অগাস্টের শেষ দিকে হাঙ্গেরির দক্ষিণে সিগেৎভার নামের ছোট্ট এক দুর্গের সামনে যখন প্রায় লক্ষাধিক উসমানীয় সৈন্য জড়ো হয়েছিল, তখন দুর্গের ভেতরে ছিল মাত্র কয়েক হাজার ক্রোয়েশীয় ও হাঙ্গেরীয় সৈনিক। সংখ্যার হিসেবে লড়াইটা অসম, প্রায় হাস্যকর রকমের অসম। অথচ এই ছোট্ট দুর্গ দখল করতেই উসমানীয় বাহিনীর লেগে গিয়েছিল একটা পুরো মাস, আর সেই এক মাসের মধ্যেই, দুর্গ পতনের ঠিক আগমুহূর্তে, নিজের শিবিরতাঁবুতে মারা যান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে দীর্ঘ শাসনকালের অধিকারী সুলতান সুলেমান। বয়স তখন একাত্তর বছর ছুঁইছুঁই, শরীর জুড়ে বাতের যন্ত্রণা, তবু নিজে হাতে নেতৃত্ব দিতে তিনি ছাড়েননি এই শেষ অভিযানের।
সুলতান সুলেমানের মৃত্যুর তারিখ নিয়ে ইতিহাসবিদরা আজও পুরোপুরি ঐকমত্য হতে পারেন নাই। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা লিখেছে তিনি মারা যান ১৫৬৬ সালের ৫ অথবা ৬ সেপ্টেম্বরে, সিগেৎভারের কাছেই স্বাভাবিক কারণে। কিন্তু, তুরস্কের সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহ-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে তিনি মারা যান ৭ সেপ্টেম্বর, দুর্গ পতনের ঠিক একদিন আগে। একই সংবাদমাধ্যমের আরেকটি পুরনো প্রতিবেদনেও ৭ সেপ্টেম্বরের রাতের কথাই বলা হয়েছে। এই তারিখের গোলযোগ আকস্মিক না, এটা নিজেই একটা গল্প বলে। কারণ সুলতানের মৃত্যুর খবর সেই মুহূর্তে কাউকে জানতে দেওয়া হয় নাই, এমনকি নিজের সেনাবাহিনীকেও না, আর যে ঘটনা গোপন রাখা হয়, তার সঠিক সময় নিয়ে ইতিহাসের নথিতে বিভ্রান্তি থেকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
সুলতান মারা যাওয়ার পরও যুদ্ধ থামেনি। গ্র্যান্ড ভিজিয়ার সোকুল্লু মেহমেদ পাশা তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর সাক্ষী হওয়া সবাইকে হত্যা করার নির্দেশ দেন, আর রটিয়ে দেন যে সুলতান কেবল অসুস্থ, সেরে উঠছেন তাঁবুতেই। সুলতানের মৃতদেহ সংরক্ষণ করে সেনাবাহিনীকে দুর্গ জয়ের কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয়, আর তাঁর নামে একের পর এক জাল ফরমান জারি করা হতে থাকে, এমনকি প্রতিদিন সন্ধ্যায় লাশের সামনে রাষ্ট্রীয় নথি রেখে কাল্পনিক অনুমোদন নেওয়ার আচারও পালিত হয়। প্রায় আটচল্লিশ দিন পর্যন্ত এই নাটক চলে, যতক্ষণ না উত্তরাধিকারী শাহজাদা সেলিম বেলগ্রেডে পৌঁছে আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসনে বসার প্রস্তুতি নেন। একজন মানুষ মারা গেছেন, কিন্তু একটা সাম্রাজ্য থেমে থাকতে পারে না, এই সহজ সত্যটাই যেন সুলেমানের গোটা জীবনের একটা রূপক হয়ে দাঁড়ায়। কারণ তিনি নিজেও ছিলেন এমন একটা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, যা ব্যক্তির চেয়ে বড়, যার ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই ছিল সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব।

শাহজাদার জন্ম ও সাম্রাজ্যের প্রস্তুতি
