লন্ডনের একটি হাসপাতালের বিছানায়, ১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট, আটচল্লিশ বছর বয়সী একজন মানুষের হৃদযন্ত্র থেমে যায়। তাঁর কিডনি ও লিভার আগেই বিকল হয়ে পড়েছিল, লাহোর থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য যাওয়ার পথে তিনি লন্ডনে যাত্রাবিরতি নিয়েছিলেন, আর সেখানেই ক্রমওয়েল হাসপাতালে তাঁর শরীর আর টিকল না। পাকিস্তানে তখন গভীর রাত। কিন্তু লাহোরের সেই বাড়ির সামনে ভোর হওয়ার আগেই শত শত মানুষ জড়ো হয়ে গিয়েছিল, কেউ জানত না ঠিক কী করবে, শুধু এটুকু জানত যে একটা কণ্ঠ থেমে গেছে যা তাদের শহরের বাতাসে মিশে ছিল বহু বছর ধরে।
আজ, তাঁর প্রয়াণের ঊনত্রিশ বছর পরও থামে নাই তার কণ্ঠ। স্পটিফাইয়ে প্রতি মাসে এক কোটির বেশি মানুষ নুসরাত ফাতেহ আলী খানের গান শোনেন, যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জন্মেছে তাঁর মৃত্যুর পরে। ইনস্টাগ্রাম রিলে তাঁর “আফরিন আফরিন” বা “মেরে রশকে কমার”-এর টুকরো বেজে ওঠে এমন প্রেক্ষাপটে যার সঙ্গে কাওয়ালি বা সুফি ঐতিহ্যের সরাসরি কোনো সম্পর্কই নাই। প্রশ্নটা তাই সহজ না। একজন শিল্পী কীভাবে তাঁর নিজের মৃত্যুকেও পেছনে ফেলে সংগীতের ভূগোল নতুন করে আঁকতে থাকেন?
নুসরাতের গায়কি নিয়ে যা সবচেয়ে বেশি বলা হয়, তা হলো তাঁর ছয় সপ্তকের বিস্তার এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাইবার সহ্যক্ষমতা। কিন্তু এই বিবরণ তাঁর সংগীতের আসল রহস্যকে ছুঁতে পারে না। নুসরাতের গায়কির কেন্দ্রে ছিল একধরনের নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ, যেখানে তিনি একটি সরগমের বাক্যকে বারবার ভেঙে নতুন করে গড়তেন, প্রতিটি পুনরাবৃত্তিতে সামান্য বদল এনে শ্রোতাকে এক ধরনের ট্রান্সে নিয়ে যেতেন। এই কৌশলের নাম সরগম, তানপল্টা কিংবা লয়কারী, খেয়াল-গায়কির থেকে ধার করা টেকনোলজি, কিন্তু নুসরাত তাকে ব্যবহার করতেন কাওয়ালির আবেগঘন কাঠামোর ভেতরে বসিয়ে, ধ্রুপদী সংগীত ও ভক্তিমূলক পরিবেশনার মাঝখানে একটি নতুন জায়গা তৈরি করে।
তাঁর কণ্ঠে যে জিনিসটা সবচেয়ে অচেনা লাগত পশ্চিমা শ্রোতার কাছে, তা হলো তীব্রতার সেই ক্রমবর্ধমান রেখা, যেখানে গান শুরু হয় প্রায় কথ্যস্বরে, ধীরে ধীরে তীব্র হতে হতে এক পর্যায়ে পৌঁছায় যাকে সুফি পরিভাষায় বলা হয় “হাল”, অর্থাৎ আধ্যাত্মিক আচ্ছন্নতার অবস্থা। পিটার গ্যাব্রিয়েল পরে বলেছিলেন, নুসরাতের কণ্ঠ যা অনুভব করাতে পারত, তেমনটা তিনি আর কারও কাছে পাননি, ওটিস রেডিংয়ের পর। এই তুলনাটা তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ রেডিংয়ের সোল সংগীতের সঙ্গে নুসরাতের কাওয়ালির আপাত কোনো মিল নািই, ভাষা নাই, ঐতিহ্য নাই। মিল আছে শুধু একটা জায়গায়, কণ্ঠ যেখানে টেকনিক ছাড়িয়ে সরাসরি স্নায়ুতে পৌঁছায়।
নুসরাতের আগে
কাওয়ালির শিকড় প্রোথিত তেরো শতকে, আমির খসরুর হাত ধরে, যিনি ফার্সি, আরবি ও ভারতীয় সংগীত-ঐতিহ্যকে মিলিয়ে সুফি দরগায় গাওয়ার একটি নতুন রূপ তৈরি করেছিলেন। “কাওয়াল বাচ্চোঁ কা ঘরানা”, নুসরাতের পারিবারিক গায়কি-বংশ, নিজেকে সরাসরি সেই খসরু-ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী বলে দাবি করে, বারোজন শিশুর একটি দলের গল্প থেকে যার সূত্রপাত। ছয়শো বছরের বেশি সময় ধরে এই পরিবার দিল্লি ও পাঞ্জাবের দরগায় দরগায় গেয়ে গেছে, বাবা থেকে ছেলে, উস্তাদ থেকে শিষ্য, একটি মৌখিক ঐতিহ্য যা কখনো সম্পূর্ণভাবে লিখে রাখা হয়নি।
গজল অবশ্য কাওয়ালির চেয়ে আলাদা এক পথ ধরে এসেছে। ফার্সি কবিতার আরবি ঐতিহ্য থেকে জন্ম নেওয়া গজল মূলত একক প্রেমিকের বিলাপ, ইশক-এ-মজাজি বা মানবিক প্রেম এবং ইশক-এ-হকিকি বা ঐশ্বরিক প্রেম এর মাঝখানে দুলতে থাকা একটি কাব্যরূপ, যেখানে প্রতিটি শের স্বতন্ত্র কিন্ত পুরো কবিতা একটি আবেগেই বাঁধা থাকে। মীর তকী মীর, মির্জা গালিব থেকে শুরু করে ফায়েজ আহমেদ ফায়েজ পর্যন্ত এই ধারা উর্দু-ফারসি সাহিত্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শাখাগুলোর একটি হয়ে উঠে। মেহদী হাসান, বেগম আখতার, গুলাম আলীর মতো শিল্পীরা গজলকে একটি ঘরানার সংগীত হিসেবে দাঁড় করান। সংযত, মার্জিত, সোজা কথায় বললে মূলত উচ্চশিক্ষিত উর্দুভাষী শ্রোতার জন্য।
কাওয়ালি ও গজল তাই একই ভাষা, একই কাব্যভাণ্ডার ব্যবহার করলেও তাদের সামাজিক অবস্থান ছিল ভিন্ন। কাওয়ালি ছিল দরগার, সমবেত, প্রায় শারীরিক এক অভিজ্ঞতা। গজল ছিল মেহফিলের, ব্যক্তিগত, সংযত। নুসরাতের গুরুত্ব এই জায়গাতেই শুরু হয়, তিনি এই দুইয়ের মাঝখানের দেয়ালটাকে ভেঙে দিতে শুরু করেন।
এবং নুসরাত
নুসরাত কখনো নিজেকে গজল-গায়ক বলে দাবি করেননি। তিনি ছিলেন, প্রথমত ও শেষত, একজন কাওয়াল। কিন্তু তাঁর পরিবেশনায় তিনি ক্রমাগত গজলের কাব্যভাণ্ডার টেনে আনতেন কাওয়ালির কাঠামোর ভেতরে, ফলে যা তৈরি হতো তা কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘরানায় বাঁধা থাকত না। “তুমহে দিলগি ভুলানা পড়েগা” কিংবা “সানসো কি মালা”-র মতো পরিবেশনায় গজলের ব্যক্তিগত বিরহ আর কাওয়ালির সমবেত উচ্ছ্বাস একসঙ্গে মিশে যেত।
এই মিশ্রণটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় হস্তক্ষেপ। ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালি-পরিবেশনায় কবিতা মূলত আধ্যাত্মিক বার্তাবাহক, শব্দের অর্থের চেয়ে জরুরি ছিল তার ছন্দ ও পুনরাবৃত্তির শক্তি। নুসরাত এই কাঠামো ভাঙেননি, কিন্তু তার ভেতরে গজলের সূক্ষ্মতা প্রবেশ করিয়েছিলেন, প্রতিটি শব্দের ওজন অনুভব করিয়ে, একটিমাত্র পঙক্তিকে কয়েক মিনিট ধরে টেনে নিয়ে তার সবক’টি সম্ভাব্য আবেগীয় স্তর বের করে আনতেন। এভাবেই তিনি শ্রোতাকে বাধ্য করতেন শুধু সুরের প্রবাহে ভেসে না গিয়ে, গানের কথার দিকে ফিরে তাকাতে।
গজলের প্রধান বিষয় ইশক, বিরহ, প্রতীক্ষা, আত্মসমর্পণ। এই থিমগুলো ধর্মনিরপেক্ষ প্রেমকাহিনি হিসেবে পড়া যায়, আবার সুফি দর্শনে একই শব্দগুলো ঈশ্বরের প্রতি প্রেমিকের আকুতি হিসেবেও পড়া যায়, এই দ্বৈততাই গজলকে তার শক্তি দেয়। নুসরাতের কণ্ঠ এই দ্বৈততাকে আরও গভীর করে তুলত, কারণ তিনি একই পরিবেশনায় প্রায়ই দুটি স্তরকেই সক্রিয় রাখতেন, কখনো একটিকে প্রাধান্য দিতেন, কখনো অন্যটিকে, বাকিটা ছেড়ে দিতেন শ্রোতার ব্যাখ্যার ওপর।
এখানেই তাঁর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে উর্দু-ফারসি কাব্যজগতের জন্য। মেহফিলে বসে গজল শোনার সংস্কৃতি একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, উচ্চশিক্ষিত, উর্দুভাষী, সাহিত্যরসিক এক গোষ্ঠী। নুসরাত যখন সেই একই কবিতাকে কাওয়ালির সমবেত, প্রায় উৎসবমুখর ধারায় গাইতেন, তখন সেই কবিতা আর মেহফিলের চার দেয়ালে বন্দি থাকত না। যে শ্রোতা উর্দু বোঝেন না, ফার্সি শের-এর রেফারেন্স চেনেন না, তিনিও নুসরাতের কণ্ঠের তীব্রতা থেকে কবিতার আবেগটুকু গ্রহণ করতে পারতেন। এভাবেই একটি অভিজাত সাহিত্যিক ঐতিহ্য তার ভাষাগত যেতে পেরেছিল সীমানা পেরিয়ে, ভাষান্তর ছাড়াই।
সীমান্ত পেরিয়ে
১৯৮৫ সালে যুক্তরাজ্যের ওম্যাড উৎসবে নুসরাতের প্রথম বড় পরিবেশনা তাঁর আন্তর্জাতিক যাত্রার সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচিত করা হয়। তখন প্রথমবারের মতো তিনি পশ্চিমা শ্রোতার সামনে গাইলেন। সেই পরিবেশনার পরপরই পিটার গ্যাব্রিয়েলের রিয়েল ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস লেবেলে সঙ্গে তার চুক্তি হয়। আর ১৯৮৯ সালে গ্যাব্রিয়েলের “প্যাশন” অ্যালবামে তাঁর কণ্ঠ যুক্ত হয়, যা মার্টিন স্করসেজির চলচ্চিত্র “দ্য লাস্ট টেম্পটেশন অব ক্রাইস্ট”-এর সাউন্ডট্র্যাকে ব্যবহৃত হয়েছিল। একজন পাকিস্তানি কাওয়াল আর একজন ব্রিটিশ রক তারকা, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সংগীত-ঐতিহ্যের সাক্ষাৎ, খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় বিষয়ভিত্তিক একটি হলিউড চলচ্চিত্রে।
এই সংযোগ শুধু একটি চলচ্চিত্রের সাউন্ডট্র্যাকে সীমাবদ্ধ থাকে নাই। নুসরাতের কণ্ঠ পরবর্তী বছরগুলোতে অলিভার স্টোনের “ন্যাচারাল বর্ন কিলার্স” এবং টিম রবিন্সের “ডেড ম্যান ওয়াকিং”-এর সাউন্ডট্র্যাকে জায়গা পায়। “ডেড ম্যান ওয়াকিং”-এ তাঁর একটি গান পার্ল জ্যামের এডি ভেডারের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি হয়েছিল, যেটি ছিল রক ও কাওয়ালির এক অস্বাভাবিক অথচ কার্যকর মিলন। ভেডার নিজে পরে নুসরাতকে নিজের “এলভিস” বলে অভিহিত করেছিলেন, যা বোঝায় এই কণ্ঠ পশ্চিমা রক সংগীতের ভেতরেও একধরনের প্রামাণিকতার মানদণ্ড হয়ে উঠেছিল।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয় কানাডীয় প্রযোজক ও গিটারিস্ট মাইকেল ব্রুকের সঙ্গে। রিয়েল ওয়ার্ল্ড স্টুডিওতে এক সেশনের শেষে গ্যাব্রিয়েল হালকাভাবে বলেছিলেন, নুসরাত যদি পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গেও কিছু গাইতেন। নুসরাত তখন প্রায় খেয়ালিভাবে হারমোনিয়ামে একটি সরগম বাজিয়ে ফেলেন, যা পরে “মুস্ত মুস্ত” গানের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত “মুস্ত মুস্ত” অ্যালবামে ব্রুকের গিটার ও ইলেকট্রনিক টেক্সচারের সঙ্গে নুসরাতের কণ্ঠ মিশে তৈরি হয় প্রথম বড় মাপের কাওয়ালি-ফিউশন রেকর্ড।
এই অ্যালবামের গুরুত্ব বোঝা দরকার তার বাণিজ্যিক সাফল্যের চেয়েও গভীরভাবে। এখানে কাওয়ালির দীর্ঘায়িত, ধ্যানমগ্ন কাঠামো পশ্চিমা প্রযোজনার সংক্ষিপ্ত, গঠনবদ্ধ ছাঁচে ঢোকানোর চেষ্টা হয়েছিল, আর নুসরাত সেই চাপের বিরুদ্ধে নিজের শর্তে দাঁড়িয়েছিলেন। ব্রুক পরে স্বীকার করেন, তিনি বুঝেছিলেন নুসরাত তখনই সবচেয়ে উঁচুতে পৌঁছান যখন তাঁকে যথেষ্ট সময় দেওয়া হয় ইম্প্রোভাইজ করার জন্য, সংক্ষিপ্ত ব্যাকিং ট্র্যাক তাঁর গায়কিকে সীমাবদ্ধ করে ফেলত। ১৯৯৬ সালের “নাইট সং” অ্যালবামে, তাঁদের দ্বিতীয় সহযোগিতায়, ব্রুক এই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ, উন্মুক্ত কাঠামো তৈরি করেন, যেখানে নুসরাত আরও স্বাধীনভাবে গাইতে পারেন। এই অ্যালবাম গ্র্যামি মনোনয়ন পায় এবং বিলবোর্ড একে “কালজয়ী একটি রেকর্ড” বলে অভিহিত করে।
নুসরাতকে প্রায়ই “ওয়ার্ল্ড মিউজিক”-এর একজন প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়, একটি শ্রেণিবিভাগ যা তাঁর সংগীতকে পশ্চিমা বাজারের জন্য বোধগম্য করে তোলে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে তাকে একধরনের প্রান্তিক, বহিরাগত অবস্থানে রেখে দেয়। বাস্তবে যা ঘটেছিল তা এই শ্রেণিবিভাগের চেয়ে জটিল। নুসরাত পশ্চিমা সংগীতের প্রতি নিজেকে খাপ খাইয়ে নেন নাই, বরং পশ্চিমা প্রযোজকদের বাধ্য করেছিলেন তাঁর গায়কির যুক্তি বুঝতে, তাঁর দীর্ঘ নিঃশ্বাস, তাঁর অপ্রত্যাশিত মোড়, তাঁর নিয়ন্ত্রিত উন্মাদনার কাঠামো মেনে নিতে। এই কারণেই তাঁর ফিউশন রেকর্ডগুলো আজও পুরোনো মনে হয় না, কারণ সেগুলোতে আপস একতরফা ছিল না।
এ.আর. রহমান, যিনি নিজেও ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতে ধ্রুপদী ও পশ্চিমা উপাদানের মিশ্রণে খ্যাত, নুসরাতকে নিজের বড় প্রভাবগুলোর একজন হিসেবে দেখেন। কোক স্টুডিওর মতো প্ল্যাটফর্ম, যা পাকিস্তানি লোক ও ধ্রুপদী সংগীতকে সমসাময়িক প্রযোজনার সঙ্গে মিশিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়, তার নান্দনিক ভিত্তি অনেকাংশে নুসরাতের রেখে যাওয়া পথের ওপর দাঁড়িয়ে। জেফ বাকলি, একজন আমেরিকান সংগীতশিল্পী যিনি নিজেও অকালে প্রয়াত হয়েছিলেন নুসরাতের মাত্র তিন মাস আগে, তাঁকে “ঈশ্বরতুল্য” বলে বর্ণনা করেছিলেন।
নুসরাতের পরে
নুসরাতের মৃত্যুর পর তাঁর ভাতিজা রাহাত ফাতেহ আলী খান পারিবারিক গায়কি-ঐতিহ্যের হাল ধরেন, বলিউড থেকে কোক স্টুডিও পর্যন্ত বিস্তৃত এক ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন রাহাত। কিন্তু রাহাত নিজেই বারবার বলেছেন, তাঁর কাকার সঙ্গে তুলনা অর্থহীন, কারণ নুসরাতের গায়কিতে যে সম্মোহনী গুণ ছিল তা পুনরাবৃত্তিযোগ্য নয়।
২০২৪ সালে রিয়েল ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের আর্কাইভ থেকে “চেইন অব লাইট” নামে একটি “হারানো অ্যালবাম” প্রকাশিত হয়, ১৯৯০ সালে রেকর্ড করা কিন্তু কখনো প্রকাশিত হয়নি এমন কিছু ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালি পরিবেশনা নিয়ে। চৌত্রিশ বছর পুরোনো টেপ থেকে একজন মৃত শিল্পীর নতুন অ্যালবাম প্রকাশিত হওয়া, আর সেই অ্যালবাম নিয়ে সংগীতাঙ্গনে যথেষ্ট আলোচনা হওয়াই বলে দেয় নুসরাতের প্রাসঙ্গিকতা কোনো নস্টালজিয়ার ব্যাপার না। তাঁর সংগ্রহশালা এখনো নিঃশেষ হয় নাই, এমনকি তাঁর শ্রোতাগোষ্ঠীও না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের যুগে এই প্রাসঙ্গিকতার একটা আলাদা যুক্তি আছে। স্পটিফাই বা ইউটিউবের অ্যালগরিদম দীর্ঘ, ধ্যানমগ্ন পরিবেশনাকে পুরস্কৃত করে না, কিন্তু নুসরাতের গায়কির মধ্যে এমন অসংখ্য মুহূর্ত আছে যা কয়েক সেকেন্ডে বিচ্ছিন্ন করে নিলেও তাদের তীব্রতা হারায় না, একটি তান, একটি আর্তনাদসদৃশ স্বর, একটি আকস্মিক লয়পরিবর্তন।
তাহলে মূল প্রশ্নে ফেরা যাক। নুসরাত কি গজলকে জনপ্রিয় করেছিলেন, নাকি গজল শোনার অভিজ্ঞতাটাকেই বদলে দিয়েছিলেন? উত্তরটা সম্ভবত দ্বিতীয়টির দিকে ঝোঁকে। জনপ্রিয়তা একটি পরিমাণগত পরিবর্তন, বেশি মানুষ শোনা শুরু করল। কিন্তু নুসরাত যা করেছিলেন তা গুণগত, তিনি গজল ও কাওয়ালির মধ্যেকার দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত বিরহকে সমবেত উদযাপনে রূপান্তরিত করেছিলেন, একটি অভিজাত কাব্যধারাকে এমন এক শারীরিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছিলেন যা ভাষা না জেনেও অনুভব করা যায়।
এর একটা মূল্যও ছিল। কিছু সমালোচক মনে করতেন “নাইট সং”-এর মতো অ্যালবাম ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালি থেকে অনেকটাই সরে গেছে,¹⁸ প্রশ্ন তুলেছিলেন কতটুকু বিশুদ্ধতা বিসর্জন দেওয়া চলে বৃহত্তর শ্রোতার জন্য। এই টানাপোড়েন নুসরাতের কাজকে জটিল করে তোলে, কিন্তু তাঁকে খাটো করে না। বরঞ্চ এটাই দেখায় তিনি ছিলেন একজন সচেতন শিল্পী, ঐতিহ্য ও নিরীক্ষার মধ্যে সজ্ঞানে হাঁটা একজন মানুষ, কোনো নিষ্পাপ প্রতিভা নন যিনি দুর্ঘটনাক্রমে বিশ্ববিখ্যাত হয়ে গিয়েছেন।
ফয়সালাবাদের জাং রোড কবরস্থানে নুসরাতের সমাধি আজও সংগীতশিল্পীদের তীর্থস্থান। কিন্তু তাঁর আসল সমাধি বোধহয় কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় নাই। এটা ছড়িয়ে আছে এক তরুণ শ্রোতার হেডফোনে, যে হয়তো জানেই না “মেরে রশকে কামার” আসলে কার লেখা, কোন শতকের কাব্যধারা থেকে উঠে আসা। ছড়িয়ে আছে কোক স্টুডিওর কোনো নতুন প্রযোজনায়, এ. আর. রহমানের কোনো সুরের বাঁকে, কিম্বা রাহাত ফাতেহ আলী খানের কণ্ঠে। শিল্পী মারা যান, কিন্তু তার কণ্ঠের সাংস্কৃতিক জীবন থেমে থাকে না, বরঞ্চ তার আকার বদলাতে থাকে, নতুন প্রজন্মের কানে নতুন অর্থ তৈরি করতে করতে। নুসরাত ফাতেহ আলী খানে এটাই প্রমাণ করে গেছেন।