবলিশ নিউজরুম

অক্টোবর ৪, ২০২৬

সিলিকন ভ্যালির রূপসী নারীর উত্থান, প্রতারণা ও পতন | দ্য পাবলিশ The Publish

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ / সূত্র: এটুয়েন্টিফোর


সান ডিয়েগোর একটি ভাড়া বাড়িতে তখন একটাই হিসাব চলছে, চৌত্রিশ। দিনগুলা ফুরালে টেক্সাসের কারাগারে যেতে হবে এক নারীকে। তিনি জানেন, তার পরিবারও জানে। বাড়িতে আরও কয়েকজন আছেন, যারা পরিবারের কেউ নন। তাদের হাতে ক্যামেরা, আর তাদের ডেকে এনেছেন এই নারী নিজেই। ছবির নাম তাই যেন নিমন্ত্রণপত্রের একটি লাইন, ইউ ক্যান সি এভরিথিং (You Can See Everything)। তবে সবকিছু দেখতে পাওয়া আর সবকিছু বুঝতে পারা যে এক জিনিস নয়, সেটা বুঝতে তখনও কিছুটা সময় বাকি।

এই নারীর নাম এলিজাবেথ হোমস। স্ট্যানফোর্ডের পড়া ছেড়ে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি দাঁড় করান থেরানোস (Theranos)। তার প্রতিশ্রুতি ছিল সহজ, আর সেই কারণেই মোহনীয়: আঙুলের ডগা থেকে এক ফোঁটা রক্ত, তাতেই অনেক রকম পরীক্ষা। সরকারি আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীদের তিনি ঠিক এ কথাই বুঝিয়েছিলেন। তরুণী, আত্মবিশ্বাসী, কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা যে শুনলে মনে হতো, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ বুঝি তার পকেটেই আছে।

টাকা এল হু হু করে। ২০১৪ সালে কোম্পানির মূল্য ৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়, ফোর্বসের হিসাবে হোমসের নিজের সম্পদ দাঁড়ায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলারে। কাগজে-কলমে অন্তত, তিনি তখন বিলিয়নেয়ার। তারপর, ২০১৫ সালের অক্টোবরে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের অনুসন্ধানে উঠে এল, থেরানোস তার নিজের প্রযুক্তি দিয়ে করছে হাতে গোনা কয়েকটি পরীক্ষা, আর কর্মীদেরই সন্দেহ ছিল ফলাফলের নির্ভুলতা নিয়ে। কোম্পানি ২০১৮ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

আদালতের হিসাবটা ছিল এ রকম। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে জুরি ১১টি অভিযোগের চারটিতে তাকে দোষী ঠেকান, সবই বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা। রোগীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগগুলা থেকে তিনি পান খালাস। হোমস নিজে সাক্ষ্যে বলেছিলেন, কাউকে ঠকানোর ইচ্ছা তার ছিল না। সাজা হয় ১১ বছর ৩ মাস। তার সাবেক সঙ্গী ও থেরানোসের প্রেসিডেন্ট রমেশ “সানি” বালওয়ানি পান ১৫৫ মাস, অর্থাৎ প্রায় ১৩ বছর। হোমস আপিলের অপেক্ষায় বাইরে থাকার আবেদন করেছিলেন। দুবার। ফলে হাজিরার তারিখ ২৭ এপ্রিল থেকে পিছিয়ে দাঁড়ায় ২০২৩ সালের ৩০ মে। সেদিন তিনি টেক্সাসের ব্রায়ানের কারাগারে ঢোকেন। পেছন দিকে চৌত্রিশ দিন গুনলে পাওয়া যায় এপ্রিলের শেষ ভাগ। ঠিক তখনই ওই বাড়িতে ঢুকে পড়ে ক্যামেরা।

সঙ্গী বিলি ইভান্স ও তাঁদের দুই সন্তানের সঙ্গে এলিজাবেথ হোমস।
ছবিতে, সঙ্গী বিলি ইভান্স ও তাঁদের দুই সন্তানের সঙ্গে এলিজাবেথ হোমস। ছবি: ফিলিপ চিউং/দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

ক্যামেরার পেছনে যারা আছে তাদের একজন নাথান ফিল্ডার, নাথান ফর ইউ-এর সেই ভাবলেশহীন কমেডিয়ান। আর তার সঙ্গে ল্যান্স ওপেনহেইম, ডকুমেন্টারি নির্মাতা, যার আগের উল্লেখযোগ্য কাজ ফ্লোরিডার প্রবীণদের শহর নিয়ে সাম কাইন্ড অব হেভেন। শুরুটা হয়েছিল এক বন্ধুর বন্ধুর মুখে শোনা একটা খবর থেকে: হোমস নাকি এমন কাউকে খুঁজছেন, যিনি তার জীবনটা নথিবদ্ধ করবেন।

