বাংলাদেশের শিরায় শিরায় ইন্ডিয়া-মিয়ানমারের মাদক চালান

বাংলাদেশে মাদক সেবনকারীর সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ, মানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ

● দ্য পাবলিশ

সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬

বাংলাদেশের শিরায় শিরায় ইন্ডিয়া-মিয়ানমারের মাদক চালান | দ্য পাবলিশ The Publish

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ, ছবি : এলামি


বাংলাদেশে মাদক সেবনকারীর সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ, মানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ, এর মধ্যে গাঁজা সেবনকারীই সবচেয়ে বেশি, একষট্টি লাখের কাছাকাছি। প্রথমবার শোনা মাত্র সংখ্যাটা বিশ্বাস করা সহজ না। এই জরিপ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি গবেষণা সংস্থা যৌথভাবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশব্যাপী যে জরিপ চালিয়েছিল, তাতে দেখা মিলে এই তথ্য। গবেষণায় দেশের ৮টি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। 

এর আগে ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট একবার হিসাব করেছিল, তখন সংখ্যাটা ছিল ছত্রিশ লাখ। সাত বছরে সংখ্যাটা প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, অথচ প্রশাসনিক আলোচনায় এই বৃদ্ধিটা প্রায় সবসময় সীমান্ত আর চালানের গল্পে চাপা পড়ে যায়, যেন মাদক একটা পরিবহন সমস্যা, স্বাস্থ্য সংকট নয়। যাইহোক, আজ আমরা জানবো বাংলাদেশে কিভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন কোন পথে মাদক ঢোকে।

কক্সবাজারের টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠটা এখনো আছে। ২০১৯ সালের  ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে সেই মাঠে একশো দুইজন আসামি লাইন ধরে দাড়ায়, সামনে একটা টেবিল, আর তার উপর সাড়ে ৩ লাখ ইয়াবা, ৩০টি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও ৭০ রাউন্ড গুলিসহ জমা পড়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে। রাষ্ট্র তখন এই দৃশ্যটাকে দেখেছিল এক মহা বিজয় হিসেবে। কিন্তু, অনুসন্ধান করে জানা যায় ভিন্ন কাহিনী। ওই একশো দুইজনের মধ্যে অন্তত দশজন অস্ত্র মামলায় জামিন পেয়ে যান দ্রুতই, বাকিরাও একে একে বেরিয়ে আসেন, আর তাদের পরিবার আর এজেন্টরা ব্যবসাটা ততদিনে সচল রেখেছিলেন যত্ন করে। দীর্ঘ তিন বছর পর, ২০২২ সালের নভেম্বরে, আদালত সেই মামলার রায় দেন। সাজা হয় দেড় বছরের কারাদণ্ড।

“ভারত মূলত বাংলাদেশে পাচারের উদ্দেশ্য মাথায় রেখেই ফেনসিডিল উৎপাদন করে”

১০২ জনের মধ্যে একজন এই রায়ের আগেই মারা যান। রায় ঘোষণার সময় আদালতের কাঠগড়ায় ছিলেন মাত্র ১৮ জন আসামি, বাকি ৮২ জন আসামি ততদিনে গা ঢাকা দিয়েছেন, আদালতে হাজিরই হননি। পলাতক  আসামিদের মধ্যে ছিলেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির চার ভাই আবদুল শুক্কুর, আবদুল আমিন ওরফে আমিনুল ইসলাম, মো. ফয়সাল, শফিকুল ইসলাম, চাচাতো ভাই মো. আলম, খালাতো ভাই মং মং সিং, ফুপাতো ভাই কামরুল ইসলাম, ভাগনে সাহেদুর রহমান নিপুসহ অন্তত ১২ জন নিকটাত্মীয়। 

এই একটা ঘটনায় গোটা সিস্টেমের প্রতিকৃতি আঁকা যায়। মাদক এখানে আসে, ধরা পড়ে, মঞ্চস্থ হয়, তারপর আবার আসে। প্রশ্নটা তাই “মাদক কেন থামে না” না। প্রশ্নটা হলো, কোন কোন হাত বদলের মধ্য দিয়ে এই জিনিসটা সীমান্তের ওপার থেকে ঢাকার একটা বহুতল ভবনের এগারো তলায় পৌঁছায়।

এক নদী, তেত্রিশটা দরজা

নাফ নদী মোটে দুশো ফুট চওড়া কোথাও কোথাও। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সরকারি বাহিনী আর আরাকান আর্মির লড়াই যত তীব্র হয়েছে, তত বেশি অস্ত্র কেনার টাকা দরকার হয়েছে বিদ্রোহীদের, আর সেই টাকার একটা বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি প্রতিবেদন বলছে, মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের জন্য মিয়ানমারে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র কেনার জন্য টাকা দরকার। সেই টাকা জোগাড় করতে এপারে বাংলাদেশ সীমান্তে থাকা রোহিঙ্গা ও দেশি মাদক কারবারিদের কাছে অল্প দামে বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি করছে তারা। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়ার সঙ্গে দেশে মাদকের চালান পাচারও বাড়ছে।

কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া আর বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে অন্তত  তেত্রিশটি পয়েন্ট চিহ্নিত হয়েছে যেখান দিয়ে নিয়মিত ইয়াবা আর ক্রিস্টাল মেথ ঢোকে, শাহপরীর দ্বীপ থেকে শুরু করে তমব্রু পর্যন্ত, নামগুলো এতটাই নির্দিষ্ট আর পুনরাবৃত্ত যে সীমান্তরক্ষীদের কাছেও এগুলো এখন রুটিন ভূগোল।

আর ২০১৭ সালে যখন সরকার নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছিল, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ আর মাদক ঠেকাতে, তখন একটা মজার জিনিস ঘটেছিল। প্রায় আট বছর পর, ২০২৫ এর ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্টের আদেশে যখন আবার মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হলো, জেলে নৌকাগুলো ফিরল বটে, কিন্তু তাদের সঙ্গে ফিরল আরেকটা পুরনো পরিচিত অতিথি। মাছ ধরার নৌকা, ছদ্মবেশ হিসেবে এর চেয়ে নিখুঁত কিছু হয় না। বিজিবি নিজেই বলেছে, একটা সন্দেহজনক মাছ ধরার নৌকা যখন সীমান্তরেখা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকেছিল, ধাওয়া খেয়ে আরোহীরা সাঁতরে মিয়ানমারে ফিরে চলে যায়।

রুট বদলায়, ব্যবসা বদলায় না

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বাড়লে চোরাকারবারিরা যা করে, তা প্রায় যেকোনো বাজার অর্থনীতির মতোই যুক্তিসংগত। তারা সরবরাহ পথ পাল্টায়। কক্সবাজারে প্রথম ক্রিস্টাল মেথের চালান ধরা পড়েছিল ২০২১ সালে, তারপর থেকে সেই “আইস”-এর প্রবাহ কমেনি, বেড়েছে বরং। লাখের বেশি ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে, আটকও হয়েছে অনেক মাদক পাচারকারী। কিন্তু মূলহোতারা প্রায় সবসময় অধরা থেকে যায়, কারণ তারা এখন আর নিজে হাতে সীমান্ত পাড়ি দেয় না, বরং বড় চালান নৌপথে সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে, বাংলাদেশের জলসীমানার বাইরে বঙ্গোপসাগরে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে কোনো টহল পৌঁছায় না, তারপর সুবিধামতো সময়ে কক্সবাজার, বাঁশখালী, মহেশখালী, এমনকি পটুয়াখালী-কুয়াকাটা পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া হয়। নিরাপত্তা বাহিনী নিজেরাই এখন সরকারের কাছে সমুদ্রপথে টহলচৌকি বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যেটা বলে দেয় স্থলসীমান্তে যতটুকু সাফল্য এসেছে, সমুদ্র ততটাই ফাঁকা রয়ে গেছে।

এই সরবরাহ শৃঙ্খলার সবচেয়ে দুর্বল আর সবচেয়ে অরক্ষিত অংশটা হলো বাহক। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে বসবাসের বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও এক তরুণ দীর্ঘদিন ধরে নাফ নদী পেরিয়ে ইয়াবা আনা-নেওয়া করছিলেন, শেষ পর্যন্ত এক লাখ বড়ি আর একটা এলজি বন্দুকসহ ধরা পড়ে। এই ধরনের গল্পে একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট, চালানের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশটুকু বহন করেন যারা, তারা প্রায়ই সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষ, রোহিঙ্গা শরণার্থী কিংবা টেকনাফের দরিদ্র জেলে পরিবারের সন্তান, যাদের কাছে কয়েক হাজার টাকার বিনিময়ে একটা বস্তা বহন করাটা জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার মতোই স্বাভাবিক একটা লেনদেন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

টাকাটা কোথায় যায়? এবং যে হিসাব মেলে না

মাদকের গল্পে সবচেয়ে কম আলোচিত চরিত্রটা হলো টাকা। ইয়াবা কেনার অর্থ মিয়ানমারের কারবারিদের কাছে পৌঁছাতে হয় আগেভাগে, নগদে নয়, হুন্ডির মাধ্যমে। কক্সবাজার জেলা পুলিশ টেকনাফে বাইশজন হুন্ডি ব্যবসায়ীর সন্ধান পায়, যাদের একজন দুবাইয়ে বসে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছিলেন, বাকিরা দুবাই, সিঙ্গাপুর আর ভারতের মধ্যে টাকা সরাচ্ছিলেন। এই একটা তথ্যই বলে দেয়, ইয়াবা যত না মাদক পাচারের গল্প, তার চেয়ে বেশি একটা সমান্তরাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার গল্প, যেখানে সীমান্তের ওপার-এপার আর দুবাই-সিঙ্গাপুরের হিসাবরক্ষণ একসঙ্গে চলে, কাগজ ছাড়াই, বিশ্বাসের ওপর ভর করে।

