কিউলেক্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, এডিসের জয়

ডেঙ্গুর মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই ৮৮,৩৬০জন হাসপাতালে, মৃত ২৭১জন।

● দ্য পাবলিশ

অক্টোবর ৬, ২০২৬

কিউলেক্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, এডিসের জয় | দ্য পাবলিশ The Publish

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ / সোর্স : দ্য সান


কাহিনী শুরু করা যাক এক মায়ের অপেক্ষা দিয়ে। সাফিয়া এসেছেন ভোলা থেকে। তাঁর ছেলে মো. সাহাদাতের বয়স বাইশ। ১৭ সেপ্টেম্বর আগারগাঁওয়ের ইএনটি ও হেড-নেক ক্যানসার হাসপাতালে তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছিল, সেরে উঠছিলেনও ভালো। তিন দিন আগে ধরা পড়ল ডেঙ্গু। এখন তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, মা বসে আছেন পাশে। অস্ত্রোপচারের টেবিল পেরিয়ে আসা একজন মানুষের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে এমন এক অসুখ, যার বাহক একটি মশা। এই ঘটনা গত ১ অক্টোবরে প্রকাশ করে দ্য ডেইলি স্টার। 

একই প্রতিবেদনে আছেন কেরানীগঞ্জের আতিবাজারের মো. মারুফ। স্থানীয় একটি হাসপাতালে চার দিন চিকিৎসা নিয়েও তাঁর উন্নতি হয়নি, তাই মঙ্গলবার তিনি এসেছেন সোহরাওয়ার্দীতে। দুজনের গল্প আলাদা, ঠিকানা এক, কারণ এ বছর দেশের সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী এই হাসপাতালেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডেঙ্গুর জন্য আলাদা ওয়ার্ড এখানে দুটি। দশটি সাধারণ মেডিসিন ওয়ার্ডে খোলা হয়েছে ডেঙ্গু কর্নার, প্রতিটিতে দশ থেকে বিশজনের জায়গা। সহযোগী অধ্যাপক এইচ এম নাজমুল আহসান জানিয়েছেন, ওয়ার্ড ভর্তি, কর্নারও ভর্তি, তাই কর্নারের বাইরেও রোগী নিতে হচ্ছে। কর্নার শব্দটি এখানে স্থাপত্যের চেয়ে আশাবাদের মাপ।

ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলোয় বসানো হয়েছে মাইক্রোহেমাটোক্রিট যন্ত্র, যা প্রায় পাঁচ মিনিটে চব্বিশজন রোগীর রক্ত পরীক্ষা করে ফেলতে পারে। চিকিৎসকেরা তাকিয়ে থাকেন দুটি সংখ্যার দিকে: দুই রিপোর্টের মাঝে হেমাটোক্রিটের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, আর প্লাটিলেটের দ্রুত পতন। জ্বর নেমে যাওয়ার পরও আবার পরীক্ষা করাতে বলা হয়, কারণ অগাস্টে নাজমুল আহসান বলেছিলেন, গুরুতর ডেঙ্গু প্রায়ই জ্বরের তৃতীয় বা চতুর্থ দিনে দেখা দেয়, আর শুরুর লক্ষণ অন্য ভাইরাস-জ্বরের মতোই। এখন হাসপাতাল এমন রোগীও দেখছে, যাঁদের ডেঙ্গু লিভার বা কিডনিকে অচল করে দিয়েছে, কারও সংজ্ঞা অস্পষ্ট। চিকিৎসকেরা এর নাম দিয়েছেন এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম।

যাঁরা এই লড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে, তাঁরাও নিরাপদ নন। ২৭ সেপ্টেম্বর স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে মারা গেছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. আঁচল রায়। সহকর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, ডেঙ্গু ইউনিটে দায়িত্ব পালনের কথা ছিল তাঁর, কিন্তু তার আগেই তিনি আক্রান্ত হয়ে পড়েন।