সুলেমানের জন্ম নিয়েও পুরোপুরি নিশ্চিত তারিখ পাওয়া যায় না। ব্রিটানিকার সংক্ষিপ্ত জীবনীতে লেখা আছে তাঁর জন্ম নভেম্বর ১৪৯৪ থেকে এপ্রিল ১৪৯৫-এর মধ্যে কোনো এক সময়ে। ওয়ার্ল্ড হিস্টরি এনসাইক্লোপিডিয়াও একই অনিশ্চয়তার কথা বলে, তবে ট্রাবজোন শহরেই যে তাঁর জন্ম, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নাই, কারণ তখন তাঁর বাবা সেলিম সেখানকার প্রাদেশিক গভর্নর। কৃষ্ণসাগরের তীরের এই বহুজাতিক, বহুধর্মীয় শহরেই কাটে তাঁর শৈশব, এমন এক পরিবেশে যেখানে সচ্ছলতার পাশাপাশি সংক্রামক রোগ আর খাদ্যসংকটও ছিল নিত্যসঙ্গী।
উসমানীয় রাজপরিবারে উত্তরাধিকার কখনোই স্বয়ংক্রিয় ছিল না। বাবার মৃত্যুর পর কে সিংহাসনে বসবেন, তা প্রায়ই নির্ধারিত হতো যুদ্ধক্ষেত্রে, ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। সুলেমান নিজে ছিলেন সেলিমের একমাত্র পুত্র, তাই এই প্রথাগত রক্তক্ষয়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাঁকে ছুঁতে পারে নাই। ১৫২০ সালের সেপ্টেম্বরে বাবা সেলিমের মৃত্যুর পর মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে তিনি সিংহাসনে বসেন, এমন একটা সময়ে যখন তিনি ইতিমধ্যেই ক্রিমিয়ার কাফা আর পশ্চিম আনাতোলিয়ার মানিসায় প্রাদেশিক গভর্নর হিসেবে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছেন। আরবি, ফার্সি ও তুর্কি ভাষায় দক্ষতা, গণিত-জ্যোতির্বিজ্ঞানের শিক্ষা, আর কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ, এই সবকিছু মিলিয়ে তরুণ সুলেমান সিংহাসনে বসার আগেই ছিলেন একজন প্রস্তুত শাসক।
কিন্তু যে সাম্রাজ্য তিনি হাতে পেলেন, সেটা তাঁর নিজের তৈরি না। তাঁর বাবা প্রথম সেলিম মাত্র আট বছরের শাসনে ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন। ১৫১৪ সালে চালদিরানের যুদ্ধে সাফাভিদ পারস্যকে পরাস্ত করে আনাতোলিয়ায় তাদের বিস্তার থামিয়ে দেন সেলিম, এরপর দক্ষিণে ঘুরে ১৫১৬ থেকে ১৫১৭ সালের মধ্যে মিশর ও সিরিয়ার মামলুক সালতানাত জয় করে নেন। এই একটিমাত্র অভিযানে সাম্রাজ্যের আয়তন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, আর ইস্তানবুলের রাজকোষে যুক্ত হয় বিপুল রাজস্ব। অর্থাৎ সুলেমান যখন সিংহাসনে বসলেন, তখন তাঁর হাতে ছিল একটা আর্থিকভাবে সচ্ছল, ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত এবং সামরিকভাবে আত্মবিশ্বাসী সাম্রাজ্য। প্রশ্ন ছিল, এই ভিত্তির ওপর তিনি নতুন কী গড়বেন।

বেলগ্রেড থেকে ভিয়েনা
সিংহাসনে বসার পরের বছরগুলোতে সুলেমান একের পর এক অভিযানে নামেন, তবে প্রতিটি অভিযানের পেছনে ছিল আলাদা আলাদা কৌশলগত যুক্তি। ১৫২১ সালে তিনি দখল করেন বেলগ্রেড, যে দুর্গ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মধ্য ইউরোপের প্রবেশদ্বার হিসাবে খ্যাত ছিল। এর পরের বছর, ১৫২২ থেকে ১৫২৩ সালের মধ্যে পতন হয় রোডস দ্বীপের, যা ছিল নাইটস অব সেন্ট জনের ঘাঁটি এবং ভূমধ্যসাগরে উসমানীয় নৌচলাচলের জন্য দীর্ঘদিনের কাঁটা। বেলগ্রেড আর রোডস, এই দুটো বিজয় একসঙ্গে মিলিয়ে সুলেমানকে দিয়েছিল স্থল ও জলপথে ইউরোপের দিকে অগ্রসর হওয়ার নিরাপদ দরজা।