আর সেই তালিকায় যে নামটা বারবার ফিরে আসে, সেটা টেকনাফের সাবেক একজন সংসদ সদস্যের, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইয়াবা কারবারিদের তালিকায় যার ভাই, চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই, ফুফাতো ভাই, এমনকি ভাগনের নামও ছিল। ২০১৮-১৯ সালের সেই তালিকায় কক্সবাজার জেলাতেই এক হাজার একশো একান্নজন মাদক ব্যবসায়ীর নাম উঠে, তার মধ্যে তিয়াত্তরজনকে চিহ্নিত করা হয়েছিল “গডফাদার” হিসেবে, ছেষট্টিজনই টেকনাফের বাসিন্দা। রাজনীতি আর মাদক অর্থনীতির যে দূরত্বটা আমরা সাধারণত কল্পনা করি, বাস্তবে সেটা প্রায় শূন্য। স্থানীয় ইউপি সদস্য, পৌরসভার কাউন্সিলর, উপজেলা রাজনৈতিক দলের নেতার আত্মীয়, সবাই একই তালিকায়। এমনকি আত্মসমর্পণ করা কারবারিদের মধ্যে বত্রিশজন পরের ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন, একজন তো চেয়ারম্যান পদেও জিতেছিলেন। এই বৃত্তটা তাই আর সরল অপরাধ-শাস্তির কাঠামোয় পড়ে না, এটা স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরকার একটা অলিখিত চুক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১৮ সালের মে মাস থেকে যখন সারাদেশে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হয়, তখন একটা শব্দ বাংলাদেশের সংবাদপত্রের নিয়মিত অতিথি হয়ে ওঠে, “বন্দুকযুদ্ধ”। সেই বছরই সারাদেশে প্রায় চারশো মাদক ব্যবসায়ী নিহত হন কথিত বন্দুকযুদ্ধে, শুধু কক্সবাজার জেলাতেই চুয়াল্লিশজন, তার মধ্যে চল্লিশজনই টেকনাফের। যে হিসাবটা কখনো মেলে না, সেটা হলো, যারা মারা যান তারা প্রায় সবাই নিচের ধাপের মানুষ, বাহক আর খুচরা বিক্রেতা, আর যারা শৃঙ্খলের ওপরের ধাপে টাকা আর সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করেন, তারা আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে থাকেন, প্রায়শই জামিনে।

পশ্চিম সীমান্তের নীরব প্রতিবেশী

মিয়ানমার সীমান্তের কোলাহলের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায় আরেকটা সীমান্ত, যেটা কম আলোচিত কিন্তু সমান নিয়মিত। রাজশাহীর চারঘাট আর বাঘা উপজেলার পদ্মাপাড়ে, জয়পুরহাটের চেঁচড়ায়, বেনাপোলের পুটখালীতে, প্রতি রাতে ভারত থেকে ফেনসিডিল ঢোকে, কখনো বোতলে, কখনো এখন কৌশল পাল্টে দশ লিটারের জারে তরল কোডিন হিসেবে, সীমান্তের এপারে নেমে তারপর বোতলজাত হয়, পুরনো বোতল আর নতুন লেবেল দিয়ে, যাতে রাস্তার ধারে খালি বোতল পড়ে থাকতে না দেখা যায় এবং অভিযানকারীদের চোখে সহজে না পড়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী নিজেই গত বছর সরাসরি বলেছেন, ভারত মূলত বাংলাদেশে পাচারের উদ্দেশ্য মাথায় রেখেই ফেনসিডিল উৎপাদন করে, যদিও এটা একজন কূটনীতিকসুলভ ভাষায় বলা এক ধরনের অভিযোগ, প্রমাণ নয়, তবু এটা বলে দেয় সরকারি পর্যায়েও এই ধারণাটা কতটা প্রতিষ্ঠিত। সীমান্তের ওপারে নদীয়ায় সম্প্রতি মাটির নিচে পনেরো ফুট গভীর বাংকার পাওয়া গেছে, ফেনসিডিলের বোতলে ঠাসা, যেটা বিএসএফ নিজেই স্বীকার করেছে এত কাছাকাছি অবস্থানে কীভাবে তৈরি হলো তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা তাদের কাছেও নেই।

