বলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ’রকস্টার’-এর শুরুতেই দেখতে পাই সুবিশাল এক প্রান্তরের দৃশ্য। পর্দায় ভেসে উঠে ‘Out beyond ideas of wrongdoing and rightdoing, there is a field. I’ll meet you there.’ একই লাইন জ্বলজ্বল করছে হলিউড তারকা ব্র্যাড পিটের ডান হাতের ট্যাটুতে। লস অ্যাঞ্জেলেসের কোনো বুকস্টোর হোক বা লন্ডনের ক্যাফে, টেবিলে হয়তো অযত্নে পড়ে আছে কোলম্যান বার্কসের অনুবাদ করা বই ‘দ্য এসেনশিয়াল রুমি’। মঞ্চে দাঁড়িয়ে পপসম্রাজ্ঞী ম্যাডোনা আবৃত্তি করছেন সেখান থেকেই কোনো শ্লোক। কিংবা ইনস্টাগ্রামে প্রেমিকার সাথে যুগল ছবির ক্যাপশনে কোনো প্রেমিক তরুণ লিখছেন, ‘In your light I learn how to love. In your beauty, how to make poems’: পঙ্ক্তিগুলোকে পাঠ করা হচ্ছে সীমানাহীন এক প্রেমের আখ্যান হিসেবে, রুমিকে সেলিব্রেট করা হচ্ছে ষোড়শী হৃদয়ে উথলে ওঠা আবেগের গভীর কোনো নন্দনের নির্মাতা হিসেবে।
ত্রয়োদশ শতাব্দীর এই সুফি মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি বর্তমান বিশ্বে বিশেষ করে পাশ্চাত্যে সর্বাধিক পঠিত এবং জনপ্রিয় কবিদের একজন হিসেবে স্বীকৃত, যার বই বিক্রির হার পাশ্চাত্যের অনেক ধ্রুপদী কবিকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই বিপুল জনপ্রিয়তা ও মডার্ন পপ কালচারে রুমির এই অবস্থান তৈরি হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে তার মূল ফার্সি কবিতা থেকে কোলম্যান বার্কসের করা ইংরেজি অনুবাদ। ১৯৯৫ সালে বার্কসের অনুবাদে ‘দ্যা এসেনশিয়াল রুমি’ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই মূলত রুমি হয়ে ওঠেন দুনিয়ার বেস্টসেলিং গ্রেট রাইটারদের একজন।
কিন্তু ইউরোপের পপ কালচার থেকে নিয়ে আমাদের ইনস্টাগ্রাম এলগরিদমে যে রুমি ঘুরেফিরে আসছেন, তিনি প্রকৃতই কি ‘রুমি’ নাকি কোলম্যান বার্কসের অনুবাদ আর এলিফ শাফাকের ‘ফোরটি রুলস অব লাভ’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে বিনির্মিত রুমির খন্ডিত ও পরিবর্তিত এক ইউরোপীয় ছায়া?
একজন প্রথাগত মুসলিম পণ্ডিত যখন পাশ্চাত্যে এসে ধর্মনিরপেক্ষ ‘নিউ এইজ গুরু’ হয়ে ওঠেন, তখন এই প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। ইউরোপের অনুবাদ কী করে? সে কি মূলের কাছে পৌঁছায়, নাকি চোখ ফিরিয়ে শিকড়কে মুছে ফেলে? নাকি জালালুদ্দিন রুমির এই পশ্চিমা উদযাপন মূলত অভিনব এক সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ (Cultural Appropriation)-এর গল্প?
