পুঁজিবাদের জন্ম এবং শোষণের ইতিহাস

যে কোম্পানি ব্যবসা করতে এসে শাসক হয়ে উঠেছিল, তার ইতিহাসেই আছে পুঁজিবাদের জন্মের সূত্র।

● দ্য পাবলিশ

অক্টোবর ১৪, ২০২৬

পুঁজিবাদের জন্ম এবং শোষণের ইতিহাস | দ্য পাবলিশ The Publish

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ


পুঁজিবাদকে যদি একটা শিশু ধরা হয়, তাহলে তার বাবার জন্ম ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর, যেদিন ইংল্যান্ডে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৈরি হয়। এটাই দুনিয়ার প্রথম কর্পোরেশন, মানে আইনের স্বীকৃতি পাওয়া বড় কোম্পানি, যেখানে অনেকে টাকা ঢালে। পরের কয়েকশো বছর বাবার কাটল কষ্টে। একদিকে সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে টক্কর (সামন্ততন্ত্র হলো সেই ব্যবস্থা, যেখানে রাজা আর জমিদার-লর্ডদের হাতেই সব ক্ষমতা আর সম্পত্তি থাকত)। অন্যদিকে ভয়, রাজা যেকোনো সময় তার টাকা কেড়ে নিতে পারেন। শেষ পর্যন্ত তার একমাত্র সন্তান পুঁজিবাদ প্রাপ্তবয়স্ক হলো ১৮৪৬ সালের ২৪ জুন। তখন ব্যবসা আর সম্পত্তির মালিকানা সবার জন্য খুলে গেল, রাজার নিয়ন্ত্রণ আর রইল না।

পুঁজিবাদ শুরু থেকেই কর্পোরেশন আর রাষ্ট্রের সঙ্গে বাঁধা ছিল। রাষ্ট্র অনুমতি না দিলে কোম্পানি দাঁড়াত না, আর কোম্পানি না থাকলে আজকের মতো করে টাকা খাটানো বা ভাগ করে নেওয়া যেত না। তার আগে সামন্ততন্ত্রের সময় কারও টাকা বা সম্পদ রাজা কিংবা লর্ডদের খেয়ালে হারিয়ে যেতে পারত।

কেউ কেউ বলেন, এই অবস্থা চলেছিল ১৬৮৮ সালের ‘Glorious Revolution (গৌরবময় বিপ্লব)’ পর্যন্ত। (এটা ইংল্যান্ডের সেই ঘটনা, যাতে রাজার ক্ষমতা কমে পার্লামেন্টের ক্ষমতা পাকা হয়।) তখন ‘বিল অব রাইটস’ নামের আইনে আধুনিক সম্পত্তির অধিকার পাকাপোক্ত হয়। কিন্তু যারা মনে করেন ‘মুক্ত বাজার’ ছাড়া পুঁজিবাদ হয় না, তাদের হিসাবে তারিখটা আরও পরে, ১৮৪৬ সাল। (মুক্ত বাজার মানে এমন বাজার, যেখানে কে কী বেচবে-কিনবে তাতে সরকার কম হাত দেয়।) সে বছর কর্ন আইন বাতিল হয়। এই আইন বিদেশ থেকে শস্য আনায় বাধা দিত, বাতিল হওয়ায় বাণিজ্য আরও খোলা হয়। আর আমেরিকার ক্ষেত্রে হয়তো ১৮৬৩ সাল, যখন সেখানে দাসপ্রথা আর দাস দিয়ে চালানো বড় খামার শেষ হয়।

আরও অনেক ঘটনা পুঁজিবাদের জন্মের পথ তৈরি করেছে:

