‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’, ‘ওই শালারপুতেরা, মোনাজাত ধর!’, ‘এই বিচার আল্লাহ সহ্য করবে না’, ‘আল্লাহ! তোমার কাছে বিচার দিলাম!’ বাক্যগুলা পড়তে পড়তে নিশ্চয়ই ওই কন্ঠটা কানে ভাইসা উঠছে, তাই না?
গত এক দশকে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় বিচরণ করছেন, কিন্তু মুন্সীগঞ্জের বিএনপি নেতা আব্দুল হাইকে চিনেন না, এমন লোক মেবি পাওয়া যাবে না। নামে না চিনলেও, তার কালজয়ী এই ডায়লগগুলা ক্লাসিক মিম ম্যাটেরিয়াল হিসাবে আমাদের নিউজ ফিডে, রেলেভেন্সি থাকুক বা না থাকুক, সবসময়ই ঘুইরা ফিরা আসছে। জনপ্রিয় সেই ভিডিওতে আব্দুল হাইকে দেখতে খুব সাদাসিধা লোকাল পলিটিকাল লিডার মনে হইলেও তিনি কিন্তু মোটেও সামান্য লোক নন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক উপমন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের সাবেক প্যানেল স্পিকার।
গতকাল ১৪ অক্টোবর বুধবার রাতে ঢাকার একটা বেসরকারি হাসপাতালে ৭৭ বছর বয়সে মারা গেছেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। মৃত্যুর আগে সর্বশেষ তিনি ছিলেন প্রয়াত বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার
আব্দুল হাইয়ের জন্ম ১৯৪৯ সালের ৫ জানুয়ারি মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোসেন্দী গ্রামে। ছাত্রজীবন থেকেই জড়িত ছিলেন রাজনীতিতে। ১৯৭১ সালে করছেন স্বাধীনতা যুদ্ধ। মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা সরকারি ডিগ্রি কলেজে বিএ পড়ার সময়েই ১৯৭৩ সালে নির্বাচিত হইছিলেন নিজের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।
১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে সদ্যগঠিত বিএনপিতে যোগ দেন দলের কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ হয়ে এবং ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই তৎকালীন অবিভক্ত ঢাকা-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সেই থেকে নিয়ে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগপর্যন্ত, প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমলে বিএনপির বর্জন করা দুই সংসদ বাদে প্রত্যেক সংসদ নির্বাচনেই তিনি বিএনপি থেকে ইলেকশন করেন এবং এমপি নির্বাচিত হন। মোট পাঁচবারের পার্লামেন্টেরিয়ান।
এর মধ্যে ১৯৯১ এর বিএনপি সরকারে দায়িত্ব পালন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসাবে আর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদে ছিলেন প্যানেল স্পিকার। একই সাথে দীর্ঘকাল ছিলেন মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি এবং প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আমৃত্যু উপদেষ্টা।
আব্দুল হাই, দ্যা মিম ম্যাটেরিয়াল
আব্দুল হাই দেশব্যাপী জনপ্রিয় হইছিলেন ২০১৪ সালে মুন্সীগঞ্জে বিএনপির এক সমাবেশে তার বক্তব্য এবং মোনাজাতের মধ্য দিয়ে সমাবেশ শেষ করার একটা ভিডিও ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার মাধ্যমে।
জনপ্রিয় সেই ভিডিও ক্লিপে আব্দুল হাই ছিলেন একদম ‘আনফিল্টারড’। পলিটিশিয়ানদের চিরাচরিত গাম্ভীর্য আর ফরমাল ভাষার খোলস ছাইড়া তিনি সেদিন হাজির হইছিলেন একদম ‘র’ আর খাঁটি লোকাল হইয়া। আঞ্চলিক টান আর স্ল্যাং-এর যেই সাবলীল মিশেল তিনি ওইদিন দিছিলেন, তাতে বিন্দুমাত্র কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। অবশ্য তিনি এমপি-মন্ত্রী-লিডার সব হওয়ার পরেও ব্যক্তিগতভাবে সবসময়ই এমন সরল ও সাদাসিধা ছিলেন বইলাই তার পরিচিতজন ও এলাকাবাসীদের সূত্রে জানা যায়।
ভিডিওতে দেখা যায় বিশৃঙ্খল নেতাকর্মীদের সামনে নিয়া কোনো মাইক ছাড়াই তিনি ক্ষিপ্ত ও উত্তেজিত অবস্থায় একের পর এক বাক্য ছুঁইড়া দিচ্ছেন, যেগুলার প্রত্যেকটাই তখন হইয়া উঠছিল তুমুল শক্তিশালী মিম ম্যাটেরিয়াল। বিশেষ করে ২০১৫ পরবর্তী বাংলাদেশের ইউটিউব-পপ কালচারে এইগুলা পাইছিল বিপুল জনপ্রিয়তা।
‘ওই শালা মোনাজাত ধর’ লিখে সার্চ দিলে ইউটিউবে এখনো পাওয়া যাবে শত শত মিম, মিমিক্রি, প্যারোডি গান। ফুটবল বিশ্বকাপের কন্টেক্সটে হোক বা কখনো র্যান্ডম ডিজে গানের ভাইবে, এই কন্টেন্টগুলা আমাদের অনলাইনে, অফলাইনে সবসময়ই ঘুইরা ফিরা আসছে।