থেরানোসকে নিয়ে ছবি আর সিরিজের অভাব ছিল না। দ্য ইনভেন্টর, ভ্যালি অব হাইপ, হুলুর দ্য ড্রপআউট। কিন্তু এর কোনোটিতেই হোমস অংশ নেননি। এবার তিনি নিজেই দরজা খুলে দিলেন। পরিকল্পনা ছিল, ফিল্ডার থাকবেন ক্যামেরার আড়ালে, ওপেনহেইমের পাশে। হলো না। হোমস ও তার সঙ্গী বিলি ইভান্সের সঙ্গে কথাবার্তা এতটাই অদ্ভুত আর অস্বস্তিকর হয়ে উঠল যে ফিল্ডারকে শেষ পর্যন্ত ছবির কেন্দ্রেই আসতে হলো। ফলে এক ঘরে তিনি একসঙ্গে সাংবাদিক, দর্শক আর গল্পের অংশ। ছবির কথোপকথনগুলা দীর্ঘ, ক্যামেরা মুখের এত কাছে যে নিশ্বাসও প্রায় শোনা যায়। দৃশ্য টেনে রাখাকে সমালোচকেরা ফিল্ডারের বিশেষত্ব বলেছেন। কৌশলটা এই: প্রশ্ন করে চুপ করে থাকো, অন্যজন নিজেই ঘরের নীরবতা ভরাতে গিয়ে বেফাঁস কিছু বলে ফেলবে।

টিজারে সেই টানাপোড়েনের একটুখানি দেখা যায়। হোমস সোজা ফিল্ডারের চোখে তাকিয়ে বলেন, “আপনাকে ঠকানোর মতো কিছু আমার নেই।” ফিল্ডার জিজ্ঞেস করেন, এখন কি তিনি সত্যিই আসল মানুষটি? উত্তর আসে, “আমি সবসময়ই খাঁটি।”

ছবিটি প্রথম দেখানো হয় টেলুরাইডে, গোপন প্রদর্শনীতে কোনো ঘোষণা ছাড়া। পরের প্রশ্নোত্তর পর্বে ফিল্ডার মঞ্চে উঠে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেন, ঠিক কী দেখলেন, আজও তিনি বুঝে উঠতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিতর্কও জমেছে। ফিল্ডারের ভাষ্য, শেষ দিকে ইভান্স প্রক্রিয়াটির ওপর অনেক নিয়ন্ত্রণ খাটাতে চাইছিলেন, আর দুজনই তখনো ছবিটি দেখেননি। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বলছে, ছবিতে হোমসের বক্তব্য যেভাবে উদ্ধৃত হয়েছে, তা নিয়ে তাদের আপত্তি আছে। 

ছবির গুরুত্ব এখানেই। থেরানোসের পুরোনো গল্প সে আবার বলছে না। সে দেখাচ্ছে, সেই গল্পের কেন্দ্রের মানুষটিকে তার নিজের ঘরে, নিজের সংসারের ভেতর কীভাবে দেখা যায়। আর সঙ্গে আসে বড় প্রশ্নটা: ক্যামেরা কি সত্য ধরে, নাকি ক্যামেরা সামনে থাকলেই মানুষ নিজের একটা নতুন সংস্করণ বানিয়ে ফেলে?
ছবিটি যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ অক্টোবর সীমিত পরিসরে মুক্তি পাচ্ছে, ২৩ অক্টোবর থেকে আরও বিস্তৃত পরিসরে। বাঁক আর চমকগুলা এখানে বলা হলো না, সেটা দর্শকের জন্য থাক। শুধু একটা কথা থেকে যায়। যে মানুষ নিজের গল্প বারবার বলে, তার সত্য আর তার তৈরি গল্পের সীমানা কোথায়, তা হয়তো সে নিজেও আর জানে না। ◼


Picture of দ্য পাবলিশ নিউজরুম

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইটে লাখ লাখ হামলার চেষ্টা। ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

প্যারিসের শহরতলির এক স্কুলের ফাঁকা পদ থেকে শুরু হয়ে এক মাসে সারা দেশ। এই আন্দোলনের মুখ কারা এবং কেন।

দ্য পাবলিশ

ভারতে বাড়ছে তরুণদের ক্ষোভ, রাস্তায় নামছেন বিরোধীরা। তবু বাংলাদেশের জুলাইয়ের সঙ্গে ভারতের আন্দোলনের দূরত্ব কতটা এবং কেন?

দ্য পাবলিশ

Scroll to Top