জাহাজের ডেক থেকে বিশ্বমঞ্চে
জুলাই, ১৯৩০। দক্ষিণ আটলান্টিকের নোনা জল ছিদ্র করছে এস.এস. কন্তে ভের্দে, একটি ইতালীয় যাত্রীবাহী জাহাজ। এর ডেকে দাঁড়িয়ে আছে জুলস রিমে। ফরাসি ফুটবল কর্মকর্তা, মুদি দোকানদারের ছেলে, পেশায় আইনজীবী, কিন্তু স্বপ্নে একজন বিশ্ব-নির্মাতা। তাঁর হাতের ব্রিফকেসের ভেতরে রয়েছে একটি সোনালি ট্রফি, নাইকি দেবীর আদলে গড়া, যার নাম তখন ‘ভিক্টোরি’। জাহাজের অন্য যাত্রীরা জানেন না যে এই ভদ্রলোকের ব্যাগের ভেতরে লুকিয়ে আছে একশ বছর ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকা এক স্বপ্নের বীজ। বিশ্বকাপ। আর, কেউ কেউ যুক্তি দেবেন, জন্ম নিচ্ছে এক দুর্নীতির সাম্রাজ্যেরও।
আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে কোনও বড় প্রতিষ্ঠানের জন্মই হয় এক আপাত-পাগলামি থেকে। অলিম্পিকের খাঁচায় বন্দি ফুটবল তখন শুধু অপেশাদারদের খেলা, যেখানে দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলো পেশাদারিত্বের নিরিখে ইউরোপকে মাত করে দিচ্ছে, অথচ অলিম্পিকের নিয়মে তাঁরা অংশ নিতে পারছেন পুরোপুরি নয়। ১৯২৮ সালের অ্যামস্টারডাম কংগ্রেসে রিমে যখন তাঁর প্রস্তাব পেশ করলেন, তখন ফিফার ভাইস প্রেসিডেন্ট অঁরি দেলোনে বলে উঠলেন, “আন্তর্জাতিক ফুটবল আর অলিম্পিকের সীমানায় আটকে থাকতে পারে না।” সেদিন হয়তো কেউ বুঝতে পারেনি, এটা শুধু ক্রীড়ার সংস্কার নয়। এটি ছিল এক বিশ্বাসের ঘোষণা, যে ফুটবল একটি সার্বজনীন ভাষা হতে পারে, রাজনীতির উর্ধ্বে। কিন্তু সে ভাষার ব্যাকরণ কে লিখবে, আর তার প্রকাশনী থেকে লাভ কে পাবে, সেই প্রশ্নটিই আজ আমাদের সামনে।
উরুগুয়ে যখন হাত তুলল আয়োজক হওয়ার জন্য, তাঁরা শুধু স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপন করতে চাননি; তাঁরা ইউরোপীয় দলগুলোর যাতায়াত খরচও দিতে রাজি হলেন। কিন্তু ইউরোপ রাজি হলো না। দুই মাস বাকি থাকতেও একটি দল নিজেদের নাম নিবন্ধন করেনি। রিমের ব্যক্তিগত কূটনীতিতে শেষমেশ চারটি ইউরোপীয় দল সাগর পাড়ি দিল। বেলজিয়াম, ফ্রান্স, রোমানিয়া, যুগোস্লাভিয়া। মোট ১৩টি দেশ। প্রথম ম্যাচের প্রথম গোলটি এল ১৩ জুলাই, লুসিয়েন লরাঁর পা থেকে, ১৯ মিনিটে। ফ্রান্স বনাম মেক্সিকো। তখন কেউ জানত না যে এই মুহূর্তটির নাম লেখা হবে ইতিহাসে; তাঁরা কেবল খেলছিলেন। ফাইনালে উরুগুয়ে আর্জেন্টিনাকে হারাল ৪-২ গোলে, রিমে ট্রফিটি তুলে দিলেন উরুগুয়ের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধানের হাতে। আর শুরু হলো একটি ঐতিহ্যের । একটি ট্রফি যা চুরি হবে, লুকানো হবে, গলিয়ে সোনার বার বানানো হবে, আবার ফিরে আসবে, আবার হারিয়ে যাবে।
এই ট্রফির জীবন ইতিহাস যেন কোন গোয়েন্দা উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিরা যখন ইতালি দখল করতে আসছিল, ফিফার ইতালীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট অট্টোরিনো বারাসি ট্রফিটি ব্যাংক থেকে সরিয়ে নিজের জুতার বাক্সে ঢুকিয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখলেন। যুদ্ধ শেষ হলো, ট্রফি রিল বেঁচে। সাল ১৯৬৬, লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার সেন্ট্রাল হলে প্রদর্শনী থেকে ট্রফিটি চুরি হয়ে গেল। সাত দিন পর, দক্ষিণ লন্ডনের এক বাগানের ঝোপে, খবরের কাগজে মোড়ানো অবস্থায় এটি খুঁজে পেল পিকলস নামের এক ভদ্রলোক, না না দুঃখিত কোনো মানুষ না। বরং পিকলস নামের এক কুকুর। পুলিশ নয়, কুকুর! ব্রাজিল ১৯৭০ সালে তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে পেল।