দুর্যোগের হিসাব ও পরিস্থিতি

৪ অক্টোবর, রোববারের বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত চব্বিশ ঘণ্টায় ছয়জন মারা গেছেন, ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৮৯ জন। এ বছর মৃত্যুর মোট সংখ্যা এখন ২৬২। ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ৮৪ হাজার ৩৬৯ জন। এই সংখ্যাগুলোর মানে বুঝতে একটি ছোট তথ্য জরুরি। অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে যা গুনছে, তা হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর হিসাব। অর্থাৎ ডেঙ্গুর সরকারি অঙ্ক তাঁদেরই অঙ্ক, যাঁরা শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে পৌঁছাতে পেরেছেন।

তুলনার জন্য: ২০২৩ সাল এ পর্যন্ত সবচেয়ে খারাপ, ভর্তি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯, মৃত্যু ১ হাজার ৭০৫। ২০২৪ সালে ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন ও ৫৭৫ মৃত্যু, ২০২৫ সালে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন ও ৪১৩ মৃত্যু। ২০২৬ সাল গত বছরের পুরা হিসাব থেকে এখন প্রায় সাড়ে আঠারো হাজার ভর্তি দূরে, যদিও বছর শেষ হতে তিন মাস বাকি এখনো। ২০২৩-এর বিপর্যয়ের পরের তিন বছরে সংখ্যাটা ঘুরছে প্রায় একই লাখের ঘরে। অসুখটা আর ব্যতিক্রম না; ঋতুর মতো ফিরে আসে, বারবার।

২০২৬ সালের বক্ররেখার আকারও কথা বলে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মৃত্যু ছিল পাঁচটি। জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৬, অগাস্টে ৪৩, আর সেপ্টেম্বরে ১৪৮, যা এ বছরের কোনো একক মাসের সর্বোচ্চ। ভর্তির হিসাবেও একই ঢাল: জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬, অগাস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ (রেড ক্রিসেন্ট), সেপ্টেম্বরে ৪৩ হাজার ৭৭৪ (ডেইলি স্টার)। রেড ক্রিসেন্টের হালনাগাদ অনুযায়ী মাঝ অগাস্ট পর্যন্ত সংখ্যা ২০২৫ সালের গতির নিচেই ছিল, তারপর অগাস্টের শেষ দিক থেকে বর্ষা-চালিত এক উল্লম্ফনে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গত বছরের একই সময়ের হিসাব ছাড়িয়ে যায়।

অগাস্টের ২২ তারিখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও চিকিৎসা-কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, পরিস্থিতি আগের বছরগুলার চেয়ে বিশেষ খারাপ মনে হচ্ছে না, বরং মোটামুটি স্বাভাবিক, আর নাটকীয় কোনো উল্লম্ফন তিনি প্রত্যাশা করছেন না। তাঁর অনুমান ছিল, অক্টোবর পর্যন্ত সংখ্যা বাড়বে, নভেম্বরে কমতে শুরু করবে। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংখ্যা লাফিয়ে উঠেছে, সেপ্টেম্বর হয়েছে বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস। এতে একজন বিজ্ঞানীর দোষ ধরা অন্যায় হবে। বরং বোঝা যায়, এই অসুখের গতি অভিজ্ঞ চোখকেও চমকে দিতে পারে।

ভূগোলও বদলেছে। আইইডিসিআর জানিয়েছে, সংক্রমণ ছড়িয়েছে ৬৪টি জেলাতেই। বছরের উনচল্লিশতম সপ্তাহ পর্যন্ত ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডের হিসাবে ৭৫ হাজার ৭৩০ ভর্তির মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩০ হাজার ৪৮৫, যার মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনে ১৭ হাজারের কিছু বেশি। খুলনা বিভাগে ১২ হাজার ৩১৩, চট্টগ্রামে ১১ হাজার ১৬৪, বরিশালে ১০ হাজার ১০৪। ঢাকা আর একমাত্র কেন্দ্র না। ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির প্রতিবেদন বলছে, সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামে রোগী বছরের প্রথম সাত মাসের দ্বিগুণ, সরকারি হাসপাতালে কোথাও এক শয্যায় দুজন, কোথাও বারান্দা বা মেঝেতে নেয়া হচ্ছে চিকিৎসা।

