ট্যাগিং ও আদারিং বনাম এডওয়ার্ড সাইদ

আমরা নিজেরা নিজেদের সম্পর্কে কী ভাবব, তার ওপরও অপরের বলা প্রভাবশালী গল্পের গভীর প্রভাব পড়ে।

● অর্বাচিন আব্দুল্যাহ

সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬

ট্যাগিং ও আদারিং বনাম এডওয়ার্ড সাইদ | দ্য পাবলিশ The Publish

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ


একটি দেশের কথা ভাবা যাক, দূরের একটি অচেনা দেশ। সেখানে মানুষ কেমন, তারা কী খায়, কীভাবে পোশাক পরে, কী বিশ্বাস করে, তাদের সমাজ কেমন, এসব আমরা নিজের চোখে দেখিনি। সেই দেশ সম্পর্কে আমাদের যা কিছু জানা, তার বেশিরভাগই এসেছে বিভিন্ন বই থেকে, সংবাদপত্র থেকে, সিনেমা থেকে, ভ্রমণকাহিনি থেকে কিংবা অন্য কারও বলা নানা গল্প থেকে।

ধরা যাক, কোনো একটি বইয়ে লেখা হলো, সেই দেশের মানুষ বড্ড আবেগপ্রবণ, রহস্যময়, অলস এবং যুক্তিবুদ্ধিতে ভীষণ দুর্বল; তারা আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না; তাদের সমাজ অদ্ভুত, তাদের রাজনীতি বিশৃঙ্খল আর তাদের সংস্কৃতি অতি পুরোনো। অন্যদিকে যে লেখক এই কথাগুলো লিখছেন, তাঁর নিজের সমাজকে বর্ণনা করা হলো যুক্তিবাদী, আধুনিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং সভ্য হিসেবে। বইটি পড়তে পড়তে আমরা হয়তো খুব স্বাভাবিকভাবেই ভাবতে শুরু করলাম, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই বিষয়টি এমনই। কিন্তু একটু থামা যাক। প্রশ্ন হলো, ওই দেশের মানুষদের কি কখনো নিজেদের সম্পর্কে নিজের ভাষায় কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল? আরেকটি প্রশ্ন, আমরা যে দেশটিকে এমনভাবে চিনলাম, সেটি কি সত্যিই সেই আসল দেশ, নাকি একজন নির্দিষ্ট লেখকের চোখে তৈরি হওয়া সেই দেশের একটি কৃত্রিম ছবি? আরও কঠিন প্রশ্ন আছে। কেউ যদি দীর্ঘদিন ধরে একটি জাতি বা গোটা সভ্যতার গল্প নিজের মতো করে বলতে থাকে, তাহলে তার বলা সেই বয়ানটি কি কেবল গল্পই থাকে? নাকি একসময় সেই গল্পই শক্তিশালী হয়ে শাসন ও আধিপত্যের বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে?

ছবিতে : এডওয়ার্ড সাঈদ

এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড সাঈদ আমাদের এমন একটি জায়গায় নিয়ে গেছেন, যেখানে সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি, উপনিবেশবাদ এবং ক্ষমতা, সবকিছু একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। এডওয়ার্ড ওয়াদি সাঈদ জন্মেছিলেন ১৯৩৫ সালে জেরুজালেমে। তিনি ছিলেন একটি আরব-ফিলিস্তিনি পরিবারে বেড়ে ওঠা মানুষ। জীবনের একটি বড় সময় তিনি কাটিয়েছেন মিসরের কায়রোতে, পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘ চার দশক শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৬৩ সালে কলম্বিয়ায় শিক্ষকতা শুরু করে ১৯৯২ সালে তিনি অত্যন্ত সম্মানজনক ‘University Professor’ পদে ভূষিত হন। ২০০৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর এই মহান চিন্তাবিদের মৃত্যু হয়।

তাই অপরের গল্প শুনতে গেলে কেবল মুখের গল্পটি শোনাই যথেষ্ট নয়; গল্পের ভেতরের রাজনীতির ভাষা শুনতে হয়, গল্পকার কার স্বার্থ পাহারা দিচ্ছেন তা দেখতে হয়।

এডওয়ার্ড সাঈদ বিশটিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন, যার মধ্যে Orientalism, Culture and Imperialism, The Question of Palestine, Out of Place এবং Representations of the Intellectual সারাবিশ্বে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ও সমাদৃত। কিন্তু সাঈদের জীবন কেবল একজন নিভৃতচারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের নিরাপদ জীবন ছিল না। তাঁর ব্যক্তিস্বত্তার ভেতরেই কাজ করত এক অদ্ভুত ও তীব্র টানাপোড়েন, একদিকে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিতে শীর্ষ অবস্থান, অন্যদিকে তাঁর ফিলিস্তিনি পরিচয়; একদিকে ইংরেজি সাহিত্যের ধ্রুপদি পাঠ, অন্যদিকে হৃদয়ে আরব সংস্কৃতি; একদিকে নিউইয়র্কের আকাশচুম্বী বিশ্ববিদ্যালয়, অন্যদিকে জন্মভূমির এমন একটি ভূখণ্ডের জীবন্ত স্মৃতি, যেখান থেকে নির্মম রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁকে আজীবনের জন্য দেশছাড়া করেছিল। এই ‘মাঝখানে থাকা’র (in-between) অভিজ্ঞতাটি পরে তাঁর সমগ্র চিন্তার খুব গুরুত্বপূর্ণ এক দার্শনিক ভিত্তি হয়ে ওঠে। তিনি নিজেকে কোনোদিন একটিমাত্র দেশের বা একটিমাত্র ঘরের মানুষ হিসাবে দেখতে পারতেন না। আর ঠিক এখান থেকেই হয়তো একটি বড় প্রশ্নের জন্ম হয়েছিল, মানুষকে কি সত্যিই কোনো একটি সংকীর্ণ পরিচয়ের খাঁচায় পুরোপুরি আটকে ফেলা যায়?

