ক্রিস হেসির চোখে স্বাধীন ঘানার উত্থান ও পতন

এক বৃদ্ধ ক্যামেরাম্যানের লেন্সে ঘানার জন্ম ও হারানো ইতিহাস—বারাক ও মিশেল ওবামার প্রযোজনায় “দ্য আইজ অব ঘানা”।

● দ্য পাবলিশ নিউজরুম

অক্টোবর ১৬, ২০২৬


ক্রিস হেসির বয়স এখন তিরানব্বই, চোখের আলো নিভে আসছে, আর তাঁর কাছে জমে আছে একটি নতুন দেশের জন্মের ছবি। দ্য আইজ অব ঘানা সেই ছবিগুলো বাঁচানোর গল্প। 

প্রথম ফ্রেমে দুটি চোখ

ছবির প্রথম দৃশ্যে, পর্দা খুললেই দেখা যায় নায়কের চোখ। ক্রিস হেসি চোখ পরীক্ষা করাচ্ছেন, আর জানতে পারছেন যে তাঁর দৃষ্টি চলে যাবে। কিন্তু ছবির আগ্রহ এই চোখে নয়। আগ্রহ সেই চোখে, যা দিয়ে একজন মানুষ একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দেখেছিলেন এবং লেন্সে ধরে রেখেছিলেন।

পরিচালক বেন প্রাউডফুট দুইবার অস্কার জিতেছেন, আর পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিতে এটাই তাঁর প্রথম কাজ। ২০২৫ সালে ছবিটি টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের ডকুমেন্টারি বিভাগের উদ্বোধনী ছবি হয়ে দর্শকের সামনে আসে। নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে আছেন বারাক ও মিশেল ওবামা, আর উৎসবের হলে বাজানো হয়েছিল তাঁদের রেকর্ড করা একটি শুভেচ্ছাবার্তা। ওবামা দম্পতির নাম পোস্টারে থাকলে কৌতূহল জাগে, এ কথা প্রযোজকেরা জানেন। তবু ছবির আসল নায়ক একজন তিরানব্বই বছরের মানুষ, যিনি এতদিন যথেষ্ট স্বীকৃতি পাননি।

ক্যামেরার পেছনের মানুষ

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ক্রিস হেসি ছিলেন কোয়ামে এনক্রুমার ব্যক্তিগত ক্যামেরাম্যান। ক্যামেরাম্যানের পেশাটাই এমন: ঘরে সবচেয়ে জরুরি মুহূর্তটি ঘটে, আর তিনি থাকেন ফ্রেমের বাইরে। হেসির বিশেষত্ব, তিনি থেকেছিলেন ইতিহাসের ঠিক পাশেই, লেন্স হাতে।

এনক্রুমা কে ছিলেন, সেটা একটু খুলে বলা দরকার। তিনি ছিলেন সেই জাতীয়তাবাদী নেতা, যিনি ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন চালিয়েছিলেন এবং ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৬ সালের অভ্যুত্থান পর্যন্ত দেশ শাসন করেছেন। স্বাধীন ঘানার তিনিই প্রথম প্রধানমন্ত্রী, ১৯৬০ সালের গণভোটের পর প্রেসিডেন্ট। ১৯৬৪ সালে ঘানাকে আনুষ্ঠানিকভাবে একদলীয় রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়, রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন এবং অন্য দল নিষিদ্ধ করার কারণে সমালোচকেরা তাঁকে একনায়ক বলতেন। ১৯৬৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, তিনি যখন দেশের বাইরে, সেনাবাহিনী ও পুলিশ দেশের ক্ষমতা নিয়ে নেয়।

ছবিরটা এই ইতিহাসের ওপরই দাঁড়িয়ে। এএফআই-এর বিবরণে, হেসির লেন্সে আমরা এনক্রুমার উত্থান ও পতন দেখি: ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি, ঐক্যবদ্ধ আফ্রিকার স্বপ্ন, আর ৬৬ সালের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতি।

যে ছবি ধ্বংসের কথা ছিল

অভ্যুত্থানের পর ধরে নেওয়া হয়েছিল, এনক্রুমার সব ফুটেজ হারিয়ে গেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে। তথ্যানুযায়ী, রাজনৈতিক উত্তালতার মধ্যে ফুটেজ ধ্বংসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু নেগেটিভগুলো রয়ে যায় লন্ডনের এক গোপন আর্কাইভে। এরপর কয়েক দশক ধরে হেসি সেগুলো উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়েছেন।

ভাণ্ডারটা কত বড়, তা নিয়ে সংখ্যা মিলে না, কারণ একেক জন একেক এককে গুনেছেন। জাতিসংঘের চলচ্চিত্র সোসাইটির বিবরণে এক হাজারের বেশি রিল, ভার্জিনিয়া চলচ্চিত্র উৎসবের তালিকায় ১,৩০০ ফিল্ম রিল, আর ভ্যারাইটির সাক্ষাৎকারে তিনশ ঘণ্টার বেশি ফুটেজের কথা এসেছে। তবে, ছবিতে এর খুব সামান্যই দেখা যায়। ভ্যারাইটির সমালোচকদের মতে, বেশির ভাগ ফুটেজ এখনো পুনরুদ্ধার হয়নি বলে পর্দায় দেখানো অংশ অল্প।

