রবীন্দ্রনাথ, ইকবাল ও আমাদের আত্মপরিচয়ের লড়াই

পিতামহের প্রয়াণের বহুকাল পর, জমিদারি রক্ষার লড়াই

● আবু তাহের তারেক

অক্টোবর ১২, ২০২৬

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ


শুনলাম, শিল্পকলার আশপাশ হইতে হকারদেরকে উচ্ছেদ করি, তার দেওয়ালে শিল্পী-সাহিত্যিকদের ছবি আঁকা হইছে। বাংলাদেশে এইরকম ঘটনা বেশ ঘটে। অর্থাৎ, বস্তিবাসীদেরকে খেদাইতে হইলে, আগে বস্তিতে আগুন লাগাইতে হয়। ফলে, শিল্পকলার দেওয়ালে এস্থেটিকস করা যে, হকারদের উচ্ছেদরে হজম করার লাগিই; এইমত অনুমান আমরা করতেই পারি। তো, আর্টিস্ট হিসাবে যাদের ছবি জাতীয় এই প্রতিষ্টানের দেওয়ালে থান পাইল, তাতে কলকাতা বা ইন্ডিয়ার আর্টিস্টদের সংখ্যা অল্প নয়। ইন্ডিয়ার নাগরিকদের ছবি বাংলাদেশের শিল্পকলার দেওয়ালে আঁকার উদ্দ্যেশ্য কি? একটা আর্ট-কালচারগত ‘ক্যাচাল’ লাগানিই কি এর মাকসাদ ছিল! বাস্তবে দেখা গেল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের ছবি আঁকা ও তা মুছতে চাওয়ার মাধ্যমে, ক্যাচাল লাগানির মাকসাদটা ভালমতই পূর্ণ হইল!

যাই হউক, বাংলাদেশের আর্ট-কালচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, ‘শিল্পকলা একাডেমী’র দেওয়ালে যে রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকা হইল (আরো অনেকের ছবিও আঁকা হইল বটে), তা কি জোর করেই আঁকা হইল না? মানে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ‘রবীন্দ্রগ্রহণ’ কি আমাদের আর্ট-কালচারের নর্ম্যাটিভিটি বা বাস্তবতারে ফলো করিই ঘটছে? যদি না ঘটে, তাহলে তান ছবিতে জোর করিই কালি লাগানো হবে; কেউ না কেউ তা করবে- বিপ্লবের ধারা কি এমনই নয়! না হইলে, আমাদের রাষ্ট্রে ঠাকুরের যে অকারণ ‘হেজমনি’ ও ‘ডমিনান্স’, সেইটা আমরা ভাংব কি করে!

(ছবিতে) নাসরিন খন্দকারের ভাওয়াইয়া গানের তালাশ-মূলক এই বইয়ে নারীর ডিজায়াররে দ্রোহ আকারে দেখার প্রয়াস আছে।

কিন্তুক, যারা রঠার ছবিতে কালি লাগাইলেন, তাদের এজেন্সিই বা কি! আমাদের আর্ট-কালচার বিষয়ক বাস্তবতার আসল মুসিবতটা এইখানে।

মানে, পাকিস্থান আমলে, ইকবাল-প্রেম হইতে মুক্তি লাভের আশায়, আমরা রঠা-প্রেমে মজছিলাম। যদিও, একাত্তরের পর হইতে, ব্যক্তি রঠা বিচিত্র পরিচয়বাদের মোড়কে আমরারে শাষন ও শোষণ করতে উইঠা পইড়া লাগলেন। আমরা তা যুগ যুগ ধইরা হাড়ে হাড়ে ঠারও পাইলাম। বিশেষ করে, বাকশালী জমানায় আমরা শুধু লর্ড মুজিব নয়, জমিদার রবীন্দ্রনাথেরও শক্তিমান শাসনকালের ভিতরে থাকলাম! 

সাতচল্লিশ-পরবর্তী সময়ে ইকবালের, আর একাত্তরের পরে রঠার দানবীয় দুই উরাতের চিপায়; আমাদের আত্মপরিচয় খাবি খাইল। তাই, আমরা কে ও কারা- জুলাইয়ের পরে তার অনুসন্ধান ফরজ হইয়া পড়ল। কিন্তুক, আমরা তার জরুরতটা বুঝতে পারলাম কই! 