আমরা প্রাত্যহিক জীবনে প্রায়ই খুব সহজে বলে ফেলি, আমি একজন বাঙালি, তিনি একজন আরব, সে একজন ইউরোপীয়, ওরা মুসলমান, তারা পশ্চিমা কিংবা এরা এশীয়। এভাবে লেবেল এঁটে পরিচয় তৈরি করা খুব সহজ। কিন্তু একজন রক্তমাংসের মানুষ কি শুধু তার দেশ, তার ধর্ম, ভাষা, জাতি, কিংবা গায়ের চামড়া বা বাহ্যিক অবয়বের বৃত্তে বন্দি? সাঈদের বর্ণাঢ্য জীবন আমাদের এই সহজ ও অতিসরলীকৃত পরিচয়গুলোর দিকে গভীর সন্দেহের চোখে তাকাতে শেখায়। তিনি নিজে ছিলেন একাধিক সাংস্কৃতিক জগতের সংযোগস্থলে বসবাসকারী একজন মানুষ। তাঁর আত্মজীবনীর নাম Out of Place, এই নামটি কেবল কোনো ব্যক্তিগত অস্বস্তির কথা বলে না; এটি তাঁর সমগ্র জীবনের একটি গভীর ও বেদনাময় অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে। কোন জায়গাকে মানুষ আসলে নিজের জায়গা বলবে? যেখানে সে প্রথম জন্মেছে? যেখানে সে শৈশবে বড় হয়েছে? যেখানে সে সারাজীবন পড়াশোনা ও কাজ করেছে? নাকি যেখানে তাঁর পূর্বপুরুষের স্মৃতি, ভাষা ও আত্মপরিচয়ের শিকড় পোঁতা রয়েছে?

সাঈদের এই দার্শনিক প্রশ্নের কোনো একরৈখিক বা সহজ উত্তর নেই। সাঈদের চিন্তার অনন্য সৌন্দর্য হয়তো এখানেই, তিনি সহজ বা একরৈখিক উত্তর নিয়ে কখনোই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি বরং দেখাতে চেয়েছিলেন, মানুষের পরিচয় অনেক সময় গড়ে ওঠে অন্য কারও সাথে কৃত্রিম তুলনা তৈরি করতে গিয়ে। যেমন ‘আমরা’কে (We) স্পষ্টভাবে বুঝতে গেলে একদল ‘ওরা’কে (They) নির্মাণ করতে হয়; ‘পাশ্চাত্য’কে উন্নত হিসেবে বোঝাতে গিয়ে ‘প্রাচ্য’কে একটি বিশেষ দুর্বল রূপ দেওয়া হয়; নিজেদের ‘সভ্য’ বলে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে অপরকে ‘অসভ্য’ বানানো হয়; আর নিজেদের ‘আধুনিক’ হিসেবে প্রমাণ করতে গিয়ে দূরের কাউকে ‘পিছিয়ে থাকা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই ‘অন্য’ (Other) বানানোর প্রক্রিয়াটিই সাঈদের চিন্তায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাকে জ্ঞানতত্ত্বের ভাষায় বলা হয় ‘Othering’, অর্থাৎ অপরকে এমনভাবে নির্মাণ ও উপস্থাপন করা, যাতে সে আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, অচেনা এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিচু ও শাসনযোগ্য বলে মনে হয়।

এবার একটি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন করা যাক, ‘প্রাচ্য’ বলতে আসলে ঠিক কী বোঝায়, এবং সেই ‘প্রাচ্য’ কোথায়? পৃথিবীর মানচিত্রে দিক নির্দেশক হিসেবে অবশ্যই পূর্ব রয়েছে। কিন্তু পশ্চিমা বয়ানে যখন ‘প্রাচ্যের মানুষ’ বা প্রাচ্যের কথা বলা হয়, তখন ঠিক কাদের বোঝানো হয়? চীন, ভারত, বাংলাদেশ, ইরান, আরব বিশ্ব, জাপান নাকি তুরস্ক? এদের কারও ভাষা এক নয়, কারও ধর্ম এক নয়, ইতিহাস এক নয়, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এক নয়, এমনকি সামাজিক সংস্কৃতিও এক নয়। তাহলে এত বিপুল ও বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ডের ভিন্ন ভিন্ন মানুষকে এক পাল্লায় মেপে একসাথে ‘প্রাচ্য’ বলা হলো কীভাবে?

সাঈদের বিশ্বখ্যাত বই Orientalism ঠিক এই প্রশ্নটিকেই বিশ্বমঞ্চের সামনে নিয়ে আসে। বইটি ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশের পরপরই এটি সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও ঔপনিবেশিকতার অধ্যয়নে এক বৈপ্লবিক আলোড়ন সৃষ্টি করে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়নে, বইটি পশ্চিম কীভাবে ‘East’ বা ‘Orient’-কে নিজের মতো করে কল্পনা করেছে ও দেখেছে, সেই জটিল দৃষ্টিভঙ্গির এক গভীর ব্যবচ্ছেদ। ‘Orient’ শব্দটির বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘প্রাচ্য’; কিন্তু সাঈদের কাছে সমস্যাটি কেবল একটি পারিভাষিক শব্দে ছিল না, আসল সমস্যাটি ছিল, ইতিহাসজুড়ে এই ‘প্রাচ্য’কে পশ্চিমা কল্পনায় কীভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। ইউরোপীয় সাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা, চিত্রকলা, প্রশাসনিক সরকারি নথি এবং রাজনৈতিক ভাষ্য, বহু ধরনের রচনায় দীর্ঘদিন ধরে ‘প্রাচ্য’কে একটি নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় রূপ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে পূর্ব ছিল যুক্তিহীন, রহস্যময়, কখনো কামুক, কখনো অলস, নিষ্ঠুর, কখনো শিশুসুলভ, কখনো বা অদ্ভুত সুন্দর ও বর্বরোচিত।