১৫২৬ সালে আসে মোহাচের যুদ্ধ, যেখানে হাঙ্গেরির রাজা দ্বিতীয় লুইয়ের বাহিনী চূর্ণ হয়ে যায়, রাজা নিজেও যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারান। এই একটি যুদ্ধ হাঙ্গেরির রাজনৈতিক কাঠামোকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়, হ্যাবসবার্গ অস্ট্রিয়া, উসমানীয় সাম্রাজ্য আর হাঙ্গেরীয়-ক্রোয়েশীয় রাজপরিবারগুলোর মধ্যে শুরু হয় দীর্ঘ উত্তরাধিকার সংকট, যার ফলে হাঙ্গেরির বড় অংশ চলে আসে উসমানীয় নিয়ন্ত্রণে। মোহাচের পরের বছরগুলোয় হাঙ্গেরির সিংহাসন নিয়ে হ্যাবসবার্গদের ফের্দিনান্দ প্রথম আর উসমানীয়-সমর্থিত ইয়ানোশ জাপোলিয়ার মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়, আর সেই বিরোধ থেকেই জন্ম নেয় সুলেমানের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী অভিযান, ১৫২৯ সালের ভিয়েনা অবরোধ।
সংখ্যার হিসাবে এই অভিযান ছিল বিশাল, এক লক্ষেরও বেশি সৈন্য নিয়ে সুলেমান অগ্রসর হন হ্যাবসবার্গ রাজধানীর দিকে। কিন্তু আবহাওয়া তাঁর পক্ষে থাকে না। সে বছর বসন্ত ও গ্রীষ্ম ছিল অস্বাভাবিক বৃষ্টিবহুল, ফলে ভারী কামান কাদায় আটকে যায়, বহু সৈন্য অসুস্থ হয়ে পড়ে, আর যখন সেপ্টেম্বরে সুলেমান শহরের দেয়ালের কাছে পৌঁছান, তাঁর বাহিনী তখন যথেষ্ট দুর্বল। অক্টোবরের শেষে, ঠান্ডা আর রসদ সংকটের মুখে সুলেমান পিছু হটতে বাধ্য হন। এই ব্যর্থতা কোনো একক যুদ্ধের হার ছিল না, বরঞ্চ তা চিহ্নিত করে দেয় মধ্য ইউরোপে উসমানীয় সম্প্রসারণের একটা সীমারেখা, যে সীমারেখা পরের দেড়শ বছরেও তেমন নড়ে নাই।
ইউরোপে যখন এই টানাপোড়েন চলছে, পূর্ব দিকে সুলেমান জড়িয়ে পড়েন শিয়া সাফাভিদ পারস্যের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে। এই লড়াই কেবল সীমান্ত বিরোধ ছিল না, ছিল সুন্নি-শিয়া রাজনৈতিক বৈধতার লড়াইও। এই সংঘাতের সূত্র ধরেই বাগদাদ ও ইরাক আসে উসমানীয় নিয়ন্ত্রণে, আর ভূমধ্যসাগরে বারবারোসা হায়রেদ্দিন পাশার নেতৃত্বে উসমানীয় নৌবহর উত্তর আফ্রিকার প্রধান বন্দরগুলো একের পর এক দখল করে নেয়, কিছু সময়ের জন্য পুরো ভূমধ্যসাগরেই উসমানীয় রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সুলেমানের শাসনকাল শেষ হওয়ার সময় সাম্রাজ্যের প্রভাব বিস্তৃত ছিল হাঙ্গেরি থেকে ইয়েমেন, আর আলজেরিয়া থেকে ইরাক পর্যন্ত, ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা তিন মহাদেশ জুড়ে ছিল সুলেমানের সাম্রাজ্য।
দুটো নাম, দুটো ভাষ্য
ইউরোপ তাঁকে ডাকত “দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট” নামে, একটা উপাধি যা তাঁর সামরিক জয়, রাজকীয় জাঁকজমক আর ইউরোপীয় রাজদরবারগুলোর ওপর তাঁর প্রভাবকে ইঙ্গিত করে। কিন্তু উসমানীয় বিশ্বে তিনি অনেক বেশি পরিচিত ছিলেন অন্য একটা নামে, কানুনি, অর্থাৎ আইনপ্রণেতা। ঐতিহাসিকদের একটা অংশের মতে এই উপাধি প্রথম ব্যবহার করেন রোমানীয় ইতিহাসবিদ দিমিত্রিয়ে কান্তেমির, আর তুর্কি ভাষাভাষীদের মধ্যে এই নাম সুলেমানের নিজের নামের চেয়েও বেশি প্রচলিত হয়ে ওঠে।
এই দুটো নামের মধ্যে ফারাকটা শুধুই ভাষাগত না। ইউরোপের কাছে “ম্যাগনিফিসেন্ট” মানে জাঁকজমক, বিজয় আর ভয়। উসমানীয় প্রজাদের কাছে “কানুনি” মানে শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার আর প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ভবনে ইতিহাসের তেইশজন মহান আইনপ্রণেতার মধ্যে সুলেমানের একটি ভাস্কর্য স্থাপিত আছে, যা এই দ্বিতীয় পরিচয়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরই একটা উদাহরণ। এই দুই পরিচয়ের টানাপোড়েনই সম্ভবত সুলেমানকে ইতিহাসের অন্যান্য বিজেতাদের থেকে আলাদা করে। তিনি শুধু জয় করেন নাই, জয় করা ভূখণ্ডকে ধরে রাখার একটা নিয়ম কানুন বা কাঠামোও তৈরি করেছিলেন।