একই বছরে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আরেকটি বোঝা আছে: হাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এপ্রিলেই জানিয়েছিল, ৬৪ জেলার ৫৮টিতে হামের সংক্রমণ ছড়িয়েছে। জুলাইয়ে ঢাকা ট্রিবিউন একে দেশের রেকর্ডে সবচেয়ে বড় হাম-প্রাদুর্ভাব বলেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে সন্দেহভাজন আক্রান্ত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৪৮, সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যু মিলিয়ে ৯৯৪। ডেঙ্গুর মৌসুম তাই ফাঁকা মঞ্চে আসে নাই। এসেছে এমন এক ব্যবস্থার ওপর, যা মার্চ থেকেই আরেকটি বড় প্রাদুর্ভাবের জবাব দিয়ে চলছিল।

ডেঙ্গু ভাইরাস

ডেঙ্গুর ভাইরাস চার ধরনের, ডেন-১ থেকে ডেন-৪। আইইডিসিআরের একটি ব্যাখ্যা বলছে, এক ধরনে আক্রান্ত হলে অন্য ধরনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা মিলে না। উল্টা, পরের বার ভিন্ন ধরনে সংক্রমিত হলে ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো প্রাণঘাতী রূপের ঝুঁকি বাড়ে। ২০২৩ সালের প্রকোপের তীব্রতার একটি অংশও ওই লেখায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে ধরনের ঘন ঘন বদল দিয়ে। এ বছরের গল্পে সেই বদলের আরেকটি অধ্যায়। আইইডিসিআরের হাসপাতালভিত্তিক নজরদারি অনুযায়ী, নয়টি হাসপাতালের ১ হাজার ৯৭টি এনএস১-পজিটিভ নমুনার মধ্যে যে ৭১টির ধরন নির্ণয় হয়েছে, তার ৯১.৫ শতাংশে মিলেছে ডেন-৩, বাকিগুলোয় ডেন-২। ডেন-৩ প্রধান ঢাকায়, ডেন-২ ঢাকার বাইরে, যেমন বান্দরবান ও বরগুনায়। ২০২৩ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত যে ধরন প্রধান ছিল, সেই ডেন-২ এখন পেছনের সারিতে। ৭১ একটি ছোট সংখ্যা, আর এটি সারা দেশের হিসাব না, নয়টি হাসপাতালের চিত্র মাত্র। ধরন-বদলের সঙ্গে এ বছরের পরিস্থিতির সম্পর্ক কতটা, তা এখনো প্রমাণিত না।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকি সেপ্টেম্বরে বলেছিলেন, ভিন্ন ধরনে পুনঃসংক্রমণে প্লাজমা লিকেজের মতো জটিলতা হতে পারে, আর বহু রোগী হাসপাতালে আসেন এত দেরিতে যে ততক্ষণে তাঁরা শকে চলে গেছেন। প্লাজমা লিকেজ মানে রক্তের তরল অংশ নালির বাইরে চুঁইয়ে যাওয়া। সোহরাওয়ার্দীর চিকিৎসকেরা অগাস্টে জানিয়েছিলেন, তাঁদের কাছে আসা বেশির ভাগ রোগীর অবস্থা তখনই রক্তচাপ পড়ে যাওয়া, প্লাজমা লিকেজ ও শক সিনড্রোমে পৌঁছে গেছে। হেমাটোক্রিটের মাপ আর প্লাটিলেটের গণনা তাই শুধু পরীক্ষাগারের অভ্যাস না, সময় কিনে নেওয়ার চেষ্টা।

