ঢাকার একটি প্রেক্ষাগৃহে বসে থাকা দর্শক আজ যদি ২০২৪ সালের জুলাই মাসের কথা মনে করতে চান, তাঁকে যেতে হবে ইউটিউবে, ফেসবুক রিলে, অথবা কারও মোবাইল ফোনে তোলা কাঁপা কাঁপা এক ভিডিওতে। প্রেক্ষাগৃহে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে না কোনো নির্মিত দৃশ্য, কোনো অভিনেতার মুখ, কোনো পরিচালকের ভাষ্য। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাবে সেই জুলাই-আগস্টে প্রায় চোদ্দশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, পনেরো বছরের একটি সরকার পতনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার হাতবদল ঘটেছিল একটি ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের মাধ্যমে। অথচ দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এই ঘটনাকে তার নিজস্ব ভাষায় এখনো ধরতে পারেনি। যে জাতি একটি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করছে, তার পর্দায় এখনো সেই মুহূর্তের কোনো স্থায়ী প্রতিচ্ছবি নেই।
এই অনুপস্থিতি আকস্মিক নয়, আবার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যাতীতও নয়। এটি একধরনের সাংস্কৃতিক লক্ষণ, যা প্রশ্ন তোলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-অবকাঠামো, রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক এবং সামষ্টিক স্মৃতির ধরন নিয়ে।
জুলাইয়ের দৃশ্যগুলো ইতিমধ্যে মানুষের মোবাইল ফোনে, ফেসবুক ফিডে বহুবার দেখা হয়ে গেছে।
রাজনৈতিক ঘটনা স্মৃতিতে টিকে থাকার জন্য কেবল ঘটনা হলেই চলে না, তার একটি আখ্যান দরকার হয়, এমন একটি রূপ যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করা যায়। খবরের কাগজ পুরনো হয়, সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট হারিয়ে যায় অ্যালগরিদমের স্রোতে, কিন্তু চলচ্চিত্র একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তকে জমাট করে রাখে, বারবার দেখা যায়, বিশ্লেষণ করা যায়, নতুন প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়াংজু গণহত্যা ১৯৮০ সালে ঘটেছিল, কিন্তু সেই ঘটনা জাতীয় স্মৃতিতে নতুন করে প্রাণ পায় ২০১৭ সালে, যখন “এ ট্যাক্সি ড্রাইভার” ছবিটি বক্স অফিসে বিপুল সাফল্য পায় এবং একটি নতুন প্রজন্মের কাছে গোয়াংজুকে পরিচিত করে তোলে। চিলিতে পিনোশের একনায়কতন্ত্রের স্মৃতি এখনো জীবন্ত, তার একটা বড় কারণ পাবলো লারাইনের নির্মিত ত্রয়ী, যেগুলো সপ্তদশ বছরের সামরিক শাসনের আঘাত ও ট্রমাকে বারবার নতুন কোণ থেকে দেখায়। চলচ্চিত্র কেবল ঘটনার দলিল নয়, এটি একটি জাতির নিজের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমও বটে।
বাংলাদেশের বিস্ময়কর নীরবতা
জুলাই নিয়ে একেবারে কিছু হয়নি, তা বলা ভুল হবে। কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি হয়েছে, তবে তাদের বেশিরভাগই দেশের সীমানার বাইরে দর্শকের কাছে পৌঁছেছে। “দীপক কুমার গোস্বামী স্পিকিং” নামের একটি একুশ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র, যা একজন সংখ্যালঘু হিন্দু ছাত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা, লন্ডনের ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রদর্শিত হয়েছে, দেশে নয়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে নির্মিত “আমাদ’স ড্রিম” প্রামাণ্যচিত্রটি যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিস, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও কানাডার উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে, দেশীয় প্রেক্ষাগৃহে নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও এগিয়ে এসেছে বরং বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্পের চেয়ে