আলো কম। ফেয়ারি লাইটের উষ্ণ আভায় সারি সারি ফটোবক্স, প্রতিটিতে জহির রায়হানের প্রামাণ্যচিত্র স্টপ জেনোসাইড-এর একেকটি স্থির ফ্রেম। আতঙ্কে ঘর ছাড়া মানুষের অন্তহীন মিছিল। শরণার্থী শিবিরের এক বৃদ্ধের ক্লোজ-আপ। আর একটি উলঙ্গ শিশুর প্রস্রাব করার দৃশ্য, যাকে পড়া হয়েছে নির্মম এক রূপক হিসেবে: যেন তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্র নিজের লজ্জার স্রোতেই ভেসে যাচ্ছে।
১৯৭১ সালের এই ছবিগুলো আজও অস্বস্তিকর রকম সমকালীন লাগে। কারণ ফ্রেমগুলো এমন একটি প্রশ্ন তোলে, যা কোনো একটি যুদ্ধে আটকে থাকে না। রাষ্ট্র যখন সহিংস হয়ে ওঠে, ক্যামেরা তখন কী করবে? দেখবে, নাকি চোখ ফিরিয়ে নেবে? এই আলোকচিত্র প্রদর্শনীর বর্ণনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সম্প্রতি আয়োজিত অভিনব এক আয়োজনের একটি পর্ব মাত্র। বিয়ন্ড দ্য সাইলেন্স শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের উপলক্ষ ছিল ‘আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস’।
নীরবতা, নৃশংসতা ও নন্দনতত্ত্ব
নীরবতা সব সময় কথা না বলার নাম নয়। অনেক ক্ষেত্রে সেটি ভয় আর অভ্যাসের ফল: যা বলা বিপজ্জনক, তা ধীরে ধীরে ভাবাও অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রে এর চেহারা আরও সূক্ষ্ম। নির্মাতা নিরাপদ বিষয় বেছে নেন, পর্দা থেকে কিছু মুখ ও ঘটনা বাদ পড়ে, আর দর্শক অভ্যস্ত হয়ে যান সেই অনুপস্থিতিতে। এই দিক থেকে দেখলে নীরবতা নিজেই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। শান্তি দিবসের ধারণাটিও এখানে নতুন প্রশ্নের মুখে পড়ে। ২১ সেপ্টেম্বরের প্রতীকী যুদ্ধবিরতি যুদ্ধের অবসান চায়। কিন্তু যেখানে বন্দুক থেমে আছে অথচ ভয় থামেনি, সেখানে শান্তি বলতে কী বোঝায়? জাতিসংঘ বিশ্বের শান্তির অভিভাবক হিসেবে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। সেই বিতর্কের পাশে এই আয়োজন শান্তিকে দেখেছে ভয়হীনতার প্রশ্ন হিসেবে।
অনুষ্ঠানে নির্মাতা ও শিক্ষক লাবিব নাজমুস সাকিব আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুমের ঘটনা নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেন: “বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এমন ভয়াবহ ও নৃশংস দৃষ্টান্ত দেখেছে যে ‘স্টেট-ব্রুটালিটি’ আমাদের সিনেমায় একটি স্বতন্ত্র নান্দনিক ধারা হিসেবে উঠে আসতে পারে।” তিনি তুলনা টেনেছেন ‘অ্যাস্থেটিকস অব হাঙ্গার’-এর সঙ্গে। ধারণাটির উৎস অবশ্য ষাটের দশকের ব্রাজিলীয় সিনেমা: নির্মাতা গ্লবার রোশা ১৯৬৫ সালে যুক্তি দিয়েছিলেন, ক্ষুধার সহিংসতাই লাতিন আমেরিকার সিনেমার খাঁটি ভাষা।
