রবিবার সন্ধ্যায় নারেলা শিল্পাঞ্চল থানা থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, আইসার দাবি অনুযায়ী ফোন আর ব্যাগ ছাড়াই। পরদিন, সোমবার ৫ অক্টোবর, তিনি দাঁড়ালেন কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে। কে পি বসু স্মারক হলের ধারণক্ষমতা ২২০ থেকে ২৩০ জন, অথচ লোক এল তার চেয়ে ঢের বেশি, সমাবেশ উপচে পড়ল গান্ধী ভবনের সামনে পর্যন্ত। ফোন আর ব্যাগ ছাড়া থানা থেকে বেরোনো একজন মানুষের পক্ষে এটা খারাপ উপস্থিতি নয়।
“দিল্লি রক্তাক্ত হলে কলকাতা ব্যথা পায়, কলকাতা রক্তাক্ত হলে দিল্লি উঠে দাঁড়াবে,” বললেন বাক্যটা তিনটি জায়গাকে এক সুতোয় গাঁথল: যন্তর মন্তর, যাদবপুর, আর সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট, যেখানকার সাম্প্রতিক অস্থিরতার কথা তিনি একই বক্তৃতায় তুলেছিলেন।
নেহা বোরা আইসা, অর্থাৎ অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি। সংগঠনটি সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের স্টুডেন্ট শাখা। অক্টোবরের শুরু থেকে দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তিনি মিছিলের সামনে আছেন, আর পুলিশ তাকে বারবার আটক করেছে। সেই মিছিলেই একটি ছবিতে তাকে দেখা গেছে পুলিশি ব্যারিকেডে উঠে পড়তে। এক সপ্তাহে দুই শহরে দুই রকম ভিড়: দিল্লিতে পুলিশের, কলকাতায় শ্রোতার।
প্রশ্নটা তাই সোজা। বিজেপি-সমর্থক পরিবারের এক মেয়ে কীভাবে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের এত পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেন, আর সেই মুখ কেন এখন এত মানুষ দেখতে চাইছে?

একের পর এক আন্দোলন
যন্তর মন্তরে ছাত্রদের দাবিটা ছিল সোজা: নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদ ছাড়ুন। ককরোচ জনতা পার্টির ডাকা সেই আন্দোলনে অনশনে বসেছিলেন সোনম ওয়াংচুক। অভিজিৎ দীপকেও বসেছিলেন, তবে ওয়াংচুকের অনুরোধে তা ভাঙেন। আর ২৮ জুন থেকে সেই মাঠের এক কোণে, ত্রিপলের নিচে, যখন ভিড় তখনও পাতলা, ওয়াংচুকের অনশনে যোগ দেন আইসার তিন সদস্য: নেহা, মনীশ আর আমিন।
অনশন চলল ২৩ দিন। আইসার হিসাবে তিনজনের প্রত্যেকে শরীরের ১২ শতাংশের বেশি ওজন হারান; নেহা শুরু করেছিলেন ৬৬ কিলো নিয়ে, কমেছিল প্রায় সাড়ে সাত কিলো। ধর্মেন্দ্র প্রধান শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করলেন, আর তার অল্প পরেই অনশন ভাঙলেন নেহারা। আন্দোলনের ক্যালেন্ডারে অবশ্য বিশ্রামের কোনো ঘর ছিল না। পিটিআইকে তিনি জানিয়েছেন, না-খাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে ফেলা শরীরকে এখন আবার খেতে শেখাতে হচ্ছে, তবু তিনি ছুটলেন বিহারে, ২০ জুলাইয়ের বিক্ষোভে গ্রেপ্তার হওয়া ছয় শতাধিক মানুষের সঙ্গে দেখা করতে। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
তারপর রাঁচি। ৭ অগাস্ট ঝাড়খণ্ডের জেপিএসসি ও জেএসএসসি নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্রদের অনশনস্থলে গিয়ে সংহতি জানিয়ে তিনি যোগ দেন বিধানসভা অভিমুখী মিছিলে। মিছিলের ভেতর থেকে এক ব্যক্তি তার গায়ে কালি ছুড়লেন এবং তাকে দেশবিরোধী বলে অভিযোগ করলেন। পুলিশ লোকটিকে আটক করে। নেহার জবাব: “কালি ছুড়লে আমি ভয় পাওয়ার মানুষ নই। দিল্লির আন্দোলনে আমি পেলেট গানের গুলি আর লাঠিচার্জের মুখে পড়েছি”। আইসার এক নেত্রী ওই ব্যক্তিকে বিজেপির মদতপুষ্ট বলে অভিযোগ করে, আর বিজেপি ঘটনাটিকে নাটক বলে উড়িয়ে দেয়। শুরুর দিকের কিছু খবরে লোকটিকে এবিভিপির সঙ্গে জড়ানো হলেও সরকারি নিশ্চয়তা মিলেনি।
