সত্যের নির্মাণ ও গল্পের রাজনীতি

গল্পের মধ্য দিয়েই মানুষ নিজেকে, সমাজকে, এমনকি রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে বুঝতে চায়।

● খান মোহাম্মদ আহাদ

অক্টোবর ৭, ২০২৬

সত্যের নির্মাণ ও গল্পের রাজনীতি | দ্য পাবলিশ The Publish

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ


মানুষ স্বভাবতই গল্পকথক; দর্শনের ভাষায় Homo Narrans। গল্পের মধ্য দিয়েই মানুষ নিজেকে, সমাজকে, এমনকি রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে বুঝতে চায়। ইতিহাসের গতিপথ বা আমাদের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ অনেক সময় এতটাই দ্রুত ও জটিল হয়, আমজনতার কাছে বিচ্ছিন্ন ও পরাবাস্তব মনে হতে পারে। এই জটিল বাস্তবতাকে আত্মস্থ করতেই মানুষ ঘটনার নানান গল্প তৈরি করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বলা যত সহজ, নিরেট সত্যকে কোনো গল্প বা বয়ানের খাঁচায় পুরতে গিয়ে তার হুবহু রূপ ধরে রাখা কি আদৌ সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে সত্য সম্পর্কে মানুষের ধারণার বিবর্তনের মধ্যে। একটা সময় পর্যন্ত ভাবা হত সত্য কেবলই এক নিরেট পরিবর্তনহীন বস্তু। কিন্তু দর্শনের বিবর্তনে আমরা বুঝেছি, মানুষের সত্য বোঝার কারবারের পেছনে কাজ করে হরেক রকমের মনের কারবার ও সামাজিক মেলামেশা। Cognitive bias এবং Social constructivism এর

ধারণাগুলা আমাদের শেখায়, সত্য স্রেফ কোনো বস্তুগত তথ্য নয়, বরঞ্চ কীভাবে তথ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে তার ওপরও মানুষের সত্য-ধারণা নির্ভর করে। অতীতে সত্য কোনো আলাদা একাডেমিক ক্যাচাল বা ডিসকোর্সের বিষয় ছিল না; পৌরাণিক কল্পকাহিনী বা জীবন্ত মিথও মানুষের কাছে চরম সত্য হিসেবে গণ্য হতো। মিথোলজি থেকে খালাস পেয়ে যুক্তি, কার্যকারণ, ধারণা ও খোলামেলা ক্যাচাল বা আলোচনার মধ্য দিয়ে যখন চিন্তার বিকাশ ঘটল, তখনই শুরু হলো গ্রিক ও আধুনিক দর্শনের যাত্রা।

চিন্তার এই বিকাশে মানুষের বিচার-বিবেচনা আর আলাপের আসল মাধ্যম হয়ে ওঠে খাপে-খাপ যুক্তি বা ‘ভাল কারণ’। স্থান-কাল-পাত্র এবং যোগাযোগের ধারার বিচারে এই যুক্তির ধরণ আলাদা হতে পারে, আর সেই আলাদা রূপ গড়ে উঠে একাধিক গল্প বা ন্যারেটিভের উপর ভিত্তি করে। কারণ, স্রেফ বিচ্ছিন্ন কিছু ডেটা, তথ্য বা ইভেন্ট মানুষকে আলোড়িত করতে পারে না; ওগুলোকে অর্থপূর্ণ করতে গল্পের ফ্রেমে সাজাতেই হয়।

তত্ত্বের এই গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাকালেও আমরা গল্পের প্রয়োজনীয়তা দেখতে পাই। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের কথাই ধরা যাক। ‘অভ্যুত্থান’ শব্দের আগে ‘গণ’ উপসর্গটি জোড়া দেয়া হয়েছে ঘটনার ঐতিহাসিক স্বকীয়তা ও জনসম্পৃক্ততার স্বকৃতি স্বাক্ষর হিসেবে। যেকোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যৌথ মনস্তাত্ত্বিক তাগিদ তৈরি হয়— ভিলেন এবং হিরো চিহ্নিত করার। এই অভ্যুত্থানে ভিলেন বা পতন হওয়া শক্তি স্পষ্ট, কিন্তু ঘটনার সাফল্যকে ব্যাখ্যা করতে এখন তৈরি করা হচ্ছে নানা ‘হিরোইজম’ বা বীরত্বের গল্প। ঐতিহাসিক সত্যে বা যৌথ স্মৃতিতে এই গল্প নিরেট সত্যের উপর দাঁড়াতে পারে, আবার কোনো কৃত্রিম বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্মিত গল্পও হতে পারে।