অন্যদিকে সেই একই সমীকরণে পশ্চিমকে সবসময় উপস্থাপন করা হয়েছিল যুক্তিবাদী, আধুনিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং প্রগতিশীল হিসেবে। ফলে মনস্তাত্ত্বিক স্তরে অদ্ভুত দ্বৈত চিত্র তৈরি হলো, আমরা বনাম তারা, পশ্চিম বনাম পূর্ব, যুক্তি বনাম আবেগ, সভ্যতা বনাম অসভ্যতা, এবং আধুনিকতা বনাম পশ্চাৎপদতা। সাঈদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বললেন, এই বিভাজনকে কেবল সরল কোনো সাংস্কৃতিক পার্থক্য বা সাহিত্যের কল্পনা হিসেবে দেখলে চলবে না; কারণ এই ধরনের বর্ণনা বাস্তব পৃথিবীতে ক্ষমতার সম্পর্ক ও ভৌগোলিক দখলের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল। তাঁর বিশ্লেষণে জ্ঞান কীভাবে ক্ষমতা ও শাসনের সাথে সম্পর্কিত হয়ে কাজ করে, সেটিই ছিল প্রধান তাত্ত্বিক বিষয়।

বিষয়টি বোঝার জন্য দুটি গ্রামের একটি রূপক গল্প ভাবা যাক। ধরা যাক, দুটি গ্রামের মধ্যে বহু বছর ধরে রেষারেষি ও ক্ষমতার বিরোধ চলছে। এক গ্রামের মানুষ নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী অন্য গ্রামের মানুষকে নিয়ে গল্প বানাতে শুরু করল, “ওরা বড় রাগী”, “ওরা কাউকে বিশ্বাস করে না”, “ওরা নিজেরা কোনো ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না”, কিংবা “ওরা একটু সুযোগ পেলেই মারামারি করে।” প্রথমে এগুলো হয়তো ছিল কয়েকজনের মুখের ব্যক্তিগত ধারণা ও পরচর্চা। কিন্তু এরপর কেউ সেই কথাগুলো নথিবদ্ধ করে লিখে ফেলল; আরেকজন সেই লেখা পড়ে নতুন একটি বই লিখল; পরবর্তীকালে আরেকজন গবেষক সেই বইয়ের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বড় গবেষণা করলেন; এবং আরেকজন সেই গবেষণার সূত্র ধরে সভায় বড় বক্তৃতা দিলেন। দেখতে দেখতে একসময় সেই গ্রামের মানুষদের সম্পর্কে একটি সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক ‘জ্ঞান’ তৈরি হয়ে গেল। ফলে যারা জীবনে কোনোদিন ওই গ্রামে পা রাখেনি, তারাও দূর থেকেই ধরে নিল, “ওরা ঠিক এমনই।” এখন যদি কোনো বাইরের প্রশাসক সেই গ্রাম পরিচালনা বা শাসন করতে আসে, তবে সে কোনো বিচার ছাড়াই আগে থেকেই ধরে নেবে যে এই অসভ্য মানুষদের লাঠি দিয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

ছবিতে : এডওয়ার্ড সাঈদ

একটি আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ গল্প তখন আর কেবল গল্প থাকে না; একটি পূর্বনির্ধারিত ধারণা বাস্তব জীবনের রাজনীতি ও শাসননীতিকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। সাঈদের বিশ্লেষণে এটিই ছিল জ্ঞান ও ক্ষমতার মিথস্ক্রিয়ার সবচেয়ে নগ্ন দিক। যে পক্ষ অন্যের সম্পর্কে প্রামাণ্য জ্ঞান তৈরি করার ক্ষমতা রাখে, সে ধীরে ধীরে সেই ‘অন্য’কে সংজ্ঞায়িত ও নিয়ন্ত্রণ করার চূড়ান্ত ক্ষমতাও নিজের পকেটে পুরে নেয়। আর কাউকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষমতা কোনো সামান্য ক্ষমতা নয়; কারণ আমরা নিজেরা নিজেদের সম্পর্কে কী ভাবব, তার ওপরও অপরের বলা প্রভাবশালী গল্পের গভীর প্রভাব পড়ে। কোনো জাতিকে যদি শত বছর ধরে শোনানো হয়, “তোমরা জন্মগতভাবে পিছিয়ে থাকা ও শাসনযোগ্য জাতি”, তবে একসময় সেই হীনম্মন্যতা তার অবচেতন আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে দাঁড়ায়; আবার কোনো আধিপত্যকামী জাতিকে যদি বোঝানো হয়, “তোমরা দুনিয়াকে সভ্য করার জন্য জন্ম নিয়েছ”, তখন পরদেশ দখল করাকেও তাদের কাছে মহৎ ও স্বাভাবিক কর্তব্য বলে মনে হতে থাকে। এই গভীর কারণেই সাঈদের কাছে সংস্কৃতি কখনো রাজনীতি ও ক্ষমতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কোনো নির্দোষ বস্তু ছিল না।

