চুমু খাওয়া হচ্ছে মানুষের অন্তরঙ্গতা প্রকাশের অন্যতম আচরণ। কিন্তু এর উৎপত্তি আশ্চর্যজনকভাবে রহস্যময়। আমরা সাধারণত চুমু খাওয়া বলতে বুঝি, ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের সংযোগ। যেখানে আছে চুষে নেয়া আর চাপ দেয়া। এভাবে ব্যখ্যা করলে ব্যপারটা অরোমান্টিক শোনায়।
কিন্তু মানুষ কেন চুমু খায়?
ঐতিহাসিকভাবে, বিভিন্ন সংস্কৃতিতে চুমুর আলাদা আলাদা অর্থ আছে৷ খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সালের প্রাচীন মেসোপটেমিয়ান টেক্সটে মানুষের চুমুর নথি পাওয়া যায়। প্রাচীন রোমানদের মাঝে তিন ধরণের চুমুর রেওয়াজ ছিল–
১. Osculum: সামাজিক সৌজন্যসূচক গালে চুমু খাওয়া।
২. Basium : পার্টনার বা পরিবারের কারো ঠোঁটে কামনাহীন চুমু খাওয়া।
৩. Savium: প্রেমিক প্রেমিকা পরস্পর আবেগপূর্ণ হয়ে চুমু খাওয়া।
স্পষ্টত, চুমু দীর্ঘকাল যাবত প্রেমের অভিব্যক্তির চেয়েও অনেক বেশি কিছু। জনপ্রিয় হলেও, সারাদুনিয়ায় চুমুর প্রচলন নেই । ২০১৫ সালে American Anthropologist জার্নালে প্রকাশিত ১৬৮টি সংস্কৃতির ওপর একটি গবেষণায় বলা হয়, মাত্র ৪৬ শতাংশ সংস্কৃতিতে ঠোঁট ঠোঁট রেখে চুমু খাওয়ার প্রচলন রয়েছে । অনেক সংস্কৃতিতে, তারা চুমু খায় না। তারা তাদের ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করে অন্যভাবে।
পাপুয়া নিউ গিনির কাছে অবস্থিত ট্রব্রিয়ান্ড দ্বীপপুঞ্জে প্রেমিক প্রেমিকারা একে অন্যের চোখের পাপড়ি আলতোভাবে কামড়ে ভালোবাসা প্রকাশ করে। মজার ব্যাপার হলো, চার্লস ডারউইন তার বিশ্বভ্রমণে মালয়দের চুমুর বর্ণনা করেন, যেখানে মানুষ উবু হয়ে একে অন্যের গায়ের গন্ধ শুঁকে। এটা ইঙ্গিত করে, গন্ধও মানুষের অন্তরঙ্গতায় একটা ভূমিকা পালন করতে পারে। বায়োলজি কি আমাদের বুঝতে সাহায্য করতে পারে, কেন আমরা চুমু খাই?
গবেষণা বলে, চুমু মানুষের মাঝে জৈবিক বন্ধন তৈরি করে। কারণ, চুমুর ফলে অক্সিটোসিন নামের এক ধরণের হরমোন নিঃসৃত হয়, যে হরমোন বিশ্বাস এবং অনুরাগের সঙ্গে সংযুক্ত। ‘অক্সিটোসিন’ মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং ঘনিষ্ঠ হওয়ার অনুভূতি তৈরি করে। প্রেমিক প্রেমিকার সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করে তুলে। তাই হয়ত আমরা ঠোঁটে চুমু খাই। কারণ তা ভালো অনুভূতি দেয়।
বির্বতনবাদী তত্ত্ব অনুযায়ী, চুমু খাওয়ার এই অভ্যেস হয়ত মায়ের প্রাথমিক আদর-যত্নের আচরণ থেকে উদ্ভূত হতে পারে, যেমন দুগ্ধপান এবং প্রিমেস্টিকেশন (যেখানে মা খাবার চিবিয়ে সরাসরি শিশুর মুখে তুলে দেন)। এই আচরণ শিম্পাঞ্জির মত প্রাইমেট প্রাণীদের মাঝে এখনো দেখা যায়। হয়ত এটাই ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের সংস্পর্শের ভিত্তি, যা যত্ন আর বন্ধনের সংকেত প্রদান করে।
মানবশিশুরা জৈবিকভাবেই ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের সংস্পর্শকে স্বস্তির আর নিরাপত্তার বোধ করে। আর হয়ত সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়ে এই আচরণ আরো বিস্তৃত সামাজিক আচরণে পরিণত হয়, যার সঙ্গে যত্নশীলতা এবং ইমোশনাল কানেকশনের সম্পর্ক গভীর।
যাহোক, মা ও শিশুর পরস্পর চুমুর উপর ভিত্তি করে চুমুর যে তত্ত্বগুলো, তা হয়ত আমরা কেন রোমান্টিক্যালি চুমু খাই তার পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারে না। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইক এর ইভোলুশনারি সাইকোলজিস্ট ড. এড্রিয়ানো লামেইরা নতুন এক সাহসী তত্ত্ব পেশ করেন। তিনি বলেন, চুমুর উৎপত্তি হয়ত গ্রোমিং বিহেভিয়ার (একে অন্যের শরীর পরিষ্কার-পরিচর্যা করা) থেকে হতে পারে।
প্রাইমেট প্রাণীদের মাঝে প্রায়ই মুখের সংস্পর্শ দেখা যায় গ্রোমিঙের শেষে। যেমন, একটি প্রাইমেট অন্য প্রাইমেটের গায়ে আটকে থাকা ময়লা মুখে সরিয়ে নেয়।
ধীরে ধীরে মানুষ যখন শরীরের লোম হারাতে থাকে, একে অপরের শরীর পরিষ্কার করার অভ্যাসের প্রয়োজন কমে যায়, বলেন লামেইরা। এর ফলে গ্রোমিং এর সময়কালও ছোট হয়ে আসে, শেষ পর্যন্ত ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের সংস্পর্শই ভালোবাসার একটি স্থায়ী অভিব্যক্তি হিসেবে থেকে যায়।
মনে হয়, চুমু একটি জটিল আচরণ যা সম্ভবত আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের আচরণ থেকে বর্তমান রূপ পেয়েছে। চুমুটা আবেগপূর্ণ savium হোক অথবা মৃদু গন্ধ শোঁকা, পরস্পর কাছাকাছি হওয়া এবং ঘনিষ্ঠ হওয়ার এই আচরণ মানুষের সংযোগের গভীর প্রয়োজন পূরণ করে। ●
আর্টিকেলটি ‘বিবিসি সায়েন্স ফোকাস’এ প্রকাশিত স্বাস্থ্য মনোবিজ্ঞানী অ্যাবি জর্ডানের লেখা থেকে অনূদিত