মাটির নিচে তিরিশ বছর

চে গুয়েভারাকে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। তারপর তাঁর দেহ লুকিয়ে রাখা হয়, পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু চিন্তাকে কি আর কবর দেওয়া যায়।

● কাজী সাঈদ মাহমুদ

আগস্ট ১২, ২০২৬

মাটির নিচে তিরিশ বছর The Pubish

ইলাস্ট্রেশন : মাহমুদ / দ্য পাবলিশ / ছবি : গেটি, পা. ডো.


সান আন্তোনিও দে লস বাইনোসের বিমানবন্দর, ১২ জুলাই ১৯৯৭। একটি সামরিক বিমান নামল হাভানার উপকণ্ঠে। ভেতরে ছিল কাঠের একটি বাক্স, আর তার ভেতরে হাড়। একটি অসম্পূর্ণ কঙ্কাল, যার দুটো হাত নেই। তিরিশ বছর আগে বলিভিয়ার একটি স্কুলঘরে যে মানুষটিকে গুলি করে মারা হয়েছিল, এই হাড়গুলো তারই বলে দাবি করেছিলেন কিউবান ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। রানওয়েতে দাঁড়িয়ে ছিলেন সত্তর বছর বয়সী এক ব্যক্তি, যিনি তখনও কিউবার রাষ্ট্রপ্রধান। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছিল এই দৃশ্য, লাখো কিউবান দেখছিল ঘরে বসে।

এই মুহূর্তটাকে যদি আমরা কাহিনীর কেন্দ্রে বসাই। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, রানওয়েতে দাঁড়িয়ে ফিদেল কাস্ত্রো তখন কী দেখছিলেন? একজন পুরনো বন্ধুকে? একটি রাষ্ট্রীয় প্রতীককে? নাকি নিজের যৌবনের একটি টুকরোকে, যা মাটির নিচে পচে গিয়েছিল অথচ রাজনৈতিকভাবে কখনো মরেনি? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। আর এই লেখার উদ্দেশ্যও কোনো সহজ উত্তর দেওয়া নয়। ফিদেল কাস্ত্রো সত্যিই কি “তিরিশ বছর” ধরে চে গুয়েভারাকে “খুঁজেছিলেন,” নাকি ইতিহাসটা তার চেয়ে জটিল এবং রাজনৈতিকভাবে বেশি সাবধানী?

মেক্সিকো সিটির এক রাতে

১৯৫৫ সালের জুলাই। ফিদেল কাস্ত্রো তখন সদ্য কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন। বাতিস্তা সরকার মনকাদা ব্যারাক আক্রমণের দায়ে তাকে পনেরো বছরের সাজা দিয়েছিল, কিন্তু জনরোষের চাপে মাত্র দুই বছরের মাথায় সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। মুক্তির পর ফিদেল মেক্সিকোতে চলে যান, যেখানে তার ভাই রাউল আগে থেকেই নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন। মারিয়া আন্তোনিয়া গনসালেসের এক ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে, এমপারান স্ট্রিটের ৪৯ নম্বর ঠিকানায়, রাউল একদিন ফিদেলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এক তরুণ আর্জেন্টাইন চিকিৎসকের। এর্নেস্তো গুয়েভারা। এই সাক্ষাতের সঠিক তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে সামান্য মতভেদ আছে। কেউ বলেন জুলাইয়ের মাঝামাঝি, কেউ ১৯ জুলাই, কিন্তু মাস ও বছর নিয়ে কোনো বিতর্ক নাই।

চে নিজে পরে লিখেছিলেন, সেই রাতে রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে বলতে ভোর হয়ে গিয়েছিল, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভবিষ্যৎ অভিযানের একজন সদস্য। জন লি অ্যান্ডারসনের জীবনীগ্রন্থ অনুযায়ী, সেই রাতেই আলাপের পর ফিদেল ও রাউলের সঙ্গে একসাথে রাতের খাবার খেতে যান চে, আর কয়েক ঘণ্টা পরেই ফিদেলের আমন্ত্রণে যোগ দেন বিপ্লবী বাহিনীতে।