যে দলের ছাত্র শাখার তিনি প্রধান, সংসদীয় অঙ্কে সেই সিপিআই (এমএল) লিবারেশন বেশ ছোট। সর্বশেষ নির্বাচনী ফল ধরলে বিহারের আরা ও কারাকাট থেকে দুজন লোকসভা সদস্য, ঝাড়খণ্ড বিধানসভায় দুটি আসন, আর ২০টি আসনে লড়ে বিহার বিধানসভায় জিতেছে দুটিতে। অঙ্কে ছয়। রাস্তায় তার চেয়ে ঢের বেশি, কারণ নির্বাচনের হিসাব আর আন্দোলনের হিসাব সবসময় এক খাতায় ওঠে না।
এখন নিশানা নির্বাচন কমিশন। ২৩ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সূত্রে জানা যায়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন, এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়ে যা তাদের অজান্তে নেওয়া হয়েছে বলে তারা জানান। এসআইআরের আদেশ ও সূচি তিন সদস্যের সর্বসম্মতিতেই অনুমোদিত বলেও জানিয়েছে তারা। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিরোধী দলগুলা তার পদত্যাগ চাইছে, আর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের হিসাবে এসআইআরে ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ১৩ কোটিরও বেশি নাম।
শনিবার, ১০ অক্টোবর, নেহা আবার আটক হলেন। যোগেন্দ্র যাদব ও প্রশান্ত ভূষণের সঙ্গে জোর বাগ থেকে দিল্লি হাট অভিমুখী মিছিলে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে। আটক অবস্থায় তার বার্তা ছিল: “আমি আটক, আন্দোলন নয়”।

কোথা থেকে এলেন আর কোথায় যাচ্ছেন
নেহা বোরার বয়স ২৯। বাড়ি উত্তরাখণ্ডের খাটিমায়। স্নাতক দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে, স্নাতকোত্তর আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় দিল্লিতে, আর এখন জেএনইউতে পিএইচডি করছেন। থিয়েটারের শিল্পী হিসাবেও তার পরিচিতি আছে। একজন গবেষকের সূচিতে সাধারণত গ্রন্থাগার, তত্ত্বাবধায়ক আর জমা দেওয়ার তারিখ থাকে। নেহার ২০২৬ সালের সূচিতে ঢুকেছে ২৩ দিনের অনশন, রাঁচির কালি আর দিল্লির থানা।
২০১৮ সালের কাছাকাছি সময়ে আইসায় যোগ দিয়ে ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আর বৃত্তির অধিকারের দাবিতে ক্যাম্পাসের লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে তিনি সংগঠনের সর্বভারতীয় সভাপতির পদে পৌঁছান। সংগঠনটি নিজেও নতুন নয়: ১৯৯০ সালে সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্র শাখা হিসাবে আইসার জন্ম, আর সময়ের সঙ্গে সেখান থেকে বেরিয়েছেন জেএনইউ ছাত্র সংসদের একাধিক সভাপতি।
অনশন ভাঙার পর নেহা থামেন নাই, বরং ঘুরতে শুরু করলেন। অগাস্টে হায়দরাবাদে নালসার, আইআইআইটি, হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, ইফ্লু আর ওসমানিয়ার ছাত্রদের তিনি বলেন, যন্তর মন্তরের আন্দোলন সরকারের বিবেকের কাছে কোনো আবেদন ছিল না; তার ঠিকানা ছিল সাধারণ নাগরিকের বিবেক। ২৩ অগাস্ট বেঙ্গালুরুতে আইসার “জেন-জি রাইজিং” প্রচারের মঞ্চে দাঁড়ালেন, যার উদ্দেশ্য যন্তর মন্তরের ছাত্র-জমায়েতকে দিল্লির বাইরে টেনে নিয়ে যাওয়া। রাঁচি, বিহার, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু, তারপর কলকাতা: ম্যাপে দাগ টানলে রেখাটা এঁকেবেঁকে চলে, ঠিক যেমন আন্দোলনের যাত্রা।