  • ভেনিসের ব্যবসায়ীদের উত্থান (১৪-১৫ শতক): তাঁরা দূরদূরান্তের ব্যবসার জাল আর আধুনিক ব্যাংক গড়ে তোলেন, আর তৈরি হয় নতুন এক ব্যবসায়ী শ্রেণি।
  • ইউরোপীয়দের সমুদ্রযাত্রা ও উপনিবেশ (১৫-১৬ শতক): আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ায় এসে তারা নতুন জমি ও সম্পদ দখলে নেয়। এতে পুঁজি জমানোর সুযোগ বাড়ে। (উপনিবেশ মানে অন্য দেশ দখল করে শাসন করা।)
  • প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার (১৬ শতক): খ্রিস্টধর্মের ভেতরের এই আন্দোলন থেকে ক্যালভিনপন্থীদের মধ্যে কঠোর পরিশ্রমকে ধর্মীয় কর্তব্য ভাবার নতুন মনোভাব জন্ম নেয়।
  • উদারনীতিবাদ (১৭-১৮ শতক): ব্যক্তির স্বাধীনতা আর নিজের স্বার্থ দেখাকে ন্যায্য বলে মানার এই মতবাদ পুঁজিবাদের জন্য দরকারি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবনাকে বৈধতা দেয়।
  • অ্যাডাম স্মিথের বই ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’ (১৭৭৬): এটি পুঁজিবাদকে দার্শনিক যুক্তি জোগায়। যদিও অনেকে বলেন, স্মিথ সমর্থকের চেয়ে বেশি ছিলেন পর্যবেক্ষক ও সমালোচক।

শুরুর দিনগুলোতে পুঁজিবাদের বেড়ে ওঠা আর টিকে থাকার জন্য নিচের বিষয়গুলা লেগেছিল:

  • আফ্রিকা-ইউরোপ দাস বাণিজ্য: ১৫১৮ সাল থেকে আটলান্টিক পার করে শ্রমিক হিসেবে দাস নেওয়া শুরু হয়, যুক্তরাজ্যে তা বন্ধ হয় ১৮০৭ সালে। মজুরি দিয়ে কাজ করানো যখন স্বাভাবিক হয়নি, তখন এই ব্যবস্থা পুঁজিবাদকে জুগিয়েছে বন্দি শ্রমিক।
  • ইংল্যান্ডের এনক্লোজার আইন (১৮-১৯ শতক): এনক্লোজার মানে জমি ঘিরে ফেলা। এসব আইনে বহু মানুষ জমি হারিয়ে ভূমিহীন শ্রমিক হয়ে পড়ে। এতে ‘গৃহহীনতা’ আর অনিশ্চিত মজুরির কাজের জন্ম হয়।
  • ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লব (১৮ শতকের শেষ থেকে ১৯ শতকের শুরু): অর্থনীতি আগে চলত জমির খাজনা আর ফসলের ওপর ভর করে। সেখান থেকে বদলে সেটা হয়ে গেল কারখানায় তৈরি পণ্য বেচাকেনার অর্থনীতি।

মোট কথা, পুঁজিবাদ সম্ভব হতে বড় বড় সামাজিক পরিবর্তনসহ অনেক কিছু একসঙ্গে ঘটতে হয়েছে।

ক্যাপিটালিজম, মানে?

‘ক্যাপিটালিজম’ শব্দটা এসেছে ফরাসি ‘capitalisme’ থেকে, যার মানে ‘ধনী মানুষের অবস্থা’। সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ আর ‘লিবার্টারিয়ান’ শব্দগুলোও মূলত ফরাসি। ‘ক্যাপিটাল’ বা পুঁজি বলতে বোঝাত এমন বড় সম্পত্তি, যা দিয়ে লাভ করা যায়। মধ্যযুগে প্রথম শব্দটা চালু হয় গবাদিপশুর সংখ্যা বোঝাতে। ‘চ্যাটেল’ শব্দেরও একই উৎস। চ্যাটেল মানে এমন সম্পত্তি, যা হাতবদল করা যায়। আবার এর মানে সেই দাসত্বও, যেখানে মানুষকেই সম্পত্তি ধরা হয়।

মূল ফরাসিতে প্রথমে ‘পুঁজিবাদ’ বলতে বোঝাত, কেউ নিজের টাকায় সরকারি বন্ড কিনছে, বিশেষ করে যুদ্ধের খরচ জোগাতে। (বন্ড হলো সরকারকে ধার দেওয়ার কাগজ, যাতে সুদসহ টাকা ফেরত পাওয়ার কথা থাকে।) এ থেকে বোঝা যায়, ব্যবস্থাটার জন্ম টাকার ওপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে। মাইকেল সনেনশার তাঁর ‘Capitalism: The Story Behind The Word’ বইয়ে লিখেছেন, ‘এর সুবিধাভোগী ছিল এর মালিকেরা, আর এর শিকার ছিল পুঁজিহীনেরা।’ অর্থাৎ শুরুর ধারণাটা ছিল সম্পত্তির মালিক কে, আর সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে কে, সেই প্রশ্ন ঘিরে।

