ভিন্ন উত্তম কুমারকে জানতে দেখতে পারেন যে ১০টি সিনেমা

উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁর সিনেমায় ফিরে যাওয়ার জন্য এই দশটি ছবি একটি ভালো শুরু।

● দ্য পাবলিশ নিউজরুম

সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬

ভিন্ন উত্তম কুমারকে জানতে দেখতে পারেন যে ১০টি সিনেমা The Publish

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ / ছবি : পা. ডো.


৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬। আজ থেকে ১০০ বছর আগে কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নিলেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। আমরা এখন যাকে উত্তম কুমার নামে চিনি। তাঁর মৃত্যুর ৪৬ বছর পরও, ২০২৬ সালে, তাঁর জন্মশতবর্ষে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত তাঁকে ঘিরে যে স্মৃতি ও আয়োজন, তাতে বোঝা যায় ‘মহানায়ক’ আসলে কোনো পুরোনো উপাধি না। এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে টিকে থাকা একটি চরিত্র। উত্তম কুমার ১৯৮০ সালে ৫৩ বছর বয়সে মারা যান। কিন্তু তাঁর সিনেমাগুলা থেমে থাকে নাই। নতুন দর্শক তাঁর ছবি দেখেছে, পুরোনো দর্শক আবার দেখেছে, আর তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো ধীরে ধীরে অভিনেতাকে ছাড়িয়ে নিজেদের জীবন পেতে শুরু করেছে।

তাঁর জনপ্রিয়তার সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হয়তো সুচিত্রা সেন। তাঁদের জুটি বাংলা সিনেমার রোম্যান্টিক কল্পনাকে এমনভাবে বদলে দিয়েছিল যে আজও দুজনকে আলাদা করে ভাবা কঠিন। কিন্তু শুধু প্রেমিক উত্তমকে দিয়ে উত্তম কুমারকে বোঝা যায় না। তিনি ছিলেন কমেডিয়ান, অ্যাডভেঞ্চার-হিরো, ব্যর্থ মানুষ, অন্ধকার চরিত্রের অভিনেতা, এমনকি নিজের তারকা-সত্তাকে ব্যঙ্গ করতে পারা একজন শিল্পীও। তাই জন্মশতবর্ষে তাঁর সিনেমায় ফিরে যাওয়ার জন্য এই দশটি ছবি একটি ভালো শুরু।

১. সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩)
উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের জুটি কোথা থেকে শুরু হয়েছিল, তার উত্তর এই ছবিতে। নির্মল দে পরিচালিত সাড়ে চুয়াত্তর মূলত একটি কমেডি ফিল্ম। কলকাতার একটি মেসে এক তরুণীর আগমন, আর তাকে ঘিরে মেসের বাসিন্দাদের নানা কাণ্ডকারখানা। কিন্তু ছবিটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব গল্পের চেয়েও বড়। এখান থেকেই বাংলা সিনেমা পেয়ে যায় এমন এক জুটি, যার পর্দার রসায়ন পরবর্তী কয়েক দশক ধরে দর্শকের প্রেমের সংজ্ঞা বদলে দেয়। উত্তম–সুচিত্রা একসঙ্গে প্রায় ৩০টি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন; সাড়ে চুয়াত্তর ছিল সেই দীর্ঘ যাত্রার শুরু। উত্তম কুমারকে শুধু ‘মহানায়ক’ হিসেবে না, তাঁর তারকা হয়ে ওঠার একেবারে গোড়ার জায়গা থেকে দেখতে চাইলে আপনার দেখতে হবে সাড়ে চুয়াত্তর।

