সেই মানুষটি কয়েক মাস ধরে অপেক্ষা করছেন। না না, আসলে বছরের পর বছর ধরে। একটি নির্দিষ্ট তারিখ তার মনে ভাসছে। যে তারিখে সে বাস্তবে বিদ্যমান কোনো শহর না, ডিজিটাল বিশ্বের এক রূপকথা ‘ভাইস সিটি’-তে পা রাখবেন। সেই শহরের সৈকতে ঠিক একইভাবে রোদ পড়বে, যেভাবে বাস্তব ফ্লোরিডার সৈকতে পড়ে। গাড়ি চালালে ট্র্যাফিক লাইট মেনে চলা শান্তশিষ্ট মানুষ থাকবে, আবার আইন ভাঙা উচ্ছৃঙ্খল মানুষও থাকবে। সেখানে পুলিশ থাকবে, থাকবে অপরাধী, হঠাৎ বৃষ্টি নেমে সবকিছু দিবে ভিজিয়ে। আর রাস্তার পাশের একটা রেডিও স্টেশনে হয়তো বাজবে তার চেনা কোনো গান, যা তাকে নিয়ে যাবে অতীতে। তার এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা হয়তো শেষ হতে চলেছে। সে এখন তার ঘরের সোফায় বসে আছে। হাতে কন্ট্রোলার, চোখ টিভি স্ক্রিনে স্থির, আর মনে মনে একটা তারিখ গোনা চলছেই। সেই তারিখটা কোনো জন্মদিন না, কোনো ছুটির দিনও না। রকস্টারের গেম ‘গ্র্যান্ড থেফট অটো সিক্স’ এর রিলিজ তারিখ।
একটা শহর বানাতে কত টাকা লাগে? বাস্তব শহর নয়, একটা ডিজিটাল শহর, যার প্রতিটা রাস্তা, প্রতিটা জানালা, প্রতিটা পথচারীর হাঁটার ভঙ্গি কাউকে না কাউকে বসে ডিজাইন করতে হয়েছে। উত্তরটা যতটা সহজ মনে হয়, ততটা সহজ না আসলে। কারণ যে শহরের কথা বলা হচ্ছে, সেটা গ্র্যান্ড থেফট অটো সিক্স, এবং এটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভিডিও গেম। রকস্টার গেমস বা তার মূল কোম্পানি টেক-টু ইন্টারঅ্যাক্টিভ কখনো জিটিএ সিক্স-এর সুনির্দিষ্ট নির্মাণব্যয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। এক বিলিয়ন, দেড় বিলিয়ন বা দুই বিলিয়ন ডলারের যে সংখ্যাগুলো ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়ায়, সেগুলোর প্রতিটিই বিশ্লেষকদের অনুমান, কোনো সরকারি হিসাব না।
তাহলে প্রশ্নটা আরেকটু গভীর হয়ে দাঁড়ায়। যদি একটি গেম বানাতে সত্যিই এত টাকা লাগে, তাহলে মানুষ কেন সেটা কিনতে এত মরিয়া? রকস্টার গেমস কি এমন কিছু বুঝে ফেলেছে বিনোদন ব্যবসা সম্পর্কে, যা সিনেমা বা সংগীত শিল্প এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে নাই?

একটি অপেক্ষার নাম জিটিএ সিক্স
জিটিএ ফাইভ মুক্তি পেয়েছিল ২০১৩ সালে। সেই হিসেবে জিটিএ সিক্স আসতে সময় লেগেছে প্রায় এক দশকেরও বেশি। এই দীর্ঘ বিরতির একটা বড় কারণ হলো, জিটিএ ফাইভ নিজেই কখনো সত্যিকার অর্থে “শেষ” হয়নি। গেমটি একাধিকবার নতুন কনসোল প্রজন্মের জন্য পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে, আর এর মাল্টিপ্লেয়ার সংস্করণ জিটিএ অনলাইন বছরের পর বছর ধরে নতুন কন্টেন্ট পেয়ে গেছে। টেক-টু-এর প্রধান নির্বাহী স্ট্রস জেলনিক নিজেই জানিয়েছেন যে জিটিএ অনলাইন-এ তাদের ফলাফল ছিল দুর্দান্ত, আর সাবস্ক্রিপশন সেবা জিটিএপ্লাস এর সদস্যপদ বছরে বছরে ২০ শতাংশ বেড়েছে, আর জিটিএ ফাইভ বিক্রি হয়েছে ২২ কোটির বেশি কপি। অর্থাৎ রকস্টারের তাড়াহুড়ো করার কোনো কারণ ছিল না। যে গেমটা দশ বছর পরেও কোটি কোটি ডলার আয় করে যাচ্ছে, তার উত্তরসূরি বানাতে দেরি হলে ক্ষতি কী?
তবে এই দেরি একেবারে বিনা মূল্যে আসেনি। জিটিএ সিক্স মূলত ২০২৫ সালের শরৎকালে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। এরপর তারিখ পিছিয়ে যায় ২০২৬ সালের মে মাসে। তারপর গত নভেম্বরে রকস্টার আবার ঘোষণা দেয়, এবার তারিখ পিছিয়ে ১৯ নভেম্বর, ২০২৬। কোম্পানির ভাষায়, “আমরা দুঃখিত যে আমরা এমন একটি অপেক্ষায় আরও সময় যোগ করছি, যা এমনিতেই দীর্ঘ ছিল, কিন্তু এই বাড়তি মাসগুলো গেমটিকে সেই মানের পরিমার্জন দেবে, যা আপনারা প্রত্যাশা করেন এবং প্রাপ্য।”
দুইবারের এই বিলম্ব নিয়ে যতটা হতাশা তৈরি হয়েছিল, ততটাই আগ্রহ তৈরি হয়েছিল ২০২২ সালে, যখন গেমটির বিপুল পরিমাণ ফুটেজ ফাঁস হয়ে যায় ইন্টারনেটে। সেই লিকেই প্রথম জানা যায়, এবার একজন নারী চরিত্র প্রধান নায়িকা হিসেবে থাকবেন, যা পরবর্তীতে অফিসিয়াল ট্রেলারে নিশ্চিত হয়। দ্বিতীয় ট্রেলারটি প্রকাশের পর তা ইন্টারনেটে ঝড় তোলে এবং কোটি কোটি মানুষের দেখা হয়। এত বড় জনমনোযোগ ধরে রাখার জন্য রকস্টার খুব বেশি বিজ্ঞাপন খরচ করে না। তারা জানে, নীরবতাই তাদের সবচেয়ে বড় প্রচার কৌশল। এই কারণেই জিটিএ সিক্স শুধু একটি ভিডিও গেম রিলিজ না। বিনোদন ব্যবসা এবং পপ-কালচারের এক জায়গায় মিলে যাওয়া একটি ঘটনা।

একটা গেম বানাতে এত টাকা কোথায় যায়
আধুনিক একটি বড় বাজেটের ভিডিও গেম, যাকে শিল্পের ভাষায় বলা হয় AAA গেম, তৈরি করতে যে পরিমাণ মানুষ এবং সময় লাগে, তা প্রায় একটা মাঝারি আকারের সিনেমার শিল্পের সমান। এখানে হাজারো মানুষের বছরের পর বছরের শ্রম জড়িত থাকে। বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা একাধিক স্টুডিও একসাথে কাজ করে, কারণ একটা একক স্টুডিওর পক্ষে এত বড় প্রকল্প একা সামলানো অসম্ভব। এর ভেতরে থাকে গেম ইঞ্জিন তৈরি বা উন্নয়নের কাজ, যা কোনো সাধারণ সফটওয়্যার নয়, বরং একটা পুরো ভার্চুয়াল পদার্থবিজ্ঞান এবং আলো-ছায়ার ব্যবস্থা। অভিনয়ের অংশটাও এখন প্রায় সিনেমার মতোই জটিল। মোশন ক্যাপচার এবং পারফরম্যান্স ক্যাপচার প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিনেতাদের শারীরিক নড়াচড়া এবং মুখের অভিব্যক্তি রেকর্ড করে সেটাকে ডিজিটাল চরিত্রে রূপান্তর করা হয়। লেখক, শিল্পী, অ্যানিমেটর, প্রোগ্রামার এবং সাউন্ড ডিজাইনার, প্রত্যেকের কাজ আলাদা হলেও একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।
তারপর আছে একটা গোটা ওপেন ওয়ার্ল্ড নির্মাণের কাজ। গাড়ি, রাস্তা, ভবন, ঘরের ভেতরের অংশ, এমনকি একটা দোকানের ভেতরের তাকের সাজানো জিনিসপত্র পর্যন্ত কাউকে না কাউকে বানাতে হয়েছে। শত শত ভার্চুয়াল মানুষ, যাদের গেমিং পরিভাষায় বলা হয় এনপিসি, তাদের আচরণ যেন বাস্তবসম্মত মনে হয়, সেজন্য থাকে জটিল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা। একটা গাড়ি দুর্ঘটনার পর কীভাবে ভেঙে পড়বে, একটা কাচ কীভাবে ভাঙবে, এসবের পেছনে থাকে আলাদা আলাদা ফিজিক্স ইঞ্জিন। এই বিশাল সিস্টেম তৈরি হওয়ার পরেও কাজ শেষ হয় না। থাকে কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স, অর্থাৎ গেমটির প্রতিটি কোণে কোনো ত্রুটি আছে কিনা তা খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া। থাকে সাইবার নিরাপত্তা এবং ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা। থাকে বিশ্বব্যাপী বিপণন এবং বিতরণ পরিকল্পনা। আর গেমটি বাজারে আসার পরেও চলতে থাকে অনলাইন অবকাঠামো এবং নতুন কন্টেন্টের কাজ।
একটা সহজ তুলনা করা যায়। সিনেমায় একজন দর্শক একটা পৃথিবী দেখেন। ভিডিও গেমে একজন প্লেয়ার সেই পৃথিবীর ভেতরে হেঁটে বেড়ান, সেটাকে স্পর্শ করেন, বদলে দেন। সিনেমা একটি পৃথিবী দেখায়। ভিডিও গেম সেই পৃথিবীর দরজা খুলে দেয়। সেই দরজা খোলার জন্যই লাগে এত বেশি প্রযুক্তি, শ্রম এবং অর্থ। কারণ একটা দৃশ্য একবার শুট করলেই চলে না, বরং সেই দৃশ্যের প্রতিটি সম্ভাব্য পরিবর্তন, প্রতিটি কোণ থেকে দেখার সম্ভাবনা আগে থেকে তৈরি করে রাখতে হয়।

রকস্টার আসলে কারা
রকস্টার গেমস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালে, টেক-টু ইন্টারঅ্যাক্টিভ-এর একটি লেবেল হিসেবে। এর আগে ছিল ব্রিটিশ স্টুডিও DMA Design, যারা মূলত তৈরি করেছিল ‘গ্র্যান্ড থেফট অটো’-র প্রথম সংস্করণটি, একটা টপ-ডাউন দৃষ্টিকোণের সাধারণ অপরাধ থিমের গেম, যার সঙ্গে আজকের জিটিএ সিক্স-এর তুলনা করাই কঠিন।
স্যাম হাউজার এবং তার সহযোগীরা মিলে রকস্টারকে গড়ে তোলেন এমন একটা কোম্পানি হিসেবে, যেটা নিজেকে প্রচলিত ভিডিও গেম কোম্পানির থেকে আলাদা ভাবত। তারা গেমকে শুধু বিনোদন না, বরঞ্চ একটা সাংস্কৃতিক বিবৃতি হিসেবে দেখত। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তাদের গেমগুলো বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে পড়েছে। সহিংসতা, অশ্লীলতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের অভিযোগ নিয়ে একাধিকবার রাজনীতিবিদ এবং সংবাদমাধ্যমের সমালোচনার মুখে পড়েছে জিটিএ সিরিজ। কিন্তু বিচিত্রভাবে, এই বিতর্কই সিরিজটাকে আরও বেশি পরিচিত করে তুলেছে।
আসল পরিবর্তনটা আসে ২০০১ সালে, গ্র্যান্ড থেফট অটো থ্রি দিয়ে। এই গেমটাই মূলত ওপেন ওয়ার্ল্ড গেমিং-এর ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলে, যেখানে খেলোয়াড় একটা নির্দিষ্ট গল্পের রেখায় বাঁধা না থেকে স্বাধীনভাবে একটা শহর ঘুরে বেড়াতে পারেন। এরপর একে একে এলো ভাইস সিটি, সান অ্যান্ড্রেয়াস, জিটিএ ফোর, এবং সেই সাথে রকস্টার-এর অন্য বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি রেড ডেড রিডেম্পশন। তারপর এলো ২০১৩ সাল, যখন মুক্তি পায় জিটিএ ফাইভ, একটা গেম যেটা এখনো পর্যন্ত বিনোদন শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আয় করা পণ্যগুলোর একটি। এর মোট আয় দশকজুড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়। এরপর ২০১৮ সালে আসে ‘রেড ডেড রিডেম্পশন টু’, যা আরেকবার প্রমাণ করে রকস্টার প্রযুক্তিগত এবং শৈল্পিক দিক থেকে ঠিক কতটা এগিয়ে।
এই পুরো যাত্রায় একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট। অন্যান্য অনেক গেমিং কোম্পানি বছরে একাধিক গেম প্রকাশ করে, বাজারে প্রাসঙ্গিক থাকার জন্য। রকস্টার করে উল্টো। তারা অপেক্ষা করে। কম গেম বানায়। কিন্তু প্রতিটি গেমকে এমনভাবে তৈরি করে, যাতে সেটা শুধু একটা পণ্য না হয়ে একটা সাংস্কৃতিক মুহূর্তে পরিণত হয়। এই কৌশলটাই তাদের এমন একটা অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে পুরো একটা জেনারেশন তাদের পরবর্তী গেমের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে রাজি। কিন্তু, জিটিএ সিরিজ কখনোই শুধু অপরাধ আর গাড়ি চালানোর গেম ছিল না। এর গভীরে থাকে আমেরিকান সংস্কৃতি, পুঁজিবাদ এবং ভোগবাদের প্রতি একটা তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। রেডিও স্টেশনের বিজ্ঞাপন, ভুয়া টিভি চ্যানেল, রাজনীতিবিদদের প্যারোডি, এসবের মধ্য দিয়ে গেমটা আসলে আমেরিকান সমাজের একটা বিকৃত প্রতিফলন তৈরি করে।
এখন প্রশ্ন হলো, জিটিএ সিক্স কি এমন এক সময়ে আসছে, যখন বাস্তব জীবন নিজেই এই ব্যঙ্গের মতো হয়ে উঠেছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে খ্যাতি অর্জনের যে অস্থির, প্রায়ই অযৌক্তিক পথ, ইনফ্লুয়েন্সার অর্থনীতির উত্থান, ফ্লোরিডার সেই বিশেষ সাংস্কৃতিক ভাবমূর্তি যেখানে অদ্ভুত অপরাধের খবর এক ধরনের হাস্যরসে পরিণত হয়, এসবই যেন আগে থেকেই জিটিএ-র জগতের মতো। গেমের কাল্পনিক রাজ্য Leonida এবং তার ভেতরের ভাইস সিটি আসলে বাস্তব ফ্লোরিডারই একটা বিকৃত, অতিরঞ্জিত প্রতিচ্ছবি। এই কল্পিত জগতটাই এখন সবচেয়ে আকর্ষণীয়, কারণ এটা বাস্তবতার থেকে যতটা দূরে বলে মনে হয়, ততটা দূরে হয়তো আসলে না।

পৃথিবীর গেমিং বাজার কতটা বড়
সংখ্যাগুলো দেখলে বোঝা যায়, কেন একটা কোম্পানি একটা গেমের পেছনে বিলিয়ন ডলার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান Newzoo-র হিসাবে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক গেমিং বাজারের আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ২১৩.৯ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬.১ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধির একটা বড় অংশ আসবে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
খেলোয়াড়ের সংখ্যা নিয়ে কথা বললে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৭০ কোটি মানুষ ভিডিও গেম খেলবে ২০২৬ সালে, যাদের বেশিরভাগই মোবাইল ফোনে খেলেন। মোবাইল গেমিং এখনো এই শিল্পের সবচেয়ে বড় এবং দ্রুত বর্ধনশীল অংশ, তবে কনসোল গেমিং, যেখানে জিটিএ সিক্স-এর মতো গেম মুক্তি পায়, তার নিজস্ব একটা আলাদা অর্থনীতি আছে। বিশ্লেষক মিখিল বাইসম্যান জানান, শুধু জিটিএ সিক্স-এর কারণেই ২০২৬ সালে কনসোল রাজস্ব প্রায় ৫.১ শতাংশ বেড়ে ৪৬.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, আর এই একটা গেম ছাড়া কনসোল আয় আসলে কমে যেত। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এখনো খেলোয়াড় সংখ্যায় সবচেয়ে বড়, আর চীন ও যুক্তরাষ্ট্র মিলিয়ে বৈশ্বিক ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি দখল করে আছে।
এই বাজারের শীর্ষে যে কোম্পানিগুলো আছে, তাদের ব্যবসার ধরন একেবারেই আলাদা। Tencent চীনের বৃহত্তম প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একটি, যাদের গেমিং আয় মূলত মোবাইল এবং অনলাইন গেম থেকে আসে। ২০২৫ সালে তাদের গেমিং রাজস্ব ছিল প্রায় ৩৩.৬ বিলিয়ন ডলার। Sony তাদের PlayStation হার্ডওয়্যার এবং একচেটিয়া ব্লকবাস্টার গেমের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা চালায়। Microsoft Activision Blizzard কিনে নেওয়ার পর গেমিংকে দেখছে সাবস্ক্রিপশন, ক্লাউড এবং একটা বৃহত্তর ইকোসিস্টেমের অংশ হিসেবে, যার কেন্দ্রে আছে তাদের গেম পাস সেবা। Nintendo দাঁড়িয়ে আছে নিজস্ব চরিত্র এবং হার্ডওয়্যার ইকোসিস্টেমের ওপর।
রকস্টার এদের কারো মতোই না। তারা বছরে অনেক গেম বানায় না, মোবাইল বাজারে তেমন সক্রিয়ও না। কিন্তু অল্প সংখ্যক গেম দিয়ে তারা এমন কালচারাল প্রভাব তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে, যুগ যুগ ধরে।
মানুষ কেন একটা ভার্চুয়াল গেমে টাকা ঢালে
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অর্থনীতিতে নাই। আছে মানুষের মনস্তত্ত্বে। একটা ভিডিও গেম মানুষকে এমন একটা জায়গা দেয়, যেখানে তার নিয়ন্ত্রণ আছে। বাস্তব জীবনে যা করা যায় না, একটা গাড়ি চুরি করা, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালানো, একটা পুরো শহরকে নিজের মতো ঘুরে বেড়ানো, সেই স্বাধীনতার আকর্ষণ অনেক গভীর। এটা এক ধরনের পলায়ন, কিন্তু নিরাপদ পলায়ন, যেখানে ফলাফলের কোনো বাস্তব ঝুঁকি নাই। কিন্তু জিটিএ অনলাইন-এর মতো গেমে মানুষ যা কিনছে, তা আসলে শুধু একটা গেম না। তারা কিনছে একটা সময়, যা তারা একটা কমিউনিটির সাথে কাটাতে পারবে। তারা কিনছে একটা পরিচয়, যেটা তাদের নিজস্ব চরিত্র, তার পোশাক, তার গাড়ি, তার অর্জনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। তারা কিনছে