ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ১৯৭০-এর দশকে অমিতাভ বচ্চনের হাত ধরে ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ আর্কটাইপটি এক মহাকাব্যিক মেলোড্রামার রূপ নিয়ে পর্দায় হাজির হয়েছিল। তৎকালীন পোস্ট-কলোনিয়াল ভারতের সামাজিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক মন্দা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই চরিত্রটি ছিল বীরত্বপূর্ণ ও পুঞ্জীভূত ক্ষোভের রূপায়ণ। তবে ৮০-এর দশকের শেষভাগে এবং ৯০-এর দশকে ভারতীয় সমাজের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে রূপালী পর্দার এই বিদ্রোহের নান্দনিক ব্যাকরণেও এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে। প্রথাগত হিন্দি সিনেমার সুবিন্যস্ত, সাজানো-গোছানো ও মেকি মেলোড্রামাটিক আতিশয্য পেছনে ফেলে অভিনেতা নানা পাটেকার ভারতীয় পর্দায় এক নতুন আর্কটাইপের আবির্ভাব ঘটান—‘অ্যাংরি কমন ম্যান’।
সাধারণ মানুষের অন্তরে প্রতিনিয়ত জমা হতে থাকা অপমান, কাঠামোগত প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক নিপীড়ন এবং সামাজিক অবক্ষয়ের রূঢ় বাস্তবতাই হলো এই ‘অ্যাংরি কমন ম্যান’ আর্কটাইপের মূল চেতনা।
অমিতাভ বচ্চন চিত্রায়িত চরিত্রগুলোর মধ্যে যে একধরনের আদর্শায়িত ও দেবতুল্য প্রতিশোধপরায়ণতা উপস্থিত ছিল, নানা পাটেকার সেখান থেকে চলচ্চিত্রকে টেনে নামান রাজপথের রুক্ষতায়। তাঁর চরিত্রগুলো গ্ল্যামারহীন, দৈনন্দিন জীবনসংগ্রামে ক্লান্ত এবং সমাজের প্রান্তিক সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ নাগরিকের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। থিয়েটারের কঠোর সামাজিক অভিনয়রীতি থেকে উঠে এসে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রের অভিনয়শৈলীতে এক অভিনব মাত্রা সংযোজন করেন। ১৯৯৩ সালের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘তিরঙ্গা’-য় নানা পাটেকারের (ইন্সপেক্টর শিবাজীরাও ওয়াগলে) সাথে কাজ করা বর্ষীয়ান অভিনেতা রাকেশ বেদীর মতে, অমিতাভ বচ্চনের অপরাজেয় আধিপত্যের যুগে দাঁড়িয়ে, সম্পূর্ণ নিজস্ব শর্তে কাজ করে “আরেকটি অ্যাংরি ইয়ং ম্যান” অবতার সৃষ্টি করা ভারতীয় সিনেমাশিল্পে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ছিল।
প্রথাগত ধীরগতির বদলে তাঁর দ্রুত, তীক্ষ্ণ ও ভাঙা-ভাঙা সংলাপ প্রক্ষেপণ, পর্দায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দৃশ্যত এক প্রকারের ‘ভার্বাল অ্যাসল্ট’ বা বাচনিক আক্রমণ হিসেবে কাজ করত। তাঁর শারীরিক উপস্থিতিতে থাকত সুনিয়ন্ত্রিত টানটান উত্তেজনা, যা যেকোনো মুহূর্তে ক্ষোভ আর উন্মাদনায় বিস্ফোরিত হওয়ার ইঙ্গিত দিত। ‘পারিন্দা’ (১৯৮৯) সিনেমায় গ্যাংস্টার ‘আন্না শেঠ’ চরিত্রে তাঁর অন-স্ক্রিন শারীরিক প্রকাশভঙ্গি ছিল চরম অস্থিতিশীল। পাইরোফোবিয়ায় বা আগুনভীতিতে আক্রান্ত আন্না আগুন দেখলেই আতঙ্কে নিজের মাথায় থাপ্পড় মারতেন, চোখ বড় করতেন এবং অনিয়ন্ত্রিত পাগলাটে হাসিতে ফেটে পড়তেন। এই অস্থিতিশীল শারীরিক ভাষার পাশাপাশি পরম শান্ত স্বরে তাঁর উক্তি—”ধান্দা কিষাণ, ধান্দে মেঁ কোই কিসি কা ভাই নেহি হোতা”—দর্শককে শিহরিত করত। সামাজিক নৈরাশ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার প্রতি ধিক্কার জানাতে তিনি ধারালো স্যাটায়ার আর ডার্ক হিউমারের অসাধারণ ব্যবহার করতেন। ‘ক্রান্তিবীর’ (১৯৯৪) সিনেমার ক্লাইম্যাক্সে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে উপস্থিত জনতার নিষ্ক্রিয়তার দিকে তাকিয়ে তাঁর সেই সংলাপ, “আ গায়ে মেরে মউত কা তামাশা দেখনে?”, আজও অবিস্মরণীয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংস্কৃতি অনুরাগী রাজ ঠাকরে নানা পাটেকারের এই অভিনব