সুন্দরী রাধে গো ও হাসন রাজার গান

বাংলা গানের স্বাতন্ত্র শুধু অঞ্চলভেদে নয়, ব্যক্তিভেদেও: লালন, জালাল থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ ও আব্দুল করিমে যার বিস্তার।

● আবু তাহের তারেক

অক্টোবর ৯, ২০২৬

সুন্দরী রাধে গো ও হাসন রাজার গান | দ্য পাবলিশ The Publish

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ / সূত্র: পাবলিক ডোমেইন


হাসন রাজার গানের লগে কবির আর ইউনুস এমরের গানের খুব মিল পাই (নোট: এনাদের লেখা মূলত, লিরিক বা গীতিকবিতা। আমরা এনাদের রচনারে এই লেখায় কখনো গান, কখনো কবিতা বলব, আমাদের সুবিধামতন)। এই তিন জনের সাদৃশ্য হইল, এনারা লোকাল বুলিতে গান বানতেন। তারা একদম স্ট্রেইট কথা বলতে পছন্দ করতেন, ধানাই পানাই না করে। তাদের গানে স্বর বা সুরের উচ্চকিত আওয়াজ নাই। এত নিচা স্বরে গান গাওয়া হইলেও, তাতে আমের অংশগ্রহণ ব্যহত হয় না। এদিকে, তাদের গান আমের জবানের খুব কাছাকাছি হইলেও, এতে একটা বৈঠকী ধাচ থাকার কারণে, এইসব গান উচ্চ বা মধ্যবিত্তের মানুষের কাছেও বেশ উপভোগ্য। 

হাসন রাজার গানের এই ইউনিকনেস বুঝতে আমার কিছুটা সময় লাগল। কিন্তুক, এখন এই ব্যাপারে আমি বেশ কনফিডেন্ট। অর্থাৎ, আমাদের গীতিকবিতার একটা গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হইতে আমি খিয়াল করলাম যে, হাসনের কবিতা সুফি-ভাবে কানায় কানায় পূর্ণ। এই পূর্ণতা এতই ভরাট, প্রশান্তিকর ও তৃপ্তিদায়ক যে, হাসন ভাবের একদম ভরকেন্দ্র হইতে কথা বলতে পারেন। ফলত, তিনি ডাইরেক্ট কথা বলতেই পছন্দ করেন বেশী বেশী। তান কবিতা অনেক সময়ই জিকিরের একদম নিকটবর্তী থাকে। যেমন ইউনুস এমরের কবিতাও। কবিরের গানেও জপ, তপস্যা বা আরাধনার একটা বৃত্ত খিয়াল করা যায়।

আমাদের ভাষার তাবত গানেই ভাবের আনাগোনা বেশ আছে। সিলেট, চিটাগাং, রংপুর বা যেই অঞ্চল বা যেই ঘরানার গানের কথাই বলবেন, দেখবেন তাতে ভাবের বিস্তার আছে। সাম্প্রতিক সময়ে, আমি রংপুর-কেন্দ্রিক গানের বিশাল দরিয়ায় মাসখানেকের লাগি ডুব মারছিলাম। এইসব গান শুনতে শুনতে, মনে-চিতে আনন্দ ও প্রশান্তি আসলেও, এইগুলা অতিরিক্ত পরিমাণে শোনার ফলে, সুর ও তালের একটা জখম আমার তনে-মনে ঘটল। তখন দেখলাম, হাসন রাজার গান সেই জখমের ওষুধ হিসাবে বেশ উপকারে আসতেছে! 

একইভাবে, আমি ভিন্ন ভিন্ন ভাষার অনেকের, বা বিভিন্ন দেশের বিচিত্র অঞ্চলের গানও বেশ শুনি। যেমন, কাওয়ালি ও উত্তর ভারতীয় গীতি। যেমন, হুট করে, পর্তুগালের ফাদো বা আলেন্তেজো অঞ্চলের গীতও শুনতে পারি। এদিকে, কবির বা ইউনুস এমরে ত শুনিই। এসব অঞ্চলের রচয়িতাদের গান শুনতে শুনতে, একসময় একটা বিরক্তি তাইয়ার হয়। অবসাদ আসে। অতৃপ্তিও কাজ করে। বিদেশী ভাষার এইসব গান আমার মনে শেষ জরুরী ফিনিশিংটা নিয়া আসে না। সেই কারণে, বাংলা ভাষায়ই ফিরতে হয় শেষমেষ। 