২. হারানো সুর (১৯৫৭)
এক দুর্ঘটনার পর স্মৃতি হারিয়ে ফেলে এক মানুষ। তার জীবনে প্রবেশ করে আরেকজন নারী। এরপর পরিচয়, বিচ্ছেদ, স্মৃতি এবং ভালোবাসার মধ্যে তৈরি হয় এক আবেগঘন নাটক। অজয় করের হারানো সুর উত্তম–সুচিত্রা জুটির সেই সময়ের জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কিন্তু আজও ছবিটি টিকে আছে কেবল নস্টালজিয়ার কারণে না। উত্তম কুমারের অভিনয়ে এখানে তারকা-আভা ও চরিত্রের দুর্বলতা পাশাপাশি থাকে। আর ‘তুমি যে আমার’ এই গানটি ছবির স্মৃতিকে আরও দীর্ঘ করেছে। উত্তম কুমারের রোম্যান্টিক নায়ক হয়ে ওঠার ভাষাটা বুঝতে আপনার দেখতে হবে হারানো সুর।

৩. সপ্তপদী (১৯৬১)
কৃষ্ণেন্দু ও রীনা ব্রাউন। দুই ভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানুষ। তাঁদের প্রেম সহজ হতে পারত, যদি সমাজ এত সহজ হতো। অজয় করের সপ্তপদী উত্তম–সুচিত্রার জনপ্রিয় প্রেমের ছবির সীমা ছাড়িয়ে যায়। এখানে প্রেমের সঙ্গে যুক্ত হয় ধর্ম, সামাজিক পরিচয়, বিশ্বাস এবং আত্মত্যাগ। ফলে এটি শুধু একটি রোম্যান্টিক ছবি থাকে না; হয়ে ওঠে বাঙালির জনপ্রিয় সিনেমায় প্রেম ও সামাজিক বিধিনিষেধের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। উত্তম–সুচিত্রা জুটির যে ছবিগুলো পরবর্তী সময়ে কাল্ট মর্যাদা পেয়েছে, সপ্তপদী তাদের অন্যতম। কেন উত্তম–সুচিত্রা শুধু একটি জনপ্রিয় জুটি ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন একটি সাংস্কৃতিক ফ্যান্টাসি তা বুঝতে আপনার দেখতে হবে সপ্তপদী

৪. চাওয়া-পাওয়া (১৯৫৯)
উত্তম কুমারকে আমরা সাধারণত প্রেমিক নায়ক হিসেবে মনে রাখি। কিন্তু তাঁর কমেডি করার ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ। চাওয়া-পাওয়া তার সুন্দর উদাহরণ। তরুণ মজুমদারের এই ছবিতে প্রেম আছে, ভুল বোঝাবুঝি আছে, আছে দুই মানুষের একে অপরকে চিনে নেওয়ার খেলাও। উত্তম ও সুচিত্রার সম্পর্ক এখানে অনেক বেশি হালকা, অনেক বেশি মজার। উত্তম কুমারের কমেডি টাইমিং ও সহজাত পর্দা-আকর্ষণ দেখতে আপনার দেখতে হবে চাওয়া-পাওয়া

৫. ঝিন্দের বন্দী (১৯৬১)
উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার একটা বড় রহস্য ছিল তাঁর বহুমুখিতা। তপন সিংহের ঝিন্দের বন্দী সেই বহুমুখিতার প্রমাণ। আলেকজান্ডার ডুমার The Prisoner of Zenda-র কাহিনির বাংলা রূপান্তরে উত্তম কুমারকে দেখা যায় একেবারে অন্য আবহে। রাজপ্রাসাদ, ষড়যন্ত্র, দ্বন্দ্ব এবং অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যে। এখানে তাঁর কাজের মূল্য শুধু সংলাপ বা রোম্যান্টিক উপস্থিতিতে না; চরিত্রটির মধ্যে যে শারীরিকতা ও নাটকীয়তা প্রয়োজন, উত্তম সেটিও আয়ত্ত করেছিলেন। মহানায়ক যে কেবল প্রেমের নায়ক ছিলেন না, সেটি দেখতে পাবেন ঝিন্দের বন্দী-তে।