তবে এখানে এসে একটি সাধারণ ভুল ধারণা সম্পর্কে আমাদের খুব সতর্ক হওয়া দরকার। সাঈদের এই বক্তব্যের একটি খুব সহজ কিন্তু মারাত্মক ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে, পশ্চিমের সমস্ত গবেষকই বুঝি অসৎ ছিলেন, তাদের সব গবেষণা সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল, আর পূর্বের (পশ্চিমারা যাদের প্রাচ্য বলে) সবকিছুই বুঝি নিখুঁত ও পবিত্র ছিল। সাঈদের দার্শনিক অবস্থান এত অগভীর বা সস্তা ছিল না। তিনি বরং ঐতিহাসিক ও কাঠামোগতভাবে দেখাতে চেয়েছিলেন যে, জ্ঞান উৎপাদনের যাবতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর থেকেই কাজ করে। একটি প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাকে তার সমকালীন ক্ষমতার রাজনীতি, পৃষ্ঠপোষকতা, ভাষা ও সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে পরম বস্তুনিষ্ঠ বলে দাবি করা সবসময় সম্ভব নয়। তিনি নিজেও Orientalism পরবর্তী বিভিন্ন বিতর্কে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, তাঁর উদ্দেশ্য কোনো একটি বিশাল ভৌগোলিক জনগোষ্ঠীকে এক কথায় বাছবিচারহীনভাবে দোষারোপ করা নয়; তাঁর মূল সমালোচনার নিশানা ছিল সেই ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্ব, যা প্রাচ্যের কোটি কোটি বৈচিত্র্যময় মানুষকে একটিমাত্র অপরিবর্তনীয় ও স্থবির ছাঁচে ফেলে বিচার করত। অর্থাৎ সমস্যাটি পশ্চিমে জন্ম নেওয়া রক্তমাংসের ব্যক্তি মানুষ নয়; সমস্যাটি হলো সেই আধিপত্যকামী দৃষ্টিভঙ্গি, যা অপর মানুষের মানবিক জটিলতাকে মুছে দিয়ে তাকে একটি সস্তা ক্যারিকেচারে পরিণত করে। এই পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি; কারণ অন্যায্য ঔপনিবেশিক সাধারণীকরণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমরা যদি উল্টো আরেকটি অন্ধ সাধারণীকরণ তৈরি করে ফেলি যে “পশ্চিমের সবাই এমন”, তাহলে আমরা অজান্তেই ঠিক সেই বুদ্ধিবৃত্তিক ভুলটি করব, যার বিরুদ্ধে এডওয়ার্ড সাঈদ আজীবন কলম ধরেছিলেন।

এবার বিষয়টি নিজেদের আরও কাছে টেনে এনে বোঝার চেষ্টা করা যাক। ধরা যাক, একজন বিদেশি গবেষক বা পর্যটক বাংলাদেশে এলেন। তিনি কয়েক দিন ঢাকার রাস্তায় ঘুরে তীব্র যানজট দেখলেন, কোনো একটি প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে দরিদ্র মানুষের অভাব দেখলেন, খবরের কাগজে রাজনৈতিক সংঘাতের খবর পড়লেন, আবার একই সাথে নদীর পাড়ে প্রকৃতির এক অপরূপ সূর্যাস্ত প্রত্যক্ষ করলেন। দেশে ফিরে গিয়ে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে একটি মোটা বই লিখে ফেললেন, “বাংলাদেশের মানুষ ও সমাজ।” 

বইটিতে হয়তো এখানকার চরম দারিদ্র্য, নাগরিক বিশৃঙ্খলা, মানুষের অমায়িক আতিথেয়তা, ধর্মীয় আচার আর নদীমাতৃক সৌন্দর্যের বহু চিত্র উঠে আসবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই বইটিই কি সামগ্রিক বাংলাদেশ? অবশ্যই নয়; সেটি কেবল একজন নির্দিষ্ট বহিরাগতের চোখে ধরা পড়া বাংলাদেশের একটি আংশিক সংস্করণ মাত্র। বিপত্তিটি ঠিক তখন শুরু হয়, যখন বিশ্বজুড়ে সেই একটিমাত্র সংস্করণকেই ‘বাংলাদেশের একমাত্র ধ্রুব সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়া হয়। আর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে তখন, যখন বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চাওয়া বিশ্বের পাঠকসমাজ এই দেশের মানুষের নিজেদের লেখা হাজার হাজার সাহিত্য ও ইতিহাস বাদ দিয়ে কেবল ওই একজন বিদেশি পর্যটকের বইটি পড়েই পুরো দেশকে বিচার করে বসে। তখন একটি সমগ্র জাতির নিজস্ব কণ্ঠস্বর ও আত্মপরিচয়ের জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।

সাঈদ আমাদের ঠিক এই জায়গাটিতে নিজের গল্প নিজের ভাষায় বলার অপরিসীম গুরুত্ব মনে করিয়ে দেন। তবে এখানেও একটি সতর্কতা রয়েছে, নিজের গল্প নিজে বললেই যে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শতভাগ নির্ভেজাল সত্য হয়ে যাবে, তা-ও নয়; কারণ আমাদের নিজেদের সমাজেও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতি আছে, পুরুষতান্ত্রিক পক্ষপাত আছে, শ্রেণিগত শোষণ আছে এবং রাজনৈতিক স্বার্থের খেলা আছে। ফলে সত্যের সন্ধান মানে কেবল ‘পশ্চিমের আধিপত্যবাদী গল্প’কে সরিয়ে দিয়ে সেখানে ‘পূর্বের পক্ষপাতদুষ্ট গল্প’ বসিয়ে দেওয়া নয়; বরং সমাজের আরও বহু বিচিত্র ও প্রান্তিক কণ্ঠস্বরকে উন্মুক্তভাবে শুনতে পাওয়া, ক্রমাগত প্রশ্ন তোলা এবং ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশাপাশি রেখে সত্যের জটিলতাকে উপলব্ধি করা।

এখানে এসেই এডওয়ার্ড সাঈদের ব্যক্তিগত জীবনে হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ও তাঁর দর্শনের সাথে এক অবিচ্ছেদ্য মোহনায় মিলিত হয়। তিনি কোনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত লাইব্রেরিতে বসে কেবল বইয়ের অক্ষরের জন্য ‘অন্যকে কীভাবে দেখা হয়’, সেই প্রশ্ন তোলেননি; তিনি নিজের অস্থিমজ্জায় নির্বাসন, উচ্ছেদ এবং পরিচয়ের সংকটকে প্রতিদিন বয়ে বেড়িয়েছেন। ফিলিস্তিনের প্রশ্নটি ছিল তাঁর সমগ্র চিন্তার মূল স্পন্দন। বিশেষ করে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর তাঁর ভেতরের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়বদ্ধতা এক তীব্র রূপ ধারণ করে। তিনি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানবাধিকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অত্যন্ত জোরালো ও সাহসী ভূমিকা পালন করেন এবং পশ্চিমা বিশ্বে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে সবচেয়ে বলিষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক মুখ হয়ে ওঠেন। তবে সাঈদ প্রথাগত কোনো রাজনীতিবিদ বা দলবাজ ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন খাঁটি সাহিত্যতাত্ত্বিক ও স্বাধীন বিবেকবান বুদ্ধিজীবী। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, কোনো একটি জাতির রাজনৈতিক বিপর্যয় বোঝার জন্য কেবল সীমানার যুদ্ধ, সেনাবাহিনীর ট্যাংক, ভূরাজনীতি বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেখলে যথেষ্ট হয় না; মানুষের কল্পনার জগতের দিকেও গভীর দৃষ্টি দিতে হয়। কারণ বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে কামান দাগার বহু আগেই মানুষের মনের ভেতরে আরেক অদৃশ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সেখানে সাহিত্যের মাধ্যমে, প্রচারমাধ্যমের দ্বারা কোনো একটি জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সুপরিকল্পিত ভীতি ও ঘৃণা তৈরি করা হয়, তাদের সংস্কৃতিকে পশ্চাৎপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর এই কৃত্রিম বিদ্বেষ যখন সংস্কৃতি ও মনোজগতে স্বাভাবিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়, তখনই তাদের ওপর পরিচালিত অন্যায় দখলদারি ও যুদ্ধকেও বিশ্ববাসীর চোখে ন্যায্য বলে চালানো সহজ হয়ে ওঠে; এই কারণেই সাঈদ সাহিত্য ও সংস্কৃতির লড়াইকে রাজনৈতিক মুক্তির চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন না।