আইন, রাষ্ট্র এবং সাম্রাজ্যের কাঠামো
সুলেমান সিংহাসনে বসার সময় যে সাম্রাজ্য তাঁর হাতে ছিল, সেটা আনাতোলিয়া, বলকান, মিশর আর লেভান্ত জুড়ে বিস্তৃত, আর প্রতিটি নতুন জয় করা অঞ্চল সঙ্গে নিয়ে আসত নিজস্ব রাজস্ব ব্যবস্থা, ভূমি মালিকানার রীতি আর আইনি ঐতিহ্য। উসমানীয় শাসনের ভিত্তি ছিল ইসলামি শরিয়া, তবে শাসনের প্রতিদিনের বাস্তবতা, যেমন কর নির্ধারণ, ভূমি বণ্টন কিংবা ফৌজদারি শাস্তির খুঁটিনাটি, এসব বিষয়ে শরিয়া সবসময় সরাসরি নির্দেশনা দিত না। এই ফাঁক পূরণ করত “কানুন”, অর্থাৎ সুলতানের নিজস্ব বিধিবদ্ধ আইন, যার চর্চা শুরু হয়েছিল সুলেমানের পূর্বসূরিদের আমল থেকেই।
সুলেমানের অবদান ছিল এই বিক্ষিপ্ত বিধিগুলোকে একটা সুসংগত কাঠামোয় দাঁড় করানো। তিনি তাঁর প্রধান বিচারিক কর্মকর্তা শায়খুল ইসলাম এবুসসুদ এফেন্দির সঙ্গে মিলে কানুন আর শরিয়ার মধ্যে একটা কার্যকর সামঞ্জস্য তৈরি করেন, যাতে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। মেহমেদ দ্বিতীয়ের আমল থেকে শুরু হওয়া কানুননামা প্রণয়নের ঐতিহ্যকে সুলেমান আর তাঁর পূর্বসূরি প্রথম সেলিম এমন এক রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যান যে পরবর্তীকালে এই দুজনের কানুনকেই সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত করা হয়। এই আইনি সংস্কার কোনো বিমূর্ত তাত্ত্বিক প্রকল্প ছিল না, ছিল একটা বাস্তব প্রশাসনিক প্রয়োজন থেকে জন্ম নেয়া কাঠামো, যা সাম্রাজ্যের বহুভাষিক, বহুধর্মীয় প্রজাদের একটা অভিন্ন শাসনব্যবস্থার আওতায় রাখতে সাহায্য করেছিল।
সুলেমানের শাসনামলে যে সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটে, তার কেন্দ্রে ছিলেন স্থপতি মিমার সিনান। গ্রিক বা আর্মেনীয় খ্রিষ্টান পরিবারে জন্ম নেওয়া সিনান দেবশিরমে প্রথায় জেনিসারি বাহিনীতে যোগ দেন, ইসলাম গ্রহণ করেন, আর সামরিক প্রকৌশলী হিসেবে বছরের পর বছর কাজ করার পর সাতচল্লিশ বছর বয়সে সুলেমান তাঁকে নিয়োগ দেন সাম্রাজ্যের প্রধান স্থপতি হিসেবে। এই নিয়োগের পর প্রায় তিন দশক ধরে সিনান নির্মাণ করেন কয়েকশ স্থাপনা, মসজিদ থেকে সেতু, স্নানাগার থেকে সমাধিসৌধ।
তাঁর সবচেয়ে খ্যাতিমান কাজ সুলেমানিয়ে মসজিদ, যার নির্মাণ শুরু হয় ১৫৫০ সালে, শেষ হয় ১৫৫৭ সালে। ইস্তানবুলের তৃতীয় পাহাড়ে দাঁড়ানো এই মসজিদ বাইজেন্টাইন হায়া সোফিয়ার সমান জাঁকজমকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই কল্পনা করা হয়েছিল, যদিও আকারে তা হায়া সোফিয়ার চেয়ে কিছুটা ছোট। এই মসজিদ ছিল একটা রাষ্ট্রীয় ঘোষণা, যেখানে ধর্ম, স্থাপত্য আর রাজকীয় ক্ষমতা একসঙ্গে মিলে গিয়ে সাম্রাজ্যের আত্মবিশ্বাসের একটা স্থায়ী স্মারক তৈরি করে। সুলেমানিয়ে কমপ্লেক্সের সঙ্গে আরো যুক্ত ছিল মাদ্রাসা, হাসপাতাল, রান্নাঘর, স্নানাগারের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যা প্রমাণ করে এই স্থাপনা কেবল ধর্মীয় না, প্রশাসনিক ও সামাজিক কেন্দ্রও ছিল।