তো, বাংলা ভাষায় অঞ্চলভেদে গায়কীর ভিন্নতা ও স্বাতন্ত্রই নয়, আছে ব্যক্তিভেদে স্বাতন্ত্রের ঘটনাও। যেমন, লালন, জালাল। অনেকে এই ধারারে চন্ডীদাস, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, আব্দুল করিম, আমির উদ্দিন ইত্যাদি অজস্র নামের লগেও যুক্ত করতে পারবেন। এই ক্ষেত্রে, প্রথমেই যেই কথা বলার দরকার তা হইল, কাওয়ালী বা উত্তর ভারতীয় গানের চাইতে আরো বেশী আপন মনে হয় ভাওয়াইয়া, বাউলা, বা চাটগাইয়া গানরে। অনেকের কাছে লালন, রবীন্দ্রনাথ বা এইমতন কাউরেও আপন লাগতে পারে। কিন্তুক, খিয়াল করলে দেখতে পারেন, আমাদের গানের এমন একটা জায়গায় হাসন রাজা অবস্থান করেন, যা বেশ আশ্চর্যের! তিনি না কথায়, না শব্দে, না ভাবে- কিছুতেই উচ্চকিত হন না। তিনি অলংকারের ধার ধারেন না। অথচ, তার গানে সুর, স্বর আর ভাবের বিবাহের অভাব নাই। এইরকম ঘটনা যে আমাদের ভাষায় আর কারো গানেই নাই, বা কুনু গানেই নাই- সেইটা বলা আমার উদ্দ্যেশ্য নায়। আমি বলতে চাই, এই মতন সহজ, স্বাভাবিক ও ভাবের গভীরতাপূর্ণ, তথাপি একদম লোকাল বুলিতে কবিতা করার প্রবণতা, একক কুনু কবির বেলায়, আমাদের ভাষায়, বেশ আনকমন। 

হাসন রাজার মতন, সিলেটেরই, আরো বেশ কয়েকজন কবির নাম এই জায়গায় অনায়াসে নিয়া আসা যায়। যেমন ধরেন, রাধা রমণ ও সৈয়দ শাহনূর। কিন্তুক, হাসন রাজার পারংগমতা তান অঞ্চলের অপরাপর কবির চাইতে অনেক ক্ষেত্রেই বেশী। সৈয়দ শাহনূরও সিলেটি ডায়ালেক্ট ইউজ করতেন। তিনিও পীরালি ধারার কাব্য রচনা করতেন। কিন্তুক, হাসন শাহনূরের চাইতে বেশী কমপ্যাক্ট, আর ফ্লুইডও। এদিকে, হাসনের লোকপ্রিয় গানের সংখ্যাও শাহনূরের তুলনায় ব্যপক। রাধারমণ বিভিন্ন দিক দিয়া হাসনের কাছাকাছি, আর অনেক দিক দিয়া, হাসনরে ছাড়াইয়াও গেছেন তিনি। যেমন, তান ধামাইল ঘরানার গানের পপুলারিটি অনস্বীকার্য। যদিও, রাধারমণ হাসনের মতন ভাষার উদামপনায় এত স্বীদ্ধহস্ত নহেন। এদিকে, তার ধামাইল ঘরানার গান কিছুটা চটুলও বটে! চর্যাপদের কবিদের কথা এইখানে স্মরণে আনা যায়। যদিও, একটা ওয়ার্ল্ডভিউ ক্রিয়েট করার ব্যাপারে, অর্থাৎ, কি ভাবে, কি ভাষায়, কি স্ট্রাকচারে- হাসন রাজার স্বীদ্ধি চর্যাপদের কুনু একজন কবি, বা সৈয়দ শাহনূর-রাধা রমণদের চাইতে বেহতর। 

বিশ্ব কবিতার দিকে চাইলে, হাসন রাজার লগে অনেকের মিলমিশই পাওয়া সম্ভব। আমাদের একটা হিন্দুস্থানি, ইরানি, তুরানি পরিচয় বা ঐতিহ্য থাকার কারণে, আমরা হাসনেরই অপর রূপে কবির বা ইউনুস এমরেকে সহজে আইডেন্টিফাই করতে পারি। 