কিন্তু ১৯৮৩ সালে রিওর ফুটবল কনফেডারেশনের অফিস থেকে ট্রফিটি আবার চুরি হলো, এবার আর ফেরত আসেনি, ধারণা করা হয় গলিয়ে ফেলা হয়েছে। আজ যে ট্রফিটি চ্যাম্পিয়নরা মাথার ওপরে তোলেন, সেটি ১৯৭৪ সালের, সিলভিও গাৎসানিগার ডিজাইন করা, ১৮ ক্যারেট সোনার, দুই মানবমূর্তি পৃথিবী তুলে ধরছে। যেন ইঙ্গিত দেয় যে খেলা যখন বিশ্বকে ধারণ করে, তখন খেলাটি আর খেলা থাকে না, তা হয়ে ওঠে রাজনীতি, অর্থ, এবং ক্ষমতার প্রতীক।
অলাভজনক টাকার পাহাড়, ফিফার অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য
এই প্রতীকটির পেছনের প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে বলে অলাভজনক। ফিফার পুরো নাম Fédération Internationale de Football Association; সুইজারল্যান্ডের আইনে নিবন্ধিত, যার কোনো মালিক নাই। কেবল ২১১টি সদস্য রাষ্ট্র, প্রত্যেকের সমান ভোট, ফিজি আর ব্রাজিলের ভোট সমান। এই কাঠামোটি দেখতে আদর্শ গণতান্ত্রিক, কিন্তু এর আর্থিক চিত্র দেখলে হাসি পায়, অথবা কান্না। ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ফিফার আনুমানিক রাজস্ব ৮.৯ বিলিয়ন ডলার। প্যারিস অলিম্পিকের আয় ছিল সাড়ে চার বিলিয়ন; একটি চার বছরে একবার হওয়া ফুটবল টুর্নামেন্ট অলিম্পিকের দ্বিগুণ আয় করছে, যেখানে অলিম্পিকে শতাধিক ক্রীড়া।
এই টাকা আসে সম্প্রচার স্বত্ব থেকে ৩.৯ বিলিয়ন, টিকিট ও আতিথেয়তা থেকে ৩ বিলিয়ন, স্পনসরশিপ থেকে ১.৮ বিলিয়ন। অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা, ভিসা, হুয়াওয়ে, এমিরেটস, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কর্পোরেশনগুলো। প্রাইজ মানি? ৮৭১ মিলিয়ন ডলার, গ্রুপ পর্বে বিদায় নিলেও ৯ মিলিয়ন নিশ্চিত। আর এই টাকার একটি অংশ ‘ফিফা ফরওয়ার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে ছোট দেশগুলোতে ফেরত যায়, প্রতি চক্রে সর্বোচ্চ ৮ মিলিয়ন ডলার। এই অর্থই ছোট দেশগুলোকে ইনফান্তিনোর প্রতি বিশ্বস্ত রাখে, কারণ তাঁর কথায়, “তোমাদের ৭০ শতাংশের কাছে ফিফার সম্পদ না থাকলে কোনো ফুটবলই থাকত না।” এ কথা শুনলে মনে হয় ফিফা যেন একটি সফল ওয়েলফেয়ার স্টেট, যার নেতা একা হাতে অর্থ বিতরণ করেন। কিন্তু এই বিতরণের রাজনীতি বোঝার জন্য আমাদের খুলতে হবে ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায়।
১৯৯৮ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ফিফার সভাপতি ছিলেন সেপ ব্লাটার, যিনি এই অর্থের প্রবাহকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর অধীনেই ফিফা একটি ক্রীড়া সংস্থা থেকে এক বৈশ্বিক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। কিন্তু এই সাম্রাজ্যের ভিতের ইটগুলো ছিল কতটা স্বচ্ছ, তা বুঝতে আমাদের যেতে হবে ২০১৫ সালের মে মাসে।
হোটেলের দরজায় পুলিশ, কালো অধ্যায় ও ‘সংস্কারক’ ইনফান্তিনো
সেই অধ্যায়ের নাম ২০১৫। ২৭ মে, ভোরবেলা, সুইজারল্যান্ডের বের আও লাক হোটেলে, যেখানে রাত্রিপ্রতি ভাড়া ৪ হাজার ডলার — সুইস পুলিশ ঢুকে সাত ফিফা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে। মার্কিন বিচার বিভাগের অভিযোগ: দুই দশকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার ঘুষ। অ্যাটর্নি জেনারেল লরেটা লিঞ্চ ঘোষণা করলেন, “দুই প্রজন্মের ফুটবল কর্মকর্তারা ফিফাকে একটি দুর্নীতির সাম্রাজ্যে পরিণত করেছেন।” গ্রেফতারের দুই দিন পর সেপ ব্লাটার পুনর্নির্বাচিত হলেন, তারপর পদত্যাগ করলেন। অক্টোবরে