জুলাইয়ের পরে, সারা দেশে কাওয়ালী অনুষ্ঠানের ধুম পড়ল। কাওয়ালি আমাদের গানের বড় স্রোত নয়। সেইটারে প্রধান-স্রোত বানানির তাগাদা কেনই বা ফিল করলাম আমরা। তাও, এত বড় গণঅভুত্থানের পরে পরেই! নোট করা ভাল, কাওয়ালীর আশিকগন আবার আল্লামা ইকবালের একনিষ্ট মুরিদও!

এদিকে, যেই বাংগালি জাতীয়তাবাদের ‘পরিচয়বাদী’ আগ্রাসনে আমরা নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত হইলাম যুগের পর যুগ, তার সবচাইতে বড় আইকন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ফষ্টি-নষ্টি বা রোমান্টিসিজম চলতেই থাকল- এইটা কি পুরা রাষ্ট্রের মেরুদন্ডহীনতার দিকেই অংগুলি নির্দেশ করল না! 

(ছবিতে) আনিবাল কিজানোর আলাপে আধুনিকতার লগে শাসন ও শ্রেণীকরণের যোগসূত্রের কথা আছে।

আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় এই মেরুদন্ডহীনতা বা দীনতার প্রকাশ বিচিত্র স্থরে ও রূপে ঘটতেছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের বড় বড় ইউনিভার্সিটির বাংলা ডিপার্টমেন্টের সিলেবাসের দিকে চোখ বোলান। দেখবেন, একজন জমিদার ঠাকুর সর্বত্র ছড়ি নিয়া ঘুরাঘুরি করতেছেন। কলোনির ভিতরের আজাবময় দুইশ বছরের ‘গৌরবেও’ ভরপুর এইসব সিলেবাস! 

বাংলা সাহিত্যের এইসব পাঠ্যে সৈয়দ সুলতানরা নাই। কলোনীর পেটের ভিতরে জন্ম লওয়া, বিপ্লবী হাছন রাজারা নাই। নাই বটতলার কাউন্টার-লিটারেচারের কথা। নাই কারবালা, বা গীতিকা সাহিত্যের গৌরবময় হাজিরাও। রবীন্দ্রবাদী, অর্থাৎ, হেজিমনিক বাংগালি জাতীয়তাবাদীদের হাতে ধরেই বাস্তবায়িত হইছে এইমতন এসেনশিয়ালিস্ট ও কূপমন্ডুক কর্মকান্ড। 

এদিকে, যেই মুসলমানরা এই অঞ্চলে ধর্মান্তরকরণে জড়িত ছিলেন বেশী বেশী, অর্থাৎ পীর-ফকিরগণ (রিচার্ড ইটন দ্রষ্টব্য); জুলাইয়ের পরে তাদের মাজার, তাদের কৃষ্টিগত ঐতিহ্য, যেমন ‘গান’ হেভিলি আক্রান্ত হইছে। আমাদের সাহিত্যে পীর-ফকিরদের হাজিরা এত প্রবল, যে মুসলমানদের রচিত তাবত গুরুত্বপূর্ণ রচনায় এনাদেরকে কোথাও না কোথাও লোকেট করা সম্ভব। জুলাইয়ের পরে, পীর-ফকিরদের অনুসারীগণের একটা সাধারণ নাম ধরাইয়া দেওয়া হইল জনতার সামনে। অর্থাৎ, তারা ‘মাজারপন্থী’ হইয়া গেলেন! কাউরে গুম করার আগে, তান পরিচয়রে গুম করা বড়ই জরুরী ব্যাপার। ফলে, মাজার ধ্বংস করার আগে, মাজারের খাদেমদেরকে ট্যাগানো একটা জরুরী কাম বটে! 

বাংলাদেশে শিল্প ও সাহিত্য নিয়া নানামুখী তৎপরতা হাজির আছে। এই তৎপরতায়, বাংগালি জাতীয়তাবাদ বরাবরই ‘মুসলমান পরিচয়’কে দমাইয়া রাখার কুশিশ জারি রাখছে। আর ইসলামি জাতীয়তাবাদও, আশরাফপনার কারণে, পীর-বাউল-ফকির বা লোকায়তদেরকে প্রতিনিয়ত খারিজ ও অপর করি রাখছে।

(ছবিতে) অনিন্দিতা দাশ বটতলাকে একটা প্রাণবন্ত সাহিত্যিক পরিসর হিসাবে লোকেইট করছেন, ‘পাওয়ার ইন প্রিন্ট’ কিতাবে ।