এইখানে বলা দরকার, উপরে উল্লেখিত তিন তিনজন কবিই মুসলমান। মানে, তাদের মুসলমান পরিচয়ের চাইতেও এই জায়গায় যেইটা বেশী গ্রাহ্য বা গুরুত্বপূর্ণ, তা হইল সুফি কৃষ্টি। তাদের গানের ভিতরে যেই ভাব, তাদের গানের যেই সহজতা, তাদের মইদ্যে ইশকের যেই তন্দ্রাচ্ছন্ন অথচ জাগরুখ স্বভাব, তার লগে সুফি সাধনার কানেকশন আছে। এও বলার চাই, তারা ভাব ও ভাষার লেনাদেনা, মিলমিশের ব্যাপারেও বেশ সহজ, স্বাভাবিক ছিলেন। সেই কারণেই বোধকরি, সকল শ্রেণী ও বর্ণের মানুষের কাছেই তারা যাইতে পারছিলেন। 

নিচে হাসন রাজার একটা কম পরিচিত গানের কয়েকটা লাইন দিতেছি, যা রাধা-কানাইর সম্পর্ক নিয়া রচিত। মানে, হাসন যে শুধু আল্লার শানেই অসাধারণ, জিকিরতুল্য গান রচনা করছেন, তাই নয়। তিনি আমাদের অঞ্চলের অপরাপর ধর্মীয় সম্প্রদায়, যেমন হিন্দুদের প্রচলিত মিথরেও তান গানে অসাধারণভাবে কাজে লাগাইছেন। এই গানে তিনি যেইভাবে শরীর ও মনরে রাধা ও কৃষ্ণের উপমায় উপমিত করছেন, তা খিয়াল করার মতন বটে!

“সুন্দরী রাধে গো
তর কানাইয়া যাইব ছাড়ি
তাই ভাবিয়া হাছন রাজা
ফিরে বাড়ি বাড়ি
কানাইয়া ছাড়িয়া গেলে
লোকে বলবে এড়ি
কানাইয়ারে বাইন্ধা রাখো
পায়ে দিয়া দড়ি..।”

তো, বাংলা ভাষায় গীতিকবিতার অনেক অনেক স্মরণীয় ও বরণীয় মাস্টার আছেন। এনাদের কেউ কেউ হাসন রাজার চাইতেও বেশী পপুলার ও বহুলপ্রজও আছে। কিন্তুক, হাসন রাজা যেইভাবে সুফিপনা করছেন তান কাব্যে, মানে তিনি যেইভাবে তান কবিতায় ভাবরে জারিত করছেন, তার তুলনা সত্যই বিরল। এছাড়া, তার কবিতা যেমন অঞ্চল ভার্সাস জাতীয়তার বেড়া, মাইর ইত্যাদিরে খারিজ করে, তেমন ধনী ও দরিদ্ররেও সমানভাবে টানে। দেখা গেছে, ইন্ডিয়ায় কবিরের গানও এইভাবে বিচিত্র শ্রেণীতে সমানভাবে জনপ্রিয়। এদিকে, ইউনুস এমরে তুরস্কে জাতীয়ভাবে স্মরিত ও বরিত। হাসন রাজা বাংলাদেশে সেইরকম এটেনশন এখনো না পাইলেও, তান গানের মহিমা মোটেও তাতে কমে না। ◼

নিচে কবির, ইউনুস এমরে ও হাসন রাজার কয়েকটা গানের লিংক দেয়া থাকল। পাঠক শুনতে পারেন!

ইউনুস এমরে, https://www.youtube.com/watch?v=6aBhY2_n9m4
হাসন রাজা, https://www.youtube.com/watch?v=Lc-8VO5Emhg
হাসন রাজা, https://www.youtube.com/watch?v=dMO4yMSO2ws
কবির, https://www.youtube.com/watch?v=nnR7GvkqgmQ


Picture of আবু তাহের তারেক

আবু তাহের তারেক

আবু তাহের তারেক একজন কবি ও অনুবাদক। বর্তমানে ইউরোপপ্রবাসী। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ফের্নান্দ পেসোয়ার কবিতা (২০১৬), আইয়ো রেগো ময়না (২০১৮) ও আম্মা নদী (২০২১)।

শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইটে লাখ লাখ হামলার চেষ্টা। ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

প্যারিসের শহরতলির এক স্কুলের ফাঁকা পদ থেকে শুরু হয়ে এক মাসে সারা দেশ। এই আন্দোলনের মুখ কারা এবং কেন।

দ্য পাবলিশ

ভারতে বাড়ছে তরুণদের ক্ষোভ, রাস্তায় নামছেন বিরোধীরা। তবু বাংলাদেশের জুলাইয়ের সঙ্গে ভারতের আন্দোলনের দূরত্ব কতটা এবং কেন?

দ্য পাবলিশ

Scroll to Top