বাহক এডিস। আইইডিসিআরের এক লেখায় বলা হয়েছে, জরিপে এডিস ইজিপ্টাই পাওয়া গেছে মূলত শহরে, আর এডিস অ্যালবোপিকটাস মূলত গ্রামাঞ্চলে। এই ভাগ আজ কতটা টিকে আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কবিরুল বাশার সেপ্টেম্বরে বলেছেন, এডিস ছড়িয়ে পড়েছে জেলা, উপজেলা ও বহু গ্রামে। বদলেছে ক্যালেন্ডারও। সেপ্টেম্বরের এক আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, ডেঙ্গু এখন সারা বছরের জনস্বাস্থ্য-হুমকি। মশার আচরণ বা জৈবিক স্বভাব বদলেছে কি না, তার যাচাইযোগ্য প্রমাণ আমরা বের করতে পারি নাই। যা যাচাই করা গেছে, তা এই: সে এখন আরও জায়গায় আছে, আরও মাসে আছে।

এডিসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এটাই যে সে ডিম পাড়ে পরিষ্কার, স্থির পানিতে। ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জুনে সাংবাদিকদের বলেছেন, সাধারণ ধারণার উল্টা, এডিস নোংরা বা পচা পানিতে না, পরিষ্কার ও স্থির পানিতে বংশবিস্তার করে। শুনতে সামান্য, অথচ ফল বহুদূর গড়ায়। শহর ঝাঁট দিলেই এডিস যায় না। প্রজননক্ষেত্রের তালিকায় আছে বসতবাড়ির আঙিনায় জমা পানি, ফুলের টব, এসি ও ফ্রিজের ট্রে, এমনকি বাথরুমের কমোডও।

ঢাকা এবং কেন ঢাকা?

তাহলে ঢাকা এই মশার জন্য এমন আরামের ঠিকানা কেন? কবিরুল বাশার ২০২৫ সালের অক্টোবরে টিবিএসকে বলেছিলেন, ঢাকায় বিজ্ঞানসম্মত মাস্টারপ্ল্যানের অভাব আছে। পানি সরবরাহ অনিয়মিত হলে মানুষ ঘরে পানি জমিয়ে রাখে। বেসমেন্টের পার্কিংয়ে গাড়ি ধোয়ার পর পানি ভেশে থাকে। ঘেঁষাঘেঁষি দালানের ফাঁকে ফেলা আবর্জনায় বৃষ্টির পানি জমে ছোট ছোট পাত্রে। তাঁর মূল্যায়নে অন্তত অর্ধেক ডেঙ্গু আক্রান্তের সঙ্গে পরিকল্পনাহীনতার সম্পর্ক আছে। একই লেখায় নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান বলেছেন, ভবনের মাঝের ফাঁক এত সরু যে সংগঠিত বর্জ্য সংগ্রহের জায়গাই থাকে না, না-তোলা প্লাস্টিকের পাত্রে বৃষ্টির পানি জমে, আর কংক্রিট বাড়লে ও সবুজ কমলে শহর যে উত্তপ্ত হয়, সেই তাপ মশার বেঁচে থাকা ও বংশবৃদ্ধির অনুকূল। অথচ বাশার নিজেই পরিকল্পনাকে একমাত্র আসামি করেন নাই। একমাত্র কারণ হলে সিঙ্গাপুরের মতো পরিকল্পিত শহরে প্রাদুর্ভাব হতো না, তিনি বলেন।

ডিএসসিসির মে মাসের লার্ভা জরিপ এই আলোচনায় কিছু মাপা সংখ্যা এনেছে। ১২ থেকে ২৩ মে ৭৫ ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে ৩০টি করে বাড়ি নমুনা ধরা হয়, পরিদর্শন করা ২ হাজার ২৩৮ বাড়ির ২৮১টিতে মিলেছে এডিসের লার্ভা বা পিউপা, অর্থাৎ প্রায় প্রতি আটটি বাড়ির একটিতে। ৭৫ ওয়ার্ডের ৬৩টিতে মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সূচকের ওপরে, ২৭টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। জরিপের হিসাবে পাওয়া লার্ভার ৩৫ শতাংশের বেশি মিলেছে বহুতল ভবনে, ২৭ শতাংশের বেশি স্বতন্ত্র বাড়িতে, ১৭ শতাংশের বেশি নির্মাণাধীন ভবনে। ডেঙ্গু এখন আর ঘনবসতি বা নিম্নআয়ের পাড়ায় আটকে নাই।