ব্লাটার ও ইউয়েফা প্রেসিডেন্ট মিশেল প্লাতিনিকে সাসপেন্ড করা হলো। ব্লাটারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল আর্থিক অনিয়ম, ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার বিক্রিতে ঘুষ নেয়ার। তবে তিনি চূড়ান্তভাবে দোষী প্রমাণিত আর হননি, ২০২১ সালে সুইস আদালতে বেকসুর খালাস পেলেন ব্লাটার। মোট ৪১ জন গ্রেফতার হয়েছিলেন, ১৪ জন দোষী সাব্যস্ত হয়। র্যাকেটিয়ারিং, ওয়্যার ফ্রড, মানি লন্ডারিং, এ অভিযোগের পাহাড় নিয়ে ফিফা দাঁড়িয়ে আছে আজও।
তারপর এলেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, একজন সুইস-ইতালীয় আইনজীবী, আসলেন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। ২০১৬ সালে ফিফার রাজস্ব ছিল ৫০২ মিলিয়ন ডলার; ২০২৫ সালে তা ২.৬৬ বিলিয়ন। সংখ্যার দিক থেকে চমৎকার, কিন্তু সমালোচকেরা বলেন, ফিফার কাঠামোয় ক্লাবগুলো বাইরে, খেলোয়াড়রা তারও বাইরে, ভক্তরা এতটাই বাইরে যে দেখাই যায় না। ইনফান্তিনো কীভাবে ক্ষমতা ধরে রাখেন? ছোট দেশগুলোর ভোটের মাধ্যমে, এবং ২০২৪ সালে সৌদি আরবকে ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক ঘোষণা করা হয় কোনো প্রতিযোগিতামূলক বিডিং ছাড়াই। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সৌদির মানবাধিকার রিপোর্টকে ‘হোয়াইটওয়াশ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে; ইনফান্তিনো ব্যক্তিগতভাবে রিয়াদে বাস করেন। ২০২৫ সালে ফিফা ট্রাম্প টাওয়ারে অফিস খুলল, এবং ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ফিফা ‘পিস প্রাইজ’ দিল ডোনাল্ড ট্রাম্পকে, মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র নিন্দা জানাল। এ যেন এক বিশাল গণপর্ব, যেখানে পুরস্কার দিচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি পুরস্কারের অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেন; প্রশ্ন জাগে, শান্তি কি অর্থ দিয়ে কেনা যায়, নাকি অর্থই এখানে শান্তির সংজ্ঞা?
এর আগে কাতার। ২০২২ বিশ্বকাপের অবকাঠামো নির্মাণে কাফালা ব্যবস্থার অধীনে হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিক কাজ করেছেন। তীব্র গরম, শ্রম শোষণ, মৃত্যু। দ্য গার্ডিয়ানের ২০২১ সালের তদন্ত অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে কাতারে কমপক্ষে ৬,৫০০ প্রবাসী শ্রমিক মারা গেছেন। কাতারের সুপ্রিম কমিটির সেক্রেটারি জেনারেল আল-তাওয়াদি স্বীকার করেছেন বিশ্বকাপ সংশ্লিষ্ট নির্মাণে “৪০০ থেকে ৫০০” শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ফিফা-নিযুক্ত স্বাধীন তদন্ত বলেছে, ২০১০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত কাতারে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে। মৃত্যু, আঘাত, মাসের পর মাস বেতন না পাওয়া। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, কাতার ও ফিফা উভয়ই মৃত শ্রমিকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ফিফাকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছে। ফিফার জবাব? একটি ৫০ মিলিয়ন ডলারের ‘লেগেসি ফান্ড’ তৈরির প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এনপিআর রিপোর্ট করেছে যে রিপোর্ট প্রকাশের দুদিন আগেই ফিফা ঘোষণা করে এই ফান্ড শ্রমিকদের নয়, “আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রকল্পে” ব্যয় হবে। অর্থাৎ, ক্ষতিপূরণের নামে আরও একটি উন্নয়নমুখী প্রকল্প, যার হিসাব কে দেবে?
দর্শকের চোখে দ্বন্দ্ব। ভালোবাসা আর সতর্কতার মধ্যবর্তী প্রান্তরে
এই সবকিছুর মধ্যেও আমরা খেলা দেখি, গোল দেখি, উচ্ছ্বাস দেখি। ৩.২ বিলিয়ন মানুষ। পৃথিবীর ৪৬.৪ শতাংশ জনসংখ্যা আর একটি বিশ্বকাপ দেখেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের শিশু আর ওয়াল স্ট্রিটের ব্রোকার, দুজনেই একই সময়ে একই মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকে; এই ক্ষণিক সাম্য অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন। ১৯৫০ সালে উরুগুয়ে ব্রাজিলকে হারানো শুধু ফুটবল জয় ছিল না। ছিল একটি দেশের জাতীয় পরিচয়ের নিশ্চিতকরণ। ২০১০ সালে ঘানার কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানো আফ্রিকা মহাদেশের গর্ব হয়ে গেল। ফিফার ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম, যাই হোক তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, বাংলাদেশ-বলিভিয়া-বেনিনের মতো ছোট ফুটবল সংগঠনগুলোকে সত্যিই অবকাঠামো তৈরিতে সাহায্য করে। হয়তো এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আর্টের সেই পুরোনো দ্বন্দ্ব, শিল্পী যেমন তাঁর শিল্পের জন্য অর্থের সাথে আপস করেন, তেমনি ফুটবলও তার বিশ্বজনীনতার জন্য অর্থের কাছে আপস করে।
আর এখন সামনে ২০২৬ বিশ্বকাপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজক। ৪৮টি দল, ১০৪টি ম্যাচ, প্রথমবারের মতো সুপার বোল-স্টাইলের হাফটাইম শো। এই বিশ্বকাপে টিকিটের ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’-এর কারণে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে, ফাইনালের একটি টিকিটের রিসেল মূল্য উঠেছে ১১.৫ মিলিয়ন ডলারে। প্রশ্ন হলো, সেই আপসের সীমা কোথায়? কোন মূল্যে আমরা ফুটবলকে বিশ্বের ভাষা বানাতে রাজি?
জুলস রিমে যখন ১৯৩০ সালে সেই ট্রফি নিয়ে জাহাজে উঠেছিলেন, তাঁর স্বপ্ন ছিল ফুটবলকে বিশ্বের ভাষা করা। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভাষার যেমন ব্যাকরণ আছে, নিয়ম আছে, তেমনি এই ভাষার ব্যাকরণ লিখেছেন কারা? তারা কি খেলোয়াড়? তারা কি ভক্ত? নাকি তারা বসে আছেন জেনেভার অফিসে, সুইজারল্যান্ডের অলাভজনক আইনের আড়ালে, আর হিসাব করছেন কোটি কোটি ডলারের প্রবাহ? ফিফা এমন এক প্রতিষ্ঠান যার গঠনতন্ত্র দুর্নীতির জন্য মাটি প্রস্তুত রাখে, যার জবাবদিহিতা দুর্বল, যার প্রেসিডেন্টরা স্বৈরশাসকের সাথে বন্ধুত্ব করেন এবং মানবাধিকারকে টুর্নামেন্টের শর্তের বাইরে রাখেন। কিন্তু একইসঙ্গে ফিফা এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার তত্ত্বাবধানে ১৩টি দেশ নিয়ে শুরু হওয়া টুর্নামেন্ট এখন ৪৮টি দেশের, যেখানে বাংলাদেশও কোয়ালিফাই করার স্বপ্ন দেখে।
বিশ্বকাপ দেখতে পারেন, তার আনন্দ নিতে পারেন, গোলের মুহূর্তে চিৎকারও দিতে পারেন। কিন্তু এই আনন্দের সঙ্গে রাখুন একটু হিসাবও। যে ট্রফিটি ওপরে তোলা হয়, তার নিচে রয়েছে কত অদেখা মৃত্যু, কত চুরি যাওয়া স্বপ্ন, কত পুনঃব্র্যান্ডেড ঘুষ। সম্ভবত এই দ্বন্দ্বকে মেনে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে বাস্তবতা। যে কোনও বড় স্বপ্নই কিছু পঙ্কিলতাকে আশ্রয় দেয়, কিন্তু সেই স্বপ্নের মূল্য যদি ভক্তের চোখের জলে মাপা হয়, তবে তার হিসাব অন্যরকম। ফিফা কখনো আদর্শ সংগঠন হবে না, কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা আদর্শবাদী থাকতে পারে।