সাগরের বীচে গুলি করে একজনকে হত্যা করে মরসো। আদালতে তাকে জিজ্ঞেস করা হয় সে কেন এই অপরাধ করেছে। সে বলে, রোদ চোখে লাগছিল। জুরি বিশ্বাস করে না। পাঠকও প্রথম পড়ায় বিশ্বাস করে না। কিন্তু বইটা শেষ করার পর একটা অস্বস্তি আপনাকে তাড়া করবে, কারণ লোকটা মিথ্যা বলছিল না। ১৯৪২ সালে প্রকাশিত আলবেয়ার কাম্যুর ছোট্ট উপন্যাস L’Étranger বা “দ্য স্ট্রেঞ্জার” বাংলায় যাকে আমরা “আগন্তুক” বলি, ঠিক এই অস্বস্তিকর চিন্তার উপরেই দাঁড়িয়ে আছে। বইটা যত পাতলা, তার প্রভাব ততই ভারী। বিশ্বসাহিত্যে খুব কম উপন্যাস আছে যেখানে একজন খুনির প্রতি পাঠকের এত মমতা তৈরি হয়, অথচ তার অপরাধকে ছোট করে দেখানোর কোনো চেষ্টাও থাকে না।
গল্পের কাঠামো আপাতদৃষ্টিতে সরল। ফরাসি-অধিকৃত আলজেরিয়ায় বসবাসকারী একজন সাধারণ অফিস-কেরানি, যার নাম মরসো। একদিন একটা বৃদ্ধাশ্রম থেকে টেলিগ্রাম আসে তার কাছে। মরসো খবর পায় তার মা মারা গেছেন, তারিখটাও ঠিক স্পষ্ট না, “আজ” না “গতকাল”। এই অনিশ্চয়তা দিয়েই উপন্যাস শুরু হয়। মরসো অফিস থেকে ছুটি নেয়, যায় শহরের বাইরে সেই বৃদ্ধাশ্রমে। মায়ের কফিনের পাশে সারা রাত বসে থাকে মরসো, কিন্তু কিন্তু তার চোখে নাই এক ফোটা জল। কফিন খুলে শেষবারের মতো মায়ের মুখও দেখতে চায় না সে। কফি খায়, সিগারেট ফোঁকে। এভাবেই সারা রাত মায়ের কফিনের পাশে বসে থাকে মরসো। পরদিন দাফন সেরে শহরে ফিরে আসে, আর তার পরের দিনই এক মেয়ের সঙ্গে সমুদ্রসৈকতে দেখা করে, মেয়েটির সঙ্গে দেখতে যায় একটি সিনেমাও, থাকে রাতেও। এই আচরণগুলো পাঠকের কাছে যতটা না অস্বাভাবিক লাগে, তার চেয়ে বেশি অস্বস্তিকর লাগে এই কারণে যে মরসো নিজে এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জিত না। সে শুধু জানায়, যা ঘটেছে তাই বলছে।

গল্পের দ্বিতীয় ভাগে। মরসোর প্রতিবেশী রেমন্ড, যার পরিচয় নিয়ে পাড়ায় ফিসফাস আছে, তার প্রাক্তন প্রেমিকার আরব ভাইদের সঙ্গে একটা বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। মরসো এই বিরোধে কোনো ব্যক্তিগত আগ্রহ ছাড়াই জড়িয়ে যায়, নিছক কারণ রেমন্ড তাকে বন্ধু বলে ডাকে আর সে “না” বলার কোনো বিশেষ কারণ খুঁজে পায় না। সমুদ্রতটে এক দুপুরে, তীব্র রোদের মধ্যে, একটা মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। প্রতিপক্ষের ছুরির ফলা থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে মরসোর চোখে এসে পড়ে, আর সেই মুহূর্তে সে গুলি চালিয়ে দেয়। একবার নয়, পাঁচবার। প্রথম গুলির পর লোকটা পড়ে যায়, তারপরও মরসো আরও চারবার ট্রিগার টানে। এই বাড়তি চারটে গুলিই আসলে উপন্যাসের আসল প্রশ্ন তৈরি করে। প্রথম গুলিকে হয়তো আত্মরক্ষা বলে ব্যাখ্যা করা যেত। কিন্তু পরের চারটে গুলির কোনো ব্যাখ্যা মরসো নিজেও দিতে পারে না, আর ঠিক এই অক্ষমতাই তাকে একজন সাধারণ আসামি থেকে দর্শনের এক জটিল চরিত্রে পরিণত করে।