এই চিন্তারই এক মহাকাব্যিক বিস্তার ঘটেছিল ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত সাঈদের আরেকটি যুগান্তকারী গ্রন্থ Culture and Imperialism-এ । এই বইটিতে তিনি গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, সাম্রাজ্যবাদ কেবল বন্দুকের নল, নৌবহর কিংবা রাজনৈতিক সনদের মাধ্যমেই বিস্তার লাভ করেনি; বরং পশ্চিমা ক্ল্যাসিক্যাল সাহিত্য ও সংস্কৃতির নিবিড় বুননের মধ্যেও সাম্রাজ্যবাদী মনস্তত্ত্ব অত্যন্ত স্বাভাবিক ছন্দে প্রবাহিত ছিল। কোনো একটি বিখ্যাত ধ্রুপদি উপন্যাসে হয়তো সরাসরি বলা হচ্ছে না যে “এই অনগ্রসর দেশটিকে আমাদের সৈন্য পাঠিয়ে দখল করা উচিত।” কিন্তু উপন্যাসের পটভূমিতে ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন ও দখলদারিকে এমন এক স্বাভাবিক ও নির্দোষ বিষয় হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়, যেন দূরদেশের কোনো এক দ্বীপ শাসন করাই ওই ইউরোপীয় চরিত্রের একমাত্র জন্মগত অধিকার। কোনো চরিত্র হয়তো খুব স্বাভাবিকভাবেই পূর্বের মানুষকে অদ্ভুত, খামখেয়ালী বা দাসসুলভ হিসেবে চিত্রিত করে চলেছে, আর তৎকালীন সাধারণ পাঠক কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সেই রোমাঞ্চকর সাহিত্য গিলতে গিলতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং সাম্রাজ্যের নিষ্ঠুর শাসনকে মানবজাতির স্বাভাবিক শৃঙ্খলা হিসেবে গ্রহণ করে নিচ্ছে। সাঈদের কাজ ছিল সাহিত্যের সেই আপাত নিষ্পাপ আবরণের নিচে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক মতাদর্শকে টেনে বের করা। তাঁর কাছে সাহিত্য কেবল কিছু অবসর যাপনের বিনোদন ছিল না; সাহিত্য হলো মানুষের সামষ্টিক কল্পনাকে রূপ দেওয়ার প্রধান কারখানা। আর যে জিনিস মানুষের কল্পনাকে নির্মাণ করে, তা শেষ পর্যন্ত মানুষের বাস্তব বিশ্বদর্শনকেও পরিচালনা করে; ফলে একজন লেখক সচেতনভাবে রাজনীতি নিয়ে এক ছত্র না লিখলেও তাঁর সৃষ্টির গভীরে কীভাবে সাম্রাজ্যের অদৃশ্য ছায়া খেলা করে, সাঈদ তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন।

সাঈদের সামগ্রিক চিন্তাকে যদি একটিমাত্র ধারণায় ধারণ করতে বলা হয়, তবে ‘Othering’ বা ‘ভিন্নকরণ’ টার্মটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এটি কোনো অভিধানের তাত্ত্বিক শব্দ নয়; আমাদের প্রাত্যহিক কথাবার্তা ও চিন্তায় আমরা প্রতিনিয়ত এই ভিন্নকরণ ঘটিয়ে চলছি। আমরা খুব সহজেই বলে ফেলি, “ওরা এমন”, “ওদের স্বভাবই খারাপ”, “ওই জেলার মানুষ এমনই হয়”, “অমুক ধর্মের মানুষ কখনো বিশ্বাসযোগ্য নয়”, কিংবা “ওই শ্রেণির মানুষের স্বভাব কোনোদিন বদলাবে না।” এই বাক্যগুলোর সবচেয়ে বড় মানসিক সন্ত্রাস হলো, এগুলো একেকজন রক্তমাংসের বিচিত্র মানুষকে তার নিজস্ব ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও মানবিক জটিলতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে একটি বিশাল অন্ধ দলের ট্যাগের ভেতর আটকে ফেলে। একজন মানুষের নিজস্ব ভালো-মন্দ, দুঃখ-কষ্ট বা সততা হারিয়ে যায়; আর তার ওপর সস্তা এক সামাজিক ‘স্টেরিওটাইপ’ বা ছাঁচ চাপিয়ে দেওয়া হয়। সাঈদ আমাদের ঠিক এই মারাত্মক সরলীকরণটির মুখে দাঁড়িয়ে আত্মজিজ্ঞাসা করতে বলেন। একজন মানুষ কি সত্যিই কোনো একটি বিশেষ দলের বা পরিচয়ের একমাত্র ও সামগ্রিক প্রতিনিধি হতে পারে? একজন মুসলমান কি পৃথিবীর সমস্ত মুসলমানের প্রতিনিধি? একজন ইউরোপীয় কি সমগ্র ইউরোপের প্রতিনিধি? কিংবা একজন ফিলিস্তিনি কি সমগ্র ফিলিস্তিনের একমুখী কণ্ঠস্বর? কখনোই নয়। মানুষের আত্মপরিচয় সব সময় অসংখ্য বিচিত্র স্তরে নির্মিত হয়। তার পারিবারিক শিক্ষা, ভাষা, সামাজিক শ্রেণি, পেশা, শৈশবের স্মৃতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ধর্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চেতনা, সবকিছুর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে তার জটিল মানবসত্তা। ফলে কোনো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে একটিমাত্র সরলীকরণ বাক্যে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়াস বাইরে থেকে যতই চটকদার মনে হোক না কেন, তা মূলত এক ভয়ংকর বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন।