কবিরুল বাশারের ভাষ্য, সিটি করপোরেশনের মশা-নিয়ন্ত্রণের বেশির ভাগ কাজ, যেমন ফগিং বা ড্রেনে ওষুধ ছিটানো, নিশানা করে কিউলেক্সকে। অথচ ডেঙ্গুর বাহক এডিস জন্মায় ফুলের টব, বালতি বা ফেলে দেওয়া কাপের মতো ছোট পাত্রের পরিষ্কার পানিতে। তাই ডেঙ্গু-নিয়ন্ত্রণকে সাধারণ মশা-নিয়ন্ত্রণ থেকে আলাদা করে ভাবতে হবে, বলেন তিনি। সেপ্টেম্বরে তাঁর আরেকটি কথা: এডিসের প্রজননস্থলে নিয়ন্ত্রণ না পৌঁছালে একা ফগিং দিয়ে ডেঙ্গু ঠেকানো যায় না। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ জুলজিক্যাল সোসাইটির সাবেক সভাপতি, কীটতত্ত্ববিদ মঞ্জুর এ চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, তাঁদের গবেষণায় ফগিংয়ে দশ শতাংশেরও কম মশা মরেছে, আর লার্ভিসাইডের পরও বেশির ভাগ ড্রেনে ত্রিশ শতাংশের বেশি মশা অক্ষত থেকেছে। সে বছর তিনি এ-ও বলেছিলেন, নিয়ন্ত্রণ-প্রচেষ্টা কাজ করছে কি না, তা মাপার মতো মাঠপর্যায়ের জরিপ নাই।

টাকার প্রশ্নটা এসে দাঁড়ায় প্রায় নিরীহ ভঙ্গিতে। ঢাকা উত্তরের মশক নিধন বরাদ্দ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা থেকে ২০২৫-২৬-এ বেড়ে হয়েছে ১৮৭ কোটি ৭৫ লাখ, দক্ষিণে ১১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৫৩ কোটি ৫০ লাখ। উত্তরে আট গুণের কিছু বেশি, দক্ষিণে চার গুণের বেশি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উত্তর রেখেছে ২০৭ কোটি, দক্ষিণ স্বাস্থ্য ও মশক নিয়ন্ত্রণ মিলিয়ে ১২১ কোটি ৬৬ লাখ। বরাদ্দ বেড়েছে, অথচ নগরবাসী এখনো কিউলেক্স ও এডিসের উপদ্রবের কথা বলছেন, আর ওষুধের অকার্যকারিতা ও নিয়মিত না ছিটানোর অভিযোগ নতুন কিছু না।

জরিপের গতিও ঋতুর তালে বাঁধা। বর্ষার আগের জরিপ হয়েছিল ১২ থেকে ২৩ মে, ফল ঘোষণা হয় ৪ জুন। ২৮ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্ষাকালীন জরিপ শুরু হয়েছে, আবার ৭৫ ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে ৩০টি করে, মোট ২ হাজার ২৫০ বাড়ি, বারো দিন ধরে। সেপ্টেম্বর, যে মাসে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন, তার শেষ সপ্তাহে। ২০২৪ সালে মঞ্জুর চৌধুরী মাঠজরিপের যে শূন্যতার কথা বলেছিলেন, দক্ষিণ সিটির এই জরিপ তার অন্তত একটি অংশ ভরাট করতে চাইছে। উত্তর সিটির তেমন কোনো জরিপের ফল আমরা এখনো পাই নাই।

দায় কার?