বিচার শুরু হলে গল্প একটা অদ্ভুত মোড় নেয়। প্রসিকিউটর মরসোর অপরাধের চেয়ে অনেক বেশি সময় ব্যয় করে তার মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় তার আচরণ নিয়ে। সে কাঁদেনি, মায়ের বয়স পর্যন্ত জানত না, মৃত্যুর পরদিনই সিনেমা দেখতে গিয়েছিল, এসবই আদালতের চোখে তার “নৈতিক দানবত্বের” প্রমাণ হয়ে ওঠে। বিচারকরা তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন খুনের জন্য, কিন্তু তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় মূলত তার সংবেদনহীনতার জন্য। কাম্যু এখানে সমাজের একটা নির্মম সত্য তুলে ধরেন, সমাজ আসলে অপরাধকে যত না ভয় পায়, তার চেয়ে বেশি ভয় পায় সেই মানুষকে, যে সমাজের প্রত্যাশিত আবেগ প্রদর্শন করতে পারে না বা অস্বীকার করে। মরসোকে শাস্তি দেওয়া হয় তার কাজের জন্য না, তার হৃদয়ের জন্য, বা বলা ভালো, তার আবেগের অনুপস্থিতির জন্য।
কারাগারে বসে মরসো একটা অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পায়। জেলের ধর্মযাজক বারবার তার সঙ্গে দেখা করতে চায়, ঈশ্বরের কথা বলতে চায়, কিন্তু মরসো প্রতিবার প্রত্যাখ্যান করে। শেষ দৃশ্যে, যখন যাজক জোর করে তার কক্ষে ঢুকে পড়ে, মরসো তাকে বলে যে তার হাতে সময় নাই ঈশ্বর নিয়ে আলোচনা করার, তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে গেছে, আর এখন আর অন্তহীন প্রশ্নের কোনো অর্থ নাই। যাজককে বের করে দেওয়ার পর মরসোর মনে পড়ে তার মায়ের কথা, আর উপন্যাস শেষ হয় এক ধরনের শান্তির মধ্যে দিয়ে, যা প্রথম পাঠে বিভ্রান্তিকর মনে হলেও আসলে কাম্যুর গোটা দর্শনের সারমর্ম।
অ্যাবসার্ড, বা যে প্রশ্নের কোনো উত্তর নাই
“দ্য স্ট্রেঞ্জার” পড়ে যদি মনে হয় এটা নিছক এক উদাসীন মানুষের গল্প, তাহলে বইটার আসল উদ্দেশ্য বোঝা যাবে না। কাম্যু নিজে এই উপন্যাসকে তার “অ্যাবসার্ডিজম” বা অসঙ্গতিবাদ দর্শনের একটা শৈল্পিক রূপ হিসেবে দেখতেন, যে দর্শনের তাত্ত্বিক ভিত্তি তিনি একই বছরে প্রকাশিত তার প্রবন্ধ The Myth of Sisyphus-এ ব্যাখ্যা করেন। অ্যাবসার্ডিটির ধারণাটা আসলে খুব সরল, একবার বুঝে ফেললে জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। মানুষ প্রতিনিয়ত জীবনের অর্থ খুঁজতে চায়, কেন আমি এখানে? আমার কষ্টের কী মানে? আমার অস্তিত্বের কী উদ্দেশ্য? এই প্রশ্নগুলো নিয়েই মানুষ বাঁচে। কিন্তু দুনিয়া এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না। এই যে মানুষের অর্থের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর তার বিপরীতে জগতের নিরুত্তর নীরবতা, এই দুইয়ের সংঘর্ষ থেকেই জন্ম নেয় অ্যাবসার্ড।