এই মুহূর্তটাকে বিশুদ্ধ রোমান্স হিসেবে দেখলে ভুল করবেন। চে তখন ইতিমধ্যে গুয়াতেমালায় জেকব আরবেনসের সমাজতান্ত্রিক সরকারের পতন প্রত্যক্ষ করেছেন, সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের তিক্ততা তার মধ্যে গেঁথে আছে। ফিদেলের আদর্শিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিগত সাহস তাকে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু এই মুগ্ধতা রাজনৈতিক ছিল ঠিক যতটা ব্যক্তিগত। চে-র নিজের কথানুযায়ী, ফিদেলকে তার মনে হয়েছিল এক অসাধারণ মানুষ, যিনি অসম্ভবকে জয় করবেন বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। ১৯৫৬ সালের নভেম্বরে বাহাত্তর জন বিপ্লবী “গ্রানমা” নামের একটি ছোট নৌযানে চড়ে মেক্সিকো থেকে কিউবার উপকূলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। চে তাদেরই একজন। অবতরণের পরপরই বাতিস্তার সেনাবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে দলটি প্রায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। বেঁচে থাকা অল্প কয়েকজন সিয়েরা মায়েস্ত্রার পাহাড়ে আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকেই শুরু হয় দুই বছরের গেরিলা যুদ্ধ।

হানিমুন সফরে চিচেন ইৎজায় প্রথম স্ত্রী হিল্ডা গাদেয়ার সাথে গুয়েভারা। ছবি : পাবলিক ডোমেইন

এই সময়ে চে শুধু যোদ্ধা ছিলেন না। তার ভূমিকা ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছিল, চিকিৎসক থেকে সামরিক কমান্ডার পর্যন্ত। ১৯৫৮ সালের শেষদিকে চে একটি স্বতন্ত্র কলাম নিয়ে লাস ভিয়াসের দিকে অগ্রসর হন এবং সান্তা ক্লারা শহরে বাতিস্তা বাহিনীর একটি সাঁজোয়া ট্রেন দখল করে নেন। ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি বাতিস্তা কিউবা ছেড়ে পালিয়ে যান। হাভানায় প্রবেশের পর দেওয়া এক ভাষণে ফিদেল নিজেই বলেন যে, যুদ্ধের শুরুতে চে-র সামরিক অভিজ্ঞতা প্রায় শূন্য ছিল। মেক্সিকোতে চে-র কাজ ছিল গবেষণাগারে খরগোশ ব্যবচ্ছেদ করা। অথচ যুদ্ধের মধ্য দিয়েই চে হয়ে ওঠেন এমন একজন সেনানায়ক, যার নেতৃত্বে কেউ প্রশ্ন তোলেনি।

বিপ্লবের পর চে একে একে দায়িত্ব পান জাতীয় ব্যাংকের সভাপতির এবং তারপর শিল্পমন্ত্রীর। তিনি কিউবার অর্থনীতিকে সোভিয়েত মডেলের চেয়েও কেন্দ্রীভূত, নৈতিক প্রণোদনা-নির্ভর একটি সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর দিকে নিতে চেয়েছিলেন। বাজারভিত্তিক প্রণোদনার বদলে “নতুন মানুষ” গড়ার আদর্শবাদী প্রকল্প। এই অবস্থান কিউবার মধ্যেই বিতর্কের জন্ম দেয়, বিশেষত সোভিয়েতপন্থী অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে। একই সময়ে চে আন্তর্জাতিকতাবাদী রাজনীতিতে ক্রমশ ঝুঁকে পড়ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি বিপ্লব বিচ্ছিন্নভাবে টিকে থাকতে পারে না। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশে থাকা একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের বিপ্লব। এই বিশ্বাস থেকেই কঙ্গোয় এবং পরে বলিভিয়ায় তার যাত্রার বীজ বোনা হয়। ফিদেলের সঙ্গে তার সম্পর্কে তখনও প্রকাশ্য দূরত্ব তৈরি হয়নি, কিন্তু অর্থনৈতিক নীতি ও আন্তর্জাতিক কৌশল নিয়ে দুজনের চিন্তাধারায় ফাটল স্পষ্ট হতে শুরু করে।

বিদায়, প্রিয়

১৯৬৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকা সফর থেকে ফেরার পর চে জনসমক্ষ থেকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান। সরকারি কোনো নোটিশ ছাড়াই। কিউবার ভেতরে ও বাইরে গুজব ছড়াতে থাকে, চে কি অসুস্থ? ফিদেলের সঙ্গে কি তার সংঘাত হয়েছে?

