১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে তাঁদের নাম এসেছে নজরুল ইসলাম আবদুল বশীর ও সিতি আক্তার। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী মসজিদের ভেতরে অনৈতিক বলে বর্ণিত কাজের অভিযোগে নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের গ্রেপ্তার করে, তদন্তের পর মামলা আদালতে যায়, আদালত তাঁদের তাজির নামের বিবেচনামূলক শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেন, রায় বহাল থাকে এবং রাজকীয় আদেশে দণ্ড কার্যকর হয়।
বিবৃতি যা বলে, না-বলে তার চেয়ে বেশি। ‘সক্ষম আদালত’ কথাটা আছে, আদালতের নাম নেই। ঠিক কোন কাজের অভিযোগ, কোন মসজিদ, কবে গ্রেপ্তার, এর কিছুই জানানো হয়নি। ঢাকার অবস্থান আরও অস্বস্তিকর। জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জানিয়েছে, দণ্ড কার্যকরের আগে তাদের কিছু জানানো হয়নি; খবর প্রকাশের পর তারা সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে নোট ভার্বাল পাঠিয়ে বিষয়টির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি চেয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, আটকের পর এত দ্রুত দণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা নয়, আর আটক ব্যক্তিদের পক্ষে কেউ মিশনে যোগাযোগ করেননি কেন, সেটিও প্রশ্ন হিসেবে উঠেছে।
সামাজিক মাধ্যমে আরও দুটি দাবি ঘুরছে। এক, এক পাকিস্তানি নাগরিকের মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও থেকেই মামলার সূত্রপাত। দুই, আসামিরা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ পাননি। এই লেখা তৈরির সময় সৌদি বিবৃতিতে বা আমাদের দেখা যাচাইযোগ্য কোনো প্রতিবেদনে এর কোনোটির নিশ্চিতকরণ মেলেনি। অতএব দুটিই আপাতত অভিযোগ, প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়। তবু প্রশ্ন দুটিকে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন, কারণ নথির অনুপস্থিতিটাই এখানে একটা তথ্য। আমনেস্টির মতে, বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতার অভাব ও অ-নাগরিক পরিচয়ের কারণে সৌদি আরবে বিদেশিরা ন্যায্য বিচারের পথে বাড়তি বাধার মুখে পড়েন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেথ পেনাল্টি রিসার্চ ইউনিটের প্রতিবেদন বলছে, বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ড প্রায়ই কনস্যুলার নোটিশ ছাড়া কার্যকর হয়। ২০২৫ সালে সৌদি আরবে রেকর্ড ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে (এএফপির গণনা), এবং ইউরোপীয় সৌদি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী এক বছরে সৌদি নাগরিকের চেয়ে বিদেশির সংখ্যা বেশি হওয়ার ঘটনা সেটাই প্রথম।
বাংলাদেশিদের জন্য এটা নতুন গল্পও নয়। ২০১১ সালে রিয়াদে একদিনে আটজন বাংলাদেশিকে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল। তখনও আমনেস্টি বলেছিল, সৌদি আদালতে আসামিদের প্রায়ই আইনজীবী থাকে না, আরবি ভাষায় চলা কার্যক্রম তাঁরা বুঝতেও পারেন না।
নারী শ্রমিকের হিসাব, এবং হিসাবের গোলমাল
এবার অন্য পাল্লা। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে সৌদি আরব থেকে অন্তত ১ হাজার ৩৫৩ নারী গৃহকর্মী দেশে ফিরেছেন, যাঁদের প্রায় সবাই নির্যাতনের কথা বলেছেন। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৭৩ নারীর মরদেহ দেশে এসেছে, এর ১৭৫টি সৌদি আরব থেকে। সৌদি থেকে আসা মরদেহের মধ্যে ৫১ জনের মৃত্যু আত্মহত্যা বলে চিহ্নিত। অন্যান্য দেশসহ আত্মহত্যার মোট সংখ্যা অন্তত ৮১।