তবে সাঈদকে কি কেবল একপাক্ষিক ‘পশ্চিমের সমালোচক’ হিসেবে দেখা উচিত? একেবারেই না; এখানে সাঈদের দার্শনিক গভীরতার আরেকটি অনন্য মানবিক মাত্রা উন্মোচিত হয়। তিনি ছিলেন একজন আপাদমস্তক ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী। তিনি মনে করতেন, অন্যের অন্যায়ের সমালোচনা করতে গিয়ে যদি আমরা নিজেদের ভেতরের অন্ধত্ব, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও স্বৈরতন্ত্রের সমালোচনা ভুলে যাই, তবে সেই জ্ঞানচর্চার কোনো নৈতিক মূল্য থাকে না। তাঁর ‘Humanism and Democratic Criticism’ গ্রন্থে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, সাঈদের কাছে মানবতাবাদ ছিল এমন এক মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, যা আত্মজ্ঞান, নির্মোহ আত্মসমালোচনা এবং অপরের সংস্কৃতির জটিল অভিজ্ঞতাকে গভীর সহানুভূতির সাথে বোঝার পথ উন্মুক্ত করে। অর্থাৎ অপরকে বুঝতে হলে কেবল অপরের দোষত্রুটির দিকে আঙুল তোলাই যথেষ্ট নয়; নিজের চোখের দিকেও তাকাতে হবে। আমরা কেন একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে এমন ভাবছি? আমাদের এই ধারণার উৎসটি আসলে কোথায়? আমরা কাদের লেখা ইতিহাস পড়েছি, আর কাদের ইতিহাসকে সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হয়েছে? কার কান্নার আওয়াজ আমাদের কানে পৌঁছেছে, আর কার কণ্ঠকে রাষ্ট্র বা সমাজের ক্ষমতা দিয়ে স্তব্ধ করে রাখা হয়েছে? এই প্রশ্নগুলো কেবল দূর অতীতের কোনো ইতিহাসের জন্য নয়; আমাদের প্রতিদিনের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এই আত্মবীক্ষণ সমভাবে প্রাসঙ্গিক।

আজকের একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ডিজিটাল দুনিয়ার দিকে তাকালে সাঈদের এই সতর্কতা যেন আরও শতগুণ বেশি বাস্তব হয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা মিডিয়ায় হঠাৎ একটি উসকানিমূলক বা চমকপ্রদ ছবি ভেসে ওঠে। ছবির নিচে সংবেদনশীল কোনো ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া হয়, আর কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ কোনো কিছু না ভেবেই তা শেয়ার করতে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যে ছবিটি আর কোনো প্রশ্নের বিষয় থাকে না, তা একটি ‘ধ্রুব সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় এবং সমাজে দাঙ্গা বা বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। কিন্তু একটু থেমে কি আমরা কখনো প্রশ্ন করি, ছবিটি আসলে কে তুলেছিল? কোন বিশেষ মুহূর্তে, কোন প্রেক্ষাপটে এটি ধারণ করা হয়েছিল? ছবির দৃশ্যটির আগে সেখানে কী ঘটেছিল, আর দৃশ্যটির পরে কী হয়েছিল? ক্যাপশনটি যিনি লিখেছেন তাঁর নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা বাণিজ্যিক স্বার্থ আছে কি না? আমরা কি সত্যিই খালি চোখে ওই ছবিটি দেখছি, নাকি ছবির সাথে আমাদের গিলিয়ে দেওয়া গল্পটিকে সত্যি বলে বিশ্বাস করছি?

ঠিক এই জায়গাতেই এডওয়ার্ড সাঈদ আমাদের মনোজগতে কড়া সতর্কবার্তা দেন। তিনি আমাদের বুঝাতে চান, যে কোনো বর্ণনা কিংবা বয়ানকে সত্য বলে মেনে নেওয়ার আগে দেখতে হবে সেই বয়ানটি কার দৃষ্টিকোণ থেকে এবং কোন সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছে। আজ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, চলচ্চিত্র, বিনোদন শিল্প এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম প্রতিনিয়ত আমাদের মগজে পক্ষপাতিত্বমূলক বিষয়বস্তু ইনপুট দিচ্ছে। কোনো একটি বিশেষ ভূখণ্ডের মানুষকে যদি খবরের পর্দায় সবসময় বোমা, সন্ত্রাস আর দারিদ্র্যের সাথেই একাত্ম করে দেখানো হয়, তবে বিশ্ববাসীর চোখে সেই দেশের একটি চিরস্থায়ী কাল্পনিক অন্ধকারচ্ছন্ন ছবি তৈরি হতে বাধ্য। আবার কোনো আধিপত্যবাদী দেশকে যদি সবসময় শুধুই প্রযুক্তি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পরাশক্তি হিসেবে দেখানো হয়, তবে তাদের দ্বারা সংঘটিত যাবতীয় ধ্বংসযজ্ঞও চোখের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। বাস্তবতা তো কোনো সস্তা সাদা-কালো ক্যানভাস নয়; বাস্তবতা এর চেয়ে বহুগুণ জটিল। সাঈদের বার্তাটি তাই অত্যন্ত সোজাসাপ্টা, যে ছবিটি অত্যন্ত সুকৌশলে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে, কেবল সেটুকুই দেখলে চলবে না; ফ্রেমের আড়ালে সচেতনভাবে কী লুকিয়ে রাখা হলো, চোখ কান খোলা রেখে সেটাও আবিষ্কার করতে হবে।