১৯৬৫ সালের ১ এপ্রিল। চে একটি চিঠি লেখেন ফিদেলকে, যদিও চিঠির উপরে কোনো তারিখ ছিল না। শুধু লেখা ছিল “হাভানা, কৃষির বছর।” ছয় মাস পরে, ১৯৬৫ সালের ৩ অক্টোবর, ফিদেল কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সামনে, ক্যামেরার সামনে, প্রকাশ্যে এই চিঠি পড়ে শোনান। একই অনুষ্ঠানে যেখানে ঘোষণা করা হয় পার্টির নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির নাম। তখনও চে জীবিত এবং তখনও তিনি কঙ্গোতে যাননি বা বলিভিয়ায় পৌঁছাননি।

ফিদেল কাস্ত্রোর কাছে চে-র বিদায়ী চিঠি। ছবি : মার্ক্সিস্ট

চিঠির ভাষা ছিল আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের ভাষা। চে লিখেছিলেন, তিনি পার্টির নেতৃত্ব থেকে, মন্ত্রীর পদ থেকে, মেজর পদমর্যাদা থেকে, এমনকি কিউবার নাগরিকত্ব থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়াচ্ছেন। শুধু এমন এক বন্ধন ছাড়া, যা আইন দিয়ে বাঁধা যায় না। তিনি স্বীকার করেন, শুরুর দিকে ফিদেলের নেতৃত্বের গুণাবলিকে যথেষ্ট দ্রুত বিশ্বাস করতে না পারাটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় ঘাটতি।

এই চিঠিকে নিছক আবেগঘন বিদায় বলে পড়াটা ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক দলিল। যা গুজবের জবাব দেয়, চে-র “বিশুদ্ধিকরণ” নয় বরং তার স্বেচ্ছা-প্রস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করে, এবং ফিদেলের নেতৃত্বকে প্রকাশ্যে বৈধতা দেয়। সে রাতে ফিদেল দৃশ্যত আবেগাপ্লুত ছিলেন বলে সমকালীন বিবরণে উঠে এসেছে

চিঠি প্রকাশের পর চে প্রথমে কঙ্গোতে যান, যেখানে তার অভিযান ব্যর্থ হয়। এরপর ছদ্মবেশে, একটি উরুগুয়ান অর্থনীতিবিদের ভুয়া পরিচয়ে, ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে তিনি বলিভিয়ায় প্রবেশ করেন। উদ্দেশ্য ছিল একটি গেরিলা কেন্দ্র তৈরি করা, যা থেকে সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়ে বিপ্লব ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।

কিন্তু বলিভিয়ায় বাস্তবতা তার পরিকল্পনার চেয়ে অনেক জালেম প্রমাণিত হয়। স্থানীয় কৃষকরা, যাদের সমর্থনের ওপর গেরিলা যুদ্ধ নির্ভর করে। তারা চে-র বাহিনীতে যোগ দেননি; অনেকে তো সেনাবাহিনীকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। বলিভিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি, বিশেষত এর নেতা মারিও মন্খে, প্রতিশ্রুত সহযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ বলিভিয়ার সেনাবাহিনীকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত একটি র‌্যাঞ্জার ব্যাটালিয়ন তৈরি করতে সহায়তা করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন কিউবান-আমেরিকান সিআইএ কর্মকর্তা ফেলিক্স রদ্রিগেজ। মাসের পর মাস চে-র দল ক্ষুধা, রোগ আর ক্রমাগত সামরিক চাপে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। ১৯৬৭ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ইউরো গিরিখাতে (Quebrada del Yuro) বলিভিয়ার সেনাবাহিনী দলটিকে ঘিরে ফেলে

অক্টোবরের ৮ তারিখ, ইউরো গিরিখাতে এক সংঘর্ষের পর কমান্ডার গ্যারি প্রাদো সালমনের নেতৃত্বাধীন বলিভিয়ান সেনাদলের কাছে আহত অবস্থায় চে আত্মসমর্পণ করেন। তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় কাছের লা ইগেরা গ্রামের একটি ছোট স্কুলঘরে। রাতভর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, যদিও তিনি কার্যকর কোনো তথ্য দেননি বলে জানা যায়। প্রাদো প্রাথমিকভাবে চে-কে সামরিক আদালতে বিচারের জন্য পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট রেনে বারিয়েন্তোস সরাসরি নির্দেশ দেন। বিচার নয়, তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড। এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি ছিল স্পষ্ট। জীবিত চে একজন রাজনৈতিক বন্দি হয়ে উঠতে পারতেন, আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও সংহতি আকর্ষণ করতে পারতেন। মৃত চে-কে “যুদ্ধে নিহত” বলে দেখানো অনেকটা সহজ ছিল।