দায় কার, এ প্রশ্নের উত্তর দুই পক্ষ দুইভাবে দেয়। কবিরুল বাশারের কথায়, সিটি করপোরেশন প্রতিটি বাড়িতে যেতে পারে না, নিজের জায়গা প্রজননমুক্ত রাখার দায় বাসিন্দার। দক্ষিণের প্রশাসকও নাগরিকের অংশগ্রহণ চান। অন্যদিকে গুলশান সোসাইটির সভাপতি ওমর সাদাত সিটি করপোরেশনের মশা-নিয়ন্ত্রণ বরাদ্দের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, ডেঙ্গুকে মৌসুমি সমস্যা না ভেবে জবাবদিহি ও সুশাসনের প্রশ্ন হিসাবে দেখতে বলেছেন। জনস্বাস্থ্যবিদ আহমেদ মুশতাক রাজা চৌধুরী ডেঙ্গুকে জাতীয় সংকট বলে সারা বছরের নিয়ন্ত্রণের তিনটি নীতি দিয়েছেন: রোগী শনাক্ত করা, দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা, আর হস্তক্ষেপ কাজ করছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা।

এডিসের জল প্রধানত ব্যক্তিগত। বালতি, ছাদ, বেসমেন্ট, নির্মাণস্থল। আর বাজেট সরকারি। এই ফাঁকের ওপর দাঁড়িয়ে একপক্ষ নাগরিককে দায়ী করতে পারে, অন্যপক্ষ প্রশাসনকে, এবং দুজনেই ঠিক, আংশিক।

জলবায়ুর প্রশ্নে সতর্ক থাকা দরকার, কারণ এখানে প্রমাণ যেমন আছে, তার সীমাও আছে। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের তথ্যে সাজানো একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা ও বৃষ্টির প্রভাব এক থেকে তিন মাস পরে ডেঙ্গুতে ধরা পড়ে, আর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও মাঝারি বৃষ্টিতে, বিশেষত জুন থেকে অক্টোবরে। ২০২৬ সালের আরেকটি গবেষণা বলছে, মাঝারি বৃষ্টি প্রজননক্ষেত্র তৈরি করে, কিন্তু প্রবল বর্ষণ সম্ভবত লার্ভা ধুয়ে নিয়ে যায়। গবেষকদের ভাষ্যে তাপমাত্রা প্রাদুর্ভাবের বিবর্ধকের চেয়ে বরং একটি অনুমোদনকারী সীমারেখা। তাপমাত্রার সীমা আর বৃষ্টির ভূমিকা নিয়ে গবেষণাগুলা একমত না। এই অমিল দুর্বলতাও না, এটি দেখায় জলবায়ু এখানে একটি চালক, একমাত্র চালক না। রয়্যাল সোসাইটির এক জার্নালে ২০২৬ সালে ছাপা একটি গবেষণা বলছে, বর্ষার তারতম্য, উষ্ণ-আর্দ্র ঋতু, ঘন নগরায়ণ ও পানি সংরক্ষণের অভ্যাস মিলে এডিসের বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

আইইডিসিআর নিজেই একটি জলবায়ু-নির্ভর আগাম সতর্কীকরণ ও সাড়া ব্যবস্থা চালায়, যার ভিত্তিতে ১৫ জেলায় সংক্রমণ বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। আইইডিসিআর এর ডিরেক্টর ড. কাজী আহমেদ জাকির কথায়, মডেলটি সপ্তাহ ৩৬ থেকে ৩৯-এর জন্য প্রায় ৮০ শতাংশ নির্ভুলতায় আন্দাজ করে, আর সেটি নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়, সম্ভাব্য দৃশ্যপটের বৈজ্ঞানিক প্রক্ষেপণ।