এরপর শব্দের মানে সরে আসে ‘কী আছে’ থেকে ‘কার আছে’-তে। ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ নৈরাজ্যবাদী উইলিয়াম গডউইন তাঁর বই ‘An Enquiry Concerning Political Justice’-এ প্রথম ‘পুঁজিপতি’ কথাটা বলেন। (নৈরাজ্যবাদী মানে যাঁরা মনে করেন সমাজ চালাতে রাষ্ট্র বা শাসকের দরকার নেই।) তিনি লিখেছিলেন:

‘সমাজের উঁচু, শাসক অংশটা ওই সিংহের মতো, যে দুর্বল পশুদের সঙ্গে মিলে শিকার করত। জমির মালিক প্রথমে উৎপন্ন ফসলের অনেক বেশি বড় একটা ভাগ নিজের জন্য নিয়ে নেয়। পুঁজিপতি তার পিছু পিছু এসে দেখিয়ে দেয়, সে-ও সমান লোভী। এই দুই শ্রেণি আজ যেভাবে আছে, ভিন্ন ধরনের সমাজে তাদের ছাড়াই চলতে পারত।’

আজকের অর্থে ‘পুঁজিবাদ’ শব্দ প্রথম ব্যবহার করেছেন বলে ধরা হয় ফরাসি ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রী লুই ব্লাঁকে, ১৮৫০ সালে। (ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রী মানে যাঁরা এক আদর্শ সমাজের স্বপ্ন দেখতেন। আর সমাজতন্ত্র হলো সেই মত, যে সম্পদের মালিকানা শ্রমিক আর সমাজের হাতে থাকা উচিত।) ব্লাঁ বলেছিলেন: ‘আমি যাকে ‘পুঁজিবাদ’ বলি, তার মানে কিছু লোক পুঁজি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়, অন্যদের বাদ দিয়ে।’
১৮৬১ সালে ফরাসি নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্রী পিয়ের-জোসেফ প্রুধোঁ তাঁর ‘War And Peace’ বইয়ে শব্দটাকে আরও ছড়িয়ে দেন: ‘এমন অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে পুঁজি, অর্থাৎ আয়ের উৎস, সাধারণত তাদের হাতে থাকে না, যারা নিজেদের শ্রমে তা চালায়।’

এই তিন সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায়, যারা প্রথম ‘পুঁজিপতি’ আর ‘পুঁজিবাদ’ বলেছিলেন, তাদের ধারণা ছিল এমন:

  • পুঁজিপতিরা একটা বাড়তি শ্রেণি, যারা শোষণ করে শ্রমিকের কাছ থেকে নিয়ে নেয়।
  • পুঁজিবাদ এমন ব্যবস্থা, যেখানে পুঁজি শ্রমিকের মালিকানায় নাই, যদিও শ্রমিকেরাই প্রায়ই নিজের খাটুনিতে তা তৈরি করে বা টিকিয়ে রাখে।

তাঁরা সবাই একমত ছিলেন, পুঁজিপতিদের হাতে নিজস্ব পুঁজি আছে, শ্রমিকদের নাই। তাই পুঁজির মালিক হওয়ার আর তা থেকে লাভ করার সুবিধা থেকে শ্রমিকেরা বাদ পড়ে। এই সংজ্ঞাদাতারা সবাই ছিলেন সমাজতন্ত্রী, আর তাঁদের মূল বোঝাপড়া একই: পুঁজিবাদে পুঁজি থাকে অল্প কয়েকজনের হাতে, আর সমাজতন্ত্রে থাকে শ্রমিক ও গোটা সমাজের হাতে। সম্ভবত এই সমাজতান্ত্রিক জন্মের কারণেই শব্দটার প্রথম একশো বছর পুঁজিপতিরা নিজেদের বা নিজেদের ব্যবস্থাকে বোঝাতে ‘পুঁজিবাদ’ বলত না। তারপর ১৯০০-র দশকের শুরুর দিকে শব্দটা ছড়াতে থাকে, আর সমাজতন্ত্রীদের বাইরের অভিধান ও বিশ্বকোষেও জায়গা পেতে শুরু করে।