এই স্থাপত্য জাগরণের চারপাশে গড়ে ওঠে আরও বিস্তৃত এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টের এক প্রবন্ধ অনুসারে, সুলেমানের আমলে ক্যালিগ্রাফি, পাণ্ডুলিপি চিত্রকলা, বস্ত্রশিল্প আর মৃৎশিল্পে যে অগ্রগতি ঘটে, তা এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ যে গোটা যুগকেই “স্বর্ণযুগ” আখ্যা দেওয়া হয়। ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল গ্যালারি অব আর্টের একটি প্রদর্শনী এই সময়ের দুইশোরও বেশি শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজিত হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল সুলেমানের নিজস্ব কবিতার পাণ্ডুলিপিও।

মুহিব্বি নামের এক সুলতান
সুলেমান নিজেও ছিলেন একজন কবি। লিখতেন ছদ্মনামে। মুহিব্বি, যার অর্থ প্রেমিক বা ঈশ্বরপ্রেমিক। এই ছদ্মনাম তিনি নেন মধ্যযুগীয় সুফি সাধক মুহিউদ্দিন ইবনে আরাবির চিন্তা থেকে, যেখানে “মুহিব্ব” মানে ঈশ্বরের বন্ধু। তাঁর দিওয়ানে হাজার হাজার কবিতা সংকলিত হয়েছে বলে গবেষকরা মনে করেন, যার একটি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে বার্লিনের এক জাদুঘরে, ২১৩ ফোলিও জুড়ে ছয়শোর বেশি কবিতা আছে সেখানে, প্রতিটি সোনালি ফুল ও লতাপাতার নকশায় সজ্জিত।
সুলেমানের কবিতা লেখার এই অভ্যাস নিছক শখ ছিল না। ষোড়শ শতকের উসমানীয় দরবারে দিওয়ান কবিতা ছিল অভিজাত সংস্কৃতির একটা কেন্দ্রীয় অংশ, আর একজন সুলতান যখন নিজে সেই ধারায় অংশ নিতেন, তখন তা কবিদের ওপর, দরবারি সংস্কৃতির ওপর একটা বাড়তি বৈধতা যোগ করত। গবেষকদের মতে সুলেমানের কবিতাগুলো একই সঙ্গে ব্যক্তিগত আবেগের প্রকাশ আর রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করত, বিশেষত সাফাভিদদের বিরুদ্ধে তাঁর মতাদর্শিক অবস্থান তুলে ধরতে। একজন শাসক যিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে কবিতা লেখেন, এই দ্বৈততা তাঁর জনসমক্ষের ভাবমূর্তিকে আরও জটিল, আরও মানবিক করে তোলে। বিজেতা আর কবি, এই দুই পরিচয় একসঙ্গে থাকা তাঁর সময়ের জন্য অস্বাভাবিক ছিল না, তা ছিল একজন আদর্শ উসমানীয় শাসকের প্রত্যাশিত রূপ।
হুররম সুলতান এবং প্রাসাদের রাজনীতি
সুলেমানের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় তাঁর স্ত্রী হুররম সুলতানকে নিয়ে, যিনি ইউরোপে পরিচিত রোক্সেলানা নামে। হুররম ছিলেন বর্তমান ইউক্রেন অঞ্চলের এক বন্দি নারী, ক্রিমীয় তাতারদের হাতে ধরা পড়ে উসমানীয় দরবারে দাসী হিসেবে আসেন তিনি। দাসী থেকে সুলতানের স্ত্রীর মর্যাদায় ওঠা এই যাত্রাকে অনেক জনপ্রিয় বর্ণনায় রূপকথার প্রেমকাহিনি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু ইতিহাসবিদরা এই সম্পর্ককে বোঝেন অনেক বেশি রাজনৈতিক পরিভাষায়।

১৫৩৪ সালে সুলেমান উসমানীয় রীতি ভেঙে হুররমকে বিয়ে করেন, যা রাজবংশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক ঘটনা, কারণ ইসলামি আইন অনুযায়ী দাসীকে বিয়ে করতে হলে আগে তাঁকে মুক্ত করতে হতো। এই বিয়ের ফলে হুররম আর তাঁর সন্তানরা রাজধানীতেই থেকে যাওয়ার সুযোগ পান, যেখানে প্রথাগতভাবে সুলতানের সন্তানদের মা-সহ প্রাদেশিক গভর্নরের দায়িত্বে পাঠানো হতো। এই একটামাত্র পরিবর্তন হুররমকে দিয়েছিল এমন এক রাজনৈতিক অবস্থান, যা এর আগে কোনো উসমানীয় নারীর ছিল না, আর ইতিহাসবিদরা এই সময়টাকেই চিহ্নিত করেন “নারীদের সালতানাত” যুগের সূচনা হিসেবে।
