অপজিশনকে দেড়শ টাকার লাঞ্চে দাওয়াত, নাগরিকের লাগে তিনশ

১৫০ টাকায় দুপুরের খাবার আর বিকালের নাস্তা সেরে নেন বাংলাদেশের বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

● তানভিরুল হক রাহাত

অক্টোবর ৫, ২০২৬

অপজিশনকে দেড়শ টাকার লাঞ্চে দাওয়াত, নাগরিকের লাগে তিনশ | দ্য পাবলিশ The Publish

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ


১৫০ টাকায় দুপুরের খাবার আর বিকালের নাস্তা সেরে নেন বাংলাদেশের বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, কুড়িয়েছেন জনগণের প্রশংসা। দলের নেতাকর্মীরা বুক ফুলিয়ে উদযাপন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সাধারণত্ব। বিরোধীদলও প্রশংসা করতে কার্পণ্য করেনি এক চিমটি।

সেই আলোচিত দুপুরের খাবারের মেন্যুতে থাকে সাদা ভাত, সাথে মৌসুমি শাকসবজি। আমিষের চাহিদা পূরণে পাতে তুলে নেন হয়তোবা একটা ডিম আর কিছুটা পাতলা ডাল। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই নিয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিবেদন পাওয়া যায়। বিরোধীদলের প্রধান নেতা ড. শফিকুর রহমানকেও দেড়শ টাকার সেই লাঞ্চ  টেবিলে দাওয়াত করতে ভুলেননি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

প্রশ্ন জাগতে পারে, একজন মানুষের দৈনিক কতটুকু আমিষের প্রয়োজন? এই সাধারণ লাঞ্চ টেবিল কি পর্যাপ্ত আমিষ জোগাতে পারে প্রধানমন্ত্রীর? সে প্রশ্নও থেকে যায়। সরকারীদল, বিরোধীদল কিংবা দেশের সাধারণ জনগণ প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসকের কাছে এই বিষয়ে জানতে চেয়েছেন কিনা তা এখনো জানা যায়নি । এই আমিষ পর্যাপ্ত কিনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য?  

হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং, ‘How much protein do you need every day?’ এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে বলে, একজন মানুষের সুস্থ থাকতে শরীরের প্রতি কিলোগ্রাম ওজনের জন্য প্রয়োজন ০.৮ কিলোগ্রাম আমিষ। কঠোর পরিশ্রম, স্তন্যদান এবং আরোকিছু বিশেষ কারণে আমিষ গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনও (WHO) সে একই নির্দেশনা প্রদান করে, সমান্য তফাতে ডব্লিউএইচও ০.৮৩ কিলোগ্রামের কথা বলে। এই হিসাব মতে একজন ৬০ কেজি ওজনের মানুষ সুস্থ থাকতে দৈনিক নুন্যতম তাকে ৪৮ থেকে ৫০ কিলোগ্রাম আমিষ গ্রহণ করতে হয়।

একটা ডিমে আমিষের পরিমাণ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণকৃত ডিম

USDA এর তথ্য মতে, একটা বড় ৫০ গ্রাম ওজনের ডিমে ৬ থেকে ৬.৩ গ্রাম আমিষ থাকে, ছোট ডিমে ৪.৮ গ্রাম। ডিমের ওজনের উপর ভিত্তি করে আমিষের পরিমাণ নির্ধারিত হবে। তবে তা বেড়ে ৭ গ্রামের বেশি আমিষ নয়। লাঞ্চে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণকৃত ডিমের আকারের উপরেই নির্ভর করছে একটা ডিম থেকে কতটুকু আমিষ তিনি পান। 

সে আলোচিত লাঞ্চ টেবিলের ডাল

USDA এর গবেষণা মতে এক কাপ মসুর ডালে প্রায় আঠারো গ্রাম আমিষ থাকে। এক কাপ রান্না করা ডালের ওজন ২৫০ গ্রাম বা তার চে’ কিছুটা কম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি একবেলায় ২৫০ গ্রাম ডাল গ্রহণ করেন? যদি করে থাকেন তাহলে ডিম আর ডালের আমিষের পরিমাণ যোগ করলে ২৪গ্রাম বা তার চে’ কিছুটা কম। 

দুই বছর আগে দ্য টপ সেলিব্রিটি (The Top Celebrity) নামের একটি ওয়েবসাইটে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওজন ৬৫কেজি বলে উল্লেখ করা হয়, এই ডাটা কতটা সঠিক তা বের করা যায়নি। আর বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ওজন কত তা কোথাও নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই।

২০২০ সালে অর্থনীতিবীদপাভলো ব্লাভাটস্কি পোস্ট-সোভিয়েত দেশগুলার একটা গবেষণা প্রকাশ করে। সেখানে সাবেক ইউনিয়ন ভিত্তিক ১৫ দেশের ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের ওজন নিয়ে কম্পিউটার অ্যালগরিদম ভিত্তিক বিশ্লেষণ চালানো হয়। ফলাফলে দেখা গেল, যেসব দেশের মন্ত্রীগণ মোটা আর বেটে সে দেশে দুর্নীতি বেশি। অর্থাৎ মন্ত্রীদের ওজন বলে দেয় সে দেশ কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত। ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রীদের ওজন বাড়ে কি কমে তা নিয়ে নির্দিষ্টভাবে বলা না গেলেও, ক্ষমতার মসনদে বসে ভোগবিলাস মোটা করে তুলতে পারে। অন্যদিকে মানসিক চাপ শরীরের ওজনে অবনতি ডেকে আনে তা সত্য। এত এত গবেষণার কথা আর হিসাব নিকাশ বাদ দিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওজন ৬৫ হিসাব করলে দৈনিক নূন্যতম ৫২ গ্রাম আমিষের প্রয়োজন।

যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডিনারেও সেই সাধারণ ভোজ গ্রহণ করেন, যোগফল হয় ২৪+২৪ = ৪৮। ৫২ এর ঘর পূরণ করতে ব্র্যাকফাস্টে নিতে হবে কমপক্ষে ছোট আকারের একটা ডিম। যদি কখনো ব্র্যাকফাস্টে ভুলে প্রোটিন স্কিপ করেন তাহলে ৫২এর ঘরও থেকে যায় অপূর্ণ। দীর্ঘকাল এভাবে নূন্যতম আমিষসমৃদ্ধ সাধারণ ভোজ গ্রহণ করলে প্রভাব পড়তে পারে মস্তিষ্কের গঠনে, কার্যক্ষমতায় পড়তে পারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব। তা দেশ ও দেশের জনগণের জীবনযাত্রার উপরও ফেলতে পারে বিরাট প্রভাব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মস্তিষ্ক যতবেশি সুস্থ হবে তত ভালো আউটপুট পাবে দেশ ও দেশের জনগণ।
তবে কি ভালো আউটপুট দিতে তিনি গোপনে পূরণ করেন আমিষের ঘাটতি? 

যুগে যুগে রাজা-বাদশাদের ভোজ

প্রাচীন ও মধ্যযুগে রাজা-বাদশাদের ভোজে থাকত নানান কিসিমের দুষপ্রাপ্য খাবারদাবার। বিচিত্র মশলার ব্যবহার। পরিবেশিত হত সোনা ও রূপার থালায়, অতিথি হিসাবে থাকত দেশবিদেশের উঁচুশ্রেণীর লোক, থাকত গুণীজন পণ্ডিতবৃন্দ। নাচ গানেরও ব্যবস্থা থাকত খাবারের পাশে। আধুনিক যুগেও সে রীতির বিচ্যুতি হয়নি তেমন। খাবারের পেছনে নষ্ট হত রাষ্ট্রীয় সম্পদ। তবে অতিরঞ্জিত ব্যতীত রাজদরবারের খাবারের এই রীতি প্রতিটা যুগে গ্রহণযোগ্য হয়েই আসছে। অর্থাৎ, এটাকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই দেখা হয়। 

কেবল রাজদরবারের খাবারের মেন্যুই কি রাষ্ট্রের উন্নতি নির্ধারণ করতে পারে? জীবনযাত্রার মানে আনতে পারে আমূল-পরিবর্তন? গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে ২১ হাজার ৭৫৬টি অপরাধ রেকর্ডেড হয়। বিগত আট মাসে মব ভায়োলেন্সের শিকার হয়ে প্রাণ হারান ১৫৪ জন। মূল্যষ্ফীতি তো আছেই। নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। গ্যাস তেলের দাম এক লাফে দুইগুণ। বিদ্যুৎ কতক্ষণ থাকে সে প্রশ্ন না, বরং কখন আসে সেটাই প্রশ্ন। গত বর্ষায় বন্যায় ফসল হারিয়েছে কত কৃষক! প্রাণও গেল অনেকের। গত কয়েক মাসে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় ১,৯৫,১৯৭ জন রোগী সনাক্ত হয়, ইতিমধ্যে ১১২০ জনের মৃত্যুও হল। বাংলাদেশ ওয়ার্লড হেল্থ অর্গানিজেশন বলছে, আক্রান্ত ও মৃতদের বেশিরভাগই শিশু।

এখন প্রশ্ন থেকেই যায়, খাবারের মেন্যু সংক্ষিপ্ত ও সাধারণ করেই সরকার কি পারবে এতগুলা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে? খাবারের মেন্যু সংক্ষিপ্ত করে প্রশংসা পেতে পারে সরকার। কিন্তু একটা প্রশ্ন তো থেকেই যায়, সরকার কি পারবে আসলে? আসলেই পারবে উন্নতি করতে? ◼


Picture of তানভিরুল হক রাহাত

তানভিরুল হক রাহাত

তানভিরুল হক রাহাত, কবি ও অনুবাদক। তিনি চট্টগ্রাম কলেজের ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে পড়েন।

শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইটে লাখ লাখ হামলার চেষ্টা। ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

প্যারিসের শহরতলির এক স্কুলের ফাঁকা পদ থেকে শুরু হয়ে এক মাসে সারা দেশ। এই আন্দোলনের মুখ কারা এবং কেন।

দ্য পাবলিশ

ভারতে বাড়ছে তরুণদের ক্ষোভ, রাস্তায় নামছেন বিরোধীরা। তবু বাংলাদেশের জুলাইয়ের সঙ্গে ভারতের আন্দোলনের দূরত্ব কতটা এবং কেন?

দ্য পাবলিশ

Scroll to Top