দ্রুত, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ২০২৫ সালের জুলাইয়ে “দ্য ব্যাটেল ফর বাংলাদেশ” নামের এক অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করে, আর আল জাজিরা একই মাসে “হাসিনা: থার্টি সিক্স ডেজ ইন জুলাই” নামের অনুসন্ধানী চলচ্চিত্র প্রকাশ করে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে সরকার “ট্রায়াল অব জুলাই ম্যাসাকার” নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করে, কিন্তু তা তদন্তমূলক সাংবাদিকতার চেয়ে বেশি ছিল রাষ্ট্রীয় ভাষ্য।
পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও করুণ। জুলাই আন্দোলনকে প্রেক্ষাপট করে নির্মিত প্রথম উল্লেখযোগ্য কাহিনিচিত্র “এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি” মুক্তি পায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, ঘটনার প্রায় দেড় বছর পর, এবং তা এসেছে স্বাধীন প্রযোজনা থেকে, মূলধারার কোনো স্টুডিও থেকে নয়। বাণিজ্যিক ধারার জনপ্রিয় পরিচালক রায়হান রাফি ঘটনার তিন মাসের মধ্যেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি শহীদ মুগ্ধকে নিয়ে অথবা শেখ হাসিনার পলায়ন নিয়ে ছবি বানাবেন, এমন সত্যকাহিনি বলতে তাঁর ভালো লাগে বলে জানিয়েছিলেন। দেড় বছর পরও সেই ছবির কাজ শুরু হয়নি; বরং তিনি অন্য একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ের চলচ্চিত্র “প্রেশার কুকার” নির্মাণ ও মুক্তি দিয়েছেন ২০২৬ সালের মার্চে।
তুলনা করলে বই প্রকাশের গতি চোখে পড়ার মতো। ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলার মূল প্রতিপাদ্যই ছিল “জুলাই গণঅভ্যুত্থান: নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ”, ঘটনার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে। বই লেখা যায় একজন লেখকের ডেস্কে বসে, একা, স্বল্প পুঁজিতে। চলচ্চিত্র তা পারে না। একটি ছবির জন্য দরকার পুঁজি, অনুমতি, প্রযোজক, শুটিং লোকেশন, সেন্সর ছাড়পত্র, পরিবেশক, এবং সবচেয়ে বেশি দরকার সময়, এমন এক বিলাসিতা যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দুর্লভ।
কেন যেটুকু তৈরি হয়েছে, তা দর্শক পায়নি
যে কটি প্রামাণ্যচিত্র বা নাটক তৈরি হয়েছে, সেগুলোরও বিতরণ ব্যবস্থা দুর্বল। দেশের বাইরে সংসদ ভবন বা আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শনী হয়েছে, কিন্তু ঢাকার কোনো প্রেক্ষাগৃহে বা কোনো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক দর্শকের কাছে তা পৌঁছায়নি। এর একটা কারণ কাঠামোগত। চোরকির প্রধান নির্বাহী রেদওয়ান রনি বলেছেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট হলো পেশাদার প্রযোজকের অভাব, যিনি টাকা ঢালেন তিনিই সবসময় প্রকৃত প্রযোজক নন। রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে যখন কেউ পুঁজি ঢালতে দ্বিধা করেন, তখন প্রকল্প আটকে থাকে ধারণাতেই, উৎপাদনে পৌঁছায় না।
দর্শকের দিক থেকেও একধরনের ক্লান্তি কাজ করছে। জুলাইয়ের দৃশ্যগুলো ইতিমধ্যে মানুষের মোবাইল ফোনে, ফেসবুক ফিডে বহুবার দেখা হয়ে গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীর তোলা কাঁচা ফুটেজ, রক্তাক্ত রাস্তা, স্লোগানের ভিডিও, এসব এত সহজলভ্য যে দর্শকের কাছে নির্মিত সিনেমার প্রয়োজনীয়তা তাৎক্ষণিকভাবে অনুভূত হয় না। সামাজিক মাধ্যম এখানে তথ্যচিত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে, যদিও তার স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষমতা দুর্বল। গ্রাসরুট আর্কাইভিং সংগঠনগুলো, যেমন জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স বা জুলাই ম্যাসাকার আর্কাইভ, প্রমাণ সংরক্ষণের কাজ করছে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই, যা মূল্যবান, কিন্তু বড় পর্দার বিকল্প নয়।
শিল্পের ভেতরকার কাঠামোগত বাধা
জুলাইয়ের পরপরই চলচ্চিত্র সমাজ সংস্কারের দাবিতে সরব হয়েছিল। শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরে “জুলাই পাবলিক স্ফিয়ার” নামের একটি নাগরিক উদ্যোগে পরিচালক কামার আহমাদ সাইমন একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন, শিরোনাম ছিল “সিনেমা এক অজুহাত মাত্র”, যা স্বাধীন চলচ্চিত্রকার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। জাতীয় চলচ্চিত্র কমিশন গঠনের প্রস্তাব ওঠে, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ভেতরে নতুন কমিটি গঠিত হয়, সেন্সরশিপ আইন বাতিলের দাবি জানায় তরুণ নির্মাতাদের একটি জোট। কিন্তু দেড় বছর পরও এই সংস্কার-প্রক্রিয়া মূলত আলোচনাসভা আর প্রস্তাবের স্তরেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
এখানে একটি গভীরতর সমস্যা আছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বরাবরই রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে জড়িয়ে থেকেছে। দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনে বহু প্রতিষ্ঠিত নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী রাষ্ট্র-সমর্থিত প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন, প্রয়োজনের তাগিদেই। অভ্যুত্থানের পর তাঁদের অনেককে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে, তাঁদের প্রকল্প স্থগিত হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রের আখ্যানও বদলে যাওয়ার এই প্রবণতা নতুন নয়, রাজনৈতিক দল বদলালে আগের ইতিহাসও নির্বাচিতভাবে মুছে যায় বা নতুন করে লেখা হয়, যেমনটি ঘটেছিল একাধিক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জীবনীচিত্রের ক্ষেত্রে। এই অস্থিরতার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী, ব্যয়বহুল একটি প্রকল্পে বিনিয়োগ করা অনেক প্রযোজকের কাছেই ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছে।
রাজশাহীতে সরকার পতনের পরপরই একটি সিনেপ্লেক্সে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছিল, যা “বঙ্গবন্ধু” নামের সংযোগের কারণে লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এই ধরনের ঘটনা দেখায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের তাৎক্ষণিক পরিবেশে চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানকে কতটা দুর্বল করে তোলে, নির্মাতাদের কাছে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস কমিয়ে দেয়।
তুলনামূলক ইতিহাস কী শেখায়
রাজনৈতিক সিনেমার ইতিহাস বলে, স্থায়ী চলচ্চিত্র প্রায়ই ঘটনার অনেক বছর পর তৈরি হয়। রোমানিয়ায় চাউশেস্কুর পতন ঘটে ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে, কিন্তু রোমানিয়ান নিউ ওয়েভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবিগুলো, যেমন করনেলিউ পোরুম্বোইউর “টুয়েলভ ও এইট ইস্ট অব বুখারেস্ট”, এসেছে ২০০৬ সালে, প্রায় সতেরো বছর পর। চিলিতে পিনোশের একনায়কতন্ত্র শেষ হয় ১৯৯০ সালে, কিন্তু পাবলো লারাইনের ট্রয়ী চলচ্চিত্র তৈরি হয় ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে। দক্ষিণ কোরিয়ায় গোয়াংজুর গণহত্যা আর তার বাণিজ্যিকভাবে সফল সিনেমার মধ্যে দূরত্ব সাঁইত্রিশ বছরের। এই সময়ের ব্যবধান কাকতালীয় নয়, এটি প্রায়ই রাজনৈতিক নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় দূরত্ব, একটি ঘটনার সব পক্ষ, তার ন্যায়বিচার, তার স্মৃতিচর্চা মীমাংসিত হওয়ার সময়।
তবে ব্যতিক্রমও আছে, এবং সেগুলো শিক্ষাপ্রদ। পোল্যান্ডে সলিডারিটি আন্দোলনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আন্দ্রেই ভাইদা ১৯৮০ সালের গদানস্ক ধর্মঘটের এক বছরের মধ্যেই “ম্যান অব আয়রন” নির্মাণ করেন এবং ১৯৮১ সালের কান উৎসবে সর্বোচ্চ পুরস্কার পাম দ’অর জেতেন। এটি সম্ভব হয়েছিল কারণ সামরিক আইন জারির আগে সংক্ষিপ্ত এক সময়ের জন্য সেন্সরশিপে একটি ফাঁক তৈরি হয়েছিল, যা ভাইদা দ্রুততার সঙ্গে কাজে লাগান। ইউক্রেনে মাইদান বিপ্লবের পরের বছরই নেটফ্লিক্স প্রযোজিত “উইন্টার অন ফায়ার” প্রামাণ্যচিত্র মুক্তি পায় ২০১৫ সালে, যা আন্তর্জাতিক পুঁজি ও বিতরণ নেটওয়ার্কের সহায়তায় দ্রুত সম্পন্ন হওয়া সম্ভব হয়েছিল, স্থানীয় শিল্পের একার শক্তিতে নয়। ইরানের ক্ষেত্রে ইসলামি বিপ্লবের পর সেন্সরশিপ কঠোর হলেও চলচ্চিত্র বন্ধ হয়ে যায়নি, বরং কিয়ারোস্তামি, মাখমালবাফ, জাফর পানাহির মতো পরিচালকদের হাতে একটি নতুন “নিউ ওয়েভ” জন্ম নেয় বিধিনিষেধের ভেতর দিয়েই।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এই দুই ধরনের উদাহরণ থেকেই আলাদা। এখানে না আছে ইউক্রেনের মতো আন্তর্জাতিক পুঁজির দ্রুত সহায়তা, না আছে পোল্যান্ডের মতো একজন প্রতিষ্ঠিত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিচালক যিনি ঝুঁকি নিয়ে মুহূর্তটি ধরে ফেলতে পারেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প নিজেই এখনো কোভিড-উত্তর সংকট, প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থেকে সেরে ওঠার চেষ্টা করছে। একটি দুর্বল শিল্প একটি বিশাল ঐতিহাসিক দায়িত্ব একা বহন করতে পারে না।
যা হারানোর ঝুঁকিতে আছে
সামষ্টিক স্মৃতি কেবল ঘটনার তালিকা নয়, এটি একটি জাতি নিজের সম্পর্কে কী গল্প বলে তার সমষ্টি। সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও তাৎক্ষণিক সত্যকে ধরে রাখে, কিন্তু তার কোনো নির্মিত দৃষ্টিভঙ্গি নেই, কোনো ব্যাখ্যার কাঠামো নেই, এবং প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম ও কোম্পানির নীতির ওপর তার অস্তিত্ব নির্ভরশীল। জুলাই কাউন্সিলের মতো মৌখিক ইতিহাস উদ্যোগ শহীদদের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার সংরক্ষণ করছে, একটি প্রশংসনীয় প্রয়াস, কিন্তু আর্কাইভ আর সিনেমা এক জিনিস নয়। আর্কাইভ তথ্য রক্ষা করে, সিনেমা অর্থ তৈরি করে, এবং অর্থই মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী হয়।
যদি জুলাই কখনো তার নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষা খুঁজে না পায়, তাহলে আগামী প্রজন্মের কাছে এই ঘটনা থেকে যাবে বিক্ষিপ্ত ভিডিওর সংকলন হিসেবে, কোনো সংহত আখ্যান ছাড়াই। এবং যেসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রকৃতি, সাধারণ মানুষের সাহস, ক্ষমতার দুর্বলতা, সেসব প্রশ্ন হারিয়ে যাবে দৈনন্দিন রাজনৈতিক কোলাহলে।
একটি জাতি কেবল তার ইতিহাস দিয়ে স্মরিত হয় না, স্মরিত হয় সেই ইতিহাসকে বলার জন্য সে যেসব গল্প তৈরি করে অথবা করতে ব্যর্থ হয়, তার মধ্য দিয়েও। বাংলাদেশ জুলাইয়ে যা করেছে তা রাজনৈতিকভাবে অসাধারণ, কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে তার প্রতিধ্বনি এখনো অসম্পূর্ণ। হয়তো সেই চলচ্চিত্র আসবে আরও কয়েক বছর পর, যখন রাজনৈতিক ধুলো থিতিয়ে আসবে, যখন কোনো নির্মাতা রোমানিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো যথেষ্ট দূরত্ব পাবেন গল্পটিকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য। অথবা হয়তো, পোল্যান্ডের ভাইদার মতো, কেউ ঝুঁকি নিয়ে এখনই লিখে ফেলবেন সেই মুহূর্তের কাব্য। যতক্ষণ তা না ঘটে, ততক্ষণ জুলাই বেঁচে থাকবে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে, খণ্ডিত, ক্ষণস্থায়ী, এবং প্রতিদিন একটু একটু করে বিস্মৃতির দিকে সরে যেতে থাকবে।