ব্যক্তিত্বকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা মরগান ফ্রিম্যানের সাথে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন। ফ্রিম্যান পর্দায় এমন এক প্রজ্ঞাবান চরিত্রের প্রতীক, যিনি জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর সময় ও বাস্তবতাকে পরম ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ শান্তির সাথে মেনে নিয়েছেন; পক্ষান্তরে, নানা পাটেকার উপস্থাপন করেন মনস্তত্ত্বের ঠিক বিপরীত মেরু—এমন এক মানুষকে, যিনি জীবনের পদে পদে চরম যন্ত্রণা, অপমান ও সামাজিক অবিচার সহ্য করতে করতে একেবারে শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন এবং যাঁর ধৈর্যের বাঁধ চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়েছে।
রাজ ঠাকরে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝাতে ‘ইমোশনাল প্রেসার কুকার’ উপমাটি ব্যবহার করেন। সাধারণ নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে যে অপমান, বঞ্চনা ও ক্ষোভ বাষ্পের মতো জমা হতে থাকে, পর্দায় নানা পাটেকার এবং অমিতাভ বচ্চনের মতো ব্যক্তিত্বদের সংঘাতময় অভিনয় সেই জমে থাকা বাষ্পকে বের করে দেওয়ার ‘সেফটি ভালভ’ হিসেবে কাজ করত। চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপালী পর্দায় এই আবেগীয় মুক্তি না ঘটলে সমাজ প্রতিনিয়ত চরম বিশৃঙ্খলা ও সামাজিক বিপ্লবের মুখে পড়ত।
নানা পাটেকারের রূপালী পর্দার উপস্থিতি গভীরভাবে প্রথিত ছিল তৎকালীন বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) শহরের আর্থ-সামাজিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার মধ্যে। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর স্থানিক পটভূমি ছিল মুম্বাইয়ের চাল (chawls), শিল্পাঞ্চল, মেহনতী মানুষের ঝুপড়ি এবং নিম্ন-মধ্যবিত্তের ঘিঞ্জি আবাসন। ৯০-এর দশকের সূচনায় ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণ, ক্রমবর্ধমান শ্রেণীসংঘাত, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের উত্থানের ফলে সাধারণ কর্মজীবী মানুষের মনে যে তীব্র নৈতিক অবক্ষয় ও অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়েছিল, পাটেকারের অভিনয় ছিল তার সরাসরি সামাজিক দলিল। তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জমে থাকা অপমান, লাঞ্ছনা ও সমাজব্যবস্থার প্রতি গভীর বীতশ্রদ্ধাকে নিজস্ব অনন্য অভিনয়রীতির মাধ্যমে রূপায়িত করেছিলেন। ফলে তিনি কেবল একজন অভিনেতা হিসেবে থাকেননি, বরং বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে উদীয়মান ভারতীয় মধ্যবিত্তের হতাশা ও ক্ষোভের প্রামাণ্য মুখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।
তাঁর এই প্রথাবহির্ভূত অবস্থান, ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্প ও সমাজ জীবনে একাধিক যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছে। তিনি প্রথাগত ফর্সা, মসৃণ, সুঠামদেহী ও চকচকে ‘চকোলেট বয়’ নায়কের একচ্ছত্র আধিপত্য চূর্ণ করেন। ২০০০-এর দশকে তারকাকেন্দ্রিক সিনেমার বদলে ‘গল্প’ ও ‘বিষয়বস্তু’ কেন্দ্রিক যে নতুন ধারার সূচনা হয়, নানা পাটেকার ছিলেন তার অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী। বাণিজ্যিক সাফল্যের জন্য যে মূলধারার চলচ্চিত্রে প্রথাগত রূপবান নায়ক হওয়ার প্রয়োজন নেই, তা তিনি প্রমাণ করেন। পরবর্তীকালে ইরফান খান এবং নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকীর মতো জাত অভিনেতাদের মূলধারার চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে সফল হওয়ার পথ নানা পাটেকারই তৈরি করে দিয়েছিলেন। রাজ ঠাকরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পর্দার পেছনের নানা পাটেকারের অনমনীয়, আপসহীন