রাষ্ট্রীয় নৃশংসতা নিয়ে ছবি বানানো এক কথা। নৃশংসতার অভিজ্ঞতাই যদি একটি সিনেমার আঙ্গিক গড়ে দেয়, সেটা আরেক কথা। তখন প্রশ্ন ওঠে ঝুঁকির: সহিংসতাকে দৃশ্যসুন্দর করে তোলা হচ্ছে না তো? বারবার দেখানো কষ্ট কি দর্শককে সংবেদনশীল করে, নাকি অনুভূতিশূন্য? এবং যাঁর যন্ত্রণা পর্দায় আসছে, তাঁর মর্যাদা কীভাবে রক্ষা হবে? আলোচনার সময় আয়োজনের অংশগ্রহণকারীরা ঠিক এই নৈতিক প্রশ্নগুলোই খতিয়ে দেখেছেন: নৃশংসতা দেখানোর প্রয়োজন কতটুকু, আর দৃশ্যগল্পে তার প্রভাব কেমন।
ইতিহাসের একটি বিষয়ও এখানে চোখে পড়ে। যে জহির রায়হান নিপীড়নের ডকুমেনটারি বানিয়েছিলেন, তাঁকেই বলা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নিখোঁজ শিল্পী। শিল্পের ভাষা আর রাষ্ট্রের সহিংসতা তাই এ দেশের সিনেমার ইতিহাসে বহুদিন ধরে মুখোমুখি।
জাতিসংঘের প্রস্তাবে ১৯৮১ সাল থেকে পালিত আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসকে ঘিরে ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বসেছিল বিয়ন্ড দ্য সাইলেন্স: ইন্টারন্যাশনাল পিস ফিল্ম অ্যান্ড ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং সামিট। আয়োজক বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র সংগঠন থার্মোকল জেইউ, যার যাত্রা এক বছর আগে।
অনুষ্ঠান শুরু হয় ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আড্ডাধর্মী পর্ব “কাট অব টি” দিয়ে। পরদিন জহির রায়হান মিলনায়তনে স্টপ জেনোসাইড-এর ফ্রেম-বাই-ফ্রেম প্রদর্শনী দিয়ে আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। সেদিনই সেমিনার কক্ষে দেখানো হয় চারটি তরুণ-নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি: সিফাত রহমানের আফটার দ্য ক্রাউড, রাহি আবদুল্লাহর কালার অব প্যারাডাইস, মুশতাক মুজাহিদের মাহফিল, ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদের হুইস্পার অব দ্য ইঙ্ক।
বিষয় ছিল সামাজিক শোষণ, রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা, গভীর সামাজিক সংস্কার, আর ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কারফিউ। থার্মোকলের আহ্বায়ক নাবিল মোস্তফা মনে করেন, ভয় আর সামাজিক স্বাভাবিকীকরণ মানুষকে ব্যবস্থাগত নিপীড়নের মধ্যেও চুপ করিয়ে রেখেছে। তাঁর কাছে সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, কঠিন আলাপ শুরু করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। আয়োজনটি একবারের ঘটনা হয়ে থাকুক, তা তিনি চান না। তিনি চান এটি হোক এমন এক সূচনাবিন্দু, যেখানে নতুন প্রশ্ন শিকড় গাড়ে। শেষে তিনি বলেন: “পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় মঞ্চ লাগে না; কখনো একটি সাহসী চলচ্চিত্র বা তরুণের একটি নির্ভীক কণ্ঠই যথেষ্ট।”
এই আশাবাদের পাশে একটি অসমাপ্ত প্রশ্নও রয়ে যায়। নিপীড়নের নথি বানানো আর নিপীড়নকে একটি শিল্পরূপে ভাষা দেওয়ার মধ্যে দূরত্ব অনেক। ক্যামেরা চুপ থাকবে, কথাও বলবে না, তার উত্তর শেষ পর্যন্ত ঠিক হবে পর্দায়। তবে, তরুণদের এই পথে পা বাড়ানোর সৎ সাহস, এগিয়ে নেবে দেশকে, দেশের কালচারকে। এবং প্রশ্ন করার সুযোগেও তৈরি করতে পারে। ◼