আমরা ভাষার রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা বলি। কে কোন ভাষায় কথা বলবে, কোন ভাষায় রাষ্ট্র চলবে, কোন ভাষায় শিক্ষা হবে, এসব প্রশ্ন আমাদের ইতিহাসের কেন্দ্রে আছে। কিন্তু ভাষাকে আমরা যে হরফে দেখি, সেই হরফেরও কি রাজনীতি আছে? কে ঠিক করে একটি ভাষা কেমন দেখতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, বাংলা হরফের ইতিহাস আসলে ক্ষমতা, প্রযুক্তি আর পরিচয়ের এক জটিল আখ্যান, যা কেবল নন্দনতত্ত্বের সীমানায় আটকে থাকে না। প্রতিটি অক্ষরের বাঁক, প্রতিটি যুক্তাক্ষরের ঘনত্ব, রেখার পুরুত্ব, মাত্রার উচ্চতা, এসবের পেছনে আছে আড়াইশো বছরের ইতিহাস।
প্রারম্ভ বা এক জোড়া হাতে বাংলা ভাষার প্রথম মুখ
১৭৭৮ সালে ইংরেজ প্রাচ্যবিদ নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড একটি বই লিখতে বসেন, নাম আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ। সমস্যা ছিল একটাই, বাংলা ছাপার কোনো হরফ তখনো তৈরি হয়নি। ইংরেজ টাইপোগ্রাফার চার্লস উইলকিন্স এই কাজে হাত দেন, কিন্তু বাংলা অক্ষরের জটিল গড়ন কাটতে তাঁর হাতে দরকার ছিল স্থানীয় এক কারিগরের। সেই কারিগরের নাম পঞ্চানন কর্মকার, হুগলির ত্রিবেণীর এক স্বর্ণকার পরিবারের সন্তান, যাঁর পূর্বপুরুষেরা তলোয়ার আর ঢালের গায়ে নকশা কাটতেন নবাব আলিবর্দী খাঁর দরবারে। উইলকিনসের তত্ত্বাবধানে পঞ্চানন কাঠের ওপর প্রথম বাংলা মুদ্রণ-হরফ খোদাই করেন, আর তাতেই ছাপা হয় বাংলা ভাষার প্রথম মুদ্রিত বই। এই ঘটনার গুরুত্ব বহু ঐতিহাসিক নথিতে ধরা আছে, যার মধ্যে দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদন বিস্তারিতভাবে জানায় যে পরবর্তীতে পঞ্চানন উইলিয়াম কেরির বাংলা নিউ টেস্টামেন্ট অনুবাদের জন্য আরেকটি নতুন হরফ তৈরি করেন।
এখানেই প্রথম প্রশ্নটা দাঁড়ায়। বাংলা ভাষার দৃশ্যমান রূপ প্রথম যাঁদের হাতে জন্ম নিল, তাঁদের একজন ইংরেজ, আরেকজন বাঙালি কারিগর, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল খ্রিষ্টান মিশনারিদের বাইবেল অনুবাদ ছাপানো। ভাষার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, সবচেয়ে দৈনন্দিন রূপটি জন্ম নিয়েছিল উপনিবেশের প্রশাসনিক আর ধর্মপ্রচারের প্রয়োজনে, বাঙালির নিজের সাংস্কৃতিক তাগিদে নয়। শ্রীরামপুরে কেরি, মার্শম্যান আর ওয়ার্ডের মিশন প্রেস পরে পঞ্চাননের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে এশিয়ার সবচেয়ে বড় বহু-লিপি টাইপ ফাউন্ড্রি, যেখান থেকে চল্লিশটিরও বেশি ভাষায় হরফ কাটা হয়েছিল বলে বাংলাপিডিয়ার নথি জানায়। বাংলা অক্ষর তখন কেবল একটি লিপি নয়, ছিল একটি সাম্রাজ্যের ছাপাখানা-অবকাঠামোর অংশ।
হাতে লেখা পুঁথির বাংলা আর ছাপার হরফের বাংলা এক জিনিস নয়। পাণ্ডুলিপিতে লিপিকর যে স্বাধীনতায় একটি অক্ষরকে বাঁকাতে, প্রসারিত করতে বা সংকুচিত করতে পারতেন, ধাতব হরফে তা সম্ভব ছিল না। প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি যুক্তাক্ষরকে একটি নির্দিষ্ট আকারের ধাতব ব্লকে বন্দি করতে হতো। বাংলা লিপির শয়ে শয়ে যুক্তাক্ষর, একই ব্যঞ্জনের একাধিক রূপ, এসব ইউরোপীয় ছাপাখানার প্রযুক্তির জন্য এক বিশাল প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে যা ঘটেছিল তা নিছক অনুলিপি নয়, ছিল একরকম সরলীকরণ। পুঁথির হাতের লেখায় যে বৈচিত্র্য ছিল, ছাপাখানার অর্থনীতি আর যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা তার একটি অংশকে বাদ দিয়ে বাকি অংশকে মান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
এই প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রযুক্তি কখনো কেবল ভাষা বহন করে না, প্রযুক্তি ভাষার চেহারাও নির্ধারণ করে। উনিশ শতকে যে বাংলা হরফ ছাপাখানায় টিকে গেল, তা কোনো নিরপেক্ষ, স্বতঃস্ফূর্ত বিবর্তনের ফল নয়। বরং তা নির্ধারিত হয়েছিল কোন যুক্তাক্ষর ছাপাখানার জন্য সাশ্রয়ী, কোনটি সহজে ঢালাই করা যায়, এসব প্রায়োগিক বিবেচনায়। পরবর্তীতে ঊনবিংশ শতকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যখন বাংলা বর্ণমালার সরলীকৃত রূপ প্রস্তাব করেন, পঞ্চাননের তৈরি করা মূল হরফের জায়গা নিতে শুরু করে সেই নতুন, তুলনামূলক সহজ কাঠামো, এমনটাই জানা যায় নানা সূত্র থেকে, যার মধ্যে আছে টাইপ ড্রয়ার্সের একটি আলোচনা। অর্থাৎ বাংলা হরফের ইতিহাসে শিক্ষা-সংস্কারও একধরনের টাইপোগ্রাফিক হস্তক্ষেপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা প্রশ্ন তোলে, কার হাতে থাকে একটি ভাষার আদর্শ চেহারা ঠিক করার ক্ষমতা।
রাজনীতিতে বাংলা হরফ
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব বাংলা পরিণত হয় পূর্ব পাকিস্তানে। মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঘোষণা দেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অথচ পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। প্রতিবাদ শুরু হয়, এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান আবুল বরকত, আবদুস সালাম, রফিক উদ্দিন আহমদসহ আরও অনেকে। এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতিতে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, এই ইতিহাস বাংলাপিডিয়ায় সবিস্তারে লিপিবদ্ধ আছে।
এখানে সরলীকরণ করা ঠিক হবে না। ভাষা আন্দোলন ছিল মূলত মৌখিক ভাষার স্বীকৃতির লড়াই, বাংলা লিপি বা টাইপফেসের নকশা নিয়ে সরাসরি আন্দোলন সেটি ছিল না। কিন্তু এই আন্দোলনের একটি গভীর টাইপোগ্রাফিক ফলাফল ছিল, তা হলো বাংলা লিপি নিজেই এক জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়। শহীদ মিনারের গায়ে খোদাই করা বাংলা অক্ষর, একুশে ফেব্রুয়ারির পোস্টারে ব্যবহৃত হরফ, স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রীয় নথিতে বাংলার প্রাধান্য, এসবই সেই লড়াইয়ের দৃশ্যমান উত্তরাধিকার। যে ভাষার জন্য রক্ত ঝরেছিল, সেই ভাষার প্রতিটি অক্ষরই যেন এক ধরনের রাজনৈতিক ওজন বহন করতে শুরু করে। স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারি সাইনবোর্ড, মুদ্রা, পাঠ্যবই, সবখানেই বাংলা হরফের উপস্থিতি হয়ে ওঠে জাতীয় সার্বভৌমত্বের একটি নীরব ঘোষণা।
পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশ একই বাংলা লিপি ব্যবহার করে, কিন্তু দুই জায়গার মুদ্রিত বাংলা একরকম দেখতে নয়। এর একটি বড় কারণ লুকিয়ে আছে বিংশ শতকের আশির দশকে। ভারতীয় সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকার জন্য টাইপ ডিজাইনার ফিওনা রস এবং টিম হ্যালোওয়ে ১৯৮২ সালে যে লিনোটাইপ বেঙ্গলি তৈরি করেন, তা পরবর্তীতে হয়ে ওঠে গোটা উপমহাদেশের বাংলা মুদ্রণের অলিখিত মানদণ্ড। বাংলা টাইপ ফাউন্ড্রির গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে পরিচিত অধিকাংশ জনপ্রিয় হরফ, যেমন সুতন্বীএমজে, সোলাইমানলিপি, বৈশাখী, এসবই মূলত সেই লিনোটাইপ বেঙ্গলির অনুলিপি, সামান্য পরিবর্তন সহ। মজার ব্যাপার, ঢাকা আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগে এই হরফকে অনেকে ভুল করে বিদ্যাসাগরের নামে চেনেন, যদিও তাঁর সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই, এমনটাই জানায় একই ফাউন্ড্রির আরেকটি নথি।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, একই ভাষা ও একই লিপি কি দুটি ভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের কারণে ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করে? উত্তরটা জটিল। বইয়ের নকশায়, সংবাদপত্রের কলামে, সরকারি নথির গড়নে পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু লক্ষণীয় পার্থক্য গড়ে উঠেছে, তবে তার মূল কারণ ভিন্ন কোনো লিপি-দর্শন নয়। বরং এর পেছনে আছে ভিন্ন বাজার-বাস্তবতা, ভিন্ন প্রকাশনা-অর্থনীতি এবং ভিন্ন প্রযুক্তিগত ইতিহাস। বাংলাদেশে ডিজিটাল বিপ্লব এসেছিল একটি নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক সফটওয়্যারের হাত ধরে, যা পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা পথে এগিয়েছিল, আর সেই গল্পই বাংলা হরফের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়।
প্রযুক্তিতে বাংলার প্রবেশ
আশির দশকে কম্পিউটারে বাংলা লেখার প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত জটিল ও সীমিত। তবে কয়েকজন প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের ধারাবাহিক উদ্ভাবনের পথ ধরেই বাংলা কম্পিউটিংয়ের ভিত্তি তৈরি হয়। সাইফুদ্দাহার শহীদ বুয়েট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে ঢাকায় “ন্যাশনাল কম্পিউটার” নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। আর ১৯৮৫ সালে সেখানেই অ্যাপল ম্যাকিন্টশ কম্পিউটারের জন্য ‘শহীদলিপি’ নামে প্রথম সচল বাংলা কিবোর্ড ও সফটওয়্যার তৈরি করে এই বিপ্লবের সূচনা করেন। ‘শহীদলিপি’ ব্যবহার করে পাক্ষিক ম্যাগাজিন তারকালোক এবং দৈনিক আজাদসহ বেশ কিছু পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর ১৯৮৭ সালে প্রকৌশলী মইনুল ইসলাম ‘মইনুলিপি’ ফন্ট তৈরি করে ম্যাক কম্পিউটারে ডেস্কটপ পাবলিশিংয়ের কাজ সহজ করেন। ১৯৮৮ সালের নভেম্বরে এম শামসুল হক চৌধুরী ডস (DOS) অপারেটিং সিস্টেমের জন্য ‘আবহ’ সফটওয়্যার প্রকাশ করেন, যা অ্যাপলের বাইরে সাধারণ পিসিতে বাংলা টাইপ করার সুযোগ করে দেয়।
তবে এই প্রাথমিক সফটওয়্যারগুলোর লেআউট কিছুটা জটিল ছিল এবং এর ব্যবহার নির্দিষ্ট কিছু প্ল্যাটফর্মেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে এবং বাণিজ্যিক রূপ দিতে সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা মুস্তাফা জব্বার ১৯৮৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর নিয়ে আসেন ‘বিজয়’ কিবোর্ড ও ফন্ট। তিনি যুক্তবর্ণ ও স্বরবর্ণের সহজ একটি লেআউট তৈরি করেন, যা বাংলা টাইপিংয়ের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ব বৌদ্ধিক সম্পত্তি সংস্থা তথা ডাব্লিউআইপিওর একটি নথি অনুযায়ী, প্রথম সংস্করণটি ভারতীয় প্রোগ্রামার দেবেন্দ্র জোশীর সহায়তায় তৈরি হলেও, কিবোর্ড লেআউট আর ফন্ট নকশা ছিল জব্বারের নিজের হাতে গড়া।
পরবর্তীতে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে মাইক্রোসফট উইন্ডোজ গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেস ও ট্রুটাইপ (TrueType) ফন্ট সাপোর্ট নিয়ে এলে বিজয়ের জন্য এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়। বিজয়ের নতুন সংস্করণ উইন্ডোজ প্ল্যাটফর্মের উপযোগী করে তোলায় এটি পেজমেকার ও এমএস ওয়ার্ডের মতো জনপ্রিয় অ্যাপ্লিকেশনগুলোর সাথে সহজে কাজ করতে শুরু করে। বিজয় কিবোর্ডের সহজ লেআউট এবং উইন্ডোজের সর্বজনীন জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে এটি তৎকালীন বাংলা সংবাদপত্র, বই প্রকাশনা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে বাংলা কম্পিউটিংয়ের বাণিজ্যিক বিপ্লব ঘটায়।
কিন্তু বিজয়ের সাফল্যের গল্পে একটি জটিল দিক আছে। এটি ছিল মালিকানাধীন, লাইসেন্সনির্ভর সফটওয়্যার, যা প্রতিটি কম্পিউটারে আলাদা করে কিনতে হতো। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি প্রতিবেদন জানায়, বাংলার মতো একটি মাতৃভাষার জন্য মানুষকে প্রযুক্তিগত অধিকার কিনতে হচ্ছে, এই বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরে অনেকের কাছেই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে গড়ে ওঠে অভ্র, রিদ্মিকের মতো মুক্ত ও বিনামূল্যের বিকল্প, এবং তা নিয়ে আইনি লড়াইও কম হয়নি। মুস্তাফা জব্বার তাঁর কিবোর্ড লেআউটের কপিরাইট রক্ষায় দীর্ঘ আইনি লড়াই চালান, যার একটি অধ্যায় নথিবদ্ধ আছে দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে।
একটি জাতির মাতৃভাষাকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করানোর ক্ষমতা যখন একটিমাত্র ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন তা কি ভাষার গণতন্ত্রায়নে বাধা তৈরি করে? বিজয়ের এনকোডিং পদ্ধতি ছিল অনেকটা এড হক, স্ক্রিন-নির্ভর, যেখানে ফন্ট বদলালেই লেখা এলোমেলো হয়ে যেত। ইউনিকোড আসার পর এই সমস্যার একটি কাঠামোগত সমাধান মেলে। বাংলা লিপি ১৯৯৩ সালে ইউনিকোড ১.১ সংস্করণে যুক্ত হয়, এবং ধীরে ধীরে বাংলা হরফ পুরোনো এনকোডিং-নির্ভরতা থেকে মুক্তি পেতে থাকে। তবে এই মুক্তি সহজ ছিল না, কারণ বাংলা লিপির যুক্তাক্ষর, মাত্রা আর কারচিহ্নের জটিল পুনর্বিন্যাস ইউনিকোডের কাঠামোতে ঠিকভাবে বসাতে প্রয়োজন হয়েছিল সুনির্দিষ্ট শেপিং ইঞ্জিন। মাইক্রোসফটের টাইপোগ্রাফি নথি বিস্তারিতভাবে দেখায় কীভাবে একটি বাংলা যুক্তাক্ষরের সঠিক রূপ পেতে ফন্টের ভেতরে বহু স্তরের নিয়ম কাজ করে, রেফ, হলন্ত, অর্ধরূপ, প্রতিটির জন্য আলাদা প্রযুক্তিগত হিসাব।
টাইপফেস কি সত্যিই নিরপেক্ষ? এই প্রশ্নটাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই বাংলা বাক্য যদি একটি ঐতিহ্যবাহী, কিছুটা ক্যালিগ্রাফিক ধাঁচের হরফে লেখা হয়, আর একই বাক্য যদি লেখা হয় একটি জ্যামিতিক, আধুনিক সান্স-সেরিফ বাংলা টাইপফেসে, তাহলে পাঠকের মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা বদলে যায়। প্রথমটি হয়তো পাঠককে নিয়ে যায় কবিতার বই বা ধর্মগ্রন্থের দিকে, দ্বিতীয়টি হয়তো মনে করায় কোনো প্রযুক্তি সংস্থার বিজ্ঞাপন বা কর্পোরেট প্রতিবেদন। টাইপফেস তাই শুধু শব্দকে দৃশ্যমান করে না, শব্দের অর্থ পৌঁছানোর আগেই একটি সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করে ফেলে। সরকারি নথিতে ব্যবহৃত হরফ কর্তৃত্বের ভাষা বলে, ধর্মীয় প্রকাশনার হরফ পবিত্রতার আবহ তৈরি করে, বিজ্ঞাপনের হরফ চঞ্চলতা আর আধুনিকতার বার্তা দেয়। বাংলা ভাষাভাষীরা প্রতিদিন এই সূক্ষ্ম সংকেতগুলো গ্রহণ করেন, প্রায়শই সচেতন না হয়েই।
বর্তমান প্রজন্মের হাতে হরফের ভবিষ্যৎ
গত দশকে বাংলাদেশে স্বাধীন টাইপ ফাউন্ড্রির উল্লেখযোগ্য ঢেউ দেখা গেছে, এবং এই ঢেউয়ের প্রতিটি ঢিল একে অপরের থেকে ভিন্ন পথে হাঁটছে। লিপিঘর নামের একটি প্ল্যাটফর্ম ২০১৮ সালে দুই ডিজাইনারের হাতে গড়ে ওঠে, একজন ঢাকার, একজন কলকাতার। এই প্ল্যাটফর্ম শত শত স্বাধীন ডিজাইনারের হাতে তৈরি বাংলা ফন্ট প্রকাশ করেছে এবং কোটির বেশি ডাউনলোড হয়েছে সেসব ফন্টের। লিপিঘরের মডেল ছিল অনেকটা উন্মুক্ত বাজারের মতো, যে কেউ একটি ফন্টের কাঠামো তৈরি করে জমা দিতে পারতেন, বাকি গ্লিফগুলো ফাউন্ড্রি নিজে সম্পূর্ণ করে দিত, আর প্রকাশের বিনিময়ে ডিজাইনার একটা নির্দিষ্ট সম্মানী পেতেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম কোডপত্র। তবে এটি প্রচলিত অর্থে শুধু একটি টাইপ ফাউন্ড্রি না। বাংলা ভাষার ডিজিটাল ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত সফটওয়্যার ও টাইপোগ্রাফিকে একই পরিসরে নিয়ে আসা একটি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম। তাদের বর্ণ নামের বাংলা টাইপিং সফটওয়্যারের পাশাপাশি রয়েছে বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্য তৈরি ও সংগ্রহ করা বাংলা ফন্টের একটি ক্যাটালগ। এই ক্যাটালগে যেমন রয়েছে তাদের নিজস্ব তৈরি ফন্ট, তেমনি বিভিন্ন স্বাধীন ডিজাইনারের কাজও। তাদের ওয়েবসাইটে ফন্টগুলোকে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য বিনামূল্যে উপলব্ধ একটি টাইপোগ্রাফিক সংগ্রহ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সময়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাম বাংলা টাইপ ফাউন্ড্রি নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ভিন্ন পথে হাঁটে, বেঙ্গল ক্রিয়েটিভ মিডিয়ার অধীনে চালু হওয়া এই স্টুডিও মূলত গবেষণাভিত্তিক, বাংলা হরফের ঐতিহাসিক পরম্পরা নিয়ে গভীর অনুসন্ধান আর নথিপত্র প্রকাশে তাদের মনোযোগ বেশি, তবে বাণিজ্যিক ফন্টও বিক্রি করে। এছাড়াও রয়েছে বেঙ্গল ফন্টস, যাদের কাজ মূলত জ্যামিতিক ও আধুনিক সান্স-সেরিফ ধাঁচের টাইপফেস নির্মাণে কেন্দ্রীভূত। এর পাশাপাশি ‘ফন্টবিডি’ (FontBD)-র মতো প্ল্যাটফর্মগুলোও বাংলা ফন্ট ডিরেক্টরি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটি মূলত একটি উন্মুক্ত আর্কাইভ বা ডিস্ট্রিবিউশন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে, যেখানে নতুন-পুরোনো অসংখ্য বাংলা ইউনিকোড ও এএনএসআই (ANSI) ফন্টকে সাধারণ ব্যবহারকারী ও ডিজাইনারদের জন্য সহজে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলে ধরা হয়েছে।
এই তালিকায় রয়েছে লিপিকলা টাইপ ফাউন্ড্রি, ঢাকাভিত্তিক একটি ইনডিপেন্ডেন্ট স্টুডিও যেটি ২০২৪ সালে যাত্রা শুরু করে। তাদের প্রথম টাইপফেস দ্রোহ প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময়, বলিষ্ঠ, কৌণিক রেখার এই ফন্ট প্রতিরোধ আর তারুণ্যের ভাষা বহন করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়, এমনটাই জানায় ফাউন্ড্রির নিজস্ব ওয়েবসাইট। এক বছর পর, ২০২৫ সালের অগাস্টে, লিপিকলা তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একসঙ্গে বারোটি নতুন বাংলা টাইপফেস প্রকাশ করে, প্রতিটির নাম বাংলা বর্ষপঞ্জির একেকটি মাসের নামে। এই প্রকাশনা উপলক্ষে ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত হয় লিপিকলা টাইপটক শীর্ষক এক আলোচনা সভা, যেখানে স্পিকাররা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটের কথা তুলে ধরেন, বাংলা টাইপ ডিজাইনাররা বেশিরভাগ সময় নজরকাড়া ডিসপ্লে হরফ নিয়েই বেশি মনোযোগী, অথচ বই প্রকাশনার মেরুদণ্ড যে টেক্সট টাইপফেস, তার মানসম্পন্ন নকশার ঘাটতি এখনো প্রকট, এই পর্যবেক্ষণ লিপিকলার নিজস্ব প্রকাশনায় নথিবদ্ধ আছে। এই পর্যবেক্ষণ আসলে গোটা বাংলা টাইপ শিল্পের একটি কাঠামোগত সমস্যাকেই সামনে আনে, দীর্ঘ পাঠ্যের জন্য উপযোগী, চোখে আরামদায়ক টেক্সট ফেস তৈরি করা প্রদর্শনী হরফ তৈরির চেয়ে অনেক বেশি শ্রমসাধ্য আর অনেক কম আকর্ষণীয়, ফলে বাজারের চাহিদা আর বাংলা টাইপোগ্রাফির প্রকৃত প্রয়োজনের মধ্যে একটা ফাঁক থেকেই যায়।
তবে এই ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক টেকসইতা এখনো এক বড় সংকট। একটি সম্পূর্ণ বাংলা ফন্টে প্রায় পাঁচশোর কাছাকাছি গ্লিফ দরকার হয়, যেখানে একটি ইংরেজি ফন্টের জন্য প্রয়োজন হয় অনেক কম। এই বাড়তি শ্রম আর জটিলতার তুলনায় বাংলা ফন্টের বাণিজ্যিক বাজার এখনো সংকীর্ণ, ফলে অনেক প্রতিভাবান ডিজাইনার পূর্ণকালীন টাইপ ডিজাইনকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে দ্বিধা করেন। পাইরেসির সমস্যাও দীর্ঘদিনের, একটি ফন্ট প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই তার নকল সংস্করণ ছড়িয়ে পড়ে বিনামূল্যে, যা মূল ডিজাইনারের আয়ের পথ সংকুচিত করে। এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যাঁরা এখনো মৌলিক বাংলা টাইপফেস তৈরি করছেন, তাঁদের কাজ অনেকটাই সাংস্কৃতিক অঙ্গীকারের জায়গা থেকে চালিত, নিছক বাণিজ্যিক হিসাব থেকে নয়। প্রতিষ্ঠানভেদে মডেল আলাদা, কেউ উন্মুক্ত ও বিনামূল্যের পথ বেছে নিয়েছে, কেউ গবেষণা-নথিপত্রকে প্রধান কাজ ধরেছে, কেউ আবার সাংস্কৃতিক ঘটনাপ্রবাহকে টাইপফেসের জন্মমুহূর্ত হিসেবে বেছে নিয়েছে, কিন্তু সবার লক্ষ্য একটাই, বাংলা হরফকে লিনোটাইপ বেঙ্গলির ছায়া থেকে বের করে আনা এবং প্রমাণ করা যে এই ভাষার দৃশ্যরূপ এখনো ক্রমবিকাশমান, স্থবির নয়।
যন্ত্রের চোখে বাংলা অক্ষরের জটিলতা
বাংলা লিপির প্রযুক্তিগত জটিলতা এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। বাংলায় প্রায় আশিটির বেশি ব্যঞ্জন-যুক্তাক্ষর প্রচলিত আছে, যেগুলোর প্রতিটির নিজস্ব দৃশ্যরূপ থাকতে পারে। একটি ফন্ট ডিজাইনারকে তাই কেবল মৌলিক বর্ণ নয়, শত শত সম্ভাব্য সংযুক্তির দৃশ্যরূপও আলাদাভাবে ভাবতে হয়। ওপেনটাইপ প্রযুক্তির অভ্যন্তরে রেফ, হলন্ত রূপ, অর্ধরূপ, প্রাক-ভিত্তিক আর অনু-ভিত্তিক প্রতিস্থাপন, এসব বিভিন্ন স্তরের নিয়ম একটির পর একটি প্রয়োগ করে তবেই একটি বাংলা শব্দ পর্দায় সঠিকভাবে ফুটে ওঠে, এই জটিল প্রক্রিয়া ওপেনটাইপ শেপিং সংক্রান্ত একটি প্রযুক্তিগত নথিতে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে। গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যাপল, অ্যাডোবি, প্রত্যেকের নিজস্ব শেপিং ইঞ্জিন আছে, আর প্রায়ই এক প্ল্যাটফর্মে ঠিকঠাক দেখানো একটি বাংলা যুক্তাক্ষর অন্য প্ল্যাটফর্মে ভেঙে যায়। গুগলের নোটো সান্স বেঙ্গলি প্রকল্প এই সমস্যার একটি সমাধানচেষ্টা হিসেবে এসেছিল, যেখানে টাইপ স্টুডিও টিরো টাইপওয়ার্কসের সঙ্গে মিলে বাংলাসহ একাধিক ভারতীয় লিপির জন্য আধুনিক, সামঞ্জস্যপূর্ণ হরফ তৈরির চেষ্টা হয়, এমনটাই জানায় গুগল ডিজাইনের একটি নথি।
এখন প্রশ্ন উঠছে ভিন্ন এক স্তরে। জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণ ডেটায় বাংলার মতো ভাষার প্রতিনিধিত্ব এখনো ইংরেজি বা চীনা ভাষার তুলনায় সীমিত, আর এই অসামঞ্জস্য সরাসরি প্রভাব ফেলে এআই কতটা ভালোভাবে বাংলা হরফ চিনতে, তৈরি করতে বা সংশোধন করতে পারবে তার ওপর। একটি অ্যালগরিদম যদি ভবিষ্যতে বাংলা টাইপফেস তৈরি করে, তার নকশার উৎস আসলে হবে অতীতের হাজারো মানুষের হাতে তৈরি করা হরফের সংকলন, নিজস্ব কোনো সাংস্কৃতিক বোধ নয়। তাই প্রশ্নটা দাঁড়ায়, একটি যন্ত্রনির্মিত হরফ কি সাংস্কৃতিক অর্থে সত্যিই বাংলা হতে পারে, নাকি তা কেবল পুরোনো নকশার একটি পরিসাংখ্যিক প্রতিধ্বনি? বাংলা ফন্টের মালিকানা আর কপিরাইটের প্রশ্নও নতুন করে জটিল হয়ে উঠছে, কারণ একটি এআই মডেল যদি হাজারো বিদ্যমান বাংলা ফন্ট থেকে শিখে নতুন হরফ তৈরি করে, তাহলে সেই নতুন হরফের ওপর মৌলিকত্বের দাবি কতটা টেকসই, তা এখনো আইনগতভাবে অমীমাংসিত।
আমরা যখন প্রতিদিন মোবাইলের স্ক্রিনে বাংলা পড়ি, কোনো বইয়ের পাতা উল্টাই বা রাস্তার একটি সাইনবোর্ডের দিকে তাকাই, তখন হয়তো আমরা কেবল শব্দ পড়ছি না। আমরা পড়ছি আড়াই শতাব্দীর প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত, ঔপনিবেশিক ছাপাখানা, ভাষার জন্য দেওয়া রক্ত, এবং একটি স্বাধীন দেশের নিজেকে দৃশ্যমান করে তোলার লড়াই। হরফকে আমরা প্রায়ই ভাষার পোশাক ভেবে ভুল করি। বাস্তবে হরফ ভাষার অবকাঠামো, তার হাড়গোড়। একটি জাতি তার ভাষায় কী লেখে তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সেই ভাষাকে মানুষ কীভাবে চোখে দেখে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ এক প্রশ্ন। প্রশ্ন হলো, এই দৃশ্যমান বাংলার ভবিষ্যৎ এখন কে লিখছে?