এইখানেই সাহিত্যিক বাস্তবতা আর রাজনৈতিক ন্যারেটিভের দোস্তি-দুশমনিটা বোঝা দরকার। সাহিত্যিক বাস্তবতা কোনো নিরেট বা অবজেক্টিভ তথ্য না, বরঞ্চ কোনো ঘটনাকে পাঠকের কাছে সত্য আর বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার শৈল্পিক ফন্দি। যেমন— ঢাকাই চলচ্চিত্রে আমরা প্রায়ই দেখি কৃত্রিম কাহিনী, যার সাথে জনজীবনের সত্যের আসমান-জমিন ফারাক। উল্টাদিকে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে পাওয়া যায় সামাজিক প্রেক্ষাপটের আসল কেচ্ছা। এই কেচ্ছা সত্য না, সামাজিক চিত্রের শৈল্পিক রূপ।

রাজনৈতিক টেক্সট বা ঐতিহাসিক বয়ানকেও এই কৃত্রিম গল্প আর আসল সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। রাজনৈতিক বয়ানকে অনেকেই সাহিত্যিক বাস্তবতা দিয়া মাপতে চায়। এতো সহজ দোস্তি বয়ান আর সাহিত্যের? বয়ানে যখন কল্পনা প্রকট রূপ নিয়ে ধরা দেয়, তখন সাহিত্য‌ও দুশমনি শুরু করে দেয়।

সাহিত্য যেখানে সত্যকে শৈল্পিক রূপে আবির্ভূত করে, রাজনৈতিক বয়ান সেখানে প্রায়ই ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি করে। ক্ষমতা ও রাজনৈতিক ডিসকোর্সের ক্ষেত্রে একটি কথা প্রচলিত আছে; ইতিহাস সবসময় বিজয়ীদের দ্বারা বা কোনো বিশেষ পক্ষকে মহিমান্বিত করার জন্য লেখা হয়। গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে যত বেশি গল্প বা ন্যারেটিভ প্রচলিত হবে, মানুষ তত নানান দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাকে জানতে পারবে। তবে গল্পের পেছনে রাজনৈতিক বা আদর্শিক অবস্থান থাকা স্বাভাবিক হলেও, গল্পের সাহিত্যিক বা ঐতিহাসিক বাস্তবতা তৈরি হতে হয় নিরেট কিছু ঐতিহাসিক সত্যের উপর ভিত্তি করে।

আজকের পোস্ট-ট্রুথ বা সত্যোত্তর যুগে প্রোপাগান্ডা দিয়ে সাময়িকভাবে কৃত্রিম হিরোইজম বা ন্যারেটিভ খাড়া করা সহজ। কিন্তু যেসব গল্প নিরেট সত্য ও জনমানুষের প্রকৃত অভিজ্ঞতার উপর দাঁড়িয়ে থাকে না, সময়ের বিচারে তা টেকসই হয় না। গণ-অভ্যুত্থানের গল্পকে দীর্ঘস্থায়ী ও অর্থপূর্ণ করতে হলে কৃত্রিম বয়ান নির্মাণের প্রলোভন এড়িয়ে, ফ্যাকচুয়াল ট্রুথ বা ঐতিহাসিক সত্যের ওপর ভিত্তি করেই গল্প নির্মাণ বা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ◼

বি. দ্র. W. R. Fisher-এর Human Communication as Narration: Toward a Philosophy of Reason, Value, and Action গ্রন্থের ভাবনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখাটি রচিত।


Picture of খান মোহাম্মদ আহাদ

খান মোহাম্মদ আহাদ

খান মোহাম্মদ আহাদ, পেশায় প্রোগ্রামার ও অ্যাক্টিভিস্ট

শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইটে লাখ লাখ হামলার চেষ্টা। ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

প্যারিসের শহরতলির এক স্কুলের ফাঁকা পদ থেকে শুরু হয়ে এক মাসে সারা দেশ। এই আন্দোলনের মুখ কারা এবং কেন।

দ্য পাবলিশ

ভারতে বাড়ছে তরুণদের ক্ষোভ, রাস্তায় নামছেন বিরোধীরা। তবু বাংলাদেশের জুলাইয়ের সঙ্গে ভারতের আন্দোলনের দূরত্ব কতটা এবং কেন?

দ্য পাবলিশ

Scroll to Top