অভিধানে

পুঁজিবাদের সংজ্ঞার সবচেয়ে আগের উদাহরণগুলোর একটি চেম্বার্স অভিধান। ১৮৬৭ সালে তারা ‘পুঁজিপতি’র মানে লিখেছিল ‘যার পুঁজি বা অর্থ আছে’। কিন্তু ‘পুঁজিবাদ’ শব্দটা তারা যোগ করে ১৯০৮ সালে, এই মানে দিয়ে: ‘পুঁজির অধিকারী থাকার অবস্থা; যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিপতি তৈরি করে।’
তিন বছর পর, ১৯১১ সালের বিখ্যাত এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় অর্থনীতির অর্থে ‘পুঁজি’র মানে দেওয়া হয়: ‘একজন মানুষ বা একটি সমাজের জমানো সম্পদ, যা সুদ আয় করতে আর নতুন সম্পদ বানাতে কাজে লাগানো যায়।’ কিন্তু তখনও ‘পুঁজিবাদ’ শব্দের সংজ্ঞা ছিল না। ১৯১৩ সালে ওয়েবস্টার্স অভিধান ‘পুঁজিপতি’র সংজ্ঞা দেয়: ‘যার পুঁজি আছে; যার বিনিয়োগের জন্য টাকা আছে, বা টাকা বিনিয়োগ করা আছে; বিশেষ করে বড় সম্পত্তির মালিক, যা ব্যবসায় খাটানো হয়।’ এখানেও ‘পুঁজিবাদ’ শব্দটা নাই। তার মানে, আমেরিকায় তখনও শব্দটা তেমন চালু ছিল না।

ব্যক্তিগত পুঁজি আর সরকারি পুঁজির আলাদা করে দেখা, এবং পুঁজিবাদের সঙ্গে ‘মুক্ত’ বাজারকে মেলানো, আরও কয়েক দশক পরের ঘটনা। অর্থনীতিবিদেরা নিজেরাই তখন শব্দটার পরিধি বাড়িয়ে নিচ্ছিলেন।
সহজ করে বললে: পুঁজি হলো একটা টাকা বানানোর যন্ত্র। পুঁজিপতি হলেন সেই যন্ত্রের মালিক। আর পুঁজিবাদ হলো সেই অবস্থা, যখন গোটা সমাজ এসব যন্ত্রের মালিকানা আর চালানোকে ঘিরে সাজানো, এবং বেশিরভাগ মানুষকে বাঁচার জন্য ওই যন্ত্রগুলোতেই খাটতে হয়।
তখন কেউ তর্ক তুলত না যে সরকার অর্থনীতির কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করলে, কিংবা পুঁজিপতিরা কার্টেল গড়লে বা সরকারি ঠিকা পেলে, সেটা আর পুঁজিবাদ থাকে না। (কার্টেল হলো কয়েকটি কোম্পানির জোট, যারা নিজেদের মধ্যে দাম ঠিক করে প্রতিযোগিতা কমায়।) প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে এ নিয়ে সমালোচনা হয়তো শুনতে হতো। কিন্তু তাতে কেউ পুঁজিপতি হওয়া থেকে থামত না, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অস্তিত্বও থামত না।

তাহলে শব্দটা কীভাবে একটা খারাপ শব্দ থেকে নিরপেক্ষ শব্দ হলো? তারপর কীভাবে পুঁজিপতিরা আর তাঁদের সমর্থকেরা একে নিজেদের করে নিয়ে এর মানে বাড়িয়ে দিলেন? শোষণের সঙ্গে জড়ানো এই শব্দ কীভাবে বিশ শতকে রাজনীতির ডানপন্থার কিছু অংশের কাছে স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে গেল? লেখক এর উত্তর দেবেন এই ধারাবাহিকের পরের লেখায়, ‘পুঁজিবাদ দার্শনিকদের ভাষ্যে’ (Capitalism According To The Philosophers)।
পুঁজিবাদ জন্ম নিয়েছে কর্পোরেশন আর রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িয়ে, আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার ‘পিতা’। সেই কোম্পানিই এই অঞ্চলের শাসক হয়ে বসেছিল।