হুররম কেবল প্রাসাদের অন্দরমহলে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি বিদেশি রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে চিঠি চালাচালি করতেন, জনকল্যাণমূলক স্থাপনার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, আর দরবারের গ্র্যান্ড ভিজিয়ার নিয়োগের মতো সিদ্ধান্তেও তাঁর প্রভাব ছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। এই প্রভাব নিয়ে সমসাময়িক বিদেশি দূতদের বিবরণে নানা গুজব আর ষড়যন্ত্র তত্ত্বও পাওয়া যায়, যার মধ্যে কিছু ছিল স্রেফ প্রাসাদ-রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছড়ানো অপবাদ। হুররম আর সুলেমানের সম্পর্ককে তাই কেবল প্রেমের গল্প হিসেবে দেখলে তার আসল তাৎপর্য হারিয়ে যায়, এই সম্পর্ক বোঝার সঠিক প্রেক্ষাপট হলো উসমানীয় উত্তরাধিকার রাজনীতি, যেখানে প্রতিটি পুত্রের মা-ই ছিলেন এক একটা রাজনৈতিক শিবিরের কেন্দ্র।
মুস্তাফা, বায়েজিদ এবং উত্তরাধিকারের রক্তমূল্য
উসমানীয় রাজপরিবারে উত্তরাধিকার ব্যবস্থা ছিল নিষ্ঠুরভাবে সরল, বাবার মৃত্যুর পর যে পুত্র সবচেয়ে শক্তিশালী, সিংহাসন তাঁরই, আর বাকি ভাইদের হত্যা করা হতো গৃহযুদ্ধ ঠেকানোর যুক্তিতে, এই রীতিকে সমকালীন উলামারাও অনুমোদন দিতেন। সুলেমান নিজে এই রক্তক্ষয়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হননি, কারণ তিনি ছিলেন একমাত্র পুত্র। কিন্তু তাঁর নিজের রাজত্বের শেষভাগে ঠিক এই একই সংকট গ্রাস করে তাঁর নিজের পরিবারকে।
তাঁর প্রথম স্ত্রী মাহিদেভরানের গর্ভজাত পুত্র শাহজাদা মুস্তাফা ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, জেনিসারি বাহিনী তাঁকে ভবিষ্যৎ সুলতান হিসেবে প্রায় প্রকাশ্যেই সমর্থন করত। ১৫৫৩ সালে সুলেমান সাফাভিদ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে নাখচিভান অভিযানের সময় তাঁর নিজের বড় ছেলে শাহজাদা মুস্তাফাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। মুস্তাফার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার এবং সিংহাসন দখলের ষড়যন্ত্র করছিলেন। উজির-ই-আজম বা প্রধান মন্ত্রী রুস্তম পাশা এবং সুলেমানের স্ত্রী হুররেম সুলতানের রাজনৈতিক চাল ও কিছু জাল চিঠির কারণে সুলেমান বিশ্বাস করেছিলেন যে মুস্তাফা সাফাভিদ শাহের সহায়তায় তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যাচ্ছেন। তারপর, কনিয়া নামক স্থানে সামরিক তাঁবুতে ডেকে এনে মুস্তাফাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনা অটোমান ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক এবং বিতর্কিত অধ্যায়।
এই ট্র্যাজেডির আরেকটা তথ্য পাওয়া যায় তাসলিজালি ইয়াহইয়া বে’র কবিতায়। ইয়াহইয়া ছিলেন ১৬শ শতকের উসমানীয় সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এবং শাহজাদা মুস্তাফার একনিষ্ঠ অনুসারী।