ও স্পষ্টবাদী ব্যক্তিত্বের কারণে মূলধারার অনেক প্রযোজক ও পরিচালক তাঁকে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়া থেকে পাশ কাটিয়ে চলতেন, যা প্রকারান্তরে হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্প ও দর্শক সমাজকেই তাঁর অসাধারণ অভিনয় থেকে বঞ্চিত করে চরম ক্ষতিসাধন করেছিল। তবে কেবল তীব্র সামাজিক ক্ষোভ বা মেলোড্রামা নয়, ‘ওয়েলকাম’ (২০০৭) সিনেমায় গ্যাংস্টার ‘উদয় শেট্টি’ চরিত্রটির মাধ্যমে অনবদ্য কমেডি টাইমিং ও স্ল্যাপস্টিক রসবোধের প্রমাণ দিয়ে তিনি বাণিজ্যিক বিনোদন চলচ্চিত্রেও নিজের আধিপত্য দেখিয়েছেন।
রূপালী পর্দার সাধারণ মানুষের এই প্রতিনিধি বাস্তব জীবনেও নিঃস্ব মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সাথে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। পুনেতে সদর দপ্তর, বিশিষ্ট এই অলাভজনক সংস্থাটি মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ ম্যারাঠওয়াদা ও বিদর্ভ অঞ্চলের সংকটগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান, আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের সামাজিক পুনর্বাসনে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।
মারাঠি থিয়েটার থেকে উঠে এসে, ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে অভিনয় জীবন শুরু করা নানা পাটেকার ছিলেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম তীব্র ও অননুমেয় অভিনেতা। ১৯৯৪ সালের ‘ক্রান্তিবীর’ চলচ্চিত্রে অসামান্য অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ড্রামার ধারালো সীমানা পেরিয়ে তিনি নিজেকে যেভাবে কমেডির মঞ্চেও সমান জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন, তা এক বিরল দৃষ্টান্ত। কেবল অতীতেই আটকে থাকেননি তিনি; ২০২৬ সালেও অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে চলচ্চিত্রে কাজ করে গেছেন। সম্প্রতি ‘হাউসফুল ৫’, বিশাল ভরদ্বাজের ‘ও’ রোমিও’ এবং অনিল কাপুরের সাথে ‘সুবেদার’ ছবিতে তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নতুন প্রজন্মের কাছেও সমান প্রাসঙ্গিক ছিলেন।
২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর সকালে, গোয়ার দোনা পাউলায় নিজ বাসভবনে গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মণিপাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কালজয়ী শিল্পী। প্রয়াণের পূর্বে রাত আনুমানিক ২:৩০ মিনিটে তিনি তাঁর এক বন্ধুকে একটি খুদে বার্তায় নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা জানান। গভীর রাত হওয়ায় বন্ধুটি বার্তাটি তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে না পেলেও পরে তা খেয়াল করে ভোর ৪টার দিকে পাটেকারের গোয়ার বাসভবনে পৌঁছান এবং তাঁকে ঘামে ভেজা ও ধীরে ধীরে চেতনা হারাতে দেখেন। এরপর কেয়ারটেকারের সহায়তায় অ্যাম্বুলেন্সে করে ভোর ৫টার মধ্যে তাঁকে মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআর ও কার্ডিয়াক ম্যাসাজ প্রদান করে চেষ্টা চালালেও তাঁর হৃদযন্ত্র সাড়া দেয়নি এবং সকাল ৬টায় তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
প্রয়াণের মাত্র ৪ দিন পূর্বে গোয়ার এক অনুষ্ঠানে নিজের নশ্বরতা নিয়ে তাঁর বলা—”আমাদের অস্তিত্ব কি শুধুই নিজের বাড়ি, স্ত্রী আর সন্তানদের কেন্দ্রিক স্বার্থপরতায় শেষ হয়ে যাবে, নাকি সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমরা সমাজের কল্যাণে কিছু অবদান রেখে আমাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য খুঁজে নেব? […] সবাইকে একদিন যেতে হবে, আমি কাল থাকব কি না জানি না”—কথাগুলো এই হঠাৎ জীবনাবসানের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ◼