বাংলার ইতিহাসে পুঁজিবাদ

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীতে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনারা বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীর মুখোমুখি হয়। ১৭৬৫ সালে ক্লাইভ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে কোম্পানির জন্য বাংলার কর ও শুল্ক আদায়ের অধিকার আদায় করেন। একে বলা হয় দেওয়ানি। অর্থাৎ একটা ব্যবসার প্রতিষ্ঠান তখন থেকে কর তোলার ক্ষমতাও পেল। কোম্পানি আর রাষ্ট্রের যে মিলনকে পুঁজিবাদের গোড়া বলা হয়, বাংলায় সেটা আক্ষরিক অর্থেই ঘটেছিল।

১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ বাংলার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয়। এর আগে ছিল মারাঠা আক্রমণ, আর সিরাজউদ্দৌলা, মীর কাসিম ও কোম্পানির নজিরবিহীন খাজনা আদায়। দুর্ভিক্ষের পরও বেঁচে থাকা মানুষের কাছ থেকে খাজনার দাবি কমাতে কোম্পানি রাজি হয়নি। মৃতের সংখ্যা প্রায়ই এক কোটির কাছাকাছি বলা হয়, মানে জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর দায় কার, তা নিয়ে মতভেদ আছে। একটি গবেষণাপত্রের মতে, কয়েকজন ব্যতিক্রম বাদে গবেষকেরা মোটামুটি মনে করেন কোম্পানি দুর্ভিক্ষ সরাসরি ঘটায়নি, তবে ত্রাণেও তেমন কিছু করেনি। ওই গবেষণাপত্রের লেখক নিজে মনে করেন, ব্রিটিশেরাই দুর্ভিক্ষ ঘটিয়েছিল।
জমিদার হলেন সেই ভূস্বামী, যিনি কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা তুলে সরকারকে দিতেন। তারপর, ১৭৯৩ সালের মার্চে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ নামের ব্যবস্থা চালু হয়। এতে জমিদার ও অন্য ভূমিধারীদের জমির নিরঙ্কুশ মালিক ঘোষণা করা হয়।

মুঘল আমলে সতেরো শতকের শুরু থেকে ঢাকা হয়ে ওঠে মসলিন (অত্যন্ত মিহি সুতির কাপড়) বোনার কেন্দ্র। কোম্পানি অঞ্চলটা দখল করার পর বাংলার বস্ত্রশিল্প ক্ষয় হতে থাকে। কোম্পানির সাবেক কর্মচারী উইলিয়াম বোল্টস ১৭৭২ সালের বই ‘Considerations on India Affairs’-এ লিখেছিলেন, তাঁতিদের জোর করে কাজের জায়গা থেকে তুলে নিয়ে ইংরেজদের কারখানায় কাপড় বোনানো হতো। বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ডের মসলিন পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের প্রধান বলেছেন, উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঢাকায় মসলিন বোনা বন্ধ হয়ে যায়।

পতনের কারণ একটা না। পরিবেশ, অর্থনীতি আর ঔপনিবেশিক শাসন, সব মিলিয়ে নানা কারণের কথা বলা হয়। সঙ্গে ছিল ইউরোপে মসলিন নকল করার চেষ্টা আর সুতা কাটার যন্ত্রের উন্নতিও। তবে, ঢাকার আশপাশে জামদানি বোনার ঐতিহ্য কিছুটা টিকে ছিল, আর ২০১৩ সালে ইউনেস্কো একে অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।


Picture of দ্য পাবলিশ

দ্য পাবলিশ

অনুসন্ধান, গল্প, প্রবন্ধ ও মুক্তচিন্তার স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম।
শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইটে লাখ লাখ হামলার চেষ্টা। ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

প্যারিসের শহরতলির এক স্কুলের ফাঁকা পদ থেকে শুরু হয়ে এক মাসে সারা দেশ। এই আন্দোলনের মুখ কারা এবং কেন।

দ্য পাবলিশ

ভারতে বাড়ছে তরুণদের ক্ষোভ, রাস্তায় নামছেন বিরোধীরা। তবু বাংলাদেশের জুলাইয়ের সঙ্গে ভারতের আন্দোলনের দূরত্ব কতটা এবং কেন?

দ্য পাবলিশ

Scroll to Top