অনেকে মনে করেন অ্যাবসার্ডিজম মানে জীবন অর্থহীন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া, অর্থাৎ এক ধরনের নিহিলিজম। কিন্তু কাম্যু এই ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করতেন না। তার মতে, জীবন নিজে থেকে অর্থহীন নয়, বরং অর্থহীনতা তৈরি হয় মানুষের প্রশ্ন করার প্রবৃত্তি আর জগতের নীরবতার মাঝখানের ফাঁকা জায়গায়। এই পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই কাম্যুর সমাধান আসে। যদি জীবন সত্যিই অর্থহীন হতো, তাহলে একমাত্র যুক্তিসংগত পথ হতো আত্মহত্যা, আর কাম্যু তার প্রবন্ধ শুরুই করেছিলেন এই বলে যে দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো আত্মহত্যা করা উচিত কিনা। কিন্তু তার উত্তর ছিল, না। তিনি প্রস্তাব করেন এক ধরনের প্রতিবাদের, যেখানে মানুষ জেনেবুঝেই এই অর্থহীন সংগ্রাম চালিয়ে যায়, ঠিক যেমন গ্রিক পুরাণের সিসিফাস অভিশপ্ত হয়ে বারবার পাহাড়ের ওপর পাথর ঠেলে তোলে, এটা জেনেও যে পাথরটা আবার গড়িয়ে পড়বে। কাম্যুর বিখ্যাত উপসংহার হলো, সিসিফাসকে সুখী কল্পনা করতে হবে। কারণ তার সংগ্রামই তার অস্তিত্বের প্রমাণ, তার প্রতিবাদই তার শক্তি।
মরসো এই দর্শনের একটা জীবন্ত রূপ, যদিও উপন্যাসের কোথাও কাম্যু সরাসরি এই তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন না। মরসো এমন একজন মানুষ, যে সমাজের তৈরি করা মিথ্যা অর্থের কাঠামোর সঙ্গে মিথ্যা সমঝোতা করতে অস্বীকার করে। তাকে এক মেয়ে বিয়ের প্রপোজ করে, উত্তরে সে বিয়ের প্রতি কোন আবেগ দেখায় না। সে বলে, করা যায়, না করলেও ব্যাপার না। তার কাছে এর কোনো তফাত নাই। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় সে ঈশ্বরে বিশ্বাস করে কিনা, সে সোজাসুজি বলে না। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় সে অনুতপ্ত কিনা, সে বলে সে মিথ্যে বলবে না, তার কোনো অনুতাপ নাই। এই প্রতিটি মুহূর্তে মরসো সমাজের প্রত্যাশিত উত্তরের বদলে সৎ উত্তর বেছে নেয়, আর ঠিক এই সততাই তাকে সমাজের চোখে বিপজ্জনক করে তোলে। আদালতে যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো, আদালত আসলে মরসোর খুনের বিচার করছে না, বিচার করছে তার সততার। একজন মানুষ যদি সামাজিক নিয়মের ভান না করে, যদি দুঃখ অভিনয় না করে, তাহলে সমাজ তাকে মানুষ বলে মেনে নিতে চায় না। তার বাস্তব অপরাধের চেয়েও বড় করে দেখায় তার সংবেদনহীনতাকে।

নীটশে থেকে যে ধারা শুরু, তার দুটো মুখ
কাম্যুকে বোঝার জন্য একটু পেছনে ফিরে তাকানো দরকার, কারণ তার অ্যাবসার্ডিজম আকাশ থেকে পড়ে নাই। উনিশ শতকের শেষভাগে জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নীটশে যখন বলেন, “ঈশ্বর মৃত”, তখন তিনি আক্ষরিক অর্থে কোনো ধর্মতাত্ত্বিক দাবি করছিলেন না। তিনি বলতে চাইছিলেন, আধুনিক যুগে বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ আর সেকুলারিজমের উত্থানের ফলে ঈশ্বরকেন্দ্রিক নৈতিক কাঠামো তার সামাজিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলেছে, আর মানুষকে এখন নিজের অর্থ নিজেই তৈরি করতে হবে, কোনো বাহ্যিক উৎস থেকে ধার করে না। এই ধাক্কাটা পশ্চিমা দর্শনে এমন এক ফাটল তৈরি করে যা পরবর্তী শত বছরের চিন্তাভাবনাকে ভাগ করে দেয় দুটো প্রধান স্রোতে।