আব্দুল হাইয়ের বাক্যের গোলাবর্ষণে ওইদিন ছিল, “আমি নাম বলব না, একজনকে জিজ্ঞেস করলাম আইনশৃঙ্খলায় যারা নিয়োজিত, নাম বললে চাকরি থাকবে না….”, (উত্তেজিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে) “অই..অই শালারপুতেরা চুপ থাক” “আল্লাহর কাছে বিচার রইল”, “ এমন বিচার আল্লাহ সহ্য করবে না”, “তুমি ঠিক সোদাও ক্যা, শালারপুত ভোট দেও না আবার ঠিক সোদাও”, “অই..অই শালারপুতেরা মোনাজাত ধর, মোনাজাত ধর!” (মোনাজাতে হাত তুইলা) “আল্লাহ! তোমার কাছে বিচার দিলাম, এই আওয়ামী সন্ত্রাসীদের…”
মোনাজাত শেষে উপস্থিত জনতারে উদ্দেশ্য কইরা আব্দুল হাই বলেন, “সবাই বাড়ি যান, শনিবার হরতাল, হরতাল, হরতাল।”
‘ভোট দেও না আবার ঠিক সোদাও’ : পার্টিসিপেটরি কালচারে রাজনৈতিক সময়
দেশে তখন রাজনীতির টালমাটাল পরিস্থিতি। আওয়ামী লীগ সরকারের একতরফা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হইল মাত্র। জনগণের ভোটাধিকার হরণ কইরা আওয়ামী লীগ সরকার তার অন্যায় শাসন আরও ৫ বছর এক্সটেন্ড করল। ওদিকে নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা কইরা বিএনপি ও তার শরিক দলগুলার আহ্বানে চলতেছে লাগাতার হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি। আর সরকার চালাইতেছে তুমুল ধরপাকড়। বিএনপি-জামায়াত জোটের যেকোনো মিছিল-মিটিং থেকেই তুলে নিয়ে যাইতেছে নেতাকর্মীদের। দিতেছে সন্ত্রাস মামলা। গুম হইতেছে অসংখ্য মানুশ।
সেইরকমই এক হরতালের কন্টেক্সটে আব্দুল হাই দাঁড়াইছিলেন মুন্সীগঞ্জের ওই সমাবেশে। টেকনিকালি বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি করা যে ওই সময় যথেষ্ট কষ্টসাধ্য ছিল, তা দেখা যায় সেই জনপ্রিয় ভিডিওতেই; নেতাকর্মীদের বিশৃঙ্খল অবস্থা, চারদিকে অস্থিরতা আর উত্তেজনা ছড়ায়া আছে, সমাবেশে কোনো মাইক নাই, বর্ষীয়ান আব্দুল হাই খালি গলাতেই চিল্লাইতেছেন।
মিডিয়া স্কলার হেনরি জেনকিন্সের ‘পার্টিসিপেটরি কালচার’ বা অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতির ধারণা থেকে দেখলে এই মিম ট্রেন্ডের একটা গভীর অর্থ দাঁড়ায়, যে কীভাবে আব্দুল হাইয়ের ভাইরাল ভিডিও ক্লিপ এবং তা নিয়া হওয়া শত শত মিম-মিমিক্রি-প্যারোডি সাবকনশাসলি দেশের ওই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিপীড়নের চিত্রকে এবং গণতন্ত্র-না-থাকা স্বাভাবিক হইয়া যাওয়াটাকে আমাদের কালচারাল মেমোরিতে জ্যান্ত রাইখা দিছে।
২০১৪ সালের ওই গুমোট রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, যখন বিরোধী দলের একটা স্বাভাবিক সমাবেশ করাও প্রায় অসম্ভব, তখন আব্দুল হাইয়ের ওই ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব শুধুই একটা ভাইরাল ক্লিপ ছিল না। সাধারণ নেটিজেনরা যখন ওই ভিডিওর ডায়লগ কেটেকুটে ডিজে গানে রিমিক্স করতে শুরু করলো, তখন তারা আসলে পরোক্ষভাবে ওই সময়ের পলিটিকাল ট্রমাটাকে নিজেদের মতো করে যাপন করতেছিল।
জেনকিন্সের মতে, ডিজিটাল যুগের মানুষ প্যাসিভ দর্শক না থেকে কনটেন্টকে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। তারা কন্টেন্ট শুধু গ্রহণ করে না, সেটাকে নিজেদের মতো করে রিমিক্স করে, এডিট করে এবং নতুন অর্থ তৈরি করে। মানুষ এখন মিডিয়া টেক্সটকে (ভিডিও, অডিও সবকিছুই) নিজের সম্পত্তি মনে করে এবং নিজের দৈনন্দিন জীবনের সাথে মিলাইয়া ফেলে।
এই মিম, প্যারোডি আর স্যাটায়ারের মাধ্যমেই নেটিজেনরা সেই সময়ের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের স্মৃতিটাকে পপ-কালচারের মোড়কে আর্কাইভ কইরা ফেলছে। যার কারণে এক দশকের বেশি সময় পার হইয়া গেলেও, একটা র্যান্ডম মিমের হাসাহাসির আড়ালে ২০১৪ সালের সেই শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক মেমোরি আমাদের সাবকনশাস মাইন্ডে ঠিকই টিকা আছে।
সেই জায়গা থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বর্ষিয়ান রাজনীতিক আব্দুল হাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক কালচারে একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুশ হিসাবেই আমাদের কালেক্টিভ হিস্ট্রিতে থাইকা যাবেন।