এই দ্বিমুখী কূপমন্ডুকতার বিপরীতে, অজস্র লিটারেচার উৎপাদিত হইছে, যেইখানে আমাদের সাহিত্যের তথাকথিত মধ্যযুগরে নানান লেন্সে দেখার প্রয়াস মিলে (আয়েশা ইরানি বা থিবো দ্যুবের দ্রষ্টব্য)। গবেষণা হইছে বটতলার সাহিত্যের রাজনীতি (অনিন্দিতা দাশ), বা কারবালার সাহিত্য নিয়াও (ইপসিতা হালদার)। সুন্দরবনের পীর (টনি কে স্টুয়ার্ট) বা রংপুরের ভাওয়াইয়াও (নাসরিন খন্দকার) গবেষণার বাহিরে থাকে নাই। বাউল ফকিরদেরকে (জন ওপেনশো, হানস হার্ডার ইত্যাদি) নিয়াও কাজ হইছে বিস্তর। 

সাম্প্রতিক কালের এইসব গবেষণার অল্পই সম্পন্ন করা হইছে বাংলাদেশে। আমাদের আর্ট-কালচারের অনেকেই, গবেষকদের এইসব গবেষণার কথা বইলা বইলা ওয়াজ মাহফিল কইরা বেড়াইলেও; মধ্যযুগ, ফোক, ভাওয়াইয়া, বাউল, জারি, সারি, ফকিরী ইত্যাদি বিচিত্র সাহিত্য-ধারা তাদের ন্যায্য স্বীকৃতি রাষ্ট্র হইতে পায় নাই। আজতক বদলায় নাই আমাদের সাহিত্য পড়বার বা পড়াইবার হেজিমনিক কায়দা-কানুনও। 

রবীন্দ্রনাথ বা ইকবালের বিগ্রহ অর্থাৎ ‘হেজিমনি’ ও ‘ডমিনান্স’ থাকবে কি না- এইটা প্রশ্ন হিসাবে খুবই ছোট্র একটা ব্যাপারই। আদতে, ইকবাল বা রবীন্দ্রনাথ, কারোরই বিগ্রহ আকারে থাকারে আমরা নেশন হিসাবে মাইনা লই নাই কুনু কালে। ইকবালের ক্ষেত্রে, একাত্তর তার স্বাক্ষী। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে, চব্বিশ তার স্বাক্ষী। 

তারপরেও, আমরা রবীন্দ্রনাথের জোব্বার ভিতরে থাইকা কথা বলতে পছন্দ করি। খনে খনে, ইকবালের টুপ্পির ভিতরে ঢুইকা পড়তেও না-পছন্দ বোধ করি না। কিন্তুক, আমরা কেনই বা করি এইসব? এই ‘আমরাই’ বা কারা? ‘আমরা’ ঠিক কাদের প্রতিনিধি? ‘আমরা’ কাদের স্বার্থ বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী? 

ইকবাল কিংবা রবীন্দ্র-পাবন্দদের মইদ্যে, অমিলের পাশাপাশি, মানে এনারা কেউ ‘বাংগালি জাতীয়তাবাদ’, আর কেউ ‘ইসলামি জাতীয়তাবাদের’ খাদিম হইলেও; এই উভয় গোষ্ঠীর মইদ্যে মিলের জায়গা হইল- তারা বেশ নাক উঁচা। তারা আমাদের আর্ট-কালচারের তাবত গুরুত্বপূর্ণ বাঁক ও বদলরে, তান তান আইকনদের জুব্বা ও টুপ্পির ভিতরে লুকাইয়া ফেলতে মোটেও পিছপা নহেন। 

