“আরে, আমি তো ডাকাতের বংশধর” – রাগ সম্রাট উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এক মজমায় রবি শংকর সহ অনেককেই নিজের পরিচয় দিতে যেয়ে এ কথা বলেছিলেন। যে ডাকাতের কথা তিনি বুঝিয়েছিলেন, সে আবার যেন তেন ডাকাত নন। ভবানী পাঠক-ই হলেন সে ডাকাত। ভবানী পাঠক ছিলেন ১৮শ শতকের বাংলার একজন ঐতিহাসিক ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র নেতা, যিনি সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আলাউদ্দীন খাঁ এমনই সাবলীলভাবে অকপটে অনেক কঠিন কথা সরল করে বলতে পারতেন।
উস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ ১৮৬২ সালের ৮ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সাধু খাঁ নিজেও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিবপুরের শিববাড়ির সাধুদের সেঁতারের মোহ হয়ে স্কুল যাওয়া বন্ধ করেছিলেন। স্কুলে অনুপস্থিতির কথা শোনে মা এর বেদম পিটুনি খেয়ে বেশ ক’দিন শিব বাড়ি যেতে পারেননি। একদিন মায়ের আঁচলের চাবি খুলে টাকার বাক্স থেকে ১০/১২ টাকা যা পেলেন তা নিয়েই ঘর ছেড়েছিলেন সুর সম্রাট, উঠলেন কোলকাতা। পৃথিবীতে যত লোক রথী-মহারথী রয়েছেন, সকলের প্রায়-ই এই একটি বিষয়ে কী ভীষণ মিল! নিরুদ্দেশ যাত্রা।
তিনি কী কী বাজাতে পারতেন? তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমার কথা’-তে উল্লেখ করেন, মুক্তাগাছার রাজার কাছে পুজার সময় একদিন গিয়ে চাকরীর জন্য আবদার করেন, উদ্দেশ্য- দরবারে গুরুদের দীক্ষা গ্রহণ। রাজা জিজ্ঞেস করলেন, “কী চাও?” তিনি জানালেন, “আজ্ঞে সাত বচ্ছর সুর সেধে এত বিদ্যা শিখেছি। বাঙ্গলাতে তো নেই-ই, ভারতবর্ষেও আমার মত ওস্তাদ নেই।“ রাজা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ব্যাটা কী পাগল হয়েছে নাকি! কী যন্ত্র বাঁজাও?” জবাবে ওস্তাদ জানালেন, “পৃথিবীর সব বাজনায় বাঁজাতে পারি।” এর থেকে বুঝা যায় যে, আলাউদ্দিন খা-এর সকল রকমের বাদ্যযন্ত্রেরই দীক্ষা ছিলো। তাঁর সংগীতচর্চার পরিধি ছিল অসাধারণ বিস্তৃত। বিশেষত, সরোদ ছিল তাঁর প্রধান বাদ্যযন্ত্র, কিন্তু তিনি সেতার, বীণা, বেহালা, সুরবাহার, বাঁশিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের চর্চা ও শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর সংগীতের বৈশিষ্ট্য ছিল গভীর রাগজ্ঞান, কঠোর তালবোধ, দীর্ঘ আলাপ এবং সুরের উপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ।
আলাউদ্দীন খাঁর শিল্পীজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল মাইহার রাজ্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। মাইহারের মহারাজা ব্রিজনাথ সিংহের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে সংগীতচর্চার সুযোগ পান। মাইহারেই তিনি তাঁর বিখ্যাত সংগীতধারা গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে যে ধারাটি ‘মাইহার ঘরানা’ নামে পরিচিত হয়, তার অন্যতম প্রধান স্থপতি ছিলেন তিনি।
আলাউদ্দীন খাঁর সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি তাঁর শিষ্যরা। তাঁর পুত্র আলী আকবর খাঁ এবং কন্যা অন্নপূর্ণা দেবী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের দুই বিশিষ্ট শিল্পী। তাঁর আরেক বিখ্যাত শিষ্য ছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। তাঁদের মাধ্যমে আলাউদ্দীন খাঁর সংগীতদর্শন আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে।
মাইহারের রাজা যখন উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এর শিষ্যত্ব বরণ করতে চাইলেন, উস্তাদ তার গুরু উস্তাদ উজির খাঁ-এর প্রতি অমোঘ শ্রদ্ধার কারণে দীক্ষাদান থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। এটি জানতে পেরে রাজা চিঠি পাঠায়ে পার্মিশন আনেন, তাকে দীক্ষা দিতে রাজি করিয়ে।
আলাউদ্দীন খাঁ ছিলেন একই সঙ্গে শিল্পী, শিক্ষক ও সংগীত-স্রষ্টা। তাঁর কাছে সংগীত শেখা মানে শুধু বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কৌশল শেখা নয়; বরং দীর্ঘ সাধনা, শৃঙ্খলা, আত্মসংযম ও নিবেদনের মধ্য দিয়ে শিল্পকে উপলব্ধি করা। তাঁর কঠোর শিক্ষাদানের গল্প আজও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে কিংবদন্তির মতো আলোচিত।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলাউদ্দীন খাঁর উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৩৫ সালে তিনি উদয় শঙ্করের নৃত্যদলের সঙ্গে ইউরোপ সফর করেন। এই সফরে ভারতীয় সংগীত ও সংস্কৃতিকে ইউরোপীয় দর্শকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পান তিনি। ষাটোর্দ্ধ বয়সেও তার চোখে ইউরোপ ছিলো- উন্নত এক বিশ্বের হাতছানির মতনই। তিনি ভারতীয় মুসলমান আর আরব মুসলমানদের মধ্যে তফাৎ বুঝতে পেরেছিলেন ইউরোপ ভ্রমণের পর। যার দরুন, নিজ দেশের মানুষের ধর্মীয় গোঁড়ামি তাকে মর্মাহত করেছিলো।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিও এসেছে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। তিনি ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মান লাভ করেন। পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণসহ ভারতের অনেক সম্মাননায় তিনি ভূষিত হন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার কোনো পদক বা উপাধি নয়—তাঁর নির্মিত সংগীতধারা এবং তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিল্পীদের উত্তরাধিকার।
আলাউদ্দীন খাঁর জীবন আমাদের সামনে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক সত্যও তুলে ধরে। উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাস কোনো একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুর গ্রামের একজন বালক তাঁর সাধনা ও প্রতিভার মাধ্যমে মাইহার থেকে ইউরোপ, ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বিশ্বসংগীতের পরিসরে নিজের স্থান করে নিয়েছিলেন।
১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আলাউদ্দীন খাঁ মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর সংগীতের যাত্রা সেখানে শেষ হয়নি। তাঁর শিষ্য, তাঁদের শিষ্য এবং পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্ট সংগীতধারা আজও বহমান। এতো এতো বিশেষণ নামের পাশে যুক্ত হবার পরও, তিনি নিজেকে আতাই-বেসুরা সংগীত শিল্পী হিসেবে পরিচয় দিতেন। তাই উস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ শুধুমাত্র একজন সরোদবাদক-ই নন, তিনি ছিলেন আবহমান বাংলার সরল, সহজ, এক নির্মোহ প্রাণ।
তিনি বাংলার সাংস্কৃতিক মাটি থেকে উঠে আসা এমন এক বিশ্বমানের শিল্পী, যাঁর জীবন প্রমাণ করে—একটি গ্রামের সীমানা কখনো একজন মানুষের স্বপ্নের সীমানা হতে পারে না। যে সাধকের সুর তাঁর আত্মার অনুরণন হয়ে গোটা ভারতবর্ষ তথা বিশ্বকে আজও বিস্মিত করে রাখে—সেই কিংবদন্তি উস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর জন্মদিনে অশেষ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। ◼