৬. নায়ক (১৯৬৬)
সম্ভবত এই তালিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবি এটি। সত্যজিৎ রায়ের নায়ক-এ উত্তম কুমার অভিনয় করেন অরিন্দম মুখার্জি নামে এক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকার চরিত্রে। ট্রেনে কলকাতা থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে এক সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে খুলে যায় তারকা-জীবনের অন্য মুখ। সাফল্যের আড়ালে থাকা ভয়, অনুশোচনা, অপরাধবোধ ও একাকিত্ব। ছবিটির সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, সত্যজিৎ রায় এমন একজন অভিনেতাকে নিয়ে ছবি বানাচ্ছেন যিনি তখন নিজেই বাংলা সিনেমার সবচেয়ে বড় তারকা। ফলে নায়ক একই সঙ্গে একটি চরিত্রের গল্প এবং তারকা-সংস্কৃতির ভেতরে প্রবেশের গল্প। উত্তম কুমারের অভিনয় এখানে তাঁর রোম্যান্টিক ইমেজ থেকে অনেক দূরে। এই ছবিতেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়, জনপ্রিয়তার আড়ালে একজন অভিনেতার কতটা গভীর অভিনয়ক্ষমতা থাকতে পারে। উত্তম কুমারকে ‘তারকা’ না, ‘অভিনেতা’ হিসেবে দেখতে চাইলে এটি প্রথম সারির ছবি।

৭. অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি (১৯৬৭)
উত্তম কুমারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ দেখা যায় অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি-তে। এখানে তিনি অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি নামের এক পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত কবিয়ালের চরিত্রে অভিনয় করেন। একজন ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত মানুষ কীভাবে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও কবিগানের জগতে নিজের জায়গা তৈরি করে নেয়, এই গল্পের মধ্যে দিয়ে ছবিটি একই সঙ্গে পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নও তোলে। উত্তম কুমারের জন্য চরিত্রটি ছিল একটি বড় পরিবর্তন। পরিচিত সুদর্শন নায়ক এখানে নিজের স্বাভাবিক শরীরী ভাষা ও তারকা-ইমেজকে অনেকটাই বদলে ফেলেন। উত্তম কুমারের চরিত্রাভিনয়ের পরিসর বুঝতে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি দেখতে পারেন।

৮. গৃহদাহ (১৯৬৭)
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত অজয় করের গৃহদাহ–তে উত্তম কুমারকে দেখা যায় সুরেশ চরিত্রে। একদিকে গভীর বন্ধুত্ব, অন্যদিকে প্রেম ও দাম্পত্য। এই তিনের টানাপোড়েনে তৈরি হয় সম্পর্কের এক জটিল গল্প। সুচিত্রা সেন ও প্রদীপ কুমারের সঙ্গে উত্তমের অভিনয় ছবিটিকে তাঁর প্রচলিত রোম্যান্টিক সিনেমা থেকে আলাদা করে। উত্তম–সুচিত্রার জনপ্রিয় রসায়নের বাইরে গিয়ে উত্তম কুমারের আরও সংযত ও চরিত্রনির্ভর অভিনয় দেখতে আপনার দেখতে হবে গৃহদাও।

৯. ছদ্মবেশী (১৯৭১)
উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার একটা দিক আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। তিনি ভীষণ জনপ্রিয় কমেডি অভিনেতাও ছিলেন। ছদ্মবেশী-তে পরিচয়, ছদ্মবেশ ও ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় হাসির পরিস্থিতি। উত্তম এখানে তাঁর গুরুগম্ভীর ‘মহানায়ক’ ইমেজকে প্রায় নিজের হাতেই ভেঙে দেন। এই ধরনের ছবিই দেখায়, তাঁর তারকা-ব্যক্তিত্ব কতটা নমনীয় ছিল। তিনি দর্শককে শুধু মুগ্ধ করতে চাইতেন না; তাদের হাসাতেও জানতেন। উত্তম কুমারের হালকা, মজার এবং অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত দিকটি দেখতে আপনার দেখতে হবে ছদ্মবেশী।

১০. অমানুষ (১৯৭৫)
সত্তরের দশকে বাংলা সিনেমার দর্শক বদলাচ্ছিল। বদলাচ্ছিল সিনেমার ভাষাও। উত্তম কুমারও তাঁর পুরোনো রোম্যান্টিক নায়ক-ইমেজের বাইরে নতুন ধরনের চরিত্রে যেতে শুরু করেন। শক্তি সামন্তের অমানুষ সেই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে এই ছবিতে উত্তমকে দেখা যায় আরও কঠিন, ক্ষতবিক্ষত এবং বাস্তব এক চরিত্রে। এখানে তিনি আর কেবল সেই নিখুঁত রোম্যান্টিক পুরুষ না, যাকে পর্দায় দেখলেই দর্শক প্রেমে পড়ে। এখানে তিনি এমন একজন মানুষ, যার জীবনে ব্যর্থতা ও প্রতিকূলতা আছে। উত্তম কুমারের শেষ দিকের তারকা-পর্ব এবং তাঁর বদলে যাওয়া অভিনয়ের ভাষা বুঝতে দেখতে পারেন অমানুষ।

তাহলে উত্তম কুমার আসলে কে?

এই দশটি ছবি পাশাপাশি রাখলে একটা অদ্ভুত পরিবর্তনের গল্প দেখা যায়। সাড়ে চুয়াত্তর-এর তরুণ কমেডিয়ান। হারানো সুর-এর প্রেমিক। সপ্তপদী-র দ্বিধাগ্রস্ত প্রেমিক। ঝিন্দের বন্দী-র অ্যাডভেঞ্চার-হিরো। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি-র চরিত্রাভিনেতা। আর নায়ক-এর সেই তারকা, যে নিজের মুখোশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ নিজেকেই প্রশ্ন করে। এই কারণেই উত্তম কুমারকে শুধু ‘বাঙালির সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক’ বলা হয়তো তাঁর প্রতি একটু অন্যায়। কারণ জনপ্রিয় নায়ক অনেকেই হন। কিন্তু খুব কম মানুষই মানুষের কল্পনায় নিজের জন্য স্থায়ী একটি জায়গা তৈরি করতে পারেন। উত্তম কুমার পেরেছিলেন।

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৫৩। তারপর কেটে গেছে চার দশকেরও বেশি সময়। তবু ২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর, তাঁর জন্মের একশ বছর পর, কলকাতার রাস্তায় আবার তাঁর ছবি, পোস্টার, স্মারক, প্রদর্শনী। তাঁর সিনেমা আবার প্রেক্ষাগৃহে। তাঁর নাম আবার সংবাদপত্রের শিরোনামে। মৃত মানুষের জন্য এমন প্রত্যাবর্তন খুব সাধারণ ঘটনা না। হয়তো এর কারণ, উত্তম কুমার আসলে কোনো একটি প্রজন্মের অভিনেতা নন। তিনি বাঙালির সিনেমা দেখার স্মৃতির অংশ।


Picture of দ্য পাবলিশ নিউজরুম

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

শেয়ার

আরও পড়েন

দুর্গের ভেতরে কয়েক হাজার সৈন্য, বাইরে প্রায় লক্ষাধিক উসমানীয় সেনা। এই লড়াই চলেছিল এক মাস, আর দুর্গ পতনের আগেই শেষ অভিযানে মৃত্যুবরণ করেন সুলতান সুলেমান।

দ্য পাবলিশ

ছবিটি দেখে পাবলো পিকাসো বলেন “চার্চিল চাইলে পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারতেন, যদি না তাঁর সময় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকত”।

কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

যখন একটা গেমের পেছনে এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, তখন ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

আমরা ভাষার রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা বলি। কিন্তু ভাষাকে আমরা যে হরফে দেখি, সেই হরফেরও কি রাজনীতি আছে? কে ঠিক করে একটি ভাষা দেখতে কেমন হবে?

দ্য পাবলিশ

Scroll to Top