সাঈদের সমগ্র জীবনের আরেকটি অত্যন্ত গভীর ও দার্শনিক শব্দ হলো, ‘নির্বাসন’ (Exile)। নির্বাসন কেবল ভৌগোলিকভাবে এক দেশ থেকে উৎখাত হয়ে অন্য দেশে শরণার্থী হওয়া নয়; কোনো কোনো মানুষের জন্য নির্বাসন মানে হলো নিজের পরিচিত সমাজ ও চিন্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দাঁড়িয়ে সত্যকে দেখার এক দুঃসাহসী অবস্থান। একজন মানুষ হয়তো এমন এক ভাষায় কথা বলছেন যা তাঁর মায়ের মুখের ভাষা নয়, এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন যেখানে তাঁর দেশের করুণ ইতিহাস অনেকের কাছে অপরিচিত, এবং এমন এক সমাজে তিনি বাস করছেন যেখানে তাঁর নিজের জাতিসত্তা সম্পর্কে মানুষ পদে পদে বিকৃত ও সংকীর্ণ ধারণা পোষণ করে। এমন গভীর টানাপোড়েনের মুহূর্তে একজন সংবেদনশীল মানুষ কোথায় আশ্রয় নেবে? সমাজের প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর ভেতরে, নাকি কাঠামোর বাইরে? সাঈদের মতে, একজন সত্যিকারের বুদ্ধিজীবীর জন্য এই ‘মাঝখানে থাকা’ (in-between) বা এক ধরনের আত্মিক নির্বাসনে (spiritual exile) থাকা এক বিরাট শক্তি হতে পারে। কারণ যে মানুষ কোনো দল, কোনো রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠানের অন্ধ মোহে পুরোপুরি নিজেকে সঁপে দেয় না, সে একই সাথে ভেতর থেকেও নিজের সমাজকে দেখতে পারে, আবার বাইরে দাঁড়িয়েও তার ত্রুটিগুলো ধরতে পারে। সে কোনো কৃত্রিম নিরাপদ আশ্রয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকে না বলেই তার দৃষ্টিতে সমাজের অস্বস্তিকর সত্যগুলো খুব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

সাঈদের বুদ্ধিজীবী-সংক্রান্ত দর্শনে এই আপসহীন দূরত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, একজন সত্যিকারের বুদ্ধিজীবীর কাজ কোনো ক্ষমতাশালী দলের তোষামোদ করা নয়, রাজদরবারের সুবিধাভোগী পাহারাদার হওয়া নয়; বরং ক্ষমতার চোখের দিকে চোখ রেখে নির্ভীক কণ্ঠে অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করা এবং সমাজের নির্যাতিত, দুর্বল ও কণ্ঠহীন মানুষের পক্ষে আজীবন দাঁড়িয়ে থাকা। একজন বুদ্ধিজীবীর কাজ কেবল জ্ঞানের পাণ্ডিত্য দেখানো নয়; সমাজে প্রতিনিয়ত অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া, এবং প্রয়োজনে নিজের পক্ষের অন্ধ অন্ধত্বকেও কঠোর সমালোচনার মুখে দাঁড় করানো।

এত দীর্ঘ ও জটিল পর্যালোচনার পর হয়তো খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জীবনে এডওয়ার্ড সাঈদের এই দর্শন থেকে আসলে প্রতিদিনের কী শিক্ষা নেওয়ার আছে? সেই শিক্ষাটি অত্যন্ত বাস্তব ও সহজ। যখনই আমরা কোনো জাতি, কোনো সম্প্রদায় কিংবা কোনো মানুষ সম্পর্কে একটি চটকদার গল্প বা প্রচার শুনব, সাথে সাথে তা অন্ধের মতো বিশ্বাস না করে আমরা অন্তত একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলতে পারি, এই গল্পটি আসলে কে বলছে? এই একটিমাত্র প্রশ্ন আমাদের চিন্তার বহু রুদ্ধ কপাট এক নিমেষে খুলে দিতে পারে।

কোনো দেশ বা সংস্কৃতি সম্পর্কে কোনো বই পড়লে আমরা নিজেদের জিজ্ঞেস করতে পারি, এই বইয়ের বর্ণনায় সেই মাটির সাধারণ মানুষ নিজের ভাষায় কোথায় কথা বলার সুযোগ পেয়েছে? কোনো একটি বিশেষ জাতি সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত নেতিবাচক মন্তব্য শুনলে আমরা বিবেককে প্রশ্ন করতে পারি, গুটিকয়েক মানুষের আচরণ বা রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে কি লক্ষ কোটি মানুষকে একটি অভিন্ন বাক্সে আটকে ফেলা যায়? খবরের কাগজের কোনো চাঞ্চল্যকর শিরোনাম দেখলে আমরা ভাবতে পারি, আমি কি বাস্তব ঘটনাটিকে নির্মোহভাবে দেখছি, নাকি ঘটনার নামে একটি বিশেষ রাজনৈতিক ব্যাখ্যা আমাকে গিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে? আর ইতিহাস পাঠের সময় আমরা খুঁজতে পারি, এই বিজয়ের ইতিহাসে কাদের গৌরবগাথা লেখা হলো, আর কাদের হাহাকার ও আত্মত্যাগকে চিরতরে নীরব করে দেওয়া হলো? এগুলো কেবল সন্দেহের জন্য সন্দেহ করা নয়; বরং অপরকে আরও গভীর মমতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে বোঝার জন্য এক সচেতন বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মরক্ষা। সাঈদের দর্শনের সবচেয়ে দীপ্তিময় দিক সম্ভবত এখানেই যে, তিনি আমাদের কেবল অন্যের চোখ দিয়ে জগৎ দেখা বন্ধ করতেই বলেননি; বরং আমরা নিজেরাও অপরকে কোন চোখের চশমা দিয়ে দেখছি, সেই চশমার কাচটিকেও বারবার মুছে পরিষ্কার করতে বলেছেন।

২০০৩ সালে যখন এডওয়ার্ড সাঈদের জীবনাবসান ঘটে, তখন তিনি শারীরিকভাবে বিদায় নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া তাত্ত্বিক প্রশ্নগুলো বিশ্বমঞ্চে আজও রয়ে গেছে। কারণ তাঁর মূল প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি আজও হয়নি, কে শেষ পর্যন্ত এই পৃথিবীর গল্প বলবে? ইতিহাসের বয়ান কার হাতে লেখা হবে? কে নির্ধারণ করে দেবে কোন জাতি ‘সভ্য’ আর কোনটি ‘বর্বর’? কার ক্ষমতায় নির্ধারিত হবে কে ‘আধুনিক’ আর কে ‘অনগ্রসর’? এবং সর্বোপরি, যে মানুষটির ভাগ্য নিয়ে বিশ্বরাজনীতির ছক আঁকা হচ্ছে, সেই অবহেলিত মানুষটির নিজের বুকভাঙা আর্তনাদ বিশ্ববাসী শুনবে কার মুখে? সাঈদ আমাদের কোনো সহজ, আরামদায়ক পৃথিবীর চিত্র উপহার দিয়ে যাননি; তিনি আমাদের পৃথিবীকে বহু স্তরের জটিলতায় উন্মোচিত করে দিয়ে গেছেন, আর সেখানেই একজন সত্যিকারের দার্শনিকের চিরন্তন অবদান। কারণ একটি অতিসরলীকৃত পৃথিবীতে কোনো চিন্তা থাকে না, সেখানে সব প্রশ্নের তৈরি করা মুখস্থ উত্তর আগে থেকেই মজুত থাকে, “ওরা খারাপ, আমরা ভালো; ওরা বর্বর, আমরা আধুনিক; ওরা ধর্মান্ধ, আমরা আলোকিত।” কিন্তু বাস্তব মানুষের পৃথিবী কোনোদিন এমন বিভাজনে চলে না। বাস্তব পৃথিবীতে এক দেশের সংস্কৃতি অন্য দেশের সংস্কৃতির সাথে হাজার বছর ধরে বিনিময় করে বেঁচে থাকে, ভাষা সীমান্ত পেরিয়ে ভ্রমণ করে, মানুষের চিন্তা দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে পড়ে, আর একজন মানুষের ব্যক্তিস্বত্তার ভেতরেই বহু ভিন্ন সংস্কৃতির নদী এসে মোহনা তৈরি করে।

সাঈদের নিজের জীবনই ছিল এই বৈচিত্র্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ, জেরুজালেমের শৈশব, কায়রোর বেড়ে ওঠা, বৈরুতের স্মৃতি আর নিউইয়র্কের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই, এই সমস্ত ভূগোল তাঁর অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। সেই বহু পৃথিবীর সন্ধিস্থলে দাঁড়িয়ে তিনি মানবজাতিকে এই চরম সত্যটির মুখোমুখি করে দিয়ে গেছেন, মানুষকে কোনো একক, সংকীর্ণ পরিচয়ের গণ্ডিতে কখনোই পুরোপুরি বাঁধা যায় না। তাই অপরের গল্প শুনতে গেলে কেবল মুখের গল্পটি শোনাই যথেষ্ট নয়; গল্পের ভেতরের রাজনীতির ভাষা শুনতে হয়, গল্পকার কার স্বার্থ পাহারা দিচ্ছেন তা দেখতে হয়, গল্পের বাইরে কাদের জোর করে ব্র্যাকেটবন্দি করে রাখা হলো তাদের সন্ধান করতে হয়, এবং সর্বোপরি নিজের চোখের দৃষ্টির ওপরও মাঝে মাঝে গভীর সন্দেহ করতে হয়। কারণ আমরা যে দুনিয়াকে দেখি, তা কোনো নিরপেক্ষ দুনিয়া না; তা হলো আমাদের বিশেষ অভিজ্ঞতার আলোকে নির্মিত এক বিশেষ দুনিয়া। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটুকু বুঝতে শেখার মধ্য দিয়েই মুক্ত চিন্তার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

এডওয়ার্ড সাঈদের সমগ্র দর্শনের সবচেয়ে পরম শিক্ষা তাই হয়তো এটাই, অন্যকে সংজ্ঞায়িত করার আগে, অন্যকে আমরা ঠিক কীভাবে ও কার স্বার্থে দেখছি, সেই প্রক্রিয়াটিকে আগে সৎভাবে বোঝা দরকার; আর সেই আত্মজিজ্ঞাসা থেকেই আমাদের বিবেকের সামনে জীবনের শেষ প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়, আমরা যখন কোনো ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন জাতি কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে কোনো একটি গল্প বলি বা রায় দিয়ে ফেলি, তখন আমরা কি সত্যি সত্যিই তাকে জানার ও বোঝার চেষ্টা করছি, নাকি নিজের অহংকার ও অন্ধ সংস্কারের তৈরি করা একটি কৃত্রিম ছবি জোর করে তার ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাকে ‘অন্য’ (Other) বানিয়ে রাখছি?


Picture of অর্বাচিন আব্দুল্যাহ

অর্বাচিন আব্দুল্যাহ

অর্বাচিন আব্দুল্যাহ একজন লেখক ও অনুবাদক

শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইটে লাখ লাখ হামলার চেষ্টা। ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

প্যারিসের শহরতলির এক স্কুলের ফাঁকা পদ থেকে শুরু হয়ে এক মাসে সারা দেশ। এই আন্দোলনের মুখ কারা এবং কেন।

দ্য পাবলিশ

ভারতে বাড়ছে তরুণদের ক্ষোভ, রাস্তায় নামছেন বিরোধীরা। তবু বাংলাদেশের জুলাইয়ের সঙ্গে ভারতের আন্দোলনের দূরত্ব কতটা এবং কেন?

দ্য পাবলিশ

Scroll to Top