১৫৫৩ সালে সুলতান সুলেমানের আদেশে যখন শাহজাদা মুস্তাফাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তখন ইয়াহইয়া বে তাঁর গভীর শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করে “শাহজাদা মুস্তাফা মার্সিয়াসি” (Şehzade Mustafa Mersiyesi) নামে এই একটি কবিতা লেখেন। এই কবিতাটির রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক গুরুত্বকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য কিছু মূল বিষয় জানা দরকার। তৎকালীন উসমানীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি উজিরে আজম রুস্তম পাশা এবং হুররেম সুলতানের বিরুদ্ধে সরাসরি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা চরম সাহসিকতার লক্ষণ ছিল। কবিতায় তিনি তাঁদেরকে “প্রতারক” ও “ষড়যন্ত্রকারী” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ইয়াহইয়া বে নিজে একজন জানিসারি (Janissary) সৈনিক ছিলেন। তাঁর এই কবিতাটি জানিসারি বাহিনী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে, যা উসমানীয় দরবারকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। একারণে, ক্রুদ্ধ রুস্তম পাশা তাঁকে শাস্তি দিতে চাইলেও, সুলতান সুলেমান তাঁর কবি প্রতিভার প্রতি উদারতা দেখিয়ে এবং জানিসারি বাহিনীর সম্ভাব্য বিদ্রোহ এড়াতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন নাই। তবে তাঁকে ইস্তাম্বুল থেকে দূরবর্তী বলকান অঞ্চলে (বর্তমান উত্তর মেসিডোনিয়া) নির্বাসিত করা হয়।
তবে, এই ট্র্যাজেডির পেছনে ঠিক কতটা হুররম আর তাঁর জামাতা রুস্তম পাশার ষড়যন্ত্র কাজ করেছিল, আর কতটা মুস্তাফার প্রকৃত রাজনৈতিক হুমকি, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আজও বিতর্ক আছে। একাডেমিক গবেষণায় দেখা যায়, উসমানীয়, ভেনিসীয়, হ্যাবসবার্গ, ফরাসি আর পারস্য সূত্রগুলো এই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়, আর আধুনিক ঐতিহাসিকরা একে একক কোনো ষড়যন্ত্রের ফল না, বরঞ্চ রাজনৈতিক চাপের একটা জটিল সমাহার হিসেবে দেখেন।
মুস্তাফার মৃত্যুর পর হুররমের দুই পুত্র সেলিম আর বায়েজিদ থেকে যান একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। ১৫৫৮ সালে হুররমের মৃত্যুর পর দুই ভাইয়ের মধ্যে টানাপোড়েন প্রকাশ্য বিরোধে রূপ নেয়, ১৫৫৯ সালে বায়েজিদ প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, আর পরাজিত হয়ে সাফাভিদ পারস্যে চলে যান। সেখানে শাহ তাহমাস্প প্রথমে তাঁকে আশ্রয় দিলেও পরে সুলেমানের চাপ আর বিপুল অর্থের বিনিময়ে বায়েজিদকে ফিরিয়ে দেন, আর তারপর ১৫৬১ সালে তাঁকে ও তাঁর পুত্রদের হত্যা করা হয়। এই ঘটনাগুলোকে জনপ্রিয় কল্পকাহিনির মতো নাটকীয় করে দেখানোর প্রলোভন সবসময়ই থাকে, কিন্তু ঐতিহাসিক নথি যতটুকু নিশ্চিত করে, ততটুকুই বলা যায়, একজন পিতা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার নামে নিজের দুই পুত্রকে হারান। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যক্তিগত স্নেহ আর রাষ্ট্রনীতির যে দ্বন্দ্ব, তা উসমানীয় রাজতন্ত্রের একেবারে কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য, যেখানে সিংহাসনের স্থিতিশীলতা রক্তসম্পর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতো।

একজন বৃদ্ধ সম্রাটের শেষ অভিযান