একটা অবস্থান, যা তাদের বন্ধুদের কাছে দেখানো যায়। এই কারণেই ভার্চুয়াল কারেন্সি, ইন-গেম কেনাকাটা, সাবস্ক্রিপশন এবং প্রসাধনী আইটেম এত ভালো ব্যবসা করে। মানুষ বাস্তব অর্থ দিয়ে এমন জিনিস কেনে, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নাই, কারণ সেই জিনিসটা তার ডিজিটাল জীবনে সামাজিক মর্যাদা বা আনন্দ তৈরি করে। এটা অনেকটা মানুষ কেন একটা ব্র্যান্ডেড পোশাক কেনে, সেই যুক্তির সাথে মিলে, শুধু জায়গাটা ভিন্ন।
সিনেমা এবং ভিডিও গেমের ব্যবসায়িক কাঠামো তুলনা করলে দেখা যায়, দুটো আসলে সম্পূর্ণ ভিন্ন যুক্তিতে চলে। একটা সিনেমার দর্শক একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টিকিট কেনেন অথবা একটা সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে দেখেন। সময়টা সীমিত, সাধারণত দুই থেকে তিন ঘণ্টা। একটা ভিডিও গেমের ক্ষেত্রে খেলোয়াড় হয়তো শত শত ঘণ্টা ব্যয় করেন। তার সাথে যুক্ত থাকে বেস গেম কেনার খরচ, তারপর ডাউনলোডযোগ্য কনটেন্ট, অনলাইন অর্থনীতি, সাবস্ক্রিপশন এবং ভার্চুয়াল মুদ্রা। তাই বলা যায়, সিনেমা মূলত একটা গল্প বিক্রি করে। গেম কোম্পানি বিক্রি করে একটা জায়গা, যেখানে মানুষ ফিরে ফিরে যেতে চায়। একটা সিনেমা একবার দেখার পর শেষ হয়ে যায়। একটা গেমের শহর কখনো শেষ হয় না, সময়ের সাথে বদলাতে থাকে।
যখন একটা গেমের পেছনে এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, তখন ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ঝুঁকির প্রকৃত রূপ দেখা গেছে গেমিং শিল্পের ব্যাপক ছাঁটাইয়ের মধ্য দিয়ে। ২০২৪ সালের প্রথম কোয়ার্টারেই প্রায় ৮,৬০০-র বেশি কর্মী চাকরি হারান, যা গেমিং ইতিহাসে একক কোয়ার্টারে সর্বোচ্চ। এই ছাঁটাইয়ের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। মহামারির সময় গেমিং শিল্পে যে অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, তার পরে বাজার স্বাভাবিক হতে গিয়ে সংকোচন ঘটে। AAA গেম তৈরির খরচ ক্রমাগত বাড়তে থাকে, এবং কিছু বড় ফ্র্যাঞ্চাইজির খরচ মার্কেটিং সহ ৫০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানা যায়। ২০২৫ সালেও এই ধারা অব্যাহত থাকে, যেখানে Microsoft, Sony, EA, Ubisoft, টেক-টু-সহ প্রায় প্রতিটি বড় কোম্পানিতেই ছাঁটাই হয়।
এই পরিস্থিতিতে একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠে আসে। ভিডিও গেম শিল্প কি এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সবচেয়ে বড় গেমগুলো বানানোর সামর্থ্য কেবল হাতে গোনা কয়েকটা কোম্পানির থাকবে? যদি তাই হয়, তাহলে এর ফলাফল শুধু অর্থনৈতিক না, সাংস্কৃতিকও। কারণ ছোট এবং মাঝারি বাজেটের স্টুডিওগুলোর হারিয়ে যাওয়া মানে সৃজনশীলতার বৈচিত্র্যও কমে আসা।

জিটিএ সিক্স-এর ব্যবসায়িক যুক্তি এবং আপনার একটি ছোট্ট প্রশ্ন
এখন প্রশ্ন জাগতেই পারে যে, এত বিশাল বিনিয়োগের পেছনে রকস্টার এবং টেক-টু-এর আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি কী?