আল জাজিরা ২০১৯ সালে লিখেছিল, আগের চার বছরে সৌদি আরবে অন্তত ৬৬ বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, যার ৫২টি আত্মহত্যা। ওই বছরের অগাস্টে ফেরা ১১০ জনের ওপর সরকারি সমীক্ষায় ৩৫ শতাংশ শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের কথা বলেছেন। অভিবাসী অধিকার সংগঠন ওকাপের একই আকারের নমুনায় ৬১ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন; একই সংগঠনের সাক্ষাৎকারে ৮৬ শতাংশ পূর্ণ বেতন পাননি, ১৪ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
আর সংখ্যাগুলো একে অপরের সঙ্গে মেলে না। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবরের জন্য ঢাকার প্রতিবেদনে ঢাকার দূতাবাসের হিসাব ১৩১ জনের মরদেহ ফেরা, যার ৯৮ জন আত্মহত্যা করেছেন ও পাঁচজন খুন হয়েছেন; ব্র্যাক বলছে একই সময়ে মৃতের সংখ্যা ১৫২। সূত্র, সংজ্ঞা আর সময়কাল আলাদা বলে ৬৬, ১৩১ ও ১৫২ পাশাপাশি বসানো যায় না। আত্মহত্যার সংখ্যা প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্যাতনের প্রমাণ নয়, আবার স্বাধীন তদন্ত ছাড়া উল্টোটাও প্রমাণ করা যায় না। যে রাষ্ট্র নিজের নাগরিকের মৃত্যুর একটিমাত্র সুসংগত হিসাবও রাখে না, বিচার চাওয়ার নৈতিক জোর তার ক্ষীণ হয়ে আসে।
এ চিত্র শুধু বাংলাদেশের নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধান অনুযায়ী পাঁচ বছরে সৌদি আরবে অন্তত ২৭৪ কেনিয়ান শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, এর ৫৫টি ২০২৪ সালে, আগের বছরের দ্বিগুণ। ময়নাতদন্তে আঘাত, পোড়া, বৈদ্যুতিক শকের চিহ্ন পাওয়া গেলেও কর্তৃপক্ষ মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে শ্রেণিবদ্ধ করে। সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র একই প্রতিবেদনে বলেছেন, গৃহশ্রমিকের শোষণ বা নির্যাতন পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য এবং অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়। দুই বক্তব্য পাশাপাশি রাখলে প্রশ্নটা পরিষ্কার হয়: তদন্ত হয় কি না নয়, তদন্ত কী ফল দেয়।
দুটি প্রশ্ন, দুটি আলাদা পথ
জনপ্রিয় আলোচনায় প্রশ্নটা প্রায়ই এভাবে আসে: মসজিদের পবিত্রতার জন্য মৃত্যুদণ্ড হলে গৃহকর্মীর ধর্ষণ ও মৃত্যুর বেলায় আদালত কোথায়? প্রশ্নের নৈতিক ওজন আছে। কিন্তু ‘আদালত’ শব্দটা ব্যবস্থার ভুল জায়গায় আঙুল তোলে। আদালত নিজে মামলা খুঁজে বের করে না। মক্কার ঘটনায় রাষ্ট্র নিজেই অভিযোগকারী, তাই বিচার দ্রুত ও কঠোর। গৃহকর্মীর ক্ষেত্রে অভিযোগ আদালত পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই পথ আটকে যায়, অন্তত চার জায়গায়।
প্রথমত, পালানোর শাস্তি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছিল, নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ছাড়লে শ্রমিকের বিরুদ্ধে পলাতক হিসেবে মামলা, কারাদণ্ড ও বহিষ্কারের ঝুঁকি থাকে। সৌদি আরবের আগের একটি শ্রম সংস্কার গৃহশ্রমিকদের ছুঁয়ে যায়নি, আর ২০২৩ সালের গৃহশ্রমিক বিধিমালাও কার্যকর পরিদর্শন ছাড়া শ্রম আইনের সুরক্ষার তুলনায় দুর্বল বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মূল্যায়ন।