এই ফাঁক ভরানোর কাজে এসেছেন অ্যানিটা আফোনু, হেসির তরুণ সহযোদ্ধা। ২০১৩ সালে তিনি ঘানার চলচ্চিত্র শিল্প ও আর্কাইভের ক্ষয় নিয়ে পেরিশড ডায়মন্ডস নামে একটি ছোট তথ্যচিত্র বানিয়েছিলেন। চার বছর ফিল্ম স্কুলে পড়েও তিনি এসব ছবি কখনো দেখেননি, আর এক দশক ধরে সরকারের দরজায় ডিজিটাইজেশনের আর্জি জানিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, সরকার বদলালে আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হয়। তাঁর পরিকল্পনা ছিল ঘানার চলচ্চিত্র-ইতিহাসের প্রাচীন নিদর্শন রেক্স সিনেমা হলে একটি জনসমক্ষে প্রদর্শনী।

প্রাউডফুট জানিয়েছেন, হেসির হাতে বানানো তালিকা ধরে ধরে তাঁরা স্ক্যান করেছেন, ক্রেডিট কার্ডের সীমা ফুরানো পর্যন্ত। থেমেছেন প্রায় পঁয়তাল্লিশটি ফিল্মে। ছবির আয়ের অর্থ ব্যয় হবে বাকি ফিল্মের ডিজিটাইজেশনে এবং রেক্স সিনেমার সংস্কারে, আর এই অঙ্গীকারে সঙ্গী ওবামা দম্পতির হায়ার গ্রাউন্ড।

পর্দায় স্পিড

১৫ অক্টোবর ঘোষণা এল, মার্কিন স্ট্রিমার আইশোস্পিড (ডারেন ওয়াটকিন্স জুনিয়র), ছবিটির প্রযোজক। এটি তাঁর প্রযোজিত প্রথম ছবি। ছবিটি ২৮ অক্টোবর একরাতের প্রদর্শনীতে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের রিগ্যাল, এএমসি, সিনেমার্ক ও কিছু ইন্ডিপেনডেন্ট হলে দেখা যাবে। এই জুটিটা প্রথমে অদ্ভুত লাগতে পারে। সমালোচকদের মতে, আইশোস্পিডের ব্র্যান্ড দাঁড়িয়ে আছে উচ্চস্বর ও অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়ার ওপর। আর এ ছবির নায়ক একজন বৃদ্ধ ক্যামেরাম্যান, যাঁর পুরো জীবন কেটেছে লেন্সের পেছনে, নিঃশব্দে। তবু যোগসূত্র আছে। এ বছরের শুরুতে আইশোস্পিড আফ্রিকার ২৮ দিনের সফরে বেরিয়েছিলেন, ঘানায় পৌঁছে বলেছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষেরা এ দেশের মানুষ। সফরের মাঝপথে বটসোয়ানায় বলা তাঁর কথাটা এখন প্রায় ছবির প্রচার-বাক্যের মতো শোনায়: “আফ্রিকা আমি যা ভেবেছিলাম, তা নয়”।

নিজের ঘোষণায় তিনি জানিয়েছেন, ঘানা সফরে একটা গভীর সংযোগ অনুভব করেছিলেন, আর হেসির কাজ জানার পর দেশটিকে বুঝতে আরও সুবিধা হয়েছে, এবং এই গল্প নিজের সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে দিতে পেরে তিনি গর্বিত।

ঢাকার জন্য একটি প্রশ্ন

হেসির গল্প বাংলাদেশের পাঠকের কাছে পুরোপুরি অচেনা ঠেকবে না। জহির রায়হান মুক্তিযুদ্ধের সময় বানিয়েছিলেন স্টপ জেনোসাইড, যা মুক্তি পায় তাঁর মৃত্যুর পরে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার অল্প পরে, ছত্রিশ বছর বয়সে, তিনি নিখোঁজ হন। প্রথম আলোর বিবরণ অনুযায়ী তাঁর বেশির ভাগ চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র, জীবন থেকে নেয়া-সহ, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষিত। তাঁর অসমাপ্ত লেট দেয়ার বি লাইট নিয়ে আর্কাইভ আর পরিবারের মধ্যে মালিকানার প্রশ্নও উঠেছিল। 

এই দুই গল্প এক নয়, তুলনা টেনে লাভ নেই। ঘানায় ক্ষতি হয়েছে অভ্যুত্থানের পরে, আর ছবি বেঁচেছে একজন মানুষের জেদে। কিন্তু একটা প্রশ্ন সীমানা মানে না: আর্কাইভে ফিল্ম থাকা এক কথা, আর সেই ফিল্ম নতুন প্রজন্মের চোখের সামনে আসা আরেক কথা। দ্য আইজ অব ঘানা-র নির্মাতারা তাঁদের বার্তাকে হেসির উপদেশের মতো করেই সাজিয়েছেন: যাঁরা ছবি তোলেন, তাঁরা যেন তোলা চালিয়ে যান, আর যাঁরা ছবি রাখেন, তাঁরা যেন তা ক্ষয়ে যেতে না দেন। ঢাকার পর্দা, গবেষণাগার আর আর্কাইভের তাকের জন্য প্রশ্নটা তাই খোলা থাকল।


Picture of দ্য পাবলিশ নিউজরুম

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইটে লাখ লাখ হামলার চেষ্টা। ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

প্যারিসের শহরতলির এক স্কুলের ফাঁকা পদ থেকে শুরু হয়ে এক মাসে সারা দেশ। এই আন্দোলনের মুখ কারা এবং কেন।

দ্য পাবলিশ

ভারতে বাড়ছে তরুণদের ক্ষোভ, রাস্তায় নামছেন বিরোধীরা। তবু বাংলাদেশের জুলাইয়ের সঙ্গে ভারতের আন্দোলনের দূরত্ব কতটা এবং কেন?

দ্য পাবলিশ

Scroll to Top