প্রথমত, জিটিএ ফাইভ-এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য। এক দশকেরও বেশি সময় পরে এখনো এই গেমটি ৩৭টি বাজারে গড়ে ১৩.৮ শতাংশ খেলোয়াড় শেয়ার ধরে রেখেছে, যা প্রমাণ করে একটা বিশাল প্রস্তুত দর্শকগোষ্ঠী জিটিএ সিক্স-এর জন্য অপেক্ষা করছে। দ্বিতীয়ত, জিটিএ অনলাইন থেকে আসা নিয়মিত আয়, যা একটা একক গেমকে বছরের পর বছর ধরে একটা চলমান ব্যবসায় পরিণত করেছে। প্রি-অর্ডারের চাহিদাও রেকর্ড মাত্রায় বলে জানা গেছে। জিটিএ সিক্স-এর দাম নির্ধারিত হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড সংস্করণের জন্য ৭৯.৯৯ ডলার এবং আলটিমেট সংস্করণের জন্য ৯৯.৯৯ ডলার, যা এই প্রজন্মের বেশিরভাগ বড় গেমের ৭০ ডলার দামের চেয়ে বেশি। টেক-টু-র প্রধান নির্বাহী জেলনিক অবশ্য নিশ্চিত করেছেন, দাম বেশি হলেও গেমের ভেতরে কোনো বিজ্ঞাপন থাকবে না।
আবার সেই প্রথম প্রশ্নে ফিরে যাওয়া যাক। একটা শহর বানাতে কত টাকা লাগে? এতক্ষণ যা পড়া হলো, তার পরেও আসল উত্তরটা কোনো সংখ্যায় ধরা পড়ে না। জিটিএ সিক্স-এর প্রকৃত মূল্য শুধু তার বাজেট দিয়ে বোঝা সম্ভব না। এই মূল্য তৈরি হয় প্রযুক্তি দিয়ে, হাজারো মানুষের শ্রম দিয়ে, খেলোয়াড়দের সময় এবং মনোযোগ দিয়ে, একটা কমিউনিটির অস্তিত্ব দিয়ে, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, একটা কাল্পনিক পৃথিবীতে প্রবেশ করার মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। রকস্টার একটা গেম বিক্রি করছে না। তারা বিক্রি করছে একটা সম্ভাবনা, যেখানে মানুষ নিজের বাস্তব জীবনের বাইরে গিয়ে অন্য একটা জীবন যাপন করতে পারে, কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও। যদি কোটি কোটি মানুষ সত্যিই একটা কল্পিত শহরে বাস করতে চায়, বছরের পর বছর ধরে, নিজের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের টাকা খরচ করে, তাহলে সেটা আসল পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের কী বলে? ●
এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত জিটিএ সিক্স-এর মুক্তির তারিখ, দাম এবং প্ল্যাটফর্ম তথ্য রকস্টার গেমস ও টেক-টু ইন্টারঅ্যাক্টিভ থেকে অফিসিয়ালি নিশ্চিত। তবে জিটিএ সিক্স-এর নির্মাণ বাজেট সংক্রান্ত ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের যে সংখ্যাগুলো এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণভাবে শিল্প বিশ্লেষকদের অনুমান। রকস্টার বা টেক-টু কখনো কোনো গেমের সুনির্দিষ্ট নির্মাণব্যয় প্রকাশ করে না, এবং জিটিএ সিক্স-ও এর ব্যতিক্রম না।