দ্বিতীয়ত, ভাষা ও আইনজীবী। সংস্থাটি আগেই বলেছিল, সৌদি বিচারব্যবস্থা অভিবাসীদের জন্য যোগ্য অনুবাদক ও আইনজীবীর ধারাবাহিক সুযোগ দিতে ব্যর্থ। তৃতীয়ত, দালালের ভয় ও ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা। ফিরে আসা নারীরা আদালতে খুব কমই যান: তাঁরা ব্যবস্থাকে দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করেন, প্রকাশ্যে বললে কলঙ্কের ভয় পান, আর এজেন্টরা মামলা তুলে নিতে চাপ দেন। চতুর্থত, মৃত্যুর শ্রেণিবিন্যাস। মৃত্যু যদি কাগজে স্বাভাবিক হয়, ফৌজদারি মামলার ভিত্তিই তৈরি হয় না।
সৌদি আইনে খুনের দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিহতের পরিবার ক্ষমা করলে ও দিয়াত দিলে প্রাণে বাঁচতে পারেন। কিন্তু এ প্রক্রিয়া শুরু হয় খুন প্রমাণিত ও বিচারাধীন হওয়ার পর। যে মৃত্যু স্বাভাবিক বলে লেখা হয়েছে, সেখানে এই ব্যবস্থা অনুপস্থিত যে তা নয়, কখনো সক্রিয় হয় না।
এখানে আরেকটি পার্থক্য টানা দরকার। সৌদি রাষ্ট্রের প্রয়োগ আর ইসলামি আইনশাস্ত্র এক প্রশ্ন নয়। তাজিরের বিচারিক বিবেচনার সীমা নিয়ে ইসলামি আইনশাস্ত্রের ভেতরেই মতভেদ আছে। তাই প্রশ্নটা ধর্মগ্রন্থ নিয়ে নয়, প্রয়োগ আর জবাবদিহি নিয়ে।
ঢাকার দায় এবং কী চাওয়া যায়
এ গল্পে প্রেরণকারী দেশও দর্শক নয়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় আগে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছিল, পরে সেপ্টেম্বরে নিজেই তা স্বীকার করে। তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, নারীদের সৌদি আরবে কাজে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হবে না। ২০১১ সালের আটজনের শিরশ্ছেদের পর আইনবিদ শাহদীন মালিক বলেছিলেন, সৌদি আরবের ওপর বাংলাদেশের যথেষ্ট প্রভাব ছিল, আরও চেষ্টা করা উচিত ছিল।
তুলনার জন্য অন্য দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগে। ২০১৮ সালে এক ইন্দোনেশীয় নারীর মৃত্যুদণ্ড আগে না জানিয়ে কার্যকর হলে সে দেশের সংসদ সদস্যরা বাধ্যতামূলক কনস্যুলার নোটিশ চুক্তির দাবি তুলেছিলেন। ফিলিপাইন ২০১২ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি করে মজুরি বাড়াতে পেরেছিল, অথচ কেনিয়া ও উগান্ডা অন্য দেশগুলোর দাবি করা সুরক্ষা ছাড়াই চুক্তি সেরেছে। আলোচনার টেবিলে কী চাওয়া হয়, তা-ই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে কার মৃত্যুর হিসাব রাখা হবে।
মক্কার ঘটনায় প্রথম দাবি তথ্যের: অভিযোগপত্র, রায়ের নথি, গ্রেপ্তার থেকে দণ্ড পর্যন্ত সময়রেখা, আর কনস্যুলেটের সঙ্গে কখন কী যোগাযোগ হয়েছিল তার বিবরণ, সবটাই পরিবার ও জনগণের জানার কথা। সৌদি বিবৃতি যথেষ্ট নয়, ঢাকার নিজস্ব অনুসন্ধানও জরুরি। সৌদি আরবের সঙ্গে ভবিষ্যৎ যেকোনো শ্রম বা কনস্যুলার ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের আগে বাধ্যতামূলক নোটিশ, গৃহশ্রমিকের জন্য আলাদা অভিযোগ ব্যবস্থা ও ন্যূনতম মজুরির শর্ত যুক্ত করা দরকার। দেশের ভেতরে ফেরত আসা প্রতিটি মরদেহের স্বাধীন ময়নাতদন্ত, মৃত্যুর কারণভিত্তিক একক সরকারি পরিসংখ্যান, আর এজেন্সির দায় নির্ধারণও সমান জরুরি।
মক্কার দুই মৃত্যুর নথি আজও আমাদের হাতে নেই। যে মেয়েরা কফিনে ফিরে এসেছেন, তাঁদেরও পূর্ণ নথি নেই। দুই ক্ষেত্রেই অভাবটা একই: স্বচ্ছতা। ক্ষোভ ন্যায্য। কিন্তু ক্ষোভের কাজে লাগার শর্ত হলো ঠিক করা, প্রশ্নটা আসলে কাকে করা হচ্ছে, বা আদৌ করা হচ্ছে কি?