চিকিৎসালয়ের ছাদের নিচে

অসুখের চেহারা এক, তবে তার বিল এক না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গত জুনের ২ তারিখে সাংবাদিকদের বলেন: বেসরকারি হাসপাতালে মোট শয্যার ১০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীর জন্য রাখতে হবে, চিকিৎসকের ভিজিট নেওয়া যাবে না, রোগী বহন করবেন শুধু ওষুধ ও খাবারের খরচ, আর পরীক্ষার খরচে ছাড় দিতে হবে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। এটি আগাম প্রস্তুতির চিহ্ন, এবং সেভাবেই দেখা উচিত। কিন্তু নির্দেশ মাঠে কতটা পৌঁছেছে, তার যাচাইযোগ্য তথ্য এখনো মিলে নাই।

বিল কেমন দাঁড়ায়, তার সাম্প্রতিকতম হিসাব এখানে ধরা যায় না। আছে তিন বছরের পুরানো সমকালের এক প্রতিবেদন আছে, মুগদা সরকারি হাসপাতালে স্ত্রীকে ভর্তি করানো এক রিকশাচালকের তিন দিনেই পরীক্ষা, ওষুধ, খাবার ও যাতায়াত মিলিয়ে খরচ হয়েছিল ১৫ হাজার টাকা। একটি বেসরকারি হাসপাতালের পরিচালক বলেছিলেন, একজন রোগীর সুস্থ হতে গড়ে ৫০ হাজার টাকার মতো লাগছে। সরকারি হাসপাতালের শয্যা বিনা মূল্যের হতে পারে, তবে তার চারপাশের জীবন খরিদ করে নিতে হয়। তিন বছর আগের ঘটনা হলেও, এখনো এই কাহিনী বাস্তবসম্মত, এ বছরের ঘোষণাও সেই স্বীকৃতি বহন করে: ওষুধ আর খাবারের খরচ রোগীরই।

আর সংখ্যায় ঢোকেন কেবল তাঁরাই, যাঁরা পৌঁছান। কখন পৌঁছান, সেটাও প্রশ্ন। সোহরাওয়ার্দীর চিকিৎসক বলছেন, জ্বর হওয়ার এক-দুই দিনের মধ্যেই পরীক্ষা করাতে। জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হুসেন প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে এনএস১ পরীক্ষা, সেবাবঞ্চিত এলাকায় ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরি, আর যেসব রোগীর নিবিড় সেবা লাগে না তাঁদের জন্য পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবগুলা পড়লে মনে হয়, পরীক্ষাকে রোগীর কাছে আনলে সময়মতো পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়ে। কে কতটা দেরিতে পৌঁছান, আয়ের হিসাবে সেই চিত্র কেমন, তার কোনো সরকারি হিসাব আমরা পাই নাই। হিসাব না থাকলে অসাম্য সহজেই আড়ালে থাকে।

আগামীর পথ ও আমাদের দায়

ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কথায় স্বল্প মেয়াদের কিছু নিশ্চয়তা আছে। কবিরুল বাশার ও কীটতত্ত্ববিদ জি এম সাইফুর রহমান, দুজনই অগাস্টে বলেছিলেন, অক্টোবর পর্যন্ত সংক্রমণ বাড়বে, নভেম্বরে কমতে শুরু করতে পারে, শীতে বৃষ্টি কমলে নামবে। সাইফুর রহমান আরও বলেছিলেন, দেশজুড়ে মশা-নিধন অভিযান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় চলছে না, আর থেমে থেমে বৃষ্টি এডিসের প্রজননের অনুকূল। অগাস্টের একটি অনুমান সেপ্টেম্বরে ঠিক মিলে নাই। নভেম্বরের হিসাব মিলে কি না, দেখা যাবে কয়েক সপ্তাহে।

দীর্ঘ মেয়াদের হিসাব অসুখের না, ব্যবস্থার। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর কোনো অনুমোদিত টিকা-কর্মসূচি নাই, ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন এখনই দেশে চালুর পরিকল্পনা সরকারের নাই বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, গত ১ অক্টোবরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ, গাভি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুমোদন ও সুপারিশ পাওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। ব্রাজিলে ২০২৫ সালের নভেম্বরে অনুমোদন পেয়েছে একক ডোজের বুটানটান-ডিভি টিকা, ১২ থেকে ৫৯ বছর বয়সীদের জন্য, যা তীব্র ডেঙ্গু ও সতর্কসংকেতযুক্ত ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে ৯১.৬ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছে।

তাহলে বাংলাদেশ কি ডেঙ্গুর সঙ্গে খাপ খাওয়াচ্ছে, নাকি শুধু প্রতিটি মৌসুম পার করছে? প্রমাণ মিশ্র। খাপ খাওয়ানোর দিকে আছে জেলা ধরে পূর্বাভাস দেওয়া আগাম সতর্কীকরণ, মৌসুমের আগেই বেসরকারি হাসপাতালের জন্য নির্দেশ, ওয়ার্ডভিত্তিক লার্ভা জরিপ, ডেঙ্গু ওয়ার্ডে দ্রুত হেমাটোক্রিটের যন্ত্র। উল্টা দিকে আছে জরিপ শেষের প্রায় বারো দিন পর ফল ঘোষণা, আর বরাদ্দ বাড়তে থাকা এমন এক ব্যবস্থায়, যার কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন বহু বছরের পুরানো। সংগ্রহ করা প্রমাণ থেকে যা মনে হয়: অসুখ চলে দিনের ঘড়িতে, ব্যবস্থা চলে ঋতুর ঘড়িতে।

ডিএসসিসির প্রশাসক জুনে বলেছিলেন, অনেকে বাথরুম বা অন্য কোথাও বালতিতে কয়েক দিন পানি জমিয়ে রাখেন, আর “দুই-তিন দিনের মধ্যেই সেখানে এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে”। সোহরাওয়ার্দীর চিকিৎসক যে সময়ের কথা বলছেন, তা-ও প্রায় একই মাপের: জ্বরের তৃতীয় বা চতুর্থ দিন, যখন রোগ সংকটজনক পর্যায়ে ঢুকতে পারে। বালতির সময় আর শরীরের সময়, দুটাই মাপা হয় দিনে। আর যে ঘড়িতে জরিপ চলে, বাজেট পাস হয়, নির্দেশ ঘোষণা হয়, সেটি ঋতুর, কিংবা বছরের। ঘড়িগুলা তাই মিলে না।

যে ঘটনা দিয়ে এই আর্টিকেল শুরু করেছিলাম, সেটি দিয়ে যদি শেষ করতে চাই: সাহাদাত কোন শয্যায় আছেন, লেখা নাই। লেখা আছে, মা বসে আছেন তাঁর পাশে। ডেঙ্গুর প্রতিটি রোগীর পেছনে অন্তত একটি জায়গা থাকে, যেখানে কোনো একদিন জল দাঁড়িয়ে ছিল। বালতির জল দাঁড়িয়ে থাকে দুই-তিন দিন। মা বসে থাকেন কত দিন, সে হিসাব কোনো বুলেটিনে ওঠে না। ◼

সম্পাদকীয় নোট: এই প্রতিবেদনটি ৪ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে কোনো তথ্য, পরিসংখ্যান বা পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়ে থাকলে তা এই প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয় নাই।


Picture of দ্য পাবলিশ

দ্য পাবলিশ

অনুসন্ধান, গল্প, প্রবন্ধ ও মুক্তচিন্তার স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম।
শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইটে লাখ লাখ হামলার চেষ্টা। ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

প্যারিসের শহরতলির এক স্কুলের ফাঁকা পদ থেকে শুরু হয়ে এক মাসে সারা দেশ। এই আন্দোলনের মুখ কারা এবং কেন।

দ্য পাবলিশ

ভারতে বাড়ছে তরুণদের ক্ষোভ, রাস্তায় নামছেন বিরোধীরা। তবু বাংলাদেশের জুলাইয়ের সঙ্গে ভারতের আন্দোলনের দূরত্ব কতটা এবং কেন?

দ্য পাবলিশ

Scroll to Top