জীবন
প্রায় নয়শো বছর আগে (৩০ সেপ্টেম্বর, ১২০৭) তৎকালীন পারস্যভুক্ত বর্তমান আফগানিস্তানের বলখে জন্ম জালালুদ্দিন মুহাম্মদ রুমির। প্রখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক ও হানাফি ফকিহ পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদের সাহচর্যে কোরআন, হাদিস ও ফিকহের নিবিড় চর্চাতেই তাঁর শৈশব কাটে।
১২১২ সালের দিকে মঙ্গোলীয়দের আক্রমণের আশঙ্কায় দেশান্তরী হয়ে দীর্ঘ যাত্রা শেষে তারা থিতু হন তৎকালীন রুম সাম্রাজ্যের (বর্তমান তুরস্ক) কোনিয়ায়। পিতার মৃত্যুর পর মাত্র ২৪ বছর বয়সেই কোনিয়ার মাদ্রাসায় শিক্ষাদানের ভার কাঁধে তুলে নেন রুমি। দামেস্ক ও আলেপ্পো থেকে উচ্চতর ইসলামি শিক্ষা শেষে মুফতি হিসেবে শুরু করেন ফতোয়া প্রদান। সেসময় তাঁর একমাত্র পরিচয় ছিল হানাফি মাজহাবের একজন সুপ্রতিষ্ঠিত আইনজ্ঞ, যার জীবন শরিয়তের কঠোর নিয়মাবলি আর প্রথাগত ইসলামি শিক্ষার গণ্ডিতেই আবর্তিত হতো।
ঐতিহাসিক বর্ণনামতে, দেশান্তরকালে যাত্রাপথে নিশাপুরে প্রখ্যাত সুফি-কবি ফরিদউদ্দিন আত্তারের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল রুমির। আত্তার কিশোর রুমির আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে তাকে উপহার দিয়েছিলেন তার ‘আসরারনামা’ (রহস্যের গ্রন্থ) এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘এই বালক একদিন বিশ্ববাসীর আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা মেটাবে।’ পরবর্তীতে রুমির জীবনে যুগান্তকারী ও নাটকীয় পরিবর্তন আসে কোনিয়ার বাজারে সুফি সাধক আল্লামা শামস তাবরিজির সাথে সাক্ষাতের পর। শামস তাবরিজির শিষ্যত্ব গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে রুমির আধ্যাত্মিক পুনর্জন্ম ঘটে, তিনি প্রবেশ করেন মারেফাত বা আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের এক দীর্ঘ সফরে, যা তিনি নিজেই লিখেন তার কবিতায়,
‘মৌলভি আয খুদ না শুদ মাওলায়ে রুম // তা গোলামে শামসে তাবরিজি না শুদ’
(সাধারণ এক মৌলভি নিজে কখনোই ‘মাওলানা রুমি’ হয়ে উঠতে পারতো না, যতক্ষণে সে শামস তাবরিজির গোলাম না হল।)
মসনভি ও অন্যান্য
রুমির সাহিত্যকর্ম কেবল বিরহের হাহাকার নয়; বরং তা সুফি দর্শন ও ঐশী প্রেমের এক বিশাল সাম্রাজ্য। শামসের বিরহে উন্মত্ত হয়ে তিনি যে ৩৫ হাজার শ্লোকের গজল ও রুবাই রচনা করেছিলেন, তা ‘দিওয়ান-ই-শামস-ই-তাবরিজি’ নামে পরিচিত। কবিতার বাইরেও শিষ্যদের লিপিবদ্ধ করা তাঁর ৭১টি গদ্য বক্তৃতার সংকলন ‘ফিহি মা ফিহি’তে সমসাময়িক আধ্যাত্মিক সংকটগুলোর আলোচনা ও কোরআনের নিবিড় ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এছাড়া তাঁর ধর্মীয় নসিহত আর চিঠিপত্রের সংকলন ‘মাজালেস-এ সাবা’ ও ‘মাকাতীব’ তাঁকে একজন সুনিপুণ গদ্যকার হিসেবেও তুলে ধরে।
তবে বিশ্বসাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক কবিতা হিসেবে যা ইতিহাস হয়ে আছে, তা হলো রুমির ‘মসনভি-ই মা’নবী’ (আধ্যাত্মিক শ্লোক)। জীবনের শেষ পনেরো বছর তিনি এটি রচনা করেন।
মসনভি কেবল একটি কাব্য নয়; একে প্রায়ই বলা হয় ‘ফার্সি ভাষার কোরআন’। পঞ্চদশ শতাব্দীর বিখ্যাত পারসিক কবি মোল্লা আবদুর রহমান জামি মন্তব্য করেছিলেন: “আমি সেই মহান ব্যক্তির কী প্রশংসা করব, তিনি নবী নন কিন্তু তাঁর একটি ঐশী কিতাব রয়েছে… মৌলভি রুমির মসনভি যেন ফার্সি ভাষায় স্বয়ং কোরআন।” এমনকি আধুনিক সময়ের দার্শনিক ও কবি আল্লামা ইকবালের লেখায়ও রুমির প্রশংসা বারবার ধ্বনিত হয়েছে, “রুমির বুকে কোরআনের আলো লুকায়িত, তার আয়নার উপস্থিতিতে জামশেদের পেয়ালাও ম্লান হয়ে যায়… তিনি ফার্সি ভাষায় কোরআন রচনা করেছেন।”
জামি বা ইকবালের এই দাবি মোটেও অতিরঞ্জিত ছিল না। মসনভির পরতে পরতে কোরআনের প্রায় ২,২০০ আয়াত এবং অসংখ্য হাদিসের সরাসরি অনুবাদ বা তফসির লুকিয়ে আছে। তবে প্রথাগত ধর্মতাত্ত্বিক বা তফসিরকারকদের মতো আক্ষরিক কিংবা আইনি বিবরণের পথে হাঁটেননি রুমি। বরং রূপক আর গল্পের মোড়কে তিনি কোরআনের অন্তর্নিহিত মর্মবাণীকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা সাধারণের কাছেও হয়ে উঠেছে আধ্যাত্মিক মুক্তির চাবিকাঠি।
‘ইউরোপীয় রুমি’ ও ডিইসলামাইজেশন
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, পাশ্চাত্যে রুমির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার প্রধান রূপকার কোলম্যান বার্কস ফার্সি বা আরবি ভাষার একটি বর্ণও জানতেন না। সত্তরের দশকে আরেক মার্কিন কবি রবার্ট ব্লাই তাঁকে এ. জে. আর্বেরি ও রেনল্ড নিকলসনের করা রুমির ধ্রুপদী ইংরেজি অনুবাদের একটি কপি দিয়ে বলেছিলেন, “এই কবিতাগুলোকে খাঁচা থেকে মুক্ত করো”। বার্কস মূলত সেই আক্ষরিক অনুবাদগুলোকে আধুনিক আমেরিকান মুক্ত ছন্দে (Free verse) রূপান্তর বা ‘প্যারাফ্রেজ’ করেছেন। আর এই পুনর্লিখনের মধ্য দিয়েই রুমির কবিতায় থাকা ইসলামের শিকড়, কোরানীয় পরিভাষা এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা হয়েছে।
বার্কসের অনুবাদে রুমি পরিণত হয়েছেন এমন এক ‘নিউ এজ গুরু’তে, যিনি সব প্রথাগত ধর্মের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন এবং কেবল গণ্ডিহীন প্রেমের কথা বলেন। পাশ্চাত্যে যেখানে ইসলামোফোবিয়ার প্রকোপ রয়েছে এবং আধুনিক সমাজ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি অনেকটাই বীতশ্রদ্ধ, সেখানে একজন ধর্মনিরপেক্ষ, সর্বজনীন এবং ইসলাম-বিচ্ছিন্ন রুমির ধারণা পশ্চিমা পাঠকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও স্বস্তিদায়ক মনে হয়েছে।
