চৌদ্দ বছরের গৃহযুদ্ধ শেষে সিরিয়ার একটি আদালত অবশেষে সেই রায় দিল, যার জন্য হাজারো পরিবার বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছে। মঙ্গলবার দামেস্কের ফৌজদারি আদালত সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ, তাঁর ছোট ভাই মাহের আল-আসাদ এবং চাচাতো ভাই আতেফ নাজিবকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তিনজনই পূর্ব-পরিকল্পিত হত্যা, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বাশার আল-আসাদ এখন রাশিয়ায় নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। মাহেরও মস্কোয়। দুজনকেই অনুপস্থিতিতে বিচার করা হয়েছে, তাই আদালতের রায় তাঁদের কাছে পৌঁছাবে কেবল কাগজে। কিন্তু আতেফ নাজিবের ক্ষেত্রে দৃশ্যটা ছিল ভিন্ন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সিরীয় কর্তৃপক্ষের হাতে আটক নাজিব বন্দির পোশাক পরে খাঁচার ভেতর দাঁড়িয়ে শুনেছেন নিজের মৃত্যুদণ্ডের রায়।
নাজিবের নাম ইতিহাসে খোদাই হয়ে আছে অন্য কারণে। দক্ষিণ সিরিয়ার দারা প্রদেশে রাজনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান থাকাকালীন ২০১১ সালে তিনিই বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সেই রক্তক্ষয়ী দমননীতির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা পরে গোটা দেশকে গৃহযুদ্ধে ঠেলে দেয়। আদালতের ভাষায়, তাঁর অপরাধের তালিকায় আছে হত্যা, পনেরো বছরের কম বয়সী শিশুদের ইচ্ছাকৃত হত্যা এবং নির্যাতনজনিত মৃত্যু। বিচারক ফখরুদ্দিন আল-আরিয়ান বলেছেন, নাজিব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং কোনো অনুশোচনা দেখাননি।
মাহের আল-আসাদকে পূর্ব-পরিকল্পিত হত্যা ও নির্যাতনের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফাহদ আল-ফ্রেইজ এবং ২০১১ সালে দারায় সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান লুয়াই আল-আলিসহ পলাতক আরও কয়েকজন সাবেক সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকেও অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত শুনানিতে বিচারক বলেন, বাশার আসাদ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছেন যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে সাবেক প্রেসিডেন্টের ভূমিকাই ছিল এসব অপরাধের মূলে।
এই রায় তাৎপর্যপূর্ণ আরেকটি কারণে। আসাদ-উত্তর অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ এ বছর থেকে সাবেক সরকারের ব্যক্তিদের বিচার শুরু করেছে, আর এটাই তার প্রথম চূড়ান্ত রায়। রায় ঘোষণার পর দামেস্কের আদালত ভবনের বাইরে জড়ো হন বহু মানুষ, কারও হাতে ছিল নির্যাতনে নিহতদের ছবি। আল জাজিরার প্রতিবেদক ওবাইদা হিত্তো দামেস্ক থেকে জানান, এই রায় সিরীয় জনগণের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে এবং তাদের নিরাময় প্রক্রিয়ায় অবদান রাখবে। তাঁর ভাষায়, এটি এমন কিছু যার জন্য মানুষ দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছে।
হিত্তো আরও বলেন, এই রায় ভবিষ্যতে অন্য অভিযুক্তদের বিচারের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি নজির স্থাপন করবে। আল জাজিরার আরেক প্রতিবেদক ওসামা বিন জাভায়েদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সিরিয়ার শহরে শহরে মানুষ কেবল আসাদের জন্য নয়, তাঁর অধীনে কাজ করা প্রত্যেক দণ্ডকর্তার জন্যও ন্যায়বিচার খুঁজছে।
তবে সাজা কার্যকর করার পথ মসৃণ নয়। দামেস্ক বারবার রাশিয়ার কাছে বাশার আল-আসাদকে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে। মস্কোর দীর্ঘদিনের এই মিত্র এখন রুশ রাজধানীতে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন বলে জানা যায়। সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা সত্ত্বেও রাশিয়া এখনো আসাদকে ফেরত পাঠাতে রাজি হয়নি, যাঁকে তারা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিল। হিত্তোর মতে, দুই দেশের মধ্যে বড় কোনো রাজনৈতিক অগ্রগতি না ঘটলে মস্কো তার অবস্থান পাল্টাবে বলে মনে হয় না।
তবে সব দরজা বন্ধ নয়। আসাদ আমলের কিছু কর্মকর্তা এখন লেবাননে অবস্থান করছেন, আর সিরীয় সরকার লেবানিজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে তাঁদের চিহ্নিত করে ফিরিয়ে আনতে। যেসব দেশে আসাদ-আমলের কাঙ্ক্ষিত কর্মকর্তারা লুকিয়ে আছেন বা আটক অবস্থায় আছেন, দামেস্ক তাদের সিরিয়ায় ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে।