কাগজে বাঁধা রক্তাক্ত জুলাই

জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে শতাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। এই বইগুলো কী রাখছে, আর কী রেখে যাচ্ছে বাদ।

● দ্য পাবলিশ

আগস্ট ১, ২০২৬

কাগজে বাঁধা রক্তাক্ত জুলাই, যে বইগুলো জুলাইকে মনে রাখতে চায়। The Publish

মোশন : মাহমুদ / দ্য পাবলিশ / প্রকাশক ও লেখক


একটি অভ্যুত্থানের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই বইমেলায় হাজির হয়েছিল শতাধিক বই। কবিতা, দিনলিপি, সাক্ষাৎকার, ইতিহাস, আর ফটোআর্কাইভের ভিড়ে জুলাই এখন যতটা রাজপথের স্মৃতি, ততটাই প্রকাশনার প্রতিযোগিতা। প্রশ্ন হলো, এই বইগুলো কী রাখছে, আর কী রেখে যাচ্ছে বাদ।

ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি ছোট্ট স্টলে ভিড় জমছে বিকেল গড়াতেই। ক্রেতাদের বেশির ভাগই তরুণ, কেউ কেউ গত বছর নিজেই রাস্তায় ছিলেন। তারা যে বই খুঁজছেন তার নাম বদলাচ্ছে ঘণ্টায় ঘণ্টায়, কিন্তু বিষয় একটাই, জুলাই। স্টলের দায়িত্বে থাকা ছাত্র আন্দোলনের দপ্তর সেল সম্পাদক জাহিদ আহসান বলছেন,‘জুলাই নিয়ে মানুষের উদ্দীপনা এখনো বহাল আছে। অভ্যুত্থান নিয়ে মানুষের জানার আগ্রহ লক্ষ্য করছি। স্টলে প্রতিনিয়তই অভ্যুত্থানের বই কিনতে আসছেন মানুষজন।’

অদূরেই প্রথমা প্রকাশনীর স্টলে সাজ্জাদ শরিফ দাঁড়িয়ে কথা বলছেন এক সাংবাদিকের সঙ্গে। তিনি সদ্য সম্পাদনা করেছেন ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাক্ষ্য’ নামের একটি সংকলন, যেখানে ছাত্র, শিক্ষক, রিকশাচালক, পাহাড়ি, বাঙালি, মুসলিম, হিন্দু সব পরিচয়ের মানুষের বয়ান একজায়গায় আনার চেষ্টা হয়েছে, সঙ্গে আন্দোলনের সময়কার পোস্টার, দেয়াললিখন আর স্লোগানের নথি। তার কথায় একটা জরুরি তাগিদ স্পষ্ট, এই মুহূর্তে স্মৃতি এখনো তাজা, এখনই তা লিপিবদ্ধ করার সময়, কারণ স্মৃতি ফিকে হতে সময় লাগে না।

এই দৃশ্যটাই বলে দেয় গত এক বছরে বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে কী ঘটেছে। বাংলা একাডেমি, ছাত্র আন্দোলনের স্টল আর বিভিন্ন প্রকাশনীর হিসাব মিলিয়ে ২০২৫ সালের বইমেলাতেই জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে প্রকাশিত হয় শতাধিক বই। একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ছয় মাসের মাথায় এত বিপুল পরিমাণ প্রকাশনা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু প্রশ্নটা সংখ্যার নয়। প্রশ্নটা হলো, কেন একটি সমাজ কোনো অভ্যুত্থানের পরপরই বই লিখতে বসে যায়, আর সেই বইগুলো আসলে কী রক্ষা করতে চায়।

বিপ্লবের পর বই কেন লেখা হয়

    ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, কোনো গণআন্দোলন বা বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই একধরনের লেখার ঢল নামে। কারণটা মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক দুই দিক থেকেই ব্যাখ্যাযোগ্য। যে মুহূর্ত রাষ্ট্রক্ষমতাকে নাড়িয়ে দেয়, সেই মুহূর্তের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তার লড়াই শুরু হয়ে যায় ঘটনার পরদিন থেকেই। স্মৃতি এখানে নিরপেক্ষ কোনো সম্পদ নয়, বরং প্রতিযোগিতার বিষয়। বাতিঘর প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন লক্ষ করেছেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জুলাই নিয়ে পড়ার আগ্রহ অন্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে বেশি, আর এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নন-ফিকশন। এই আগ্রহটা কেবল কৌতূহল নয়। যারা নিজে রাস্তায় ছিলেন, তাদের কাছে বই হয়ে ওঠে এক ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ, প্রমাণ যে তাদের অভিজ্ঞতা বাস্তব ছিল, এবং তা মুছে যাবে না।

    প্রকাশনার ঢেউ

      এই ঢেউয়ের আকার বোঝার জন্য প্রকাশনীভিত্তিক হিসাবটা জরুরি। ঐতিহ্য প্রকাশনী একাই জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে বের করেছে দশটি বই, যার মধ্যে আছে আরমান আহমেদ সিদ্দিকীর ‘৩৬ জুলাই ২০২৪’, মঈন শেখের ‘জুলাইয়ের অশেষ পাখিরা’, ফরিদ উদ্দিন রনির ‘আত্মনিবেদন: চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে জীবন দিলেন যারা’, অনুপম দেবাশীষ রায়ের ‘বিদ্রোহ থেকে বিপ্লব: নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে জুলাই অভ্যুত্থান’ এবং মুসা আল হাফিজের ‘অভ্যুত্থানের চিন্তাশিখা’। প্রথমা প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে ছয়টি বই। সাজ্জাদ শরিফ সম্পাদিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাক্ষ্য’ ছাড়াও ‘লাল জুলাই: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পথ-পরিক্রমা’, ‘আমিই রাষ্ট্র’, ‘শেখ হাসিনার পতনকাল’, এবং আহম্মদ ফয়েজের ‘সংবাদপত্রে জুলাই অভ্যুত্থান’, যেটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ধরে ঘটনাক্রম পুনর্গঠনের চেষ্টা করে। বরেণ্য গবেষক বদরুদ্দীন উমরের ‘বাঙলাদেশে জুলাই এর গণঅভ্যুত্থান’ প্রকাশ করেছে সংস্কৃতি প্রকাশন, আর প্রথম মুদ্রণ এতটাই দ্রুত বিক্রি হয়ে যায় যে মেলা চলাকালীনই দ্বিতীয় মুদ্রণ আনতে হয় প্রকাশককে। এসবের বাইরে আছে কাব্যগ্রন্থও, পলিয়ার ওয়াহিদের ‘গুলি ও গাদ্দার’ কিংবা জয়েন উদ্দিন সরকার তন্ময়ের ‘জুলাই ও একটি লাল মাশরিক’-এর মতো সংকলন, যেখানে শহীদদের আর আহতদের নিয়ে লেখা কবিতাও জায়গা পেয়েছে।

      সাংগঠনিক উদ্যোগও কম নয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নিজেই ‘তোমার চোখে জুলাই’ নামে একটি সংকলনের জন্য দেশজুড়ে আন্দোলনকারীদের কাছে লেখা আহ্বান করে, উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ আর নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া। ইংরেজি ভাষাতেও কাজ হয়েছে। তরুণ সাংবাদিক মাহমুদ রাকিব লিখেছেন ‘ইকোস অব রেড জুলাই: দ্য ২০২৪ আপরাইজিং ইন বাংলাদেশ’, যেখানে কোটা সংস্কার আন্দোলন কীভাবে ধাপে ধাপে সরকার পতনের দিকে গড়াল তার বিবরণ আছে। ঢাকার বাইরে থেকেও একটি সংকলন এসেছে, ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের জন্য রেজওয়ান রহমান সম্পাদিত ‘দ্য জুলাই রিজলভ’, যেখানে বিচিত্র পেশা আর শ্রেণির মানুষের ছত্রিশটি বয়ান একত্র করা হয়েছে।

      নানা ধরনের জুলাই-বই

        এই বইগুলোকে একই তাকে রাখা ঠিক হবে না, কারণ প্রতিটি ধরন আলাদা কাজ করে। সাংবাদিকতাধর্মী বইগুলো ঘটনাক্রম বাঁধে, কে কবে কী বলল, কোন দিন কোথায় গুলি চলল, তার দিনপঞ্জি তৈরি করে। বদরুদ্দীন উমরের মতো বিশ্লেষণাত্মক বই আন্দোলনটিকে বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বসাতে চায়, প্রশ্ন তোলে এটি ঠিক কী ধরনের অভ্যুত্থান, কার স্বার্থ এতে রক্ষা পেল। সাক্ষ্যভিত্তিক সংকলনগুলো, যেমন সাজ্জাদ শরিফের বই বা ‘দ্য জুলাই রিজলভ’, ইতিহাসকে এক কেন্দ্রীয় বয়ান না বানিয়ে বহু কণ্ঠে ভাগ করে দিতে চায়। কবিতা আর কথাসাহিত্য আবার তথ্যের বাইরে গিয়ে আবেগ আর স্মৃতির আকার ধরে রাখার চেষ্টা করে, যেখানে সংখ্যা নয়, অনুভূতিই প্রধান দলিল। আর পাঠ্যপুস্তকে জুলাইয়ের প্রবেশও একটি নতুন মাত্রা, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি বইয়ে এখন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে আটটি নতুন পাঠ যুক্ত হয়েছে, যার একটিতে আন্দোলনের সময়কার কার্টুন আর গ্রাফিতিকে প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ জুলাই এখন কেবল বইমেলার পণ্য নয়, রাষ্ট্রীয় পাঠ্যক্রমেরও অংশ।

        বই ছাড়াও ডকুমেন্টেশনের অন্য চেষ্টাগুলোও একই তাগিদ থেকে জন্ম নিয়েছে। প্রথম আলো একটি ডিজিটাল আর্কাইভ চালু করেছে, যেখানে ছত্রিশ দিনের আন্দোলনের ঘটনাপঞ্জি, তারিখ, স্থান আর ছবি রাখা হয়েছে। ঢাকার দৃক গ্যালারিতে হয়েছে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনী, ‘আ জার্নি থ্রু জুলাই’ শিরোনামে, যা আয়োজন করে জুলাই ম্যাসাকার আর্কাইভ নামের একটি সংগঠন। এসবের পাশাপাশি জুলাই কাউন্সিল নামের একটি মৌখিক ইতিহাস প্রকল্প শহীদ ও তাদের পরিবারের বয়ান ভিডিও আকারে সংরক্ষণ করছে। বই, আলোকচিত্র, আর মৌখিক ইতিহাস, তিনটি মাধ্যমই একই কাজ করছে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে, স্মৃতিকে কোনো একটি স্থায়ী রূপে বেঁধে ফেলা।

        পুনরাবৃত্ত সুর, আর যা অনুপস্থিত

          এই শতাধিক বই একসঙ্গে পড়লে কিছু সুর বারবার ফিরে আসে। আবু সাঈদের নাম প্রায় প্রতিটি সংকলনেই আছে, রংপুরের এই তরুণ জুলাইয়ের প্রথম শহীদদের একজন হিসেবে একরকম প্রতীকী মর্যাদা পেয়ে গেছেন। কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ, আর গণভবনে জনতার প্রবেশের দৃশ্যও ফিরে ফিরে আসে প্রায় প্রতিটি বইয়ে, কারণ এগুলো সবচেয়ে বেশি ক্যামেরাবন্দী আর সবচেয়ে বেশি আলোচিত মুহূর্ত। কিন্তু এই পুনরাবৃত্তিই একটি সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। যা বারবার লেখা হচ্ছে, তা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক, আর দৃশ্যমান সহিংসতাকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতা। জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা প্রায় চৌদ্দশো ছুঁয়েছিল, অথচ যারা রাজধানীর বাইরে, প্রত্যন্ত জেলা শহরে বা গ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের বয়ান এখনো তুলনামূলক কম। শ্রমজীবী মানুষ, নারী আন্দোলনকারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বইয়ের পাতায় জায়গা পায়নি। ছাত্র আন্দোলনের নিজস্ব নেতৃত্বের ভেতরের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে টানাপোড়েন, এসব বিষয় এখনো বেশির ভাগ বইয়ে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এটা স্বাভাবিক, কারণ যারা লিখছেন তাদের অনেকেই এখনো এই রাজনীতির ভেতরেই আছেন। দূরত্ব ছাড়া নিরপেক্ষ ইতিহাস লেখা কঠিন, আর জুলাইয়ের এখনো এক বছরও পার হয়নি।

          যখন প্রত্যক্ষদর্শী লেখক হয়ে ওঠেন

            এই ঢেউয়ের সবচেয়ে অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে লেখক আর ঘটনার চরিত্র প্রায়ই একই মানুষ। যিনি রাস্তায় ছিলেন, গুলির শব্দ শুনেছেন, বন্ধু হারিয়েছেন, তিনিই কলম ধরছেন। সাংবাদিকতার চিরাচরিত দূরত্ব এখানে অনুপস্থিত, বরং তার জায়গায় আছে সরাসরি সাক্ষ্য। এটি একদিকে বইগুলোকে অসাধারণ জীবন্ততা দেয়, আবার অন্যদিকে প্রশ্ন তোলে বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে। যিনি নিজে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বা যার সন্তান মারা গেছে, তার কাছে ঘটনার একটি ব্যাখ্যাই সত্য মনে হবে, বিকল্প ব্যাখ্যা শোনার মানসিক জায়গা তখন সংকুচিত থাকে। এটা দোষের কিছু নয়, বরং মানবিক এক বাস্তবতা। কিন্তু ইতিহাস রচনার জন্য এই ঘনিষ্ঠতা একইসঙ্গে সম্পদ আর সীমাবদ্ধতা। ইতিহাসবিদদের কাছে প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান মূল্যবান কাঁচামাল, কিন্তু তা চূড়ান্ত ইতিহাস নয়, বরং ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদের জন্য এক ধরনের উপাদান, যা যাচাই, তুলনা আর পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

            আন্তর্জাতিক পরিসরেও এই ঘটনা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে গেছে, এবং সেখানে দূরত্বটা কিছুটা হলেও ফিরে এসেছে। ব্রিলের ‘জার্নাল অব বাংলাদেশ স্টাডিজ’ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে, যা সম্পাদনা করেছেন আরিল্ড এঙ্গেলসেন রুড আর মুবাশ্বার হাসান। এই ধরনের একাডেমিক কাজ ধীরে ধীরে সেই দূরত্ব তৈরি করবে, যা প্রত্যক্ষদর্শীর বই একা দিতে পারে না। বৈশ্বিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনও একই কাজ করছে ভিন্ন ভাষায়, সংখ্যা আর কাঠামোগত বিশ্লেষণের ভাষায়, যেখানে ব্যক্তিগত আবেগের বদলে জবাবদিহিতার প্রশ্ন প্রধান হয়ে ওঠে। দেশের ভেতরের বই আর দেশের বাইরের গবেষণা, এই দুইয়ের মধ্যে একটা দূরত্ব এখনো স্পষ্ট, বাংলায় লেখা বইগুলো যতটা আবেগ আর অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক, ইংরেজি একাডেমিক প্রকাশনাগুলো ততটাই কাঠামো আর নীতিকেন্দ্রিক। ভবিষ্যতে এই দুই ধারা কতটা একে অপরের সঙ্গে কথা বলবে, তার ওপর নির্ভর করবে জুলাইয়ের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কতটা সম্পূর্ণ হয়ে উঠবে।

            প্রকাশনা শিল্পের ভেতরের প্রতিযোগিতাও এই মুহূর্তের একটি বাস্তবতা। একটি ঘটনা নিয়ে যখন একসঙ্গে এত প্রকাশনী ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন বাণিজ্যিক তাড়না আর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার সীমারেখা অনেক সময় ঝাপসা হয়ে যায়। প্রথমার বিক্রয়কর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী জুলাই নিয়ে প্রকাশিত প্রায় প্রতিটি বই-ই ভালো বিক্রি হচ্ছে, আর এই বাজার-সাফল্য স্বাভাবিকভাবেই আরও প্রকাশককে উৎসাহিত করবে। এতে ভালো দিক যেমন আছে, তেমনি ঝুঁকিও আছে, তাড়াহুড়ো করে লেখা বই কখনো কখনো যাচাই ছাড়াই তথ্য পরিবেশন করতে পারে। ছাত্র আন্দোলনের নিজস্ব প্রতিনিধিরাই তাই লেখকদের কাছে নির্মোহ ইতিহাস রচনার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে অতিরঞ্জনের পুরনো প্রবণতা নতুন করে ফিরে না আসে।

            আগামী দিনের পাঠক যেভাবে পড়বেন

              দশ বা বিশ বছর পর কেউ যখন এই বইগুলোর তাক খুলবে, তখন হয়তো প্রথমেই চোখে পড়বে সংখ্যাটা, এত অল্প সময়ে এত বই। সেই পাঠক হয়তো বুঝবেন, এই তাড়াহুড়োর পেছনে ছিল ভয়, ভয় যে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ইতিহাস আবার নতুন করে লেখা হয়ে যেতে পারে, যেমনটা বাংলাদেশে আগেও ঘটেছে। একই ঘটনার এত রকম বয়ান পাশাপাশি রাখলে ভবিষ্যতের পাঠক বুঝবেন, জুলাই কোনো একরৈখিক গল্প ছিল না, বরং একই সময়ে বহু মানুষের বহু রকম অভিজ্ঞতার সমষ্টি। আর যেসব কণ্ঠ এখনো অনুপস্থিত, তাদের অনুপস্থিতিও একধরনের তথ্য, ভবিষ্যতের গবেষকের জন্য একটি প্রশ্নচিহ্ন হয়ে থাকবে, কারা লিখতে পারেননি, আর কেন পারেননি।

              বই বিস্মৃতিকে পুরোপুরি ঠেকাতে পারে না, কিন্তু তা বিস্মৃতির গতি কমিয়ে দেয়। জুলাইয়ের শতাধিক বই আসলে সেই ধীর করে দেওয়ার একটি সমষ্টিগত প্রচেষ্টা, যার ফলাফল বোঝা যাবে আরও অনেক বছর পর। ●

              দ্রষ্টব্য: জুলাই-সংক্রান্ত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক হলেও, প্রতিটি শিরোনামের প্রকাশকাল, আইএসবিএন ও পৃষ্ঠাসংখ্যা স্বতন্ত্রভাবে যাচাইযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করা প্রতিটি ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি বলে এই প্রতিবেদনে কেবল সেসব বই বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যেগুলোর অস্তিত্ব, লেখক ও প্রকাশক নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে নিশ্চিত।


              Picture of দ্য পাবলিশ

              দ্য পাবলিশ

              অনুসন্ধান, গল্প, প্রবন্ধ ও মুক্তচিন্তার স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম।
              শেয়ার

              আরও পড়েন

              দুর্গের ভেতরে কয়েক হাজার সৈন্য, বাইরে প্রায় লক্ষাধিক উসমানীয় সেনা। এই লড়াই চলেছিল এক মাস, আর দুর্গ পতনের আগেই শেষ অভিযানে মৃত্যুবরণ করেন সুলতান সুলেমান।

              দ্য পাবলিশ

              উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁর সিনেমায় ফিরে যাওয়ার জন্য এই দশটি ছবি একটি ভালো শুরু।

              দ্য পাবলিশ নিউজরুম

              ছবিটি দেখে পাবলো পিকাসো বলেন “চার্চিল চাইলে পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারতেন, যদি না তাঁর সময় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকত”।

              কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

              যখন একটা গেমের পেছনে এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, তখন ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে।

              দ্য পাবলিশ নিউজরুম

              Scroll to Top