এর পিছনে দেশের সাম্প্রতিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের লগে লগে, আমাদের অতীতের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীরও দায় থাকা সম্ভব। বার্নার্ড কোহেনের কলোনি সংক্রান্ত নৃতাত্বিক গবেষণা, বা কলোনাইজড ও কলোনাইজারদের মানসিকতা নিয়া ফ্রাঞ্জ ফানোর তাত্ত্বিকতা এইমতন স্বাক্ষ্য দেয়। আনিবাল কিজানোর ‘কলোনিয়ালিটি’ তত্ত্বও এইখানে স্মরণীয়। এদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার জনমিতিতে, ধর্ম ও বর্ণের প্রভাবও লক্ষ করা দরকার। আমরা এই অঞ্চলে শুধু শুধু বৈদিকদের ‘বর্ণাশ্রম’ রীতির ভিতরেই বড় হওয়া মানুষই নহি। আমাদের আছে শোষণ-বঞ্চণার বিচিত্র চোরাটানের ইতিহাস। মুসলমানদের মৈদ্যে আশরাফ-আতরাফ ভাগ, বা ভাষাগত শ্রেণী-বৈষম্যের রীতি আকছার ছিল, বা আছে এখনো (রাফিউদ্দিন আহমদ দ্রষ্টব্য)। লেখক আহমদ ছফা তান ‘বাংগালি মুসলমানের মন’ নামক প্রবন্ধে আমাদের চরিত্রের উপর বেশকিছু দাগ আরোপ করতে চাইছেন, যা ন্যায্য নয়। রাফিউদ্দিন আহমদ, ইপসিতা হালদার, বা অনিন্দিতা ঘোষদের গবেষণা তারই প্রমাণ। কিন্তুক, বাংলার আপামর জনগন যে বার বার বর্ণবাদ ও শোষণের শিকার হইছেন, এই কথা হজরত আহমদ ছফা সত্য সত্যই বলতে পারছেন। 

(ছবিতে) টনি কে স্টুয়ার্ট পীর-ফকিরদের গাঁথা কিভাবে একটা কমন অডিয়েন্স বা গোষ্ঠী তাইয়ারের মাধ্যমে, নয়া সমাজ গইড়া তোলে, তার কথা বলছেন।

আদতে, উর্দু-পাবন্দ আশরাফ মুসলমানরা সহজ সাধনের কথা বলা ফকির সাধুদের বাণী ও তাদের ভার্নাকুলার জবান পছন্দ করতে পারে নাই। ফলে, তারা খনে ইকবাল, খনে কাওয়ালিতে তাদের আত্মার শান্তি খুজতে গেছেন। এদিকে, রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের ‘হাই কালচারের’ এক উৎকৃষ্ট নমুনা। যিনি একই লগে বিচিত্র ইন্টারসেকশনে বাস করেন। তিনি হিন্দু-কিশটান চেরাগায়নের ধারক ও বাহক। এছাড়া, তিনি জমিদারও। ফলত, আমাদের রাষ্ট্রের শাসক ও শোষক শ্রেণীর জনতার উপরে ‘ডমিনান্সের’ খাতিরে, রবীন্দ্রনাথ বা তান গোত্রীয়দের শিল্প-সাহিত্যগত ‘হেজিমনিরে’ সমাজে মেইনটেইন করার একটা তাগাদাময় তরীকা এই অঞ্চলে এস্টাবলিশড হইয়া গেছে। 

ইকবাল বা রবীন্দ্রনাথ তাই, কেবলই ‘আদর্শের’ মামলা নহেন। উহারা শ্রেণী, বর্ণ ও গোত্র বা আশরাফপনার চিহ্নও। ‘বিগ্রহ’ হিসাবে প্রতিষ্টিত এই দুই ব্যক্তির ধর্ম বা বর্ণ এইখানে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। কারণ, উনারা এখন ‘ডমিনান্সের’ হাতিয়ারে পরিণত হওয়া দুই জাতীয় ‘আইকন’ মাত্র। 

কিন্তুক, আমাদের আত্মপরিচয়ের যে জার্নি, তার শুরুই হবে না, আমাদের পথের কাঁটা এইসব আইকন নামক জাতীয়তাবাদী মূর্তিদেরকে সরাইতে না পারলে।


Picture of আবু তাহের তারেক

আবু তাহের তারেক

আবু তাহের তারেক একজন কবি ও অনুবাদক। বর্তমানে ইউরোপপ্রবাসী। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ফের্নান্দ পেসোয়ার কবিতা (২০১৬), আইয়ো রেগো ময়না (২০১৮) ও আম্মা নদী (২০২১)।

শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইটে লাখ লাখ হামলার চেষ্টা। ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

প্যারিসের শহরতলির এক স্কুলের ফাঁকা পদ থেকে শুরু হয়ে এক মাসে সারা দেশ। এই আন্দোলনের মুখ কারা এবং কেন।

দ্য পাবলিশ

ভারতে বাড়ছে তরুণদের ক্ষোভ, রাস্তায় নামছেন বিরোধীরা। তবু বাংলাদেশের জুলাইয়ের সঙ্গে ভারতের আন্দোলনের দূরত্ব কতটা এবং কেন?

দ্য পাবলিশ

Scroll to Top