হাতে হাতে মৃত্যু

সীমান্ত পেরিয়ে একবার দেশের ভেতর ঢুকলে, বিতরণ ব্যবস্থাটা মূলত একটা পিরামিড, যা বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটা পাইকারি বাণিজ্যের মতোই কাজ করে, শুধু পণ্যটা বেআইনি বলে প্রতিটা স্তরে ঝুঁকির প্রিমিয়াম যোগ হয়। সীমান্তের কাছের আড়তদার বড় চালান ছোট ছোট ভাগে ভাঙেন, আঞ্চলিক পরিবেশক সেগুলো ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরে পাঠান, সেখান থেকে খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে পৌঁছায় সেবনকারীর কাছে

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিয়মিত হালনাগাদ থেকে দেখা যায়, ঢাকার প্রায় প্রতিটা সার্কেলে প্রতিদিনই ছোট আকারের উদ্ধার আর গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে, ইয়াবা থেকে গাঁজা থেকে হেরোইন পর্যন্ত। এই দৈনন্দিনতাটাই আসলে সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য, কারণ প্রতিটা ছোট গ্রেপ্তার একটা সাফল্যের সংবাদ হয়ে প্রকাশ পায়, অথচ পুরো শৃঙ্খলটা প্রতিদিনই অক্ষত থাকে, কারণ ধরা পড়ে তারাই যারা সবচেয়ে সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য।

সমাধান হবে কী?

তাহলে বাংলাদেশে মাদক কেন থামে না, এই প্রশ্নের একটা উত্তর দাঁড় করানো যায় কিছুটা এভাবে। উৎসস্থলে দুটো প্রতিবেশী দেশ, একটাতে গৃহযুদ্ধ চলছে বলে অস্ত্রের টাকা দরকার, আরেকটাতে সীমান্তবর্তী অবৈধ কারখানাগুলো বন্ধ করার রাজনৈতিক ইচ্ছা যথেষ্ট জোরালো নয়। মাঝখানে একটা প্রায় অরক্ষিত সমুদ্রসীমা, যেখানে টহল নাই। বিতরণ ব্যবস্থার প্রতিটা স্তরে স্থানীয় রাজনীতি আর প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশের এত দীর্ঘ ইতিহাস যে “গডফাদার” শব্দটা এখন প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক একটা পরিভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সবচেয়ে ওপরে টাকা, যেটা হুন্ডির মাধ্যমে সীমান্ত আর মহাদেশ পেরিয়ে অবাধে চলাচল করে, প্রায় কোনো ব্যাংকিং ব্যবস্থার নজরদারি ছাড়াই।

টেকনাফ পাইলট স্কুলের সেই মাঠে যে একশো দুইজন মানুষ ২০১৯ সালের সেই সকালে ইয়াবা জমা দিয়েছিলেন, তাদের একজন পরে হাসপাতালে মারা যান, বাকিরা প্রায় সবাই জামিনে মুক্ত, কেউ কেউ আবার পুরনো ব্যবসায় ফিরেছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ, আর দুর্নীতি দমন কমিশন কুড়ি মাসেও তাদের অবৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে একটা মামলাও করতে পারেনি। মাঠটা এখন হয়তো ফাঁকা আছে পড়ে, ঘাস গজিয়েছে আবার। কিন্তু নাফ নদীর ওপারে, প্রতি রাতে, একই কাজ চলছে, চলছে বারংবার। শুধু বদলেছে নৌকার রঙ, বদলেছে রুট,  মুখগুলো হয়তোবা নতুন। তবে ব্যবসাটা বদলায়নি আজো। ◼

সম্পাদকীয় নোট: এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে নেয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট পাচার কৌশল বা যোগাযোগের বিস্তারিত এখানে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, কারণ প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য ব্যবস্থাটা বোঝানো, কাউকে নতুন পথ দেখানো নয়।


Picture of দ্য পাবলিশ

দ্য পাবলিশ

অনুসন্ধান, গল্প, প্রবন্ধ ও মুক্তচিন্তার স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম।
শেয়ার করুন

পড়তে পারেন

পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইটে লাখ লাখ হামলার চেষ্টা। ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

প্যারিসের শহরতলির এক স্কুলের ফাঁকা পদ থেকে শুরু হয়ে এক মাসে সারা দেশ। এই আন্দোলনের মুখ কারা এবং কেন।

দ্য পাবলিশ

ভারতে বাড়ছে তরুণদের ক্ষোভ, রাস্তায় নামছেন বিরোধীরা। তবু বাংলাদেশের জুলাইয়ের সঙ্গে ভারতের আন্দোলনের দূরত্ব কতটা এবং কেন?

দ্য পাবলিশ

Scroll to Top