জীবনের শেষ দশকে সুলেমানের স্বাস্থ্য ক্রমশ ভেঙে পড়তে থাকে। বাতের প্রকোপ তাঁকে দীর্ঘ ভ্রমণে কষ্ট দিত, তবু ১৫৬৬ সালে যখন হ্যাবসবার্গ সম্রাট দ্বিতীয় ম্যাক্সিমিলিয়ানের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে, তিনি নিজেই শেষবারের মতো অভিযানে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৫৬৫ সালে মাল্টা অবরোধে ব্যর্থতার পর উসমানীয় মর্যাদা পুনরুদ্ধারের একটা তাগিদও এই অভিযানের পেছনে কাজ করেছিল। শারীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও তিনি রাজকীয় শোভাযাত্রা সহকারে ইস্তানবুল ত্যাগ করেন, সাদা পোশাকে ঘোড়ায় চড়ে, যাতে তাঁর অসুস্থতার কোনো ইঙ্গিত প্রজাদের চোখে না পড়ে। পথে অসুস্থতা আরও বাড়লে তাঁকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়, কিন্তু প্রতিটি শহরের কেন্দ্রে পৌঁছালে তিনি আবার ঘোড়ায় চড়ে বসতেন, যাতে রাজকীয় ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ থাকে।
সিগেৎভারের দুর্গ শেষ পর্যন্ত পতিত হয় সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, প্রায় সব প্রতিরক্ষাকারী নিহত হন, দুর্গের সেনাপতি নিকোলা জ্রিনস্কিও যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা যান। কিন্তু জয়ের এই মুহূর্তে সুলেমান নিজে বেঁচে ছিলেন না, তিনি ইতিমধ্যে ইহলোক ত্যাগ করেছেন নিজের তাঁবুতে। হাঙ্গেরির পেচ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রবন্ধ অনুসারে, ঐতিহ্য মতে তাঁর অন্তরাঙ্গ অঙ্গ তাঁবুর কাছেই মাটিচাপা দেওয়া হয়, আর পরে সেই জায়গায় তাঁর পুত্র দ্বিতীয় সেলিম একটা তুর্বে বা সমাধিসৌধ নির্মাণ করান। তাঁর দেহাবশেষ পরে ইস্তানবুলে ফিরিয়ে আনা হয়, সমাহিত করা হয় সিনানের নির্মিত সুলেমানিয়ে মসজিদেই, যে মসজিদ তিনি নিজেই নির্মাণ করিয়েছিলেন। মৃত্যুর খবর গোপন রাখার এই আটচল্লিশ দিনের নাটক আসলে উসমানীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার একটা গভীর সত্যকে প্রকাশ করে। রাজতন্ত্রে সিংহাসনের ধারাবাহিকতা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, একজন সম্রাটের মৃত্যুর মতো মৌলিক সত্যকেও সাময়িকভাবে অস্বীকার করা যেত, যদি তাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিরাপদ থাকে। শাহজাদা সেলিম শেষ পর্যন্ত বেলগ্রেডে পৌঁছে সিংহাসনে বসেন।
সুলেমান কি সত্যিই উসমানীয় সাম্রাজ্যের “স্বর্ণযুগের” স্থপতি ছিলেন, নাকি তিনি এমন এক সাম্রাজ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ, যার শক্তির ভিত্তি তাঁর আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল? এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নাই। তাঁর বাবা সেলিম যে ভৌগোলিক আর আর্থিক ভিত্তি রেখে গিয়েছিলেন, তার ওপর দাঁড়িয়েই সুলেমান নির্মাণ করেছিলেন একটা আইনি কাঠামো, একটা স্থাপত্য ভাষা, একটা সাংস্কৃতিক পরিচয়, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও উসমানীয় আত্মপরিচয়ের মানদণ্ড হয়ে থাকে। ছেচল্লিশ বছরের এই দীর্ঘ শাসন কোনো একরৈখিক বিজয়গাথা ছিল না, এটি একসঙ্গে ধারণ করে সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর আইনি সংযম, সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা আর পারিবারিক নিষ্ঠুরতা, কাব্যিক সংবেদনশীলতা আর রাজনৈতিক নির্মমতা। সুলেমান নিজে হয়তো এই দ্বন্দ্বগুলোকে কখনো সমাধান করতে পারেন নাই। তবে ইতিহাস তাঁকে মনে রেখেছে ঠিক এই দ্বৈততার কারণেই, একজন সুলতান যিনি একই সঙ্গে ম্যাগনিফিসেন্ট আর কানুনি, বিজেতা আর আইনপ্রণেতা, প্রেমিক আর ঘাতক হয়ে থেকে গেছেন ইতিহাসের পাতায়।