হাসপাতালের লন্ড্রিতে চে’র মরদেহ। মাটিতে ফেলে রাখা নিহত অন্য গেরিলা যোদ্ধাদের মরদেহও দেখা যাচ্ছে। ছবি: এএফপি

পরদিন, ৯ অক্টোবর সকালে। স্থানীয় সময় বেলা এগারোটা থেকে দুপুর একটার মধ্যে (এই সময় নিয়েও সূত্রভেদে সামান্য পার্থক্য আছে) সার্জেন্ট মারিও তেরান স্কুলঘরে প্রবেশ করেন। তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল গলার নিচে গুলি করতে, যাতে মনে হয় চে যুদ্ধেই মারা গেছেন। চে’র ওপর কতটি গুলি চালানো হয়েছিল, তার সঠিক তথ্য জানা যায়নি। কোথাও ছয়, কোথাও সাত, আবার কোথাও নয়টি গুলির কথা বলা হয়েছে। তবে, যা নিশ্চিতভাবে জানা যায় তা হলো। গুলি বুক, বাহু ও পায়ে লেগেছিল। চে বয়স তখন উনচল্লিশ।

মৃত্যুর পর দেহ হেলিকপ্টারে করে ভায়্যেগ্রান্দে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তারপর সেখানকার নুয়েস্ত্রা সেনিয়োরা দে মাল্টা হাসপাতালের লন্ড্রি ঘরে জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়। সাংবাদিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য। এই ছবিগুলোই পরে চে-কে এক ধরনের ক্রুশবিদ্ধ শহীদের প্রতিমূর্তি করে তোলে বিশ্বজুড়ে। আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য তার দুই হাত কেটে নেওয়া হয় এবং আর্জেন্টিনার নথির সঙ্গে মেলানোর জন্য পাঠানো হয়।

চে-র মৃত্যুর পরে

পরদিন, ১০ অক্টোবর রাতে বলিভিয়ার সেনাবাহিনী হাসপাতালের প্রদর্শনী বন্ধ করে দেয় এবং দেহগুলো “অদৃশ্য” করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের যুক্তি ছিল রাজনৈতিক গণনা। চে’র কবরকে ঘিরে হয়ে উঠতে পারত তীর্থস্থান, শ্রদ্ধা জানানোর জায়গা, কিংবা হতে পারত প্রতিরোধের প্রতীক। কবরহীনতা সেই সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করে দেয়, হোক না সেটা স্বল্পমেয়াদেই। তাই, ভায়্যেগ্রান্দে বিমানবন্দরের রানওয়ের প্রান্তে বুলডোজার দিয়ে খোঁড়া একটি গর্তে চে ও তার ছয়জন সহযোদ্ধার দেহ সমাহিত করা হয় (যদিও এই “একই গর্তে” দাফনের দাবিটি নিয়েও পরে বিতর্ক তৈরি হয়, সেটা আলোচনা করছি পরে)। এই কাজে যুক্ত ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল আন্দ্রেস সেলিচ। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে এই স্থানের অবস্থান সরকারিভাবে গোপন ছিল

বলা যায়, এই কবরহীনতাই বিদ্রূপাত্মকভাবে চে-কে পরিণত করে এক অর্থে চিরস্থায়ী প্রতীকে। শরীর নেই, তাই সমাধিও নেই যেখানে ইতিহাস থেমে যেতে পারে। বলিভিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম লা ইগেরায় স্থানীয় বাসিন্দারা চে-কে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী “সান আর্নেস্তো দে লা ইগেরা” নামে ডাকতে শুরু করেন। চে-র মৃত্যুর খবর হাভানায় পৌঁছানোর পর ফিদেল প্রথমে জনসমক্ষে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দেন, এবং ১৮ অক্টোবর ১৯৬৭ অর্থাৎ মৃত্যুর মাত্র নয় দিন পর, প্লাজা দে লা রেভলুসিওনে একটি দীর্ঘ স্মারক ভাষণ দেন। এই ভাষণের পূর্ণ পাঠ এখনও সংরক্ষিত আছে এবং এটি আমাদের কাছে ফিদেলের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিলও বটে।

ফিদেল সেই ভাষণে চে-কে বর্ণনা করেন এক অসাধারণ যুদ্ধশিল্পী হিসেবে। যিনি সিয়েরা মায়েস্ত্রা থেকে সান্তা ক্লারা পর্যন্ত এমন সব সামরিক কীর্তি রচনা করেছিলেন, যা ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়। তিনি বলেন, শত্রুরা ভুল করছে যদি তারা মনে করে চে-র মৃত্যুতে তার চিন্তা বা কৌশলও পরাজিত হয়েছে। ভাষণের শেষদিকে ফিদেল কিউবার তরুণদের উদ্দেশে যে আহ্বান জানান, তা পরবর্তীতে কিউবার স্কুলগুলোর প্রতিদিনের প্রতিজ্ঞাবাক্যে পরিণত হয়, “চে-র মতো হও।”

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ভাষণে ফিদেল ব্যক্তিগত শোকের ভাষা ব্যবহার করেননি। কোনো কান্না, কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয় যা রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে যায়। বরং পুরো ভাষণ নির্মিত হয়েছে ইতিহাস, আদর্শ ও উত্তরাধিকারের ভাষায়। এটি আকস্মিক নয়, ফিদেল কখনোই তার ব্যক্তিগত আবেগ প্রকাশ্যে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার মানুষ ছিলেন না। তার শোক প্রকাশ পেয়েছে কাজে। একটি সরকারি বছরকে “বীরত্বপূর্ণ গেরিলার বছর” ঘোষণা করে, লাতিন আমেরিকাজুড়ে বিপ্লবী আন্দোলনকে সমর্থন জুগিয়ে, এবং পরবর্তী দশকগুলোতে প্রতিটি বার্ষিকীতে চে-র নাম উচ্চারণ করে।

কিউবা সরকার বহু বছর ধরে কূটনৈতিক পথে বলিভিয়ার কাছে চে-র দেহাবশেষ ফেরত চাচ্ছিল, কিন্তু এই প্রচেষ্টা ছিল মূলত নীরব, নিম্ন-মাত্রার কূটনৈতিক তৎপরতা। কোনো ধারাবাহিক গোয়েন্দা অভিযান বা প্রকাশ্য অনুসন্ধান ছিল না। ১৯৯৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিউবান কূটনীতিকরা “নীরবে” এই প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, কিন্তু বলিভিয়ার তরফে কার্যত কোনো সাড়া মেলেনি। কিউবা-বলিভিয়া সম্পর্কের স্পর্শকাতরতার কারণে বিষয়টি প্রকাশ্যে তোলাও রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এই আটাশ বছরে বলিভিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে বহুবার। সামরিক স্বৈরশাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটেছে ১৯৮০-র দশকে। প্রতিটি সরকার আমলে চে-র দেহাবশেষের প্রশ্নটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর থেকে গেছে, কারণ যারা দাফনে অংশ নিয়েছিলেন তারা তখনও অনেকে জীবিত এবং প্রভাবশালী সামরিক বৃত্তে সক্রিয়। আটাশ বছরেও কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি, কারণ কোনো বলিভিয়ান সাক্ষী মুখ খোলেননি।

মাটির তলে এক বিদ্রোহী

১৯৯৫ সালে বলিভিয়ায় গনসালো সানচেস দে লোসাদার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায়। সেই বছরই নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিক জন লি অ্যান্ডারসন, যিনি চে-র জীবনী লিখছিলেন। বলিভিয়ার অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মারিও ভার্গাস সালিনাসের সাক্ষাৎকার নেন। ভার্গাস সালিনাস ১৯৬৭ সালে বলিভিয়ার অষ্টম সেনা ডিভিশনের একজন কর্মকর্তা ছিলেন এবং ভাদো দেল ইয়েসোতে গেরিলাদের বিরুদ্ধে অ্যামবুশ পরিচালনা করেছিলেন। ভার্গাস সালিনাস অ্যান্ডারসনকে জানান, চে ও তার সহযোদ্ধাদের দেহ ভায়্যেগ্রান্দে বিমানবন্দরের রানওয়ের নিচে গণকবরে সমাহিত করা হয়েছিল। কেন তিনি আটাশ বছর পর মুখ খুললেন? এই প্রশ্নে তিনি বলেন, এত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর গোপনীয়তা বজায় রাখার আর কোনো অর্থ নাই। তারপর, ১৯৯৫ সালের ২১ নভেম্বর নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত এই প্রতিবেদন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই তথ্য শুধু ভার্গাস সালিনাস একাই দেননি। আরেক অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গ্যারি প্রাদো সালমন, যিনি চে-কে বন্দি করেছিলেন। নিশ্চিত করেন যে চে-কে পাঁচজন সহযোদ্ধার সঙ্গে ভায়্যেগ্রান্দেয় সমাহিত করা হয়। প্রেসিডেন্ট সানচেস দে লোসাদা তাৎক্ষণিকভাবে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন এবং ডিসেম্বরের ১ তারিখ থেকে খননকাজ শুরু হয়।

এখানে একটি বিতর্কিত কথা উল্লেখ না করলে এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ভার্গাস সালিনাস নিজে দাবি করেছিলেন যে চে-কে অন্য সহযোদ্ধাদের থেকে আলাদাভাবে সমাহিত করা হয়েছিল। একই দাবি পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল সেলিচের বিধবার বক্তব্যেও সমর্থিত হয় বলে কিছু সাংবাদিক দাবি করেন। অথচ ১৯৯৭ সালে কিউবান দল যে গণকবর আবিষ্কারের দাবি করে, সেখানে চে-কে ছয়জন সহযোদ্ধার সঙ্গেই একই গর্তে পাওয়া যায় বলে জানানো হয়। এই অসঙ্গতি নিয়ে একটি সমালোচনামূলক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনস্টিটিউট-এ, যেখানে কিছু ফরেনসিক অসংগতির কথাও তোলা হয়েছে। এই সন্দেহবাদী ভাষ্যটি মূলধারার ঐতিহাসিক ঐকমত্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে এবং ব্যাপকভাবে গৃহীত নয়, কিন্তু সৎ সাংবাদিকতার স্বার্থে এই বিতর্কের অস্তিত্ব উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। যাইহোক, মূল ঘটনায় ফিরি।

কমিশন গঠিত হওয়ার পরও অনুসন্ধান সহজ ছিল না। ত্রিশ বছরে বিমানবন্দরের ভূচিত্র বদলে গিয়েছিল, রানওয়ে সম্প্রসারিত হয়েছিল, এবং সঠিক অবস্থান নির্ণয়ে ভূতাত্ত্বিক, ভূ-পদার্থবিদ, এবং প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের প্রায় দুই বছর সময় লাগে। এই কাজে যুক্ত হয় কিউবার ফরেনসিক ইনস্টিটিউট, যার নেতৃত্বে ছিলেন ডা. হোর্হে গনসালেস, এবং আর্জেন্টাইন ফরেনসিক নৃতত্ত্ব দল (EAAF)। ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন সকালে, ভায়্যেগ্রান্দে বিমানবন্দরের পুরনো অংশে একটি গণকবর থেকে সাতটি কঙ্কাল পাওয়া যায়। তাদের একটির হাত ছিল না। কঙ্কালটির সঙ্গে পাওয়া যায় ছেঁড়া জলপাই-সবুজ জ্যাকেটের অংশ এবং চামড়ার বেল্টের টুকরো, যা চে-র মৃত্যুর দিনের পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।

১৯৯৭ সালের ২৮ জুন, একটি গণকবরে সাতটি মানুষের কঙ্কাল পাওয়া যায়, যার মধ্যে একটির হাত ছিল না।

কীভাবে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হলেন যে এই কঙ্কালটিই চে গুয়েভারার? প্রমাণের কার্যক্রম ছিল বহুস্তরীয়, হাত না থাকা (ফিঙ্গারপ্রিন্টের জন্য কেটে নেওয়ার নথিভুক্ত ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ), মাথার খুলির গঠন, উপরের বাম দিকের একটি দাঁতের অনুপস্থিতি (যা চে-র জীবিতকালীন দন্ত-রেকর্ডের সঙ্গে মিলে যায়), হাড়ে গুলির চিহ্ন, এবং সঙ্গে পাওয়া পোশাকের অংশ। প্রবীণ প্রাক্তন গেরিলা যোদ্ধারাও শনাক্তকরণে সহায়ক তথ্য দিয়েছিলেন।

এর পরে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।  হাড় থেকে সংগৃহীত ডিএনএ-র সঙ্গে চে-র জীবিত সন্তানদের ডিএনএ তুলনা করে। এই বিষয়ে একটি সমকক্ষ-পর্যালোচিত (peer-reviewed) গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে শর্ট ট্যান্ডেম রিপিট (STR) ও মাইটোকনড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে পিতৃত্বের সম্ভাবনা নিরানব্বই শতাংশের বেশি নির্ধারিত হয়েছিল বলে জানানো হয়। এটি প্রকৃত অর্থেই বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। কিন্তু আগের পর্বে উল্লেখিত বিতর্কের কথা মাথায় রাখলে বলতে হয়, এই শনাক্তকরণ নিয়ে সংশয় প্রকাশকারী কিছু গবেষক এখনও পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন, যদিও ঐতিহাসিক ও ফরেনসিক মূলধারা এই শনাক্তকরণকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে।

ফিরে এসো হে বিপ্লবী

১২ জুলাই ১৯৯৭। চে’র দেহাবশেষ বহনকারী বিমান হাভানার কাছে সান আন্তোনিও দে লস বাইনোস সামরিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ফিদেল সেই টেলিভিশন-সম্প্রচারিত অনুষ্ঠান স্বয়ং পরিচালনা করেন। এরপর দেহাবশেষ নিয়ে যাওয়া হয় সান্তা ক্লারায়, যেখানে ১৪ অক্টোবর রাতভর প্রকাশ্যে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ দেওয়া হয় জনসাধারণকে। চূড়ান্ত শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয় অক্টোবরের ১৭ তারিখে। কয়েক লক্ষ মানুষ সমবেত হয়েছিলেন সেদিন। স্কুলছাত্রদের একটি সমবেত কণ্ঠ কার্লোস পুয়েবলার লেখা গান “আস্তা সিয়েম্প্রে” গেয়ে ওঠে, আর তারপর বক্তব্য দেন ফিদেল।

সেই ভাষণে ফিদেল বলেছিলেন— তারা এসেছেন চে ও তার বীর সহযোদ্ধাদের বিদায় জানাতে নয়, বরং তাদের গ্রহণ করতে। আরেকটি অংশে তিনি বলেন, চে যে পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতেন, যে পৃথিবীর জন্য বেঁচেছিলেন এবং লড়েছিলেন, একমাত্র সেই পৃথিবীতেই তার জন্য যথেষ্ট জায়গা আছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন তার হত্যাকারীরা ভেবেছিল যে হত্যার মাধ্যমে তাকে যোদ্ধা হিসেবে নিঃশেষ করে দেওয়া যাবে, আজ তিনি প্রতিটি জায়গায় আছেন, যেখানেই ন্যায্য কারণের প্রয়োজন।

এই ভাষণও ১৯৬৭ সালের ভাষণের মতোই রাজনৈতিক ভাষায় নির্মিত, ব্যক্তিগত শোকের ভাষায় নয়। ত্রিশ বছর ব্যবধানে ফিদেলের শব্দচয়নে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন নাই। একই ধরনের প্রতীকী দৃঢ়তা, একই ধরনের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত আবেগ। আর এটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। ফিদেল কাস্ত্রো তার সমগ্র জনজীবনে চে-কে নিয়ে কখনোই ব্যক্তিগত ভাষায় কথা বলেননি। প্রতিবারই তিনি চে-কে রাষ্ট্রের ভাষায়, ইতিহাসের ভাষায় বেঁধেছেন।

সান্তা ক্লারা শহরেই ১৯৫৮ সালের শেষ দিনগুলোয় চে মাত্র তিনশ যোদ্ধা নিয়ে বাতিস্তার সাঁজোয়া বাহিনীকে পরাস্ত করেছিলেন। এমন এক সামরিক কীর্তি, যা বিপ্লবের জয়কে চূড়ান্ত করে দিয়েছিল। চে-কে এখানে সমাহিত করার অর্থ ছিল তাকে তার নিজের সবচেয়ে বড় সামরিক বিজয়ের ভূমিতে ফিরিয়ে আনা। একটি প্রতীকী বৃত্ত সম্পূর্ণ করা। আর্নেস্তো গুয়েভারা স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্সে এখন একটি বাইশ ফুট উঁচু ব্রোঞ্জের মূর্তি আছে, একটি জাদুঘর আছে যেখানে চে-র শৈশবের ইনহেলার থেকে শুরু করে তার পড়া বইপত্র প্রদর্শিত হয়, আর আছে একটি চিরন্তন শিখা, যা ফিদেল নিজে প্রজ্বলিত করেছিলেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে বলিভিয়ায় আরও তেইশটি দেহাবশেষ পাওয়া যায় এবং সেগুলোও পরে এই স্মৃতিসৌধে স্থানান্তরিত হয়। কবরহীন এক বিপ্লবীর অবস্থানই এভাবে রূপান্তরিত হয় রাষ্ট্রীয় তীর্থস্থানে। যে পরিণতি বলিভিয়ার সামরিক বাহিনীরা রুখতে চেয়েছিল, ত্রিশ বছর পর সেটাই ঘটে গেল, আরো বড় আঁকারে।

কিউবায় আসলে কী ফিরেছিল?