নারেলা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর নেহা বললেন, “আমরা কুকুর নই, পোকা নই, কীটও নই”। কথাটার একটা ইতিহাস আছে, যদিও সেটা তার নিজের নয়। অভিজিৎ দীপকের ছয় শব্দের সেই পোস্টের জন্ম সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্তের এক মন্তব্য থেকে, যাতে বেকার তরুণদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করা হয়; তবে কান্ত পরে বলেন, তার কথা ভুল বোঝা হয়েছে। নেহা সিজেপির সদস্য নন, বিবিসির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী যদিও তিনি সদস্য নন, তার সংগঠন সিজেপির ডাকা কর্মসূচিতে থাকবে বলে তিনি জানিয়েছেন। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের ওপর পড়া আলোকে বরং খাটো করেই দেখিয়েছেন।

ঘরের ভেতরের মতভেদ
নেহার বেড়ে ওঠা এমন এক পরিবারে, যারা অনেক দিন ধরে বিজেপির সমর্থক। তার বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন, আর পিটিআইকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় পর্যন্ত আন্দোলনের পর বাবার সঙ্গে তার কথা হয়নি। রাজনীতিতে জড়ানোর পর পরিবারের সঙ্গে প্রাথমিক টানাপোড়েনের কথা তিনি একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন। ঘরের ভেতরের সেই তর্ক বাইরে এসে খবর হওয়ার আগে চার দেয়ালের মধ্যেই ছিল।
তারপর তার মা দিল্লিতে এসে নিজের চোখে পুলিশের পদক্ষেপ দেখেন এবং আন্দোলনকারীদের পক্ষে মত দেন। পিটিআইকে নেহা জানান, মা ১৯ জুলাই যন্তর মন্তরে এসেছিলেন এবং পরদিনের ঘটনার সাক্ষী হন। নেহার কথায়, “আমার কাছে এই আন্দোলন একটা ব্যক্তিগত অর্জন”।
আশা নামের পেশি
নেহার নিজের হিসাবে এই আন্দোলনের মানে একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে ফুরায় না। অগাস্টে তিনি বলছিলেন, একজন মন্ত্রীর বিদায় কেবল শুরু, দরকার পরীক্ষাব্যবস্থা আর উচ্চশিক্ষার কাঠামোগত বদল। নিউজলন্ড্রির সাক্ষাৎকারে তিনি জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা (এনটিএ) আর জাতীয় শিক্ষানীতিকে শিক্ষাব্যবস্থার অন্যায়ের কেন্দ্রে রেখেছেন, আর কথা শেষ করেছেন আশা নিয়ে: আশা এমন এক পেশি, যাকে যৌথ সংহতির চর্চায় সবল রাখতে হয়। বামপন্থী সংগঠনগুলায় প্রচলিত একটি বাক্যও সেখানে এসেছে: “আমি যদি তোমার নিপীড়নের সাক্ষী হই, তোমার মুক্তিরও সাক্ষী আমাকে হতে হবে।”
কলকাতায় এসে সেই সুর তিনি ঘুরিয়ে দিলেন বাংলার দিকে। যাদবপুরের সমাবেশে এসআইআরকে তিনি বর্ণনা করলেন বাংলার বিরুদ্ধে সাজানো এক আঘাত হিসেবে, আর বাংলাকে বললেন নীরব না থাকতে। বিজেপি ও আরএসএস সম্পর্কে তার অভিযোগ, তারা সহিংসতা আর গুন্ডামি ছাড়া কিছু বোঝে না।

দীপকে এবং নেহা
সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছুদিন ধরে একটা প্রশ্ন ঘুরছে: অভিজিৎ দীপকে আর নেহা বোরার মধ্যে কে বেশি পরিণত? একলোক নেহার ছবি দিয়ে লিখলেন, নেহা প্রতিভায় দীপকের চেয়ে এগিয়ে এবং জেন-জির পূর্ণাঙ্গ প্রতীক। উত্তর এল প্রশ্নের মাঝখান থেকেই: পোস্টের জবাবে দীপকে লিখলেন, “আমি একমত”। কেউ কেউ তার বিনয়ের প্রশংসা করলেন, কেউ মনে করিয়ে দিলেন, এই মুহূর্তে তুলনার প্রয়োজন নাই।
আন্দোলনের মাঠে দুজনের কাজ আলাদা। নেহা যখন দিল্লিতে মিছিল চালাচ্ছিলেন, দীপকে মুম্বইয়ের আজাদ ময়দানে বিশাল জনসমাবেশে বক্তৃতা করছিলেন এবং ১০ অক্টোবরের মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার পদ না ছাড়লে দিল্লিতে বড় কর্মসূচির ঘোষণা দিচ্ছিলেন। সেই ১০ অক্টোবর এলে দীপকে ও সিজেপির দুই মুখপাত্র সৌরভ দাস আর আশুতোষ রাঙ্কা দিল্লি বিমানবন্দরে নামার পরই আটক হলেন, আর নেহা আটক হলেন দিল্লি হাটের কাছে। কে বেশি পরিণত, সে তর্ক সমাজমাধ্যমে চলতে থাকল। রাস্তার হিসাবে সেদিন দুজনের পরিণতি অবশ্য একই: দুজনই আটক।