একদিকে ইউরোপীয় মহাদেশে গড়ে ওঠে যাকে বলা হয় কন্টিনেন্টাল ফিলোসফি, যেখানে নীটশের উত্তরাধিকার বহন করে এক্সিস্টেনশিয়ালিজম বা অস্তিত্ববাদীরা, তারপর ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের সমালোচনামূলক তত্ত্ববিদরা, আর শেষে ফুকো, দেরিদা, লিওতারের মতো পোস্টমডার্নিস্ট বা উত্তর-আধুনিকতাবাদীরা। যারা ক্ষমতা, ভাষা আর সত্যের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। অন্যদিকে ব্রিটেন আর আমেরিকায় গড়ে ওঠে অ্যানালিটিক্যাল ফিলোসফি, যার শুরু ইম্প্রেসিওনিস্ট চিন্তাবিদদের হাতে, তারপর ভিয়েনা সার্কেলের যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ, আর শেষে আমেরিকান প্র্যাগমেটিজম, যেখানে দর্শনের মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায় ভাষার যৌক্তিক বিশ্লেষণ আর বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে সত্যতা যাচাই। আজকের একাডেমিক দুনিয়ায় এই দুই স্রোত প্রায়ই একে অপরকে তাচ্ছিল্য করে, পোস্টমডার্নিস্টদের অভিযোগ করা হয় অস্পষ্টতা আর আপেক্ষিকতাবাদের, আর প্র্যাগমেটিস্টদের অভিযোগ করা হয় সংকীর্ণ যান্ত্রিকতার। অথচ দুই ধারাই একই উৎস থেকে জন্ম নিয়েছে, একই ফাটল থেকে যে ফাটল নীটশে তৈরি করেছিল।
কাম্যুর অ্যাবসার্ডিজম এই বিভাজনের ঠিক আগে, অস্তিত্ববাদী চিন্তাধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে, যদিও কাম্যু নিজে নিজেকে অস্তিত্ববাদী বলতে অস্বীকার করতেন, বিশেষত সার্ত্রের সঙ্গে তার বিখ্যাত মতবিরোধের পর। কিন্তু নীটশের প্রভাব তার চিন্তায় স্পষ্ট। ঈশ্বরের অনুপস্থিতিতে মানুষ কীভাবে অর্থপূর্ণ জীবনযাপন করবে, এই প্রশ্নটাই কাম্যুর গোটা সাহিত্যের কেন্দ্রে আছে। নীটশে একটা জায়গায় লিখেছিলেন যে, যদি দেবতা থেকেই থাকে, তাহলে নিজে একজন দেবতা না হওয়াটা কীভাবে সহ্য করা যায়। একটা প্যারাডক্সিক্যাল, প্রায় উদ্ধত কথা, যা প্রথমবার পড়লে আপনাকে চমকে দেয়। এই ধরনের কথা নীটশের রচনায় বারবার আসে, কারণ তিনি লিখতেন কবিতার ঢঙে, রূপকের আড়ালে, যাতে তার কথাকে বহু রকমভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। মিল্টনের Paradise Lost-এ শয়তানের চরিত্রেও একই ধরনের উদ্ধত আত্মমর্যাদার সুর পাওয়া যায়, ‘বেহেস্তের সেবাদাস হওয়ার চেয়ে জাহান্নামের রাজত্ব করা ভালো’, এই কথায়। আল্লামা ইকবালের কবিতাতেও কিছুটা একই রকম প্রতিধ্বনি মিলে, যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্বের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করে, নিজেকে জিজ্ঞেস করে সে কোথায় দাঁড়িয়ে, কোন জগতে তার প্রকৃত ঠিকানা। এই তিনটি ভিন্ন ঐতিহ্যের তিনটি ভিন্ন কণ্ঠস্বর, অথচ প্রশ্নটা একই। অস্তিত্বের অর্থ কোথায়, আর সেই অর্থ না পেলে মানুষ কী করবে।