একটা প্রশ্ন করা যেতে পারে। ১৯৯৭ সালে কিউবায় আসলে কী ফিরেছিল?। এর উত্তর বুঝতে আরেকটু ঘাটা দরকার। ২০১৬ সালের নভেম্বরে, নব্বই বছর বয়সে ফিদেল কাস্ত্রো মারা যান। তার মৃত্যুর পর কিউবার সরকারি টেলিভিশনে যে ভাষণাংশ বারবার প্রচারিত হয়, তা ছিল ১৯৬৭ সালের সেই পুরনো আহ্বান “চে-র মতো হও।” এখন প্রশ্নে ফিরে আসা যাক। ১৯৯৭ সালে কিউবায় আসলে কী ফিরেছিল?

এটা আক্ষরিক অর্থে একটি অসম্পূর্ণ কঙ্কাল ছিল। হাতবিহীন, তিরিশ বছরের মাটির নিচে থাকা অবস্থায় ক্ষয়প্রাপ্ত। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি ছিল একটি ফরেনসিক শনাক্তকরণের ফল। রাজনৈতিকভাবে এটি ছিল একটি রাষ্ট্রের নিজেকে পুনর্নির্মাণের হাতিয়ার। এমন এক সময়ে, যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবার অর্থনীতি বিপর্যস্ত, এবং বিপ্লবী বৈধতার নতুন উৎসের প্রয়োজন ছিল। সাংস্কৃতিকভাবে এটি ছিল এক বৈশ্বিক আইকনের প্রত্যাবর্তন, যার ছবি ততদিনে টি-শার্ট, পোস্টার আর ছাত্রাবাসের দেয়ালে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন এক প্রতীক, যা কিউবার নিয়ন্ত্রণ ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেছে, বহুদূরে।

মেক্সিকোর সেই রাতে যে দুজন মানুষ একে অপরকে চিনেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন বেছে নিয়েছিলেন থেকে যাওয়া, আরেকজন বেছে নিয়েছিলেন চলে যাওয়া। একজন মারা যান বিদেশের মাটিতে, ইতিহাসের প্রান্তরেখায়। আরেকজন বেঁচে থাকেন চার দশকের বেশি সময়, নিজের দেশকে শাসন করেন, আর সেই দেশের প্রতিটি সরকারি স্মৃতিতে মৃত বন্ধুটির নাম বুনে দেন। যা ফিরেছিল, তা কোনো একক জিনিস ছিল না। তা ছিল হাড়, রাজনীতি আর কিংবদন্তির একটি জটিল মিশ্রণ। ●

এই আর্টিকেলে সরাসরি কোন দাবিকে গ্রহণ না করে, প্রতিটি ধাপ প্রাথমিক ও নির্ভরযোগ্য সেকেন্ডারি সূত্র দিয়ে যাচাই করা হয়েছে। যেখানে সূত্র পরস্পরবিরোধী (যেমন কবরের সংখ্যা, গুলির সংখ্যা, শনাক্তকরণের চূড়ান্ততা নিয়ে), সেখানে বিতর্কটি তুলে ধরা হয়েছে, একরৈখিক সিদ্ধান্তে না পৌঁছে।


Picture of কাজী সাঈদ মাহমুদ

কাজী সাঈদ মাহমুদ

সাংবাদিক ও ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর, দ্য ডেল্টাগ্রাম
শেয়ার

আরও পড়েন

দুর্গের ভেতরে কয়েক হাজার সৈন্য, বাইরে প্রায় লক্ষাধিক উসমানীয় সেনা। এই লড়াই চলেছিল এক মাস, আর দুর্গ পতনের আগেই শেষ অভিযানে মৃত্যুবরণ করেন সুলতান সুলেমান।

দ্য পাবলিশ

উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁর সিনেমায় ফিরে যাওয়ার জন্য এই দশটি ছবি একটি ভালো শুরু।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

ছবিটি দেখে পাবলো পিকাসো বলেন “চার্চিল চাইলে পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারতেন, যদি না তাঁর সময় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকত”।

কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

যখন একটা গেমের পেছনে এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, তখন ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

Scroll to Top