কিন্তু বিশ্বায়নের এই জনপ্রিয়তার জন্য যে মূল্য চোকাতে হয়েছে, তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন ফ্রাংকলিন লুইস, জাওয়িদ মোজাদ্দেদি এবং ফাতেমা কেশাভারজ-এর মতো সমকালীন ফার্সি একাডেমিশিয়ানরা। তারা বার্কসের এই পদ্ধতিকে আখ্যা দিয়েছেন ‘ডি-ইসলামাইজেশন’ বা ইসলামি সত্তা মুছে ফেলার এক প্রক্রিয়া হিসেবে। অধ্যাপক জাওয়িদ মোজাদ্দেদি যথার্থই বলেছেন, “মানুষ যে রুমিকে ভালোবাসে তা ইংরেজিতে অত্যন্ত সুন্দর, কিন্তু এর জন্য আপনাকে যে মূল্য চোকাতে হয়েছে তা হলো তার ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে কেটে বাদ দেওয়া।”
অনুবাদ-বিকৃতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ফিচারের শুরুতে উল্লেখ করা সেই বিখ্যাত ‘আউট বিয়ন্ড আইডিয়াস অব রংডুয়িং অ্যান্ড রাইটডুয়িং’ লাইনটিতেই। মূল ফার্সিতে লাইনটি ছিল, “কুফর-ও যে-ইসলাম বেরুন সাহরাইয়স্ত”, অর্থাৎ, ‘ইসলাম এবং কুফরের (অবিশ্বাসের) ঊর্ধ্বে এক বিশাল মরুপ্রান্তর রয়েছে’। বার্কস এখানে ‘কুফর’ এবং ‘ইসলাম’ শব্দগুলোকে মুছে ফেলে ‘rightdoing’ ও ‘wrongdoing’ শব্দ বসিয়ে পুরো কবিতাকে একটি নৈতিকতার বালাইহীন ধর্মনিরপেক্ষ রূপ দিয়েছেন। অথচ রুমি তার কবিতায় বলেছেন সংশয়ে ভরা হৃদয় নিয়েও খোদার সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ার কথা।
পাশ্চাত্যের এই ধর্মনিরপেক্ষ ও গণ্ডিহীন রুমির ধারণা যে একটি সুপরিকল্পিত বিকৃতির ফসল, তার সবচেয়ে বড় জবাব রুমি নিজেই দিয়ে গেছেন। নিজের আত্মপরিচয় স্পষ্ট করে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তার কবিতায় ঘোষণা করেছিলেন,
“মান বান্দায়ে কোরআনাম, আগার জান দারাম // মান খাক-ই-রাহে মুহাম্মদ মুখতারাম আগার কাসি গুয়াদ // জুজ ইন আজ গোফতারাম বিজারাম // আজ উ ওয়া আজ আন গোফতারাম”
(”যতদিন আমার দেহে প্রাণ আছে, আমি কোরআনের দাস। আমি নির্বাচিত নবী মুহাম্মদের (সা.) পথের ধূলিকণা।
কেউ যদি আমার কথাকে এর বাইরে অন্য কোনো অর্থে ব্যাখ্যা করে, তবে আমি সেই ব্যক্তির প্রতি এবং তার কথার প্রতি তীব্রভাবে বিরক্ত।”)
কোলম্যান বার্কসের অনুবাদের এই নির্ধর্মীকরণের মধ্য দিয়েই মূলতঃ রুমিকে একজন সুফি ও পণ্ডিত কবি থেকে পরিণত করা হয়েছে উত্তরাধুনিক সময়ের একজন ‘ইনস্টাগ্রাম মোটিভেশনাল পোয়েট’-এ। বাস্তবে রুমির সার্বজনীন প্রেম, পরমতসহিষ্ণুতা এবং আধ্যাত্মিক উন্মাদনা—যা যুগে যুগে প্রভাবিত করেছে শত সহস্র সুফিকে, উপমহাদেশে আল্লামা ইকবাল কিংবা বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও এই প্রভাবের বাইরে ছিলেন না—কোনো বায়বীয় ‘নিউ-এজ’ ধারণা থেকে আসেনি; বরং তা এসেছে ইসলামের শরিয়ত ও তরিকতের গভীর অনুশীলন এবং আল্লাহর প্রতি প্রেমের একনিষ্ঠ সাধনার দীর্ঘ সফরের মাধ্যমে। এমনকি পরবর্তীতে রুমির লেখা ও দর্শনের ধারাবাহিকতায় তরিকতের জগতে প্রতিষ্ঠিত হয় বিখ্যাত ‘মৌলভি তরিকা’, যা উসমানীয় সাম্রাজ্যের শাসনকালে যথেষ্ট প্রভাবশালীও হয়ে উঠেছিল।