মরসোর গল্প এই বৃহত্তর দার্শনিক প্রশ্নেরই একটা নিরাসক্ত উত্তর। সে দার্শনিক তত্ত্ব আওড়ায় না, তার প্রতিটি সিদ্ধান্তে এই তত্ত্বকে বাস্তবে রূপ দেয়। সে সমাজের তৈরি করা মিথ্যা সান্ত্বনার আশ্রয় নেয় না, সে ভান করে না যে তার জীবনের একটা মহৎ উদ্দেশ্য আছে, সে ভান করে না যে তার মায়ের মৃত্যুতে তার হৃদয় ভেঙে গেছে যদি বাস্তবে তা না হয়ে থাকে। আর ঠিক এই সততার মূল্যই তাকে দিতে হয় নিজের জীবন দিয়ে।
উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে একেবারে শেষে, যখন মরসো কারাগারের সেলে বসে মৃত্যু ডাকের প্রতীক্ষা করছে। জেলের ধর্মযাজক তাকে বারবার বলার চেষ্টা করে যে ঈশ্বরের কাছে ফিরে আসার এখনো সময় আছে, যে মৃত্যুর মুখেও প্রার্থনা তাকে শান্তি দিতে পারে। মরসো প্রতিবার প্রত্যাখ্যান করে, আর শেষ দৃশ্যে যখন যাজক জোর করে ঢুকে পড়ে, মরসোর মধ্যে দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে বেড়িয়ে আসে। সে যাজককে বলে তার হাতে সময় নাই, তার সাজা নিশ্চিত হয়ে গেছে, আর এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির কোনো মানে নাই তার কাছে।
এই কথার পর যে শান্তি আসে, সেটাই উপন্যাসের সবচেয়ে গভীর মুহূর্ত। মরসো বুঝতে পারে, তার নিজের মৃত্যু আর দুনিয়ার নিরুত্তর নীরবতার সঙ্গে তার নিজের এক ধরনের সাদৃশ্য আছে, দুইটাই উদাসীন, দুইটাই অর্থহীন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না। কিন্তু এই উপলব্ধি তাকে হতাশ করে না, এক অদ্ভুত মুক্তি দেয়। যদি দুনিয়া উদাসীন হয়, তাহলে মানুষের নিজের জীবনযাপনের পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাও অসীম। কাম্যুর ভাষায়, এই উপলব্ধিই সিসিফাসকে তার পাথর নিয়ে সুখী করে তোলে। মরসোও ঠিক এই জায়গায় পৌঁছায়, মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও।
এখানেই “দ্য স্ট্রেঞ্জার” কে নিছক একটা অপরাধকাহিনি থেকে আলাদা করে দেয় তার দার্শনিক গভীরতা। বইটা প্রশ্ন তোলে না মরসো নির্দোষ কিনা, তার প্রশ্ন হলো, সমাজ আসলে কাকে শাস্তি দেয়, অপরাধীকে নাকি সেই মানুষকে যে সামাজিক নিয়মকানূন মানতে ও ভান করতে অস্বীকার করে। প্রায় আশি বছর পরেও এই প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতা ফুরায় নাই, কারণ প্রতিটা সমাজই কোনো না কোনো রূপে তার নিজস্ব সংবেদনশীলতার মানদণ্ড তৈরি করে, আর যে মানুষ সেই মানদণ্ডে খাপ খায় না, তাকে অস্বাভাবিক বা বিপজ্জনক বলে গণ্য করে, তার প্রকৃত কাজের চেয়ে তার আচরণের ভিন্নতাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিচার করে।
কাম্যু নিজে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তার এই উপন্যাসের সারকথা এক লাইনে বলা যায় এভাবে যে, আমাদের সমাজে যে মানুষ তার মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় কাঁদে না, তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার ঝুঁকি নিতে হয়। কথাটা শুনতে অতিরঞ্জিত মনে হইলেও উপন্যাসটা পড়ার পর বোঝা যায়, এটা অতিরঞ্জন না। এটাই সমাজের কঠিনতম সত্য।