চার্চিলের আঁকা ছবিটি যেভাবে পৌঁছাল এক নাৎসি দালালের হাতে

ছবিটি দেখে পাবলো পিকাসো বলেন “চার্চিল চাইলে পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারতেন, যদি না তাঁর সময় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকত”।

● কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬

চার্চিলের আঁকা ছবিটি যেভাবে পৌঁছাল এক নাৎসি দালালের হাতে? The Publish

শিল্পকর্ম : ‘লা ড্রাগোনিয়ের (La Dragonnière)’, উইনস্টন চার্চিল, ১৯৩৭


লন্ডনের ওয়ালেস কালেকশনে এখন ঝুলছে উইনস্টন চার্চিলের আঁকা একটি ছবি, যার নাম La Dragonnière, Cap Martin। অলিভ গাছের সারি, দূরে একটি ভিলা, ফরাসি রিভিয়েরার আলো। দেখতে নিরীহ একটি ল্যান্ডস্কেপ। কিন্তু এই ক্যানভাসটির পেছনে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক অস্পষ্ট অধ্যায়, একজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর শখের আঁকা ছবি ঘুরপথে গিয়ে পৌঁছায় নাৎসিদের সঙ্গে সহযোগিতাকারী এক প্যারিসীয় চিত্র-ব্যবসায়ীর হাতে। ওয়ালেস কালেকশনের চলতি প্রদর্শনী Winston Churchill: The Painter আগামী ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে, এবং এই প্রদর্শনীতেই ছবিটি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে এর যুদ্ধকালীন গল্প নিয়ে আলোচিত হচ্ছে।

একটি উপহার এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ

রাজনীতির চাপ থেকে সাময়িক মুক্তির জন্য, অবসরে ছবি আঁকতেন চার্চিল। ১৯৩৭ সালে তিনি মোনাকোর কাছে কাপ মার্তাঁয় দ্য’এস্তাঁভিল পরিবারের অতিথি হয়ে ছিলেন, তাঁদেরই ভিলা লা দ্রাগোনিয়েরে। সেই সফরের স্মৃতি ধরে রাখতেই তিনি এঁকেছিলেন প্রাচীন অলিভ গাছের এই দৃশ্য, যেখানে পেছনের দিকে দেখা যায় ভিলাটি নিজেই। সফর শেষে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ছবিটি তিনি উপহার দেন বাড়ির মালিক রনে দ্য’এস্তাঁভিলকে। রনে ছিলেন লঁসোঁ শ্যাম্পেইন কোম্পানির প্রতিনিধি, আর শ্যাম্পেইন ছিল চার্চিলের প্রিয় পানীয়, ফলে দুজনের মধ্যে সখ্যতা গড়ে ওঠা খুব একটা আশ্চর্যের না। মজার বিষয় হলো, এই ভিলা একসময় ছিল চার্চিলের বন্ধু ও ডেইলি মেইলের মালিক লর্ড রথারমিয়ারের।

পাবলো পিকাসো বলেন, “চার্চিল চাইলে পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারতেন, যদি না তাঁর সময় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকত”।

১৯৪০ সালে জার্মান বাহিনী ফ্রান্স দখল করার পর ছবিটি সম্পর্কে দ্য’এস্তাঁভিল পরিবারের ভেতরেই একাধিক গল্প প্রচলিত আছে। কারও মতে ছবিটি নিরাপত্তার খাতিরে এক বন্ধুর কাছে রাখা হয়েছিল, যিনি পরে মারা যান, এবং কীভাবে যেন সেটি একজন প্যারিসীয় ডিলারের হাতে চলে যায়। কারও মতে ছবিটি সীমান্ত পেরিয়ে মোনাকোয় পাঠানো হয়েছিল এবং সেখান থেকেই হারিয়ে যায়। পরিবারের আরেক তথ্যমতে, ছবিটি সোজাসুজি “চুরি” হয়ে গিয়েছিল। ঠিক কোন গল্পটি সত্যি, তা আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায় নাই।

তবে যা নিশ্চিত, তা হলো ছবিটি শেষমেশ পৌঁছে যায় প্যারিসীয় ডিলার মার্তাঁ ফাবিয়ানির কাছে। ফাবিয়ানির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি নাৎসিদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন এবং তাঁর সংযোগ ছিল আইনজাৎসস্টাব রাইখসলাইটার রোজেনবার্গ নামের সেই বাহিনীর সঙ্গে, যারা জার্মান দখলদারিত্বের সময় ফ্রান্সে ইহুদি মালিকদের কাছ থেকে শিল্পকর্ম লুট করেছিল। ফাবিয়ানির নাম নাৎসি-লুণ্ঠিত শিল্পকর্মের খোঁজ করা গবেষকদের কাছে এক ধরনের সতর্কসংকেত হিসেবে পরিচিত, যদিও তাঁর হাত দিয়ে যাওয়া অনেক ছবিই বৈধভাবেই কেনা হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য যে দ্য’এস্তাঁভিল পরিবার নিজেরা ইহুদি ছিলেন না। যুদ্ধকালীন ফাবিয়ানির নাম ওঠে জ্যু দ্য পোম জাদুঘর থেকে লুট করা শিল্পকর্ম ঘিরে চলা একটি চক্রান্তেও, যেখানে ইহুদি সংগ্রহ থেকে বাজেয়াপ্ত করা প্রায় চুয়ান্নটি ছবি বিক্রির পরিকল্পনা হয়েছিল, যা পরে বার্লিন থেকে সরাসরি হস্তক্ষেপে ভেস্তে যায়, এমনটাই লিখেছেন গবেষকেরা একটি নথিপত্রভিত্তিক আলোচনায়। ফাবিয়ানি নিয়মিত যেতেন মোনাকোর ক্যাসিনোতেও, যা হয়তো ব্যাখ্যা করে ছবিটির সঙ্গে তাঁর সংযোগ কীভাবে ঘটেছিল।

পিকাসোর প্রশংসা, ফাবিয়ানির দাবি

১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে, প্যারিস মুক্ত হওয়ার পাঁচ মাস পর, ফাবিয়ানির গ্যালারিতে একটি প্রদর্শনী হয়, যার লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেনাদের বিনোদনের জন্য গড়া প্রতিষ্ঠান স্টেজ ডোর ক্যান্টিনের তহবিল সংগ্রহ। সেই প্রদর্শনীতেই ছবিটি দেখেন পাবলো পিকাসো, তার নিজের কাজও সেখানে ছিল, এবং মন্তব্য করেন যে “চার্চিল চাইলে পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারতেন, যদি না তাঁর সময় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকত”। এই সময় চার্চিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্রিটেনের যুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। সেই একই প্রদর্শনী উপলক্ষে ফাবিয়ানি একটি চমকপ্রদ দাবি করেন, যুদ্ধের সময় নাকি এক উচ্চপদস্থ জার্মান কর্মকর্তা ছবিটি কিনতে চেয়েছিলেন, এমনকি হিটলারের আঁকা একটি ছবির বিনিময়ে চার্চিলের এই ছবিটি নেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ফাবিয়ানির ভাষ্যে, তিনি দেশপ্রেমের খাতিরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই দাবির সত্যতা যাচাইয়ের কোনো স্বাধীন উপায় নাই।

ছবি: ইন্টারন্যাশনাল চার্চিল সোসাইটি

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই ফাবিয়ানি গ্রেপ্তার হন, অভিযোগ ছিল জার্মান দখলদারদের সুবিধার্থে শিল্পকর্ম বিক্রির। ফরাসি কর্তৃপক্ষ তখন তাঁর সংগ্রহের ছবিগুলো বাজেয়াপ্ত করে, চার্চিলের ছবিটিসহ। এরপর দুই অজ্ঞাতনামা দাবিদার সামনে আসেন, যারা বলেন ছবিটির প্রকৃত মালিক তারাই, ফাবিয়ানি নন। শেষ পর্যন্ত অস্পষ্ট এক প্রক্রিয়ায় ছবিটি কিনে নেন অস্ট্রেলীয় সংগ্রাহক এডওয়ার্ড ওয়াটারফিল্ড হেওয়ার্ড, যাঁর সম্পদের উৎস ছিল অ্যাডিলেডে একটি কোকা-কোলা ফ্র্যাঞ্চাইজি।

১৯৬১ সালে হেওয়ার্ড ছবিটি লন্ডনের সদবিতে নিলামে তোলেন। প্রায় ঘটনাক্রমে সেখানে ছবিটি চিনে ফেলেন রনে দ্য’এস্তাঁভিলের মেয়ে, সমাজতাত্ত্বিক আন-মারি অপেনহাইমার। সেই সময় যুদ্ধে হারানো শিল্পকর্মের দাবি তোলা ছিল কঠিন, তাই তিনি সরাসরি নিলামে দর হেঁকে মাত্র পাঁচশো পাউন্ডে ছবিটি পরিবারের জন্য ফিরিয়ে আনেন। ১৯৬৬ সালে বিবাহবিচ্ছেদের পর আন-মারি আবার ছবিটি বিক্রি করেন, ফের সদবিতে, এবার দুই হাজার পাউন্ডে। এরপর ছবিটি সর্বশেষ হাতবদল হয় ২০১৮ সালে, আবারও সদবিতে, এবার তিন লক্ষ আটান্ন হাজার পাউন্ডে, যা দেখিয়ে দেয় চার্চিলের ছবির প্রতি সংগ্রাহকদের আগ্রহ কতটা বেড়েছে। বর্তমানে ছবিটি এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিগত সংগ্রাহকের কাছে আছে, যাঁর সংগ্রহে চার্চিলের আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে।

ওয়ালেস কালেকশনের পরিচালক ও প্রদর্শনীর কিউরেটর জাভিয়ের ব্রে মনে করেন এই ছবিটিই বর্তমান প্রদর্শনীর সেরা কাজ। তাঁর ভাষায়, দ্য’এস্তাঁভিল পরিবারের হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ছবিটি নিয়ে একাধিক গল্প এবং ফাবিয়ানির কুখ্যাতি মিলিয়ে প্রশ্ন ওঠে, ঠিক কীভাবে এটি তাঁর হাতে পৌঁছেছিল। একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্ট, যেহেতু ১৯৬১ সালেই পরিবার ছবিটি ফিরিয়ে কিনেছিল, তাই এটি নিয়ে এখন আর কোনো পুনর্স্থাপন-দাবির সম্ভাবনা নাই। তবু গবেষকদের কৌতূহল থামে নাই। ছবিটি নিয়ে গবেষণায় সহায়তাকারী মার্কিন শিল্প-ঐতিহাসিক এমিলি এসারের ভাষ্যে, যুদ্ধকালীন বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার সুযোগ নিয়েই ছবিটি কোনোভাবে পৌঁছে যায় দুর্নীতিগ্রস্ত নাৎসি-দালাল ফাবিয়ানির হাতে। ঠিক কোন পথে, তা আজও অজানা। একটি ছোট্ট ল্যান্ডস্কেপ, অলিভ গাছ আর একটি ভিলার দৃশ্য, এভাবেই বহন করে চলেছে এক শতাব্দীর ইউরোপীয় ইতিহাসের এক অস্পষ্ট অধ্যায়।


Picture of কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

শেয়ার

আরও পড়েন

দুর্গের ভেতরে কয়েক হাজার সৈন্য, বাইরে প্রায় লক্ষাধিক উসমানীয় সেনা। এই লড়াই চলেছিল এক মাস, আর দুর্গ পতনের আগেই শেষ অভিযানে মৃত্যুবরণ করেন সুলতান সুলেমান।

দ্য পাবলিশ

উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁর সিনেমায় ফিরে যাওয়ার জন্য এই দশটি ছবি একটি ভালো শুরু।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

যখন একটা গেমের পেছনে এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, তখন ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

আমরা ভাষার রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা বলি। কিন্তু ভাষাকে আমরা যে হরফে দেখি, সেই হরফেরও কি রাজনীতি আছে? কে ঠিক করে একটি ভাষা দেখতে কেমন